ভারতীয় পুরাণ, সংস্কৃত সাহিত্য থেকে পারস্যের সুফি সাহিত্যে পাখির সরব উপস্থিতি দেখা যায়। পারস্যের বিশিষ্ট সুফি কবি ফরিদউদ্দিন আত্তার দ্বাদশ শতকে রচনা করেছিলেন তার বিখ্যাত কাব্য মানতিক-উত তায়ের। ইংরেজিতে এ বইয়ের নাম দ্য কনফারেন্স অব দ্য বার্ডস, বাংলায় অনুবাদ করলে সহজে বলা যায় ‘পাখিদের সম্মেলন’। দুনিয়ার সব পাখি এক জায়গায় হয় তাদের মধ্যে কে সত্যিকার স্বাধীন সেটা নির্ধারণ করতে। কারণ তারা সবাই জানে, তারা সত্যিই পরমার্থে স্বাধীন নয়। পাখিদের এ সমাবেশে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিল হুপু পাখি। এ জ্ঞানী পাখি পরামর্শ দেয় আরেক পাখিকে খুঁজে বের করার। এ কাঙ্ক্ষিত পাখিটি হলো পারস্যের পৌরাণিক সিমোর্গ।

আত্তারের মানতিক-উত তায়ের ধর্মীয় ও অধ্যাত্মবাদী দর্শনবিষয়ক কাব্য হলেও এতে রস ও কাহিনীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ছোট ছোট গল্পে তিনি তার দার্শনিক বার্তা দিয়েছেন পাঠককে, গুরুগম্ভীর বার্তা পড়তে গিয়েও পাঠক ক্লান্ত হবেন না। অধ্যাত্মবাদী ধারণায় ‘সত্য’ উপরিতলে পাওয়া যায় না, বরং সত্যকে অনুসন্ধান করতে হয়। আর এ ধারণার প্রেক্ষিতে সুফি সাহিত্যে রূপকের ব্যবহার দেখা যায়। কারণ রূপকে মূল বার্তাটি সরাসরি দেয়া হয় না, বরং সেটা ভেবে বের করতে হয়। আত্তারের হুপু পাখি হল সুফি শেখের মতো, যিনি একদল মানুষকে ধর্মের পথে চলতে নেতৃত্ব দেন। পাখিদের সম্মলেন কাব্যে এই হুপু পাখি আত্তার নিজেই আর পাঠকরা হলেন অন্য পাখিরা। এই পাখিরা মানুষের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে। যেমন- পাপিয়া হলো প্রেমিক, ফিঞ্চ ভীতু মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে। সিমোর্গ খুঁজতে যাওয়ার যাত্রায় পাখিদের অনেকে নানা কারণ দেখিয়ে অনীহা প্রকাশ করে। এসব কারণ প্রকৃতপক্ষে মানব চরিত্রেরই নানা সীমাবদ্ধতা। সিমোর্গের দিকে যাত্রায় হুপু পাখির বেশে মানুষের সব সীমাবদ্ধতার জবাব দেন কবি, সুফি ফরিদউদ্দিন আত্তার।

পারস্য সংস্কৃতিতে, পুরাণে পাখির প্রভাব ছিল। প্রাক-ইসলামী পারস্যের পুরাণ, রূপকথায় পাওয়া যায় হোমা পাখির কথা। পরবর্তী সময়ে পারস্যের মুসলিম সুফি কবিরা তাদের কবিতায় হোমাকে অহরহ ব্যবহার করেছেন।

শার্ল বোদলেয়ার যুগসন্ধিক্ষণের কবি। তিনি কবিতায় আধুনিকতার শুরু। আধুনিক কবিকে নির্দিষ্ট করতে বোদলেয়ার ব্যবহার করেছিলেন অ্যালবাট্রসকে। দি অ্যালবাট্রস কবিতায় বোদলেয়ার দেখিয়েছেন আধুনিক কাল কবিকে সমাজের প্রভাবশালী পরিচয় থেকে তুলে নিয়ে প্রান্তিক অচ্ছুত চরিত্রে পরিণত করেছেন। কবির সব রহস্য আধুনিক সমাজ উন্মোচন করে দিয়েছে। তার কাছে আর কোনো পবিত্র ভাবনা নেই, কাব্য নেই, যা তাকে সমাজে সম্মানিত করে রাখবে। রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা, অবিশ্বাসের স্রোতে কবির সব রহস্য উন্মোচিত হয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ারের দি অ্যালবাট্রসের অনুবাদ করেছেন আলবাট্রস নামে—

 

মাঝে মাঝে, সকৌতুকে, নাবিকেরা তাকে ধরে ফেলে।

বিশাল আলবাট্রস, সমুদ্রের বিহঙ্গপুঙ্গব,

তিক্ত ফেনা পেরিয়ে যে চলে আসে মৃদুমন্দ তালে,

জাহাজের সহযাত্রী, সঙ্গদাতা, পথের বান্ধব।


যে-মুহূর্তে ওরা তাকে ধরে এনে রাখে পাটাতনে,

লজ্জায় বিকল এই নীলিমার সম্রাট তখনই

বিরাট, করুণ, শুভ্র ডানা তার, ক্ষুব্ধ নিপাতনে

নাড়ে, যেন দাঁড়-ভাঙ্গা, অসহায়, সন্ত্রস্ত তরণী।

এই সে-আকাশযাত্রী, কত রূপ ছিল সম্প্রতি ও!

