আলাপচারিতার ভঙ্গিতে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান গল্পকার জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।

 

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: শহীদ, পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে?

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, অনেক কিছু মনে পড়ে, একটু এলোমেলোভাবে মনে পড়ে, ধারাবাহিকতা কিছুটা নষ্ট হয়ে গেছে। পুরনো কথা বলতে গেলে একটা বলি, একটা বলতে ভুলে যাই, কখনো সময় উল্টাপাল্টা হয়ে যায়।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: মনে পড়ে, আমি কাজের শেষে বেলা ৩টা-৪টা-৫টার দিকে তোমার বাসায় যেতাম? গিয়ে ডাক দিতাম, ‘শহীদ’। কোনো কোনো দিন তোমার বড় ভাই এসে বলতেন, ‘শহীদ তো বাড়ি নেই’? যেটা আল মাহমুদের কবিতায় চলে গেছে, ‘শহীদ তো বাড়ি নেই’। কোনো দিন হয়তো তোমার সঙ্গে দেখা হতো। তার পর একসঙ্গে আমাদের সান্ধ্য অভিযান শুরু হতো...

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, আমার মনে আছে। কিন্তু আমার বেশি মনে আছে, আমি প্রায়ই তোমাদের ব্রিটিশ কাউন্সিলের উল্টো দিকের বাসায় চলে যেতাম, আড্ডা দিতাম। আর বেশি মনে পড়ে দেবব্রত ও সেবাব্রতদের ওখানে প্রায়ই যেতাম, আল মাহমুদই আমাকে প্রথম সেখানে নিয়ে যান। আর তোমরা একটা পত্রিকা বের করলে সপ্তক  নামে, যেটা বের করার সময় আমি আবার নতুন করে লেখা শুরু করি। অনেক দিন লেখা বন্ধ রেখেছিলাম। তার পর যখন সপ্তক বের করলে তখন সেখানে গোটা তিন-চারেক লেখা ছিল আমার।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তোমাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম অভয়দাস লেনে, সমকালের অফিসের পেছনে, সম্ভবত সেখানেই তোমাদের বাড়ি ছিল।

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, প্রথম দেখা হয়েছিল অভয়দাস লেনের বাড়িতেই, উপরে থাকতেন সিকান্দার আবু জাফর, নিচে থাকতাম আমরা।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: কোনো রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে তোমার কবিতায়?

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: এখানে একটা মামুলি কথা বলি, খুবই মামুলি? ‘ভালো কবিতা’ কী?

শহীদ কাদরী: দেখো, প্রথমত প্রতিটি ভালো কবিতার মধ্যে একটি বিশেষ উপাদান, যাকে বলে ‘এলিমেন্ট অব এক্স’ থাকে। যে জিনিসটি সরাসরি আঙুল দিয়ে শনাক্ত করা যাবে না। সৌন্দর্যের একটি সংজ্ঞা হচ্ছে হারমনি। এ হারমনির চিন্তা থেকেই ইউরোপে এমনকি এখন আমাদের দেশেও সেরা সুন্দরী নির্বাচন করা হয়। সেখানে বুকের মাপ কত, কোমরের মাপ কত— যা গ্রিকরা প্রথম মেজারমেন্ট করে
হারমনির কনসেপ্ট বের করে। হারমনি আমরা মিউজিকে পাচ্ছি, দেহসৌষ্ঠবের মধ্যে পাচ্ছি, হারমনি আমরা কবিতার মধ্যেও পাচ্ছি। কবিতায় শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক, শব্দের সঙ্গে সেখানে যে চিত্র আছে, চিত্রের সঙ্গে যে বিষয়বস্তু আছে, সেই বিষয়বস্তুর সঙ্গে উপমা ও ধ্বনিপুঞ্জের হারমোনাইজ-সম্পর্ক থাকতে হবে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: পাঠক যখন কবিতা পড়েন তখন তো তার কাছে হারমনির এসব উপাদান ভিন্নভাবে আসে, একটা সমন্বিত রূপ উপস্থাপিত হয়। তাহলে কি বলা যায়, পাঠকের যে কবিতা পড়তে ভালো লাগে— সেটিই তার কাছে ভালো কবিতা?

শহীদ কাদরী: সেটি তার কাছে ভালো কিন্তু অনেক কবিতা আছে, যেগুলো পড়তে ভালো লাগে না কিন্তু বোঝা যায় সেগুলো ভালো কবিতা। তবে শেষ পর্যন্ত আমার পক্ষপাত হচ্ছে লিরিকের প্রতি, যদিও আমি নিজেও ঠিকমতো লিখতে পারিনি কিন্তু আমার পক্ষপাত হচ্ছে লিরিক, মিউজিক্যালি রিচ লিরিকের প্রতি।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: এমন বলা যায়, কবি যখন তার আবেগ পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারেন না, তিনি তখন ব্যর্থ?

শহীদ কাদরী: অ্যাবসুলিউটলি।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: আরো সহজ কথায় কি বলা যায় না, পাঠকই ভালো কবিতার বিচারক?

