সাহিত্যমাধ্যম হিসেবে বাংলা ছোটগল্পের সাফল্য বিস্ময়কর। এ ভাষায় লেখা হয়েছে অসংখ্য শিল্পসফল ছোটগল্প। এর কোনো কোনোটি আমাদের স্মৃতিতে হানা দেয় প্রতিদিন, কখনো তাত্ক্ষণিকভাবে উঁকি দিয়ে যায় কোনো কাহিনী, কোনোটি দিনযাপনের ভাষ্যকার। তেমন কিছু ছোটগল্প নিয়ে এ ধারাবাহিক—
এখন শুধু ‘বারো ঘর এক উঠোন’ নামের বিখ্যাত উপন্যাসটির লেখক হিসেবে পরিচিত জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, যদিও তিনি উপন্যাস লিখেছেন ষাটখানা; আর কয়েকশ গল্প। তবে কোনো কোনো (আসলে কয়েকটি) গল্পের কথা হঠাত্ শোনা যায়। যেমন বনের রাজা, গিরগিটি বন্ধুপত্নী, সমুদ্র কিংবা রাইচনের বাবরি। তখন হঠাত্ মনে হয়, কী অনায়াস ছোটগল্প লেখক ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। তার পর পরই যেন পাঠকের মনের গহিন নির্জনতায় আবার সেই স্মৃতির তলানি।
ওদিকে নির্জনতা খুব প্রিয় ছিল জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর। নগর কলকাতার বাসিন্দা হয়েও যেন অনাগরিক নির্জনতায় নিজেকে ঘিরে রাখতেন তিনি। যেন, সেখানে তিতাস-পাড়ের নিজস্ব অনুসঙ্গ সবসময়ে তাকে ঘিরে থাকত। পরের প্রজন্মের কোনো তরুণ লেখক তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে, লক্ষ্য করতেন জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী আর সেখানে নেই। আলাপে অংশগ্রহণ করছেন না। চায়ের কাপ ঠোঁটে ছুঁইয়ে তিনি এখন অন্যত্র চলে গেছেন।
অথচ শোনা যায়, একেক দুপুরে একেকটি গল্প লিখেছেন। মেস বাড়ির আবাসিক এই লেখকের সেই সব গল্পের ভেতরেও অনায়াসে ঠাসা যেন সেই নির্জনতার অন্য রূপ! গল্পে ‘হত্যার সঙ্গে ফুল ও পাখির সমাবেশ ঘটিয়েছেন’ অনায়াসে। উত্তেজনাহীন গল্প, ঘটনার কোনো ঘনঘটা নেই প্রায়। সমালোচকের কাছে তার গল্প তাই, ‘প্রেম, প্রেমহীনতা, সংগুপ্ত যৌনবাসনা, তীব্র যৌনাবেগ, মনস্তত্ত্ব, প্রাকৃতিক মহিমার বিভিন্ন আস্বাদন থেকে শুরু করে শোচনীয় দারিদ্র্য, যা মানুষের অস্তিত্ব ধরে নাড়া দেয়’— এই নিয়ে তার গল্প।
এসব গল্প ছাপা হয়েছে কলকাতার সব বড় ও বিশিষ্ট কাগজে। পূর্বাশা, দেশ, চতুরঙ্গ, ভারতবর্ষ, পরিচয়ের মতো কাগজের এই লেখক তবু ছিলেন এই স্বনির্মিত নির্জনতারই আবর্তে, কোনো গোষ্ঠীতে নেই। এই কাগজগুলোয় ধারাবাহিক উপন্যাস লিখেছেন আর অসংখ্য গল্প, কিন্তু তার পরও জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী প্রচার আর পুরস্কার সব প্রদীপের আলোর থেকে দূরের মানুষ। এ জন্যই হয়তো তার গল্প-উপন্যাসও প্রায় একই রকম উত্তেজনাহীন, তারই মতো।
আকৃতিতে খুব ছোট। আর গল্পের কাহিনী হিসেবে অতি সাধারণ ‘রাইচরণের বাবরি’ আবার পড়তে পড়তে, এমনকি পড়া শেষ হওয়ার পরও জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ব্যক্তিচরিত্রই এসে হানা দেয়। তাঁর সাহিত্যে যেমন কোনো পরচুলা নেই, তা নিয়ে নিজের বৃত্তের বাইরে আলাদা আয়োজন ও আস্ফাালন একেবারেই অনুপস্থিত, রাইচরণও যেন তাই। তার আসল অকৃত্রিম বাবরি কোনোক্রমে নকল ঠাওরানোর সুযোগ সে দেবে না, সেই সুযোগটুকুও দাম দিয়ে কেনা যাবে না। তার চেয়ে শেয়ালদার কাছাকাছি বউ বাজারের মোড়ের মাথায় তার এক দরজার দর্জির দোকানই ভালো। কাপড় সেলাই করে দিন এনে দিন খেয়ে তার চলবে।
