দেশে দেশে জাতীয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে পাখিকে ব্যবহারের প্রবণতা বেশ প্রাচীন। মানুষ যখন থেকে ভাবতে শিখেছে তখন থেকেই পাখি তার কাছে চরম এক বিস্ময়ের নাম। অসীম ক্ষমতাধরের প্রতিচ্ছবি। মানবসভ্যতার প্রত্যুষে চারপাশের জীবজন্তুর মাঝে পাখিকেই তার সবচেয়ে ক্ষমতাধর বলে মনে হয়েছে। বোধ করি অন্য কোনো প্রাণীর শূন্যে ডানা মেলে উড়ে চলার ক্ষমতা নেই বলেই পাখিকে তার স্বর্গীয় আশীর্বাদধন্য মনে হয়ে থাকবে। আর সেই থেকেই নানা কল্পকাহিনীর জন্ম হয়েছে পাখিকে ঘিরে। বাঙালির রূপকথায় ভবিষ্যৎ বলে দেয়ার অলৌকিক ক্ষমতায় উঠে এসেছে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি পাখির কাহিনী। এসেছে শুক-সারির গল্প। পেঁচার ডাককে, কুক পাখির ডাককে অমঙ্গলের বার্তা বলে মনে করা হয়েছে। আবার সেই পেঁচাকেই দেখা যায় দেবী লক্ষ্মীর বাহনরূপে।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে দুনিয়ার নানা প্রান্তে মঙ্গল ও অমঙ্গল—দুইয়েরই রূপক হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে নানা ধরনের পাখি। পাখিকে ঘিরে লতিয়ে উঠেছে কতই না কিংবদন্তি, উপকথা, লোকগাথা আর কুসংস্কার! অমিত শক্তির উৎস বিবেচনায় পাখিকেই তাই জাতীয় ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বেছে নিতে দেখা যায়।

কেউ যখন বলে ওঠে, ‘একটি ছোট্ট পাখি আমাকে বলেছে’, তখন কিন্তু আসলে সে একই সঙ্গে কিংবদন্তি, লোকগাথা ও কুসংস্কারের বশেই এ কথা বলে। বাস্ক জাতিসত্তার লোকেদের ভেতর এক ধরনের পাখি নিয়ে প্রাচীন গল্প প্রচলিত রয়েছে যে সেই পাখি সবসময় সত্য কথা বলে। হামিংবার্ড পাখি নিয়ে একই রকমের ধারণা পোষণ করে বিলক্সি ইন্ডিয়ানরা। ব্রিটেনের চাষীদের মাঝে এখনো এ ধারণা প্রবল যে সঠিক পরিস্থিতিতে সব পাখিই মানুষের মতো কথা বলে। আর বিশ্বের সব প্রান্তেই মানুষের মাঝে এ ধারণা বেশ প্রবল যে এখন কথা বলতে না পারলেও একসময় সব পাখিই কথা বলত। আরব্য রজনীর কাহিনীর সেই বুলবুল বাজারের কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে! আরব্য রজনীরই সোলেমানকে নিয়ে যে গল্প, তাতে কথা বলা তিতির আর ঝুঁটিওয়ালা হুপু পাখির কথা বলা হয়েছে। দুনিয়ার সব দেশের প্রাচীন উপকথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বয়ান করা হয়েছে পাখির মাহাত্ম্য।