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, পাঠকই বিচারক, তবে সব পাঠক নন। কারণ আমরা দেখেছি, পাঠক-মনোরঞ্জনকারী কবিতাও আছে। আজকের এ যুগেও লেখা হচ্ছে পাঠক-মনোরঞ্জনকারী কবিতা। এগুলো মোটামুটি সরল, ছন্দবদ্ধ, কোনো জটিলতা নেই, কোনো নতুনত্ব নেই। ভালো কবিতার তো অনেক শর্ত আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, আজ অবধি যে ধরনের কবিতা লেখা হয়েছে, আজকের পড়ে যারা লিখবেন, তাদের অন্য ধরনের কবিতা লিখতে হবে, অন্য ধরনের সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে হবে। আবার সেখানে সৌন্দর্যের যেগুলো মূলকথা, সেগুলো ঠিক রাখতে হবে। এ বিষয়গুলো ভালো কবিতার স্বাদ গ্রহণ করেছেন এমন বিশেষ ধরনের পাঠকরাই শুধু বিচার করতে পারবেন, সব পাঠক নয়।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তাহলে কি বলা যায় ভিন্ন ভিন্ন পাঠকের ভালো কবিতার ধারণা ভিন্ন?

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, বুদ্ধদেবের একটা প্রবন্ধ আছে রবীন্দ্রনাথের ওপর— ‘কবিতার সাত শরীর’। সেখানে দেখা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ সাত ধরনের কবিতা লিখেছেন। তার মধ্যে সব ধরনের কবিতা আবার সবার পছন্দ নয়। এ নিয়ে মতদ্বৈততা তো আছেই। অনেক সময় দেখা যায় যে, অনেক কবিকে তার যুগে উপেক্ষা করে যাওয়া হয়েছে, দুইশ-তিনশ বছর পরে তাদের সাহিত্য পুনর্জীবন পেয়েছে। এমন তো হয়ই। এটা ঔপন্যাসিকদের ব্যাপারেও হয়। জগদীশ গুপ্তের ব্যাপারে হয়েছিল। কত পরে জগদীশ গুপ্ত আমাদের কাছে এসেছিল। শিল্প-সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে এ সমস্যা থাকবে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: আমরা একটা কথা শুনে থাকি, কবি বা সাহিত্যিকের বিচার তার রচনার পরিমাণ দিয়ে নয়, তার রচনার গুণে...

শহীদ কাদরী: আমি এখানে দু-তিনটা কথা বলব। রচনার পরিমাণটা কোন পরিমাণ, তা তো বলে দেননি কেউ। যেমন— জীবনানন্দ দাশ যখন প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেন, তখন তার বনলতা সেন থেকে শুরু করে বেলা অবেলা কালবেলা পর্যন্ত মাত্র ১৬০টি কবিতা। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আমাদের অন্যতম প্রধান কবি। আমাকে যদি বলা হয়, সত্যিকার তিন প্রধান কবি কে কে? আমি বলব বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও জীবনানন্দ দাশ। বুদ্ধদেব বসু ও অমিয় চক্রবর্তী আমার কাছে একটু পেছনেই থাকবে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কিন্তু মাত্র পাঁচটি বই। অন্যদিকে বাংলাদেশী কোনো কোনো কবির ৬০-৭০টা বই এরই মধ্যে বেরিয়ে গেছে। পৃথিবীর মহাকবিদের মধ্যে র্যাঁবোকে ধরা হয় এবং বোদলেয়ারকে ধরা হয়। বোদলেয়ারের মাত্র দুটি বই। একদম চটি বই। র্যাঁবোর দুটো বই। দুটিই চটি বই— ইলুমিনেশনস এবং সিজন ইন হেল। আবার...থাক...আমি বাংলাদেশী কবিদের নাম বলতে চাই না। হাজার হাজার লিখলেই তো আর হবে না। ভালো কবিতায় অভিনবত্ব আছে, পুরনো জিনিসকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা আছে। ভালো কবিতার সংখ্যা খুব কম। অত্যন্ত ছোট একটা দৃষ্টান্ত দিই। ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি ‘চাঁদমুখ’। নারীদের মুখের সৌন্দর্যের সঙ্গে চাঁদের তুলনা করে বলা হয়— চাঁদমুখ। তার পর আমরা দীনেশ দাসকে পেলাম। তিনি লিখলেন, ‘চাঁদের এই বাঁকা ফালিটি তুমি বুঝি খুব ভালোবাসতে/ এ যুগের চাঁদ হলো কাস্তে।’ এর কিছুদিন পর পেলাম আমরা সুকান্তকে, ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ প্রায় ওই ধরনেই আমরা পেয়েছি আল মাহমুদের কবিতায়— ‘হলুদ পিঠার মতো চাঁদ।’ আর বুদ্ধদেবের কঙ্কাবতী কবিতায় চাঁদের অসংখ্য উপমা আছে। আবার কোনো একটা কবিতায় আমি পড়লাম যে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত মানুষ পড়ে আছে, রাতে চাঁদ উঠেছে, মনে হয় আকাশে একটা নক্ষত্র। এ পর্যন্ত আমরা এসেছি। এর পরে কবিদের যদি চাঁদ ব্যবহার করতে হয়, তাঁকে নতুন কিছু করতে হবে। একজন কবিকে যখন এগোতে হয়, তখন নতুন কিছু করতে হয়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় গ্রামবাংলার বর্ণনায় আমরা যে উপমা পাই, তা রবীন্দ্রনাথেও নেই। এতে বিস্মিত হতে হয়। যখন কবিরা এভাবে যা কিছু স্পর্শ করবে, সেখানেই নতুনত্বের ছাপ থাকবে— এভাবে কয় হাজার বই লিখতে পারবে? চার-পাঁচটা বই-ই তো যথেষ্ট।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: কবির জন্য পেশা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অথবা বলা যায়, পেশা কি কবিতাকে প্রভাবিত করে?