গল্পটা প্রায় সবটুকুই ইতিমধ্যে বলা হয়ে গেছে। রাইচরণ ঘোষের মাথায় চুলে দারুণ বাবরি দোলানো। এ নিয়ে তার নিজস্ব যত্ন পরিচর্যাও আছে। কিন্তু স্ত্রী মানদা তা কোনোভাবে সহ্য করতে পারে না। ‘প্রত্যহ স্নানের পূর্বে, সমুখে আরশি’ নিয়ে বসে সে। তখন মানদা বলে, ‘যা দেখতে পারিনে, অসুরের মতো চুলের ঝাড়, দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে পুড়িয়ে দেব একদিন।’ এর কারণ মানদার দিক থেকে এই : স্নানের আগে ওই বাবরিতে সে অতি যত্নে তেল মাখে। আর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলে, ‘রক্তবীজের বংশ— হে-হে; পুড়িয়েই দাও আর কেটেই ফেল, চুল ফের গজাবে— ফের দেখতে না দেখতে বাবরি গজাবে।’ তাতে মানদা ক্ষিপ্ত হলে সে আরো বলে, ‘বাবরি দেখে শহরের লোকের চোখ টাটাই আর তোমার কিনা হয় ঘেন্না— বমি আসে।’
তা চোখ টাটাই বটে। এই বাবরির জন্যেই তার কাছে খদ্দের আসে। এমনিতে হাসিখুশি গোলগাল গড়নের মানুষ রাইচরণও তা জানে। আর লেখকও রাইচরণের বাবরির বর্ণনা দিতে এক কথাও লিখেছেন। ‘ঈশ্বর একটা লোকের মাথায় এমন অজস্র চুল দান করিয়া অন্যায় পক্ষপাতিত্ব করলেন। না জানি ইহার পরিবর্তে আরো কটা মাথা একেবারে ন্যাড়া করিয়া তাঁহাকে গড়িতে হইয়াছে।’
সে কথা অবশ্য রাইচরণের জানার কথা নয়, কিন্তু সে জানে, জানে বলেই মানদার উদ্দেশ্যে কখনো জানায়, ‘আমার বাবরির কল্যাণে সংসার তোমার শ্রীমন্ত হয়ে উঠবে।’ কিন্তু এন্ট্রাস পাস রাইচরণই শুধু খলিফাগিরি ফাটাবে তাই বা মানদা মানে কী করে; কোনো আবদারই তো তার মেটে না, ‘দেখেছি ছাই হবে, দেখতে দেখতে দুই চোখে পোকা পড়ে গেল নইলে য়াদ্দিনেও শশীর বৌর মতো একটা স্কার্ট পাড় শাড়ি দেখলুম না।’
যাই হোক, মানদার আবদার মানদার। তার তো জানার কথা নয়, বউবাজারে তার দোকানের কাছে তার নাম ইতিমধ্যে রাইচরণ ঘোষ থেকে বাবরি ঘোষ, বাবরি ঘোষ থেকে শুধু বাবরি।
এই বাবরি ঘোষের দোকানে একদিন এক ফিটফাট ভদ্রলোক এসে হাজির। বেশ নিরিখ করে তিনি রাইচরণের বাবারি পর্যবেক্ষণ করছেন। রাইচরণ তাকে অভ্যর্থনাও জানাল। আর ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো কিছুর অর্ডার দেবে। কিন্তু তা না করে লোকটি তার বাবরির প্রশংসা করেন। ‘এমন চমৎকার বাবরি, বলতে কি, কলকাতায় দুটি নেই, আর এই নিয়ে, মাপ করবেন, কথাটা কড়ামত শোনাচ্ছে, আপনি এখানে বসে কল চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ এই চুল দিয়ে আপনি দেশজোড়া নাম কিনতে পারেন; এসব বাবরির যদি যোগ্য ব্যবহার না হয়, উহ্ ভারি দুঃখের কথা মশাই। মাইরি—
লোকটি তাকে থিয়েটারে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। রাইচরণ প্রায় হায় হায় করে উঠল। তার চৌদ্দপুরুষ কেউ অভিনয় করেনি। থিয়েটারের ওই ম্যানেজার তার অভিজ্ঞতায় আরো জানালেন, রাইচরণের পক্ষে সম্ভব। মাসে একশ করে টাকাও দেয়া হবে তাকে।
রাইচরণ রাজি হয় না। লোকটি কাল আবার আসবে বলে চলে যান। রাইচরণ এ কথা স্ত্রী মানদাকে জানায়। ভেবেছিল স্রেফ তার বাবরির কদর বোঝাতে বলবে, কিন্তু ফল হলো উল্টোটা। মানদা বলল, যদি অভিনয় না করে তাহলে এই বাবরি সে সত্যি সত্যি দিয়াশলাই দিয়ে জ্বালিয়ে দেব।