প্রাচীন ও আধুনিক কালের অনেক জাতি ও সম্রাট তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছেন অথবা নিদেনপক্ষে তাদের রাজকীয় পোশাকের হাতায় ও সিলমোহরে খুব স্পষ্টভাবে পাখির প্রতিমূর্তি ব্যবহার করেছেন। এক্ষেত্রে বরাবরই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য ও গুরুত্ব পেয়ে এসেছে ঈগল। মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন যে দালিলিক প্রত্নফলক পাওয়া গেছে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে, তা চার হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। সেই প্রত্নফলকে প্রাচীন সুমেরীয় নগরী লাগাশ সম্পর্কে লেখা ও প্রতীক দুটোই উত্কীর্ণ রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার অব্দের দিকে ব্যাবিলনিয়া এ অঞ্চল দখল করে নেয়ার অনেক আগেই এ নগরীর শাসনাধীনে ছিল মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণ এলাকা। ফলকটিতে এ নগরীর প্রতীক হিসেবে উত্কীর্ণ রয়েছে একটি ঈগলের ছবি, যেটি পা ও পাখা ছড়িয়ে আছে এবং মাথাটি নিজের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছে। সৈন্যরা সামরিক বাহিনীর নিশান হিসেবে এ ঈগলের প্রতীক বহন করত; কিন্তু এরই অন্য একটি নমুনায় দেখা যায় লাগাশের দেবতাদের বিশেষ প্রতীক হিসেবে উত্কীর্ণ রয়েছে একটি সিংহের মাথা, যেটি দিয়ে রাজপ্রাসাদকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেটি হচ্ছে রাজার নিশান।

অ্যাসিরীয়রা ব্যাবিলনিয়া জয় করার পর বিজয়ী হিসেবে তারা লাগাশের এ ঈগল কবজা করে নেয় এবং বহু শতক পর অ্যাসিরীয় রাজা উরের সিলমোহর হিসেবে এটিকে ব্যবহূত হতে দেখা যায়। প্রাচীন পরিবারগুলোর কুলমর্যাদাচিহ্ন সংরক্ষণের অনিবার্য তাগিদে একই সঙ্গে দুটি প্রাণীকে আক্রমণে সক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য পরবর্তী সময়ে সিলমোহরে দুই মাথাবিশিষ্ট ঈগল ব্যবহূত হতে থাকে। হিট্টাইট চিত্রকলায় এ দুই মাথাবিশিষ্ট ঈগলের দেখা পাওয়া যায় এবং তুর্কি ও আধুনিক ইউরোপীয় প্রতীকে এ ধারা অব্যাহত ছিল। কাপাডোসিয়ায় (গ্রিকদের পেরিয়া) পর্বতের পাথর কুঁদে যারা মূর্তি ও প্রতীক খোদাই করত, তাদের ভেতরে বিশেষ করে হিট্টি খোদাইকারী, পেরোট ও শিপির পাথরে খোদাইকর্মে দুই মাথাবিশিষ্ট ঈগলের দেখা পাওয়া যায়। তারা তাদের খোদাইকর্ম সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন, এর অবস্থান সবসময়ই সুস্পষ্ট—মহান কোনো পবিত্র স্থানে, কোনো প্রাসাদের প্রধান ফটকে, দুর্গের দেয়ালে এবং এ ধরনের বিশেষ স্থাপনায় এগুলো খোদাই করা হয়; পেরিয়ানরা এ প্রতীককে অস্ত্রের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত—এটা বোঝানোর জন্যই এ খোদাইকর্ম।


অ্যাসিরীয়রা তাদের জাতীয় পাখিকে দুই মাথাবিশিষ্ট করে প্রদর্শন করত প্রতিসাম্য, পাখা ও পা বাইরের দিকে মেলে ধরা অবস্থায় ভারসাম্য রক্ষার ললিত রূপ দেয়ার লক্ষ্যে, কিন্তু হিট্টিদের হাতে পড়ে তা আরো গভীরতা অর্জন করে। সম্ভবত এশীয় ধর্মতত্ত্বের স্বর্গীয় দ্বৈত অর্থ প্রকাশের, অর্থাৎ ভালো ও মন্দ, ঈশ্বর ও শয়তান ইত্যাদি তুলে ধরার জন্য এটি তারা ব্যবহার করত, পরবর্তী সময়ে প্রাচীন পারস্য মতবাদে যা আরো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। হতে পারে আরো শুদ্ধ ও পরিশোধিত হয়ে মোজাইকদের আমলে এ ঈগল প্রতীক পবিত্র আত্মার গুরুত্ব তুলে ধরে।