শহীদ কাদরী: আমার ধারণা কবির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর পেশা সাংবাদিকতা। যে ভাষায় সে কবিতা লেখে, সে ভাষায় দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করলে সাংবাদিকতার ভাষা আক্রমণ করে তার সৃষ্টিশীল লেখায়।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: কিন্তু আমরা তো দেখি অনেক কবিই সাংবাদিক এবং তাদের মধ্যে অনেকেই পাঠকপ্রিয়।

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু আমি একটা কথা বলতে চাই যে, কবিতার বিষয়ে একটা কথা আসে— যা গদ্যে লেখা যায়, যা সম্পাদকীয়তে লেখা যায়, তা কিন্তু কবিতার বিষয় নয়। আমাদের এসব কবি অনেক কবিতা লিখেছেন, যা বুদ্ধদেবের ভাষায়— বক্তৃতা, উপদেশ বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ। এবং এসব কবিতা অতিক্রান্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্ণ হয়ে যায়, হতে বাধ্য এবং এটা হচ্ছে সাংবাদিকতার একটা প্রভাব। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করি, আজকের সভ্যতায়, বিশেষত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকে লেখক-সাহিত্যিক-কবিদেরও একটা ভূমিকা পালন করতে হয়। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে অনেক কথা, অনেক কিছু রবীন্দ্রনাথকে বলতে হয়েছে, বুদ্ধদেবকেও বলতে হয়েছে। যেমন— আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমি সাংবাদিকতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও ১৯৬৪ কি ১৯৬৬ সালে একটা বিরাট ঝড় হয়, সেই ঝড়ের পরে আমি একটা বেশ বড় কবিতা লিখেছিলাম, যেটা আজকে আমার কাছে খুব বিবর্ণ মনে হয়, মনে হয় এর প্রাসঙ্গিকতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সাংবাদিকতা অনেক সময় সাংবাদিক-কবিকে বাধ্য করে সময়ের তাত্ক্ষণিকতা দ্বারা আক্রান্ত হতে। যেমন— ভারতীয় কবি-সাহিত্যিকরা একসময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন। সম্প্রতি আমি একটা বই পড়লাম— দ্য লেফট রাইটারস ইন আমেরিকা। তাদের একটা ঐতিহাসিক সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব হয়তো আছে কিন্তু ঠিক সাহিত্যিক গুরুত্ব আর নেই।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: পেশার কথায়ই আবার আসি, তোমার নিজের কথাই ধরা যাক। সেই সময়ে, কবিতা লেখার সেসব দিনে সেই অর্থে তোমার স্থির কোনো পেশা ছিল না। তার পর আমরা তখন তোমাকে দেখলাম ঢাকা টেলিভিশনে কাজ নিতে। সেটিই যখন তোমার পেশা হয়ে দাঁড়াল, তখন তোমার লেখার যে অভ্যাস, তা কি পরিবর্তিত হয়েছিল?

