আমি তো ছিলাম ভস্মরাশি হয়ে গৌরববিহীন

অন্ধকারে সুনসান এলাকায় অনেক বছর।

আমার ওপর বয়ে গ্যাছে কত যে বৈশাখী ঝড়,

তুহিন বাতাস তীক্ষ ছুঁয়েছে আমাকে রাত্রিদিন।

 

(রাহমান, শামসুর; ‘ফিনিক্সের গান’, মাতাল ঋত্বিক; ঢাকা; সন্ধানী প্রকাশনী; ফেব্রুয়ারি ১৯৮২)

 

শুধু শামসুর রাহমানের এ কবিতাটি নয়, পৃথিবীর বহুল কথিত জীবিত বা মৃত ভাষাগুলোর অধিকাংশে এমন অসংখ্য কবিতা, গান, গল্প পাওয়া যাবে, যেখানে ফিনিক্স অথবা তার মতো পৌরাণিক পাখির উল্লেখ আছে। অগণিত চিত্রকর ফিনিক্সের ছবি এঁকেছেন, কারুশিল্পীরা তাদের কর্মে ফিনিক্সের প্রতিমূর্তি ফুটিয়ে তুলেছেন। পৌরাণিক পাখিদের কুলে ফিনিক্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকার উপকথায় অতিদীর্ঘ সময় ধরে উপস্থিতির জন্য। বস্তুত শিল্প-সাহিত্যের বাইরে দুনিয়াজুড়ে জনসংস্কৃতিতে ফিনিক্স এখনো বিদ্যমান পরাজিত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর উদাহরণ হিসেবে, হার না মানা মানুষের প্রতীক হিসেবে, শক্তি ও পুনর্নবায়নের প্রতিশব্দ হিসেবে।

আধুনিক ‘ফিনিক্স’ নামটির উত্পত্তির গ্রিক ‘ফোনিক্স’ থেকে। গ্রিক নামটির উত্পত্তি মাইসেনীয় গ্রিক শব্দ ‘পোনিকে’ থেকে, যার অর্থ সম্ভবত ‘তাল/পাম গাছ’। সেটির উত্পত্তি আবার সম্ভবত পশ্চিম সেমেটিক ভাষা থেকে, যার মানে দাঁড়ায় ‘রক্ত লাল পাখি’। ফিনিক্স শব্দের উত্পত্তি যে ভাষা থেকেই হোক না কেন, এ রকম পৌরাণিক পাখির উল্লেখ পাওয়া যায় স্লাভিক (যার-প্তিৎসা), প্রাচীন মিসরি (বেন্নু), জর্জীয় (পাসকুঞ্জি), তুর্কি (কনরুল), আরবি (আনকা), পারসি (সিমুর্গ), ভারতীয় (বিষ্ণুর বাহন কাশ্যপপুত্র গরুড়), তিব্বতি (মি বেই কার্মো), চীনা (ফেঙগুয়াঙ), জাপানি (হঅঅ) আর উত্তর আমেরিকার (থান্ডারবার্ড) উপকথায়।