ডাল্টনের মতে, হিট্টিদের পাথরে খোদাই করা দুই মাথাবিশিষ্ট ঈগলের প্রতীক ছিল। ডাল্টন আরো বলেছেন, ১২১৭ সালে ইরানের সাসানিড সম্রাট মালেক-এল সালা মোহাম্মদ হিট্টিদের মতো প্রতীক উত্কীর্ণ করে মুদ্রা চালু করেছিলেন। ১৩ শতকে তুরস্কের শাহজাদারা তাদের দুর্গদেয়ালে এ প্রতীক খোদাই করিয়েছিলেন। তারা তাদের যুদ্ধ-নিশানেও এ প্রতীক এমব্রয়ডারি করিয়ে নিয়েছিলেন।

গ্রিক সভ্যতার গোড়ার দিকে ঈগলকে মনে করা হতো জিউসের সংবাদবাহক। রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ৮৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রজাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল এবং তাদের সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈন্যদল যে পতাকা বহন করত তাতে রুপালি রঙের ঊর্ধ্বমুখী একটি বর্শায় শোভা পেত একটি ঈগল, যেটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বর্শার ওপর, ডানা দুটি অর্ধেক মেলে আছে, মাথাটি বাঁ দিকে ফেরানো এবং এর নখরে ধরে রেখেছে বজ্র। গাইয়ুস মারিউস দ্বিতীয়বার রাজ প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পর কিউরিয়ায় এ পাখির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে কিছু হুকুম জারি করেন।

রোমানদের ওপর এ অভিযোগ আনা উচিত হবে না যে তারা কেবলই প্রাচ্যের রাজতন্ত্রকে অনুকরণ করেছে। এ পবিত্র পাখিটির রাজকীয় চেহারা ছাপিয়ে তারা যদি অন্য কিছু বিবেচনায় নিয়ে থাকে তাহলে তা হচ্ছে তাদের মহান দেবতা জুপিটারের সঙ্গে এর সংশ্লিষ্টতা, যে জুপিটার হচ্ছেন জিউসের প্রতিপক্ষ। জুপিটার যখন টাইটানদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, একটি ঈগল তখন তার বাণ এনে দিয়েছিল, সেই থেকে জুপিটারের ঈগলকে তার নখরে বজ্র ধরে আছে বলে বিবেচনা করা হয়। এভাবেই পাখিটি চরম ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবেই সৈনিকদের ব্যাজে এ ঈগলের ছবি ব্যবহার করা হয়। সার্বভৌম রোমের সম্রাটরা তাদের পতাকায় বরাবর এটিকে স্থান দিয়ে এসেছেন। হাড্রিয়ান সাম্রাজ্য তার সাম্রাজ্যের ধাতু হিসেবে রুপার বদলে সোনাকে বেছে নিয়েছিল এবং এ সাম্রাজ্যের সামরিক পরাক্রমতা ও রাজকীয় শাসন সম্পর্কে বলার সময় ‘রোমের ঈগল’ শব্দবন্ধটি ব্যবহূত হতো।

এমনই এক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ নিয়মেই কিছুটা কল্পনা এবং কিছুটা বাস্তব মহিমার পরশে পাখিটি রাজকীয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বর্শার ওপরে চড়ে বসা একটি সোনালি ঈগল পারস্যের প্রথম সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট বা সাইরাস দি এলডারের (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০) রাজকীয় প্রতীক ছিল, ঠিক যেমনটি ছিল তার পূর্বপুরুষদের।