শহীদ কাদরী: তোমাকে একটা স্পষ্ট কথা বলি, চার বছর কাজ করেছিলাম আমি সেখানে। তার পর আমি আমার বড় ভাইকে বললাম, আমি সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার সময় যাই, রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার সময় বেরিয়ে আসি, আমার দ্বারা এ চাকরি করে লেখালেখি করা সম্ভব হবে না, আমার বইও বের করা সম্ভব হবে না। টেলিভিশনে থাকতেই আমাকে আল মাহমুদ-এখলাস এসে বলল, ওরা আমার প্রথম বইটা বের করতে চায়। কিন্তু আমি তিন বছরের মধ্যে ওদের কোনো পাণ্ডুলিপি দিতে পারিনি। যে ক’টা কবিতা লেখা হয়েছে, সেই কবিতাগুলো আমার কাছে নেই। আমি সেগুলো সংগ্রহ করার সময়ও পাচ্ছিলাম না। আমার ভাই বললেন, ‘এই যদি হয়, তবে চাকরি করার দরকার নেই।’ আমার ভাই কোনো দিন আমাকে চাকরি করতে জোর করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘চাকরি করিস না, চাকরি ছেড়ে দে।’ টেলিভিশন থেকে আমি যখন রিজাইন করলাম, টেলিভিশনের লোকেরা তখন খুব অবাক হয়ে গেল। সবাই এসে আমার বাসায় হাজির। বলল, এ চাকরি তুমি ছাড়ছ কেন? এ চাকরি কেউ ছাড়ে! আমি বললাম, আমি তো চাই না টিভি প্রযোজক হিসেবে আমার পরিচিতি হোক। আমি টেলিভিশনে আর কাজ করব না। টেলিভিশন ছেড়ে দিয়ে প্রথমে আমার লেখাগুলো সংগ্রহ করলাম। এ ব্যাপারে আল মাহমুদ আমাকে সাহায্য করলেন, শামসুর রাহমান আমাকে সাহায্য করলেন। আমার অধিকাংশ কবিতা ওদের সঙ্গে ছাপা হতো। ওরা ওদের কপি সংগ্রহে রাখত। এসব কপি চেয়ে চেয়ে প্রথম পাণ্ডুলিপি তৈরি করলাম। পাণ্ডুলিপি তৈরি করে আল মাহমুদকে দিলাম। টেলিভিশনে চাকরির সময়ে আমার লেখা তো হয়ইনি, এমনকি আমার লেখাগুলো জোগাড় পর্যন্ত করতে পারছিলাম না। সপ্তকের সব ক’টা কবিতাই আমি প্রথম কবিতার বইয়ে নিয়েছি। কবিতায় আমার একটু ঘাটতিও ছিল। এমনকি শেষ যে কবিতা ‘শহীদ কাদরি বাড়ি নেই’— সেটা আমি কবিতার বইয়ে নিতে চাইনি। আমি ভেবেছিলাম লোকে এটা নিয়ে হাসাহাসি করবে। ওটা কেন আমি লিখলাম? ওটা আমি লিখেছিলাম কারণ ভেবেছিলাম, একটা কবিতায় নিজের নাম যাওয়া উচিত। বুদ্ধদেব বসুর একটা কবিতা ছিল, ‘বুদ্ধদেব বসু, একদা ছিলেন শিশু, যখন তিনি যুবক হলেন, লোকে বলতো পশু, বুদ্ধদেব বসু।’ ওদিকে আবার আবিষ্কার করলাম এলিয়টরেরও নিজের ওপর একটা ছড়া আছে। আমি ভাবলাম আমারও দরকার এমন একটা নিজের কবিতা, নিজের নামে। Just wrote it. I never meant it seriously. কিন্তু পরে দেখলাম, সেখানে একটা সিরিয়াস কথাও আছে। ওই কবিতাটায় আমি বলতে চেয়েছি যে, আমি একজন বিপদগ্রস্ত মানুষ। শহীদ কাদরী বাড়ি নেই, শহীদ কাদরী ঘুরে বেড়ায়, শহীদ কাদরী আড্ডা মারে— আমি সেটা বোঝাইনি। কবিতা যখন শর্ট পড়ছে— দু-তিনটা কবিতা, যেগুলো আমি নিতে চাইনি বা ভেবেছিলাম পুনর্লিখন করব কিন্তু সময় ছিল না, ওই অবস্থায়ই দিয়ে দিই। তার পর আবার যখন এপিএনে যোগ দিয়েছিলাম, তখনো আমার লেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি ওই ধরনের লোক ছিলাম, যার জন্য শৃঙ্খলহীন অবস্থায় না থাকলে কবিতা হতো না। আর সত্যি কথা বলি— আমার বই বেরুবে, হেন হবে, তেন হবে আমি ভাবিনি।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: শহীদ, ঢাকা টেলিভিশনের চাকরিই কি তোমার সেই অর্থে প্রথম নিয়মিত চাকরি ছিল?

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, ওটাই প্রথম চাকরি।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তার আগে কী করতে? কবিতা রচনা? পাঠাভ্যাস কি ছিল?

শহীদ কাদরী: পাঠাভ্যাস আমার অনিয়মিতই ছিল। আসলে আমাদের বাড়ির স্কলার তো আমার বড় ভাই। তার প্রভাবে পাঠাভ্যাস আমার ছেলেবেলা থেকেই ছিল। আর খুব ছেলেবেলায়ই যে আমি লেখালেখির চেষ্টা করিনি তা নয়। একবার আমার হাম হয়, তখন আমি শুয়ে থাকতে থাকতে দু-চারটা পদ্য বানাই। সেটা আবার বাবাকে শোনাই। বাবা আবার পদ্যটা একটু ঠিকঠাক করে দেন। বলে দেন, এভাবে এভাবে করো। এছাড়া মাঝে মধ্যে আমার ভাই বলত, একটা গল্প তোকে পড়ে শোনাই, এটা আনসু ভাই লিখেছে। আনসু ভাই হলো আনিস চৌধুরী। আনিস চৌধুরী সম্পর্কে আমার ফুফাতো ভাই। আনিস ভাই তখন শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়তেন আর ছোটগল্প লিখতেন। ভাইয়া আবার গল্পগুলোর চরিত্রগুলো শনাক্ত করত যে, অমুক চাচার চরিত্র আছে এ গল্পে। আমার ভাই যখনই যেটা পড়ত, যেটা তার ভালো লাগত, ইংরেজি ও বাংলায়, আমাকে পড়ে শোনাত। যখন যে সিনেমা দেখে তার পছন্দ হতো, আমাকে পয়সা দিয়ে সে সিনেমা দেখতে পাঠাত। আমি তো জানতাম যে লেখকরা লেখে। এ সময় রাজধানীতে ঝড় বেরুল আবু রুশদ মতিনউদ্দিনের। তিনি সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই হন। ওটা নিয়ে খুব হইচই হলো। শুনলাম ‘আবু রুশদ কিতাব লিখতা হে, আবু রুশদ কিতাব লিখতা হে।’ এগুলো আমার মনে ছাপ ফেলেছিল। তার পর ঢাকায় এলাম।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: ঢাকায় এলে কবে?

শহীদ কাদরী: ভাষা আন্দোলনের ঠিক আগে। আসার মাসখানেকের মধ্যেই গোলাগুলি হলো।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তাহলে বায়ান্নর গোড়ার দিকে?

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, আমার মনে আছে, আমি পাকিস্তান অবজারভারের ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ওখানে গুলি হলো। তখন দৌড়ে এসে বাড়ির ছাদে উঠলাম এজন্য যে, ছাদ থেকে কিছু দেখা যায় কিনা। ছাদ থেকে কিছু দেখা গেল না। সেই ঘটনার পরে আমার একটা অঙ্কের খাতায় কয়েকটা মকশো করেছিলাম।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তুমি কত বড় তখন?