অপ্রতিভ কুশ্রীতায় প্রহসন-পুত্তলি এখন!

কারো বা খুঁড়িয়ে-চলা বিদ্রূপে সে অনুকরণীয়,

অথবা হুঁকোর নল চঞ্চুপুটে দেয় কণ্ডুয়ন!

মেঘলোকে যুবরাজ! এইমতো, কবিও হেলায়

তুফানে ঝাপট দেয়, ব্যর্থ করে কিরাতের ফলা;

কিন্তু এই মৃত্তিকার নির্বাসনে, উল্লোল মেলায়

মহান ডানার ভারে অবরুদ্ধ হয় তার চলা।

 

বোদলেয়ার দি অ্যালবাট্রস কবিতায় কবি ও অ্যালবাট্রসের তুলনায় নির্মাণ করেছেন এক আকালিক চিত্ররূপ। বিরাট ডানা মেলে অতল সাগর জলের ওপর রাজার মতো ভেসে বেড়ায় অ্যালবাট্রস, কিন্তু বাতাসের এমন রাজা জাহাজের নাবিকের হাতে বন্দি হয়ে মর্যাদা হারিয়ে ম্রিয়মাণ। বোদলেয়ার কবিকে বলেছেন মেঘের দেশের রাজা, কিন্তু দুনিয়ার মানুষের ভিড়ে সেই রাজা হারিয়ে ফেলে তার ওড়ার শক্তি। আধুনিক দুনিয়ায় কবিকে কাজের মানুষ হতে হবে, শুধু মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়িয়ে লাভ নেই। কবির কল্পনা, নৈতিকতার কোনো মূল্য আধুনিকতার কাছে নেই, সে আস্থা রাখে বস্তুগত উপযোগিতায়। মধ্যযুগের সম্মানিত, রাজা কবি আধুনিক শহরে এসে পথের ধুলোয় খাবি খায় হাজারো মানুষের ভিড়ে, ঠিক যেভাবে জাহাজের ডেকে অপমানে মিশে যায় অ্যালবাট্রস।

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার লিখেছেন দ্য ফিনিক্স অ্যান্ড দ্য টার্টল। এ সংক্ষিপ্ত কবিতাটিকে কবির প্রথম মেটাফিজিক্যাল কবিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একদিকে পৌরাণিক ফিনিক্স পাখি, অন্যদিকে টার্টলডোভ নামে এক জাতের ঘুঘু।

পার্সি বিশি শেলি ১৮২০ সালের জুনে লিখেছিলেন তার অন্যতম বিখ্যাত কবিতা ‘টু আ স্কাইলার্ক’। ইতালির লিভোরনোতে স্ত্রী মেরি শেলির সঙ্গে এক সান্ধ্য ভ্রমণের সময় শেলির মাথায় কবিতাটির ধারণা উদয় হয়েছিল। সেই সন্ধ্যা এবং তার স্বামীর ভাবনা নিয়ে মেরি পরবর্তীকালে বলেছিলেন, ‘সেটা ছিল গ্রীষ্মের এক সুন্দর সন্ধ্যা। আমরা হাঁটছিলাম জোনাকিদের ভিড়ে মেদিগাছের ঝোপে ভরা অলিগলি দিয়ে, শোনা যাচ্ছিল স্কাইলার্কের গান।’ শেলির কবিতার প্রথম লাইন থেকে নোয়েল কোয়ার্ড তার নাটকের নাম দিয়েছিলেন Blithe Spirit।

জন কিটসের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাগুলোর একটি ওড টু আ নাইটিঙ্গেল। ১৮১৯ সালে এক বড়ই গাছের তলায় বসে তিনি লিখেছিলেন কবিতাটি। নাইটিঙ্গেল পাখিকে ব্যবহার করে কিটস কথা বলেছেন মৃত্যু, হত্যা, অমরত্ব নিয়ে; বর্ণনা করেছেন এসব বিষয়ে তার ব্যক্তিগত ধারণা। নাইটিঙ্গেলকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে কবিতা লেখার চর্চা বহুদিনের।  