প্রথম নেপোলিয়ান যখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন তখন তিনি তার সেনাদলের ব্যানারগুলোতে পরিচয়সূচক চিহ্ন হিসেবে আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন তার রোমান পূর্বসূরিদের সেই চিহ্ন, অর্থাৎ ঈগলকে। বস্তুত তার এটি করার এখতিয়ারও ছিল, কারণ তিনি ইতালি ও অস্ট্রিয়া—দুটোই জয় করেছিলেন, এ দুটি অঞ্চল ছিল রোমান সাম্রাজ্যেরই উত্তরাধিকার। নেপোলিয়ান বোনাপার্টের পতনের পর বার্বনরা তাদের সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে ঈগলের এ প্রতীক অপসারণ করেছিলেন, কিন্তু ১৮৫২ সালে লুই নেপোলিয়ান এক হুকুমনামা জারি করে ঈগল প্রতীককে পুনরায় বলবৎ করেন। একটি কিংবদন্তি রয়েছে যে তিনি যখন ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ইংল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে এসে পৌঁছেন তখন তার সামনে একটি পোষা ঈগল ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। এর প্রায় ১০০ বছর পর সারা দুনিয়ার মিনার ও ভবনশীর্ষের পতাকাদণ্ডে ঈগল প্রতীকের পতাকা শোভা পেতে দেখা গেলেও খোদ ফ্রান্সে ততদিনে এ পতাকার বদলে শোভা পাচ্ছিল লরেলের মালাসংবলিত প্রজাতন্ত্রের তেরঙা পতাকা।

কাল-প্রবাহের অনিবার্য ভাঙা-গড়ায় রোমান সাম্রাজ্য নানামাত্রিক বিভাজনে বিভক্ত হয়ে পড়লেও শত শত বছর ধরে তাদের ঈগল খচিত পতাকা ইউরোপজুড়ে পত্পত করে উড়েছে। মাঝে মাঝেই রোমানদের ঈগল পুরো ইউরোপে সাচ্চা কর্তৃত্ব ফলিয়েছে। সময়ের প্রবহমানতায় অনেক রাষ্ট্রই ভেঙে বিভক্ত হয়ে পড়লেও বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর রাজকীয় পতাকায় ঈগলের রাজকীয় উপস্থিতি অব্যাহত ছিল। প্রুশিয়া ও অন্যান্য জার্মান রাজ্য তাদের ঢালে রোমান ঈগল ব্যবহার করত। পনেরো শতকে এসে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তা অস্ট্রিয়ার হাউজ অব হাবসবার্গের ঐতিহ্যে পরিণত হয়, যা ছিল জার্মান হোহেনস্টফেন্সের উত্তরাধিকারী; অস্ট্রিয়ার অস্ত্রে তখন দুই মাথাবিশিষ্ট ঈগল প্রতীক উত্কীর্ণ থাকত, যেটি ডানে-বাঁয়ে এমনভাবে তাকাচ্ছে, যেন গর্বিত দৃষ্টিতে জানান দিচ্ছে যে সে পূর্ব ও পশ্চিম শাসন করে।

ওই একই সময়ে অর্থাৎ পনেরো শতকের মাঝামাঝি রাশিয়ার আইভান দ্য গ্রেট বিভক্ত মাসকোভিকে একই শাসনের অধীনে আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এতে কৃতকার্য হওয়ার লক্ষ্যে তিনি ১৪৭২ সালে বাইজেনটাইনের সম্রাটের ভাইঝি সোফিয়া পালাইয়োলোগাসকে বিয়ে করেন। এ সময় থেকে রাশিয়া ও অস্ট্রিয়া তাদের বর্মে দুই মাথাওলা ঈগল প্রতীক ব্যবহার করতে থাকে। এখানে বন্ধনীর ভেতরে বলে নেয়া ভালো যে, মিসরে কখনো রাজকীয় ঈগলকে সগৌরবে আমলে নেয়া হয়নি। সেখানে বরং কল্পিত প্রাণী গ্রিফন শকুনকে রাজকীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হতো, যেটিকে তারা মনে করত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সর্বব্যাপী ও নাছোড়বান্দা। এখনো মিসরের চাষীরা ছোট্ট এক প্রজাতির শকুনকে ফারাওয়ের মুরগি বলে ডাকে।