শহীদ কাদরী: আমার তখন ১২-১৩ বছর হবে। আরেকটু কমও হতে পারে। পঞ্চাশের দশকের দাঙ্গার সময় আমাদের বাড়ির পাশে একটা পরিবার এল। খোকন নামে একটি ছেলে ছিল, তার সঙ্গে আমার বড় ভাইয়ের খুব বন্ধুত্ব হলো। খোকনরা তো সাতচল্লিশেই চলে এসেছে। আব্বার মৃত্যুর পর আমরা এসেছি ঢাকায়। আমার মা তো বর্ধমানের। মায়ের দিকের আত্মীয়রা বলছিলেন, ঢাকায় যাওয়ার তো কোনো দরকার নেই। অন্যদিকে আমার বাবার এক ভাই আর এক বোন। তারা বললেন যে, আমাদের ঢাকায় যেতেই হবে। আমরা তা-ই বাধ্য হলাম আসতে। আসার পর হঠাত্ দেখি, একদিন কেউ বাইরে থেকে শাহেদ শাহেদ বলে ডাকছে। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি যে খোকন। খোকন জানাল, আনিস ভাইয়ের কাছ থেকে ঠিকানা পেয়েছে। সে বোধহয় কবিতা লেখে তখন। সে বলল, ‘তুই শামসুর রাহমানের কবিতা পড়েছিস?’— ‘না তো।’ ‘নাম শুনেছিস?’— ‘না তো, আমি নাম জানি না।’ ‘আরে তার তো দেশ পত্রিকায় প্রত্যেক সপ্তাহে কবিতা ছাপা হয়। দেশ পত্রিকায় কখনো দেখিসনি?’— ‘না তো।’ ‘আরে বাচ্চু ভাইকে তো আমি তোর কথা বলব।’

এই বলে খোকন চলে গেল।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: এই মহিউদ্দিন আহমদই আহমদ মীর। এই আহমদ মীরই শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতার বই প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে প্রকাশ করেন বার্ডস অ্যান্ড বুকস থেকে...

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, মহিউদ্দিন ভাইয়ের পত্রিকায়ই আমার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতার নাম ছিল পরিক্রমা। পুরোপুরি তখনকার মার্কসিস্ট কবিতার নকল। তার পর আবার ওখানেই আমার দ্বিতীয় কবিতা ছাপা হয়— জলকন্যার জন্যে। সেখানে আমি মার্কসিস্ট কবিতা থেকে কিছুটা সরে এসেছি। জলকন্যার জন্যে যখন প্রকাশিত হলো, তখন শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার আলাপ হয় খান মজলিসের বুক স্টলের ওখানে। কারণ আমি প্রায়ই গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, দেখতাম যে কেউ স্পন্দন খুলে আমার কবিতাটা পড়ছে কিনা। একদিন দেখি শামসুর রাহমান স্পন্দন খুলে কবিতা দেখছেন। আমি অধীর আগ্রহে ঝুঁকে দেখছি, তিনি কোন কবিতাটা পড়ছেন। শামসুর রাহমান মুচকি হেসে আমার দিকে তাকালেন। আমি আর পারলাম না। আমি বোধহয় জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার কাছে কেমন লাগল জলকন্যার জন্য? তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি শহীদ কাদরী? আপনার কথা তো আমাকে খোকন বলেছে। আমার পকেটে একটা টাকা ছিল। আমি দেখলাম আলাপটাকে দীর্ঘায়িত করা দরকার। রিভার ভিউ ক্যাফে নামে একটি ক্যাফে ছিল সদরঘাটে। আমি বললাম, ‘চা খাবেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ রিভার ভিউ ক্যাফেতে তখন চা চার আনা করে কাপ। দু’আনা করে একটা বিস্কুট পাওয়া যেত, যার মধ্যিখানে চকোলেট দেয়া থাকত। চা-বিস্কুট নিয়ে বসলাম। তখন কিন্তু আমার পকেটে আরেকটা কবিতা। কথার ফাঁকে বললাম, ‘আমার কাছে আরেকটা কবিতা আছে, আপনি শুনবেন?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি কবিতা বের করলাম। শামসুর রাহমান নিলেন। সেখানে একটা লাইন ছিল, ‘মেয়েটা সারারাত জেগে ভুল ব্যাকরণে কবিতা লেখে।’ শামসুর রাহমান আমাকে বললেন, ‘আপনার ভুল বানানটা কিন্তু ভুল।’ এই কথা শুরু হলো। সেখান থেকে কথা বলতে বলতে তার আশিক লেনের বাসায় যাই। সেখানে তিনি তার ছাপা হওয়া কবিতার একটা বান্ডিল নামালেন। একটার পর একটা কবিতা পড়ে শোনালেন। এরই মধ্যে একজনের আমন্ত্রণে সওগাত অফিসে গিয়ে দেখি, ওখানে সব বড় বড় লেখক— বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক, খালেদ চৌধুরী— সবাই ওখানে। তখন সওগাত পত্রিকা চালাচ্ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি কলকাতার ছেলে, আমি শুনলাম কলকাতার ছেলেরা নাকি ইংরেজিতে ভালো। এই প্রবন্ধটা অনুবাদ করে আইনো তো মিয়া।’ স্টেটসম্যানে একটা ইংরেজি প্রবন্ধ বেরিয়েছিল লীলা রায়ের— Contemporary Bengali Poetry. এতে শামসুর রাহমানের ওপর অনেকখানি কথা ছিল। তো আমি সেটা অনুবাদ করে নিয়ে গেলাম আর বললাম, একটা কবিতা দেব। দিলাম কবিতা একটা। তার পর আবার ওই একই কবিতা গোধূলির গান দিলাম পূর্বাশায়। ছাপা হয়ে গেল ওটা। তখন আমার মা বেঁচে। আমি ক্রিকেট খেলে বাসায় ফিরছি। ফিরে দেখি আম্মার কাছে রাখা পূর্বাশা। কয়েক ডজন কবির সঙ্গে ছাপা হয়েছে আমার কবিতা। এ রকম চলছে। এর মধ্যে একদিন সওগাত অপিসেই আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা। আল মাহমুদ একেবারে সদরঘাটে নেমেই সওগাত অফিসে। ওই যে আমি লিখেছি না, ‘আল মাহমুদ এক হাতে তার ঐ টিনের সুটকেস’... (হেসে)। ও আহত হয়েছিল এ টিনের সুটকেসটা লেখায়।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: (হেসে) তখন তো টিনের সুটকেসই ছিল...