জেমস হেনরির (১৭৯৮-১৮৭৬) কবিতা ‘পিজিয়নস’ শুরু হয়েছে এভাবে—‘কোন ভুলে কবুতরগুলোকে এত সুখী করে সৃষ্টি করা হয়েছে...’, কবুতরকে ব্যবহার করে এমন কবিতা বিরল। বিশেষত হেনরির সমসাময়িক অন্য কবি কিটস, টেনিসন কিংবা ব্রাউনিং এর চেয়ে একেবারে ভিন্ন এ কবিতা।

এমিলি ডিকিনসন লিখেছিলেন কবিতা ‘হোপ ইজ দ্য থিং উইথ ফেদারস’। স্যামুয়েল কোলরিজ (১৭৯২-১৮৩৪) লিখেছিলেন ‘দ্য রিম অব দ্য অ্যানশিয়েন্ট ম্যারিনার’— এ কবিতায় এক বৃদ্ধ তার সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার গল্প বলে, এক অ্যালবাট্রসকে হত্যার পর তার জীবনে দুর্ভাগ্য নেমে এসেছিল। কবিতাতে কোলরিজ শুনিয়েছেন জীবে দয়া করার সেই আদি নৈতিকতাকে—

 

যে বেশি ভালবাসে, সেই সবচেয়ে পবিত্র প্রার্থনা করে

বড় কিংবা ছোট—

ঈশ্বর যাই সৃষ্টি করেছেন না কেন

সবাইকেই তিনি ভালবাসেন।

 

প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠুর হওয়ার অপরাধবোধ কোলরিজের কবিতার মূল সুর। এই নিষ্ঠুরতা ছিল সেই বৃদ্ধ নাবিকের হাতে একটি অ্যালবাট্রসের হত্যাকাণ্ড এবং সেই পাপে বিদ্ধ নাবিকের মনোবেদনা। কবিতায় তার এভাবে অপরাধবোধ বয়ে বেড়ানো এবং অ্যালবাট্রসের হত্যাকাণ্ড সে যুগে পাঠকদের এতটা প্রভাবিত করেছিলেন যে কোনো বিষয়ে অপরাধবোধ অনুভব করে বিষণ্নতাকে দেখলে মানুষ বলে উঠত ‘ওয়্যারিং অ্যান অ্যালবাট্রস অ্যারাউন্ড ইয়োর নেক’। 

কোলরিজ শুনিয়েছিলেন অ্যালবাট্রস হত্যার পর নাবিকের মনোবেদনার কথা, আর লেখক ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিদ টেরি টেম্পেস্ট উইলিয়ামস তার বই রিফিউজে মায়ের অসুস্থতা নিয়ে লিখেছেন—আমি পাখিদের কাছে প্রার্থনা করি কারণ আমার বিশ্বাস তারা আমার হূদয়ের প্রার্থনা উর্ধ্ব গগনে পৌঁছে দেবে। তাদের কাছে প্রার্থনা করি কারণ আমি তাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি। পাখিরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেসব বিষয়ের কথা যেগুলো আমি ভালোবাসি। আমার প্রার্থনার শেষে তারা আমাকে শেখায় কীভাবে শুনতে হবে।

১৯৯৩ সালে ব্রিটিশ লেখক সেবাস্তিয়ান ফকস প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস লিখেছিলেন বার্ডসঙ। গাছে পাখিদের আনাগোনা, কিচিরমিচির বিশ্বযুদ্ধের আহত জীবনে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছিল।

ঈশপের গল্পে দেখা যায় নীতিশিক্ষায় পাখিদের চরিত্রের ব্যবহার। ঈশপের এক গল্পে দেখা যায় একটি মোরগ তার পরিবারের জন্য খাবার খুঁজতে গিয়ে একটি রত্নপাথর পায়। কিন্তু মানুষের জন্য সেই দামি রত্ন খাদ্যশস্য খুঁজে বেড়ানো মোরগটির জন্য মূল্যহীন। মোরগটি রত্নকে বলেছিল দুনিয়ার সব মুক্তা নিয়ে আমাকে এক দানা শস্য দাও।

বাইবেল, চসারের ক্যান্টারবারি টেলস, দান্তের ডিভাইন কমেডিতে পাখির প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিক নাট্যকার দ্য বার্ডস নাটকে পাখিকে ব্যবহার করেছেন সমাজকে ব্যঙ্গ করতে। ডারউইন তার ভয়েজ অব দ্য বিগলে (১৮৩৯) লিখেছিলেন ফিঞ্চ পাখি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ। এ পর্যবেক্ষণই পরবর্তীতে বিবর্তনের তত্ত্ব এবং অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণার সূচনা করেছিল।

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও সাংবাদিক