প্রুশিয়া তার অতীতের ‘রোমান’ ঐতিহ্যের স্মরণে ঈগল প্রতীককে তাদের এক্তিয়ারভুক্ত রেখেছিল। বিসমার্ক জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর ঈগল প্রতীক পুনঃপ্রবর্তন করেন। তা থেকেই কাইজার দুটি জার্মান সামরিক অর্ডারের ডিজাইন করেন—কালো ঈগল এবং তার চেয়ে উঁচু মর্যাদার লাল ঈগল। রাশিয়া ও সার্বিয়াও সাদা ঈগল—একই নাম ব্যবহার করে একটি সামরিক অর্ডার প্রবর্তন করে। পোল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ঈগলকে কালো রঙের পটভূমিতে সাদা রঙে উপস্থাপন করা হয়। ভাগ হয়ে যাওয়ার পর পরাধীন অবস্থায় ১৭৯৫ সালে এটিকে পাখা গোটানো অবস্থায় প্রদর্শন করা হতো। তবে ১৯১৯ সালের পর থেকে স্বাধীনতার গর্বিত অভিব্যক্তিতে এটি পাখা মেলা অবস্থায় প্রদর্শন করা হতে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে ঈগলকে বেছে নেয়ার পেছনে রয়েছে এক মজার কাহিনী। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই সকাল থেকে শুরু করে দুপুর গড়িয়ে গিয়েছিল ফিলাডেলফিয়ায় কংগ্রেস অধিবেশনে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন চলছিল তখন। এর জন্য টুপিতে ব্যবহারের ফিতা দিয়ে তৈরি ফুল বা ব্যাজ নির্ধারণের জন্য আলোচনাটি সেদিকে গড়ালে নতুন প্রজাতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের গ্রেট সিল বা সিলমোহর এবং বর্মে কুলমর্যাদার চিহ্ন আঁকার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইউরোপীয় ঘরানাকে এড়িয়ে, তবে এ ব্যাপারে চিত্রকলার প্রথা মেনে এ কমিটি বেশ কয়েকটি রূপকাশ্রয়ী ডিজাইন করে জমা দেয়। কিন্তু কংগ্রেস সঙ্গে সঙ্গে এগুলো নাকচ করে দেয়। অবশেষে ১৭৮২ সালে দায়িত্বটি চাপে কংগ্রেসের সেক্রেটারি চার্লস থমসনের কাঁধে। তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে ফিলাডেলফিয়ার উইলিয়াম বার্টনের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন। তারা দুজনে রূপকাশ্রয়ী প্রতীক পরিহার করে একটি ঈগলের নকশা করে প্রদর্শন করেন, যেটির বুকে ছিল একটি বর্ম। বার্টন কুলচিহ্নবিদ্যায় শিক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, কুলমর্যাদার চিহ্নাঙ্কিত ঢালটি ঈগলের বুকে স্থান দেয়া হয়েছে অনেক প্রাচীন রীতি অনুসরণ করে এবং এটি সত্যিই রাজকীয়। তবে রাজকীয়তার আবহ এড়াতে অবশ্য স্থানীয় সংস্কার অনুসরণ করে আমেরিকান টাকমাথা ঈগল ব্যবহার করা হয় প্রতীকটিতে। শেষমেশ ১৭৮২ সালে ডিজাইনটি অনুমোদন হয়। এর পর থেকে অবশ্য এ গ্রেট সিল বেশ কয়েকবার কাটছাঁট করা হয়। প্রতীকের এ ঈগলটি ডান নখরে ধরে আছে ফুল-পাতায় শোভিত জলপাইয়ের একটি ডাল।

বিশ্বের আরো অনেক দেশেই রাজকীয় পাখি ঈগল রাজ প্রতীকের গর্ব ধারণ করছে।

 

মনজুর শামস : লেখক ও অনুবাদক