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ। তো সওগাত অফিসে আল মাহমুদ এল। চোখ টিপাটিপি হলো, লোকজন এটা-সেটা কথা বলল। কিন্তু তখন অলরেডি সওগাতে মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে ওর একটা কবিতা ছাপা হয়— ‘অধ্যাপক তবুও কান্না পায়।’ ইট ওয়াজ অ্যা নাইস পয়েম। কিন্তু লোকজন চোখ টিপাটিপি করল ওকে দেখে। আমি আর আল মাহমুদ সওগাত থেকে বেরিয়ে এলাম। অনেক কথা বলতে বলতে আল মাহমুদের সঙ্গে গেলাম নবাবপুরে, যেখানে ও উঠেছিল। ওর সঙ্গে আমার গভীর বন্ধুত্ব হলো। অন্য কারো সঙ্গে তার ঠিক হূদ্যতা হয়নি। একদিন আমি শামসুর রাহমানের বাড়ি থেকে— আশিক লেন থেকে ফেরার পথে আবার আল মাহমুদের ওখানে ঢুকেছি। দেখি সে লেখালেখি করছে। বললাম, ‘কি রে দোস্ত কী করিস?’ বলে, ‘আমি শামসুর রাহমানের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে এসেছি কবিতা পত্রিকার— কবিতা পত্রিকায় কবিতা পাঠাচ্ছি। সেদিন বিকালে শামসুর রাহমান এসেছেন। আমি শামসুর রাহমানকে বললাম, আল মাহমুদ তো কবিতা পাঠাল কবিতা পত্রিকায়। ওর তো কবিতা পত্রিকায় আমার আগে কবিতা ছাপা হয়ে যাবে। শামসুর রাহমান বললেন, খাতা বের করেন আপনি। খাতা বের করে দিলাম। একটা কবিতা দেখিয়ে বললেন, এটা পাঠান। আরেকটা দেখিয়ে বললেন, এটাও পাঠান। আমি ওই কবিতা দুটো কপি করে পাঠিয়ে দিলাম ওই দিনই। একসঙ্গে সবার কবিতা ছাপা হয়ে গেল। নেক্সট ইস্যুতেই। শামসুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী। অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু যেদিন সেই সংখ্যাটা আমার হাতে এল, তার আগের রাতেই আমার মা মারা গেলেন। আমি কবরস্থান থেকে ফিরে স্নান করে বিউটি বোর্ডিংয়ে এসে একা বসে আছি। টেবিলে মাথা রেখে আমি বসে আছি চুপচাপ। হঠাত্ দেখি পিঠে কার হাত পড়ল। মাথা তুলে দেখি শামসুর রাহমান। শামসুর রাহমান বললেন, আপনার কবিতা তো ছাপা হয়েছে। দুপুরে আপনার বাসায় গিয়েছিলাম। দেখলাম অনেক লোকের ভিড়। এর মধ্যে পিয়ন এসে পত্রিকাটা দিয়ে গেছে। ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারত, তাই আমি নিয়ে এসেছি। দেখলাম সংখ্যাটা। ভালোই লাগল।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তখনো তো শামসুর রাহমানের কবিতার বই বের হয়নি?

শহীদ কাদরী: না, তখনো বের হয়নি। প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে আমার সামনে ছাপা হয়েছে। আমি দেখেছি।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে-এর প্রুফ-পাঠক ছিলাম আমি। আহমদ মীর সাহেবের প্রকাশনা বার্ডস অ্যান্ডস বুকসের একমাত্র কর্মচারী বলা হোক আর সহায়ক বলা হোক— সে আমিই ছিলাম। আর তোমার বইটি... একসঙ্গে তিনটি বই বের হয়— শামসুর রাহমানের রৌদ্র করোটিতে...

শহীদ কাদরী: না, না। শামসুর রাহমানের বিধ্বস্ত নীলিমা।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: বিধ্বস্ত নীলিমা, তোমার উত্তরাধিকার আর আল মাহমুদের কালের কলস। এ তিনটি বই যখন একসঙ্গে প্রকাশিত হয় বইঘর থেকে, তখন আমরা ধরে নিই— এই হচ্ছে আধুনিক বাংলা কবিতার শুরু। এবার এক ভিন্ন প্রসঙ্গ তুলি। কবির জন্য কোনটি সহায়ক— শুদ্ধাচারী জীবন না অমিতাচারী জীবন?