প্রাচীন মিসরীয় চিত্রকলা থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতায় ঐতিহাসিক হেরোডটাস (৪৮৫-৪২৫ খ্রি. পূ.) জানান, ফিনিক্স আকার-আকৃতিতে ঈগলের সঙ্গে তুলনীয়। এর পালক আংশিক স্বর্ণাভ, আংশিক রক্তাভ। গ্রিক জীবনীকার প্লুটার্কের (৪৬-১২০ খ্রি.) বর্ণনায় পাতিকাক মানুষের নয় গুণ আয়ুসম্পন্ন, মর্দা হরিণের আয়ু পাতিকাকের আয়ুর চার গুণ, দাঁড়কাকের আয়ু মর্দা হরিণের আয়ুর তিন গুণ, ফিনিক্সের আয়ু দাঁড়কাকের নয় গুণ, আর জিউসকন্যা নিম্ফের আয়ু ফিনিক্সের ১০ গুণ। প্রাচীনকালে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৫ বছর, সেই হিসাবে ফিনিক্সের আয়ু দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ২০ বছর। বলাই বাহুল্য, প্লুটার্কের এ হিসাব নিতান্তই কাল্পনিক। কারণ বাস্তবে দাঁড়কাক (১০-১৫ বছর), পাতিকাক (১০-১৫ বছর) বা মর্দা হরিণ (১০-১৩ বছর) এত দীর্ঘ আয়ুসম্পন্ন নয়। রোমান লেখক ক্লডিয়াস এলিয়ানাস (১৭৫-২৩৫ খ্রি.) জানিয়েছেন, ফিনিক্সের আয়ু ৫০০ বছর। লাতিন কবি ক্লডিয়াস ক্লডিয়ানাস (৩৭০-৪০৪ খ্রি.) ফিনিক্সের বিবরণী দিয়ে বলেছেন, সাধারণ কোনো বস্তুতে ফিনিক্স তার ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটায় না। সূর্যের উজ্জ্বল কিরণ তার খাদ্য, মহাসাগরের ফেনা তার পানীয়। তার চোখ থেকে আগুন ঝরে আর মাথার উপরে জ্যোতির্ময় বলয় আছে। তার ঝুঁটি সূর্যের আলোকে দেদীপ্যমান। তার পা টায়রিয়ান বেগুনিরঙা। তার গতি পশ্চিমা বাতাসকে হার মানায়। ফিনিক্স কখনো বাচ্চা প্রসব করে না বা ডিম দেয় না। ফিনিক্সের জন্ম কী করে হয়, সে ব্যাপারে হেরোডটাস বলছেন, ফিনিক্সের পিতার ইচ্ছামৃত্যুর পর সে সুগন্ধি কষ দিয়ে একটি ডিম তৈরি করে। ডিমটির ওজন অতটা হয়, যতটা সে বহন করে উড়তে পারবে। তারপর সেই ডিমটিতে ছিদ্র করে ভেতরটাকে ফাঁপা করে তাতে পিতার মরদেহ ঢোকায়। এরপর আবার সুগন্ধি কষ দিয়ে ডিমটি বন্ধ করে আরব থেকে উড়ে মিসরের সূর্য মন্দিরে এসে সমাহিত করে। ৫০০ বছর পরপর এ ঘটনা ঘটে। এ ডিম থেকে নতুন ফিনিক্সের জন্ম হয়। তাই ফিনিক্স দেখতে অবিকল তার পিতার মতো হয়। আবার কেউ কেউ বলছেন, ফিনিক্স আরব নয়, ভারত থেকে উড়ে আসত। কেউ আবার ফিনিক্সের নিবাস ভারতের বদলে আসিরিয়ার কথা বলেছেন। ৫০০ বছরের বিরতিকে কেউ কেউ হাজার বছর বলেছেন। কিছু হেরফের থাকলেও পশ্চিমা ভাষ্যকারদের বর্ণনায় ফিনিক্স এমনই।


চীনা উপকথার ফিনিক্স পশ্চিমা ফিনিক্সের মতো ভস্ম থেকে পুনরুজ্জীবিত হয় না। সেখানে ফিনিক্স হচ্ছে পাখিদের রাজা—যার মাথা ময়ূরের, শরীর রাজহাঁসের, ডানা সোনালি মোরগের। সেখানে ফিনিক্স সুখের বার্তাবহ। তাকে দেখা যায় শান্তি আর সমৃদ্ধির দিনগুলোতে, সে দর্শন দিলে গুপ্তধন তাদের লুকোনো স্থান থেকে প্রকাশ্য হতে থাকে। চীনা উপকথায় ফিনিক্স আছে কয়েক হাজার বছর ধরে। ধারণা করা হয়, প্রাগৈতিহাসিক যুগে ওই অঞ্চলে অস্ট্রিচের মতো বিরাট পক্ষী ছিল, যেখান থেকে এ পৌরাণিক পাখির উদ্ভব হয়েছে। ফিনিক্সের চীনা নাম ফেঙগুয়াঙ; ‘ফেঙ’ (পুরুষ) আর ‘হুয়াঙ’-এর (নারী) সমন্বয়ে সৃষ্টি। চীনা প্রতীকে প্রায়ই ফিনিক্সের সঙ্গে ড্রাগন আঁকা হয়, যেখানে ড্রাগন সম্রাটের প্রতীক আর ফিনিক্স সম্রাজ্ঞীর প্রতীক। সম্মিলিতভাবে এটি নর-নারীর মিলনের প্রতীক। এ কারণে চীনা কনেদের বিয়ের পোশাকে প্রায়ই ফিনিক্স আঁকা থাকে। কোনো চীনা পরিবারে যদি একটি ছেলে ও একটি মেয়ে যমজ শিশু জন্মে, তাহলে তা গোটা পরিবারের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করা হয়। এ প্রকার যমজদের ‘লঙ ফেঙ বাও’ বা ড্রাগন-ফিনিক্স যমজ বলা হয়। চীনা ফিনিক্স খুব দয়ালু পাখি। সে কারো ওপর প্রতিশোধ নেয় না, কারো কোনো ক্ষতি করে না, দুর্জনদের এড়িয়ে চলে। জাগতিক কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদের কোনো প্রকার ক্ষতি যেন না হয়, তাই এ ফিনিক্স খাদ্য হিসেবে শুধু ভোরের শিশির গ্রহণ করে। চৈনিক ফিনিক্স ন্যায়বিচার আর উদারতারও প্রতীক। এরা মিথ্যাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার সহ্য করতে পারে না। তাই তারা অনৈতিক ব্যক্তিদের সামনে কখনো আসে না। এ কারণে খুব কম মানুষই ফিনিক্সের দেখা পায়।

জাপানি উপকথার ফিনিক্সের (হঅঅ) সঙ্গে চৈনিক ফিনিক্সের অনেক সাদৃশ্য থাকলেও কিছু পার্থক্য আছে। জাপানি ফিনিক্স পলোনিয়া গাছে থাকে, শুধু বাঁশের বীজ খেয়ে বেঁচে থাকে। একে স্বর্গীয় আত্মা বিবেচনা করে পূজা করা হয়। এর চঞ্চু মোরগের মতো, চোয়াল ভরত পাখির মতো, মাথা তিতিরের মতো, গলা সাপের মতো, পিঠ কচ্ছপের মতো, পা সারসের মতো, পুচ্ছ ময়ূরের মতো। এর পালক সাদা, কালো, লাল, হলুদ আর নীল রঙে রাঙানো, যা তত্কালীন ধারণা অনুযায়ী পাঁচটি মৌল বস্তু—কাঠ, আগুন, মাটি, ধাতু আর পানির প্রতীক। এ ফিনিক্স যখন উড়ে যায়, তখন বাতাস থেমে যায়, ধুলা থিতিয়ে পড়ে, অন্য পাখি আর কীটপতঙ্গরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। শান্তি, সমৃদ্ধি আর সুখের দিন শেষ হয়ে এলে তারা স্বর্গে উড়ে চলে যায়। তাই ফিনিক্সের উপস্থিতি মানে সমৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা হওয়া। ফিনিক্স দিয়ে আগুন, সূর্য, রাজপরিবারকে চিহ্নিত করা হয়। কর্তব্য, যথার্থতা, বিশ্বাস ও করুণার প্রতীক বলে ফিনিক্স আঁকা থাকে মন্দিরের গায়ে, আশ্রমের দেয়ালে, কিমোনোতে, চিত্রকর্ম আর হস্তশিল্প দ্রব্যাদিতে।

প্রাচীন উপকথায় কথিত আপন ভস্ম থেকে ফিনিক্সের পুনরাবির্ভাবের সঙ্গে অনেক ধর্মের বিশ্বাস মতো মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে তুলনীয়। মধ্যযুগে অনেক ধর্মগুরু যিশু খ্রিস্টের স্বেচ্ছায় মৃত্যু, পুনর্জন্ম, পুনরায় মৃত্যুকে ফিনিক্সের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতেন। এভাবে নানা ধর্মে, তুলনামূলক বিবেচনায়, আচারে ফিনিক্স শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে। মানুষের গল্পকথায় অমর হয়ে গেছে। সন্দেহ নেই ফিনিক্স একটি কাল্পনিক পাখি, কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতির উপকথায় এর বর্ণনার সাদৃশ্য বা অঙ্কনের মিল থাকায় স্বাভাবিকভাবে মনে প্রশ্ন জাগায়, সত্যি কি কখনো কোথাও ফিনিক্সের মতো পাখি ছিল?

একটা ধারণা হচ্ছে, প্রাচীনকালে মানুষ টেরোসর গোত্রের প্রাগৈতিহাসিক পাখির জীবাশ্ম দেখে এমন অতিকায় পাখি কল্পনা করেছে। তারপর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে নানা কিংবদন্তি যুক্ত হয়েছে। আরেকটি ধারণা হচ্ছে, প্রায় আট কোটি বছর আগে ক্রেটাসিয়াস যুগে বৃহত্তর মঙ্গোলিয়াসহ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে প্রোটোসেরাটপস নামের তৃণভোজী, চতুষ্পদী ডাইনোসরের অস্তিত্ব ছিল। যার মাথা ছিল বিশাল, তোতা পাখির মতো চঞ্চু ছিল, আর ওজন ছিল প্রায় ১৮০ কেজি। এ প্রাণীর জীবাশ্ম দেখে এশিয়ায় ফিনিক্সের মতো অতিকায় পাখির ধারণা সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে করা হয়।

কেউ কেউ ময়ূর অথবা অনাগাদোরি (অতি লম্বা পুচ্ছবিশিষ্ট মোরগ) থেকে ফিনিক্সের উদ্ভব হয়েছে বলে দাবি করতে চাইলেও এ দাবিগুলোর ভিত্তি দুর্বল। প্রথমত, ফিনিক্সের ভৌগোলিক বিস্তার যত, বিশাল ময়ূরের ভৌগোলিক বিস্তার তার চেয়ে অনেক কম। দ্বিতীয়ত, কিছু পৌরাণিক গল্পে ময়ূর ও ফিনিক্সসদৃশ পাখির একই সঙ্গে উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, অনাগাদোরি কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে সৃষ্ট প্রজাতি যা মাত্র সপ্তদশ শতাব্দী থেকে মূলত কেবল জাপানে পাওয়া যেত। পক্ষান্তরে সাহিত্য ও শিল্পকর্মে ফিনিক্সসদৃশ পাখির উপস্থিতি কয়েক হাজার বছর ধরে। কাক গোত্রের পাখি যেমন—পাতিকাক, দাঁড়কাক, ডোমকাক, নীলকণ্ঠ, হাঁড়িচাছা, লাল পা কাক, জ্যাকড্র, জে, নাটক্র্যাকার—জ্বালানি কাঠকুটো দিয়ে নীড় বানায়। কখনো সেই বাসায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ধরে ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে পাখি তখন জ্বলন্ত বাসা থেকে উড়ে যায়। এ দৃশ্য থেকে ফিনিক্স আগুন থেকে উত্পন্ন হয় বা ভস্ম থেকে পুনরুজ্জীবিত হয় এমন রূপকল্পের সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

ফিনিক্স নিয়ে যে যা খুশি ধারণা করুন এবং তাতে সত্যাসত্য যা-ই থাকুক, সাহিত্যে, সংগীতে, চিত্রকলায়, নাটক-চলচ্চিত্রে, প্রতীক-মাসকট-লোগোতে, কমিকে, ভিডিও গেমে, পোশাক-আশাকে, নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যে ফিনিক্সের চিত্রায়ণ অব্যাহত থাকবে। কল্পনার অগ্নিপক্ষী এভাবে অবিনশ্বর হয়ে আছে।

 

জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আরিফ: লেখক, প্রকৌশলী