পরদিন থিয়েটারের সেই ম্যানেজার আসতেই রাইচরণ রাজি হয়। এখন সম্মানী মাসিক একশ পঁচিশ টাকা। রাইচরণ দোকানের দরজায় তালা লাগিয়ে থিয়েটারের অভিনয় করতে চলে গেল।
রাইচরণের পার্ট ডাকাত সর্দারের। রাইচরণ জানতে চায়, সে তো সত্যিকারের ডাকাত নয়। ম্যানেজার রাইচরণকে বোঝায়, ‘আপনি সেই রাইচরণবাবুই শুধু ডাকাতের বেশ নিয়ে একদিন রাত্রে আপনাকে স্টেজে নেমে বইয়ের ক’টা কথা বলতে হবে।’
ম্যানেজার আর রাইচরণের এই সংলাপেই গল্পটা মুহূর্তে ঘুরে যায়, যে রাইচরণকে চিনতাম আমরা তার ভেতর থেকে প্রকৃত রাইচরণ যে তার বাবরিকে শুধু বাবরিই মনে করে না, এ তার অস্তিত্বের অংশ তা জানা হয়। যদিও পাঠক হিসেবে সত্যি সে প্রস্তুতি যেন আমাদের কোনো ক্রমেই ছিল না।
— বুঝলুম, গম্ভীর হইয়া রাইচরণ কহিল, এবং আমার এই ডাকাতের সাজ-পোশাক, ডাকাতের মতো কথাবার্তা, লুটতরাজ, মারপিট করা, এসব কোনোটাই সত্যি নয়— কৃত্রিম, এমনকি দর্শকবৃন্দ পর্যন্ত জানবে এগুলো আগাগোড়া মিথ্যা। তারা শুধু সাময়িকভাবে ধরে নেবে, যেন সত্যি একটা ডাকাত এসে তাদের সামনে দেখা দিয়েছে।
— হ্যাঁ, তাই ত, তাই নাটক, দরাজ গলায় ম্যানেজার উত্তর দিলেন— নাটকের সবটাই মিথ্যে, একটা গল্প, তবু তা সত্যি করে’ দেখবার, সত্যি বলে মেনে নেয়ার মানে একটা সাময়িক উপভোগ ছাড়া আর কি—
হাত জোড় করিয়া রাইচরণ উত্তর দিল, আমিও তাই ভাবছি, মাপ করবেন, আমি পারব না।
— কেন কেন? ম্যানেজার আকাশ হইতে পড়িলেন— কী হলো আপনার?
— যেখানে সাজ-পোশাক, হাব-ভাব, মায় কথাবার্তা পর্যাপ্ত কৃত্রিম, আপনি কি মনে করেন সে-স্থলে কোনো দর্শক আমার বাবরিটা সত্যিকারের বাবরি বলে ধরে নেবে? সবাই ভাববে ওটা একটা পর-চুলা— স্টেজে নামার আগে গ্রিন রুম থেকে মাথায় চাপিয়ে এসেছি।
লোকটা পাগল না আর কিছু— ম্যানেজার ভাবিয়া সঠিক আন্দাজ করিতে পারিল না।
এর পর রাইচরণ আর বাক্য ব্যয় না করে রাস্তায় নেমে এসে মনে মনে বলল, বেঁচে থাক আমার সেলাইয়ের দোকান। দোকানে বসে পয়সাও রোজগার হবে, বাবরি দেখানো চলবে। স্টেজে উঠি আর লোকের চোখে অমন বাবরিটা কিনা পরচুলা হয়ে যাক!
এর পর কলেজ স্ট্রিটের দোকান থেকে মানদার জন্যে একখানা হাল ফ্যাশনের স্কার্ট পাড় শাড়ি কিনে বাড়ি ফেরে। এতে মানদা আর বঁটি নিয়ে তেড়ে আসবে না। যদিও ‘থিয়েটারে মাস-মাস একশ পঁচিশ টাকা মাইনের চেয়ে রাইচরণের বাবরির মায়া অনেক বেশি, অবশ্য বাঁচিয়া থাকিতে মানদা তাহা বুঝিবে না।’
যদিও রাইচরণ আর তার বাবরির গল্প, রাইচরণ থিয়েটার থেকে চলে আসায়ই শেষ। কৃত্রিম-অকৃত্রিম, সুখ আর সুখের দ্বন্দ্ব সে আগেই মিটিয়ে দিয়েছে। জীবন এক রঙ্গমঞ্চ তা রাইচরণ খলিফা জানে কি জানে না, জানার দরকার নেই কিন্তু জীবন আর থিয়েটারের স্টেজ এই দুই জায়গায় তফাতটা আজ তার জানা হয়েছে। স্টেজে তার প্রকৃত বাবরি সে কৃত্রিম ঠাওর হবে, এটি সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। ফলে পায়ে সেলাইয়ের কল চালাতে চালাতে প্রকৃত বাবরিই যেন রাইচরণ। রাইচরণ ঘোষ থেকে বাবরি ঘোষ থেকে বাবরি। এর বাইরে রাইচরণের আর কোনো পরিচয় আর বেঁচে থাকার অবলম্বন অসম্ভব।