শহীদ কাদরী: আমরা জগতে দুই ধরনের কবিই দেখেছি। এটা আসলে নির্ভর করবে কবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। শুদ্ধাচারী কবি যে ধরনের কবিতা লিখবেন, অমিতাচারী কবির কবিতা কিছুটা হলেও ভিন্ন হবে। তবে আমি বলব, কবির জীবন কিছুটা শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া দরকার। তা না হলে অসংযম, শৃঙ্খলাহীনতা দ্বারা কবিতা আক্রান্ত হয়, সেটা খুবই ক্ষতিকর হবে। একটা চমৎকার উপন্যাস আছে বুদ্ধদেবের, পড়েছ কিনা জানি না— যবনিকা পতন। দুই বন্ধু, দুজনই কবি। একজন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, নিয়মিত পড়াশোনা, লেখালেখি করে; অন্যজন মদ্যপ, জুয়া খেলে, টাকা উড়ায়, টাকা ধার করে এবং মাঝে মধ্যে লেখে— মধ্যপথে লেখা বন্ধ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নেশার ঘোরে কাউকে হত্যা করে। আমি শামসুর রাহমানকে দেখেছি নিয়মিত লিখতে। আমার মনে আছে একদিন সন্ধ্যায় আমরা কোথাও গিয়েছিলাম— কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে। ফিরে এসে দেখি আমাদের বাড়ির সামনে লাইটপোস্টের নিচে শামসুর রাহমান খুব দ্রুত পায়চারি করছেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে শামসুর রাহমানকে বললাম, ‘কী ব্যাপার? আপনি কতক্ষণ হয় এসেছেন?’ শামসুর রাহমান বললেন, ‘অনেকক্ষণ। চলেন যাই বসি।’ বসে শামসুর রাহমান বললেন, ‘আমি আজকে সপ্তাহখানেক হয়ে গেল একটা লাইনও লিখতে পারিনি।’ খুব মন খারাপ ছিল তার। সৈয়দ শামসুল হককেও আমি দেখেছি ভোরে উঠে লিখতে বসতেন। আর রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে আশ্চর্য হতে হয় এ কারণে যে, রবীন্দ্রনাথ এত কিছু লিখেছেন, শুধু নাটকই এত পরিমাণ লিখেছেন! আর রবীন্দ্রনাথ তো পড়েছেনও। আমি কার লেখায় যেন পড়লাম যে, তিন-চারটে বই রবীন্দ্রনাথের টিপয়ের ওপরে থাকত বাম দিকে। সকালবেলায় দেখা যেত বইগুলো ডান দিকে। অর্থাত্ বইগুলো পড়া হয়ে গেছে। বইগুলো এখন লাইব্রেরিতে চলে যাবে। এক রাতে রবীন্দ্রনাথ তিন-চারখানা বই পড়ে ফেলতে পারতেন।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: লেখকের নিজের রচনার প্রতি প্রেম থাকতে হয়, সংকল্প থাকতে হয়, সেসঙ্গে নিষ্ঠা থাকতে হয়...

শহীদ কাদরী: আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, শামসুর রাহমান, আপনি কি মনে করেন আমার দ্বারা কবিতা হবে? শামসুর রাহমান আমাকে বললেন, দেখেন আমি দেখতে পাই আপনার মধ্যে দুটো শক্তি কাজ করছে। একটা আপনার লেখার পক্ষে, আরেকটা বিপক্ষে। যে শক্তিটা জিতবে সে অনুযায়ী আপনার কবিতা হবে। আপনি যেভাবে চলছেন, সেভাবে তো মানুষ লেখা বন্ধ করে দেয়। আমার তখন চিন্তা ছিল, একে তো বাংলা কবিতা, তার ওপর পূর্ব পাকিস্তান, এমন কিছু হলে কি-ইবা আসে যায়— এমন একটা ভাবনা ছিল। এ রকম একটা ব্যাপারের সঙ্গে ভাইয়ার একটা উন্নাসিকতাও কাজ করেছিল। ভাইয়া আমাকে এলিয়ট পড়ে শোনাচ্ছে, এলিয়টের ওপর বিষ্ণু দে’র প্রবন্ধটা পড়ে শোনাচ্ছে, আমার মনে হতো— ওরে বাবা, আমি তো ওইখানে কখনো পৌঁছতে পারব না! এজন্য ক্ষণজন্মা হতে হয়।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: আমরা শুরুতে ফিরে যাচ্ছি আবার, তোমার কবিতার কথায় ফিরে আসি। তুমি তোমার কবিতার মধ্য দিয়ে পাঠককে কী দিতে চেয়েছ বা পাঠকের মধ্যে কোন আবেগ সঞ্চারিত করতে চেয়েছ? পাঠককে কী বলতে চেয়েছ?

শহীদ কাদরী: আমি প্রথমত উত্তরাধিকার কবিতার মাধ্যমে...আমার প্রথম বইয়ের নামও উত্তরাধিকার...পাঠকদের বলতে চেয়েছি যে, আবহমান বাংলা কবিতা এবং তিরিশের কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের অবস্থান কোথায়। আমরা যখন জন্মগ্রহণ করলাম, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলো অথবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্যে পড়ল। সর্বত্রই ব্ল্যাকআউটের শহর। জাপানি বোমা পড়বে— এই ভয়। এমন সময়ে আমরা জন্মালাম। আরেকটু বড় হতেই আমরা দেখলাম আন্দোলন, দাঙ্গা, দেশভাগ। দেশভাগ হতে না হতেই আমাদের অনেককে আজন্ম নিজেদের দেশ বলে যেটা জেনেছি, সে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। এই যে পটভূমি, এই পটভূমির কারণে আমাদের মানসিকতা তিরিশের কবিদের মানসিকতা থেকে অনেকটা ভিন্ন। তিরিশের কবিরা নরকের কথা বলেছেন, নিঃসঙ্গতার কথা বলেছেন। মানুষমাত্রই নিঃসঙ্গ কিন্তু নিঃসঙ্গতারও মাত্রা আছে। তিরিশের কবিরা যে নরকের কথা বলেছেন, যেমন— সুধীন দত্তের কবিতায়, সে নরক তারা তাত্ত্বিকভাবে দেখেছেন। কিন্তু আমরা সেই নরকেই বড় হলাম। এবং সেই নরকে বড় হওয়ার পর সেই নরকে বসবাস করার যে অভিজ্ঞতা, সে অভিজ্ঞতা বিভিন্ন কবিতায় বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: এই যে পরবাস, একজন লেখকের নিজ দেশ— যেখানে সে বড় হয়েছে, বেড়ে উঠেছে— তার বাইরে এসে ভিন্ন দেশে, ভিন্ন সংস্কৃতিতে থাকায় তার লেখায় প্রচুর পরিমাণে ইফেক্ট পড়ে।

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, তা পড়ে। প্রবাসে বাস করি, কবিতায় নিশ্চয়ই তার প্রভাব পড়ে। লোকে অমিয় চক্রবর্তীর দৃষ্টান্ত দেয়। তবে অমিয় চক্রবর্তী প্রবাসে আসার আগেই বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। একমুঠো খসড়া, দূরযানী— এসব লেখা হয়ে গেছে তার। প্রবাসে তিনি প্রধানত পরপার আর পালাবদল— এ দুটি বই লিখেছেন। তবে আমি মনে করি, দেশে থাকলে যেসব ঘটনা ঘটে, যেসব আলাপ-আলোচনা হয়, এগুলো নানাভাবে লেখককে উদ্বুদ্ধ করে, চালিত করে। কখনো তিনি প্রতিবাদী হন, কখনো সমর্থন করেন। এমনকি বিদেশে এসেও দেশের একেকটা ঘটনার তরঙ্গ এসে তাকে আঘাত করে কিন্তু সে আঘাত এত সরাসরি নয়। তার জন্য অবশ্যই লেখা ব্যাহত হয়। প্রবাসে আরেকটা মস্ত অসুবিধা এই যে, প্রবাসে লেখকরা সম্পূর্ণ স্মৃতির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু স্মৃতিটা তো স্মৃতিই হয়ে গেছে, সেটা তো আজকের সময় না। মাঝে মধ্যে বছরে একবার দেশে গেলেও দেশের মধ্যে যে সামাজিক, রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনার স্রোত, প্রতিস্রোত, জোড়স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে— এগুলো সব স্পর্শ করা যায় না।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: ফেলে আসা জীবন নিয়ে যদি লেখককে থাকতে হয়, তাহলে তো এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কী পরিমাণে তার রচনা ব্যাহত হয়...

শহীদ কাদরী: অ্যাকজাক্টলি। তবে প্রবাসে লেখক প্রবাসের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নিজের দেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশ নিয়েও লিখতে পারেন, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। অমিয় চক্রবর্তী লিখেছেন। ইউরোপের অনেক লেখকই নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গেছেন কিন্তু তারা ইউরোপীয় ফ্রেমের মধ্যেই থেকেছেন।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: অনেকে বিদেশে বসেও যা লিখেছেন... যেমন— সিংগার—

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, তবে ওই পোল্যান্ডেই তার ব্যাকগ্রাউন্ড। কিছু সস্তা বই আছে নিউইয়র্কের ব্যাকগ্রাউন্ডে।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: আরেকটি মজার ব্যাপার কিন্তু আছে। যারা ছোটবেলা থেকেই বিদেশে আছেন, বিদেশেই লেখক হিসেবে যারা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, তাদের লেখার বিষয়ও কিন্তু দেশ।

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ, ঝুম্পা লাহিড়ীও তা-ই, অরুন্ধতী রায়ও তা-ই।

আমি দেশ ছেড়ে আসব ঠিক করিনি। ’৭৮-এ এসেছি। ঠিক করেছি দেশে ফিরে যাব। ’৮২-তে ঢাকায় গিয়েছিলাম। আমি অসুস্থ না হলে এখনই ফিরে যেতাম। আমার স্ত্রীও তো থাকতে চায় না এখানে। অনেকে বলে, তোমার কপাল ভালো যে তুমি বিদেশে। কারণ বাংলাদেশে এ চিকিত্সার যে খরচ, তা কোটিপতি হলেও বহন করা সম্ভব হতো না। আমার আজকে ১০ বছর ধরে চলছে ডায়ালাইসিস।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: শহীদ—

শহীদ কাদরী: হ্যাঁ।

জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত: তোমায় যন্ত্রণা থেকে এবার মুক্তি দেয়া যাক। আমরা চলি।

 

            (প্রকাশিতব্য গ্রন্থ: সাক্ষাৎকার/শহীদ কাদরী, সম্পাদনা: মুহিত হাসান, থেকে নেওয়া)

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত