পঞ্চানন দাসের কবিতা দিয়েই শুরু হোক!
শুন সভে একভাবে নৌতুন রচনা।
বাংলা নাশের হেতু মজনু বারনা।।
কালান্তক যম বেটাক কে বলে ফকির।
যার ভয়ে রাজা কাঁপে প্রজা নহে স্থির \
সাহেব সুভার মত চলন সুঠাম।
আগে চলে ঝাণ্ডা বাণ বাউল নিশান\
উট গাভী ঘোড়া হাতী কত বোগদা সঙ্গতি।
জোগান তেলেঙ্গা সাজ দেখিতে ভয় অতি\
চৌদিকে ঘোড়ার সাজ তীর বরকন্দাজি।
মজনু তাজির পরে যেন মরদ গাজি।।
দল বল দেখিয়া সব আক্কেল হৈল গুম।
থাকিতে এক রোজের পথ পড়্যা গেল ধুম\
এবার তখনকার বাংলা বড় জমিদারদের একজন নাটোরের রানী ভবানীকে লেখা সুপ্রকাশ রায় অনূদিত মজনু শাহর একটি চিঠি পাঠ করা যাক। মজনুর চিঠি ১৭৭২-এর প্রথম দিকে লিখিত হয়েছে বলে মনে করা হয়।
‘আমরা দীর্ঘকাল ধরিয়া বাংলাদেশে ভিক্ষা করেতেছি এবং বাংলাদেশেও বরাবর আমাদের অভ্যর্থনা জানাইয়াছে। আমরা কাহাদের গালি দিই না অযথা কোন লোকের গায়ে হাত তুলি না।। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও আমাদের ১৫০ জন নির্দোষ ফকিরকে হত্যা করা হইয়াছে। আমাদের পরিধান বস্ত্র এমন কি খাদ্যদ্রব্য পর্যন্ত কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে। এই সকল গরীব লোককে হত্যা করিয়া কি লাভ হয় তাহা বলিবার প্রয়োজন নাই। পূর্বে ফকিরেরা একাকী ভিক্ষা করিয়া বেড়াইত, এখন তাহারা দলবদ্ধ হইয়াছে। ইংরেজরা তাহাদের এই ঐক্য পছন্দ করে না, ফকিরদের উপাসনায় বাধা দেয়। আপনিই আমাদের প্রকৃত শাসক, আমরা আপনাদের সকলের জন্য প্রার্থনা করি। আমরা আপনার নিকট হইতে সাহায্য লাভের আশা করি।’
২৫ জানুয়ারি ১৭৭২ নাটোরের নিযুক্ত কোম্পানির সুপারভাইজার কোম্পানির রাজস্ব পর্ষদে যে চিঠি পাঠান সুপ্রকাশ রায়ের অনুবাদে তা পাঠ করা যেতে পারে:
‘আমার হরকরা সংবাদ লইয়া আসিল, গতকাল ফকিরদের একটা প্রকাণ্ড দল সিলবেরির (বগুড়া জেলার) একটি গ্রামে আসিয়া সমবেত হইয়াছে। তাহাদের নায়ক মজনু অনুচরদের উপর কঠোর নির্দেশ দিয়াছেন যে তাহারা যেন জনসাধারণের উপর কোনো প্রকার অত্যাচার বা বলপ্রয়োগ না করে এবং জনসাধারণের স্বেচ্ছার দান ব্যতীত কোন কিছুই গ্রহণ না করে। কিন্তু আমি সংবাদ পাইয়াছি তাহারা দয়ারাম রায়ের অধিকারযুক্ত নূরনগর গ্রামের কাছারি হইতে পাঁচশত টাকা ও জয়সিন পরগণার কাছারি হইতে ষোলশত নব্বই টাকা লুণ্ঠন করিয়াছে। শেষোক্ত কাছারির সকল কর্মচারী বিদ্রোহীদের আগমণের সংবাদ শুনিয়াই সকল টাকা-পয়সা ও মালপত্র ফেলিয়া পলায়ন করিয়াছে।’
সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ গ্রন্থে এ নির্দেশনার পরবর্তী একটি দৃশ্যপটও চিত্রিত হয়েছে। সেই হরকরা কোম্পানির সুপারভাইজারকে জানিয়েছেন যে গ্রামবাসীরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে বিদ্রোহীদের আহারের ব্যবস্থা করেছে। তাছাড়া বিদ্রোহীরা গ্রামবাসীর ওপর কোনো অত্যাচার করেনি। সুপারভাইজারের সেই হরকরা তাকে আরো জানিয়েছে যে কৃষকরাও বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিয়েছে এবং ইংরেজ সরকারকে কর দেয়া বন্ধ করে সেই কর বিদ্রোহীদের হাতে তুলে দিয়েছে। বিদ্রোহ কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। পঞ্চানন দাসের কবিতার সেই ‘কালান্তক যম বেটা কে বলে ফকির/ যার ভয়ে রাজা কাঁপে প্রজা নহে স্থির’—সেই যম যে আসলে ভিখারি নন তাতো স্পষ্ট, তিনি ডাকাতও নন, তিনি বিদ্রোহী। তিনি অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা, মুসলমানদের মধ্যে অবশ্যই প্রথম বিদ্রোহের নেতৃত্ব ফকির মজনু শাহেরই। মজনু শাহের জন্মস্থান পারিবারিক পরিচয় ইতিহাস গবেষকরা উদ্ধার করতে পারেননি। যার জন্ম পাঞ্জাবের আলোয়ার পরগণার মেওয়াতে। তবে তার মৃত্যুর বছর ১৭৮৭, এটা নিশ্চত। তিনি বাংলায় দীর্ঘকাল অবস্থান করলেও মৃত্যুর ক’বছর আগে নিজ এলাকায় চলে যান এবং তাকে সমাহিত করা হয় মেওয়াতেই। তিনি কখন কীভাবে বাংলায় এসে পৌঁছেন, তা অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। তার নামে ব্রিটিশ কোম্পানি প্রশাসনে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হতো তা স্পষ্ট। ১৭৭৬-এ বগুড়ায় কালেক্টর পদে যোগদান করলেন মিস্টার গ্ল্যাডউইন, সেদিন ১৫ মার্চ এসেই শুনলেন ২০ মার্চ মহাস্থান মেলায় ফকির মজনু শাহ আসছেন। পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চেলে যেতে পারে এ আশঙ্কায় তিনি বাড়তি সৈন্যের আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। বিচলিত ও সন্ত্রস্ত কালেক্টর অসন্তুষ্ট হয়ে কাউন্সিলকে লেখেন যে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় হলে তিনি বাড়তি সৈন্য চাইতেন না, কিন্তু প্রজাদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, তাদের অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়া যায় না। তিনি রাজপত্র বাহিনীর নায়কের মতো আসছেন। তিনি এখানে নিজস্ব সেনানিবাস গড়ে তুলছেন এবং বর্ষা মৌসুম এখানেই কাটাবার ঘোষণা দিয়েছেন। কালেক্টরের বার্তাবাহক বলছেন এবার তিনি আর কিছু বন্ধকী সম্পদ আদায় করবেন। তিনি ভীত নন, বিরোধিতা করলে তিনি প্রতিরোধ করবেন। কালেক্টরের চিঠিতে জানা যায় ফকির মজনু শাহ মোটেও দীনহীন ছিলেন না। তিনি টাকা লগ্নি করার ব্যবসাও করতেন। তার নেতৃত্বে বহু অভিযান পরিচালিত হয়। তার অনুসারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, অন্যদিকে পতন ঘটতে থাকে ব্রিটিশ রাজত্বের। কয়েকবার পশ্চাদপসরণ করে আবার সদলবল জেগে উঠেছেন। ১৭৮৬ সালে ময়মনসিংহ-সংলগ্ন অঞ্চলে যুদ্ধে তার বাহিনী মারাত্মকভাবে পর্যুদস্ত হয়। তিনিও আহত হন। এরপর তিনি আর বাংলায় ফেরেননি।
আবু তালিব বনাম সিরাজুল ইসলাম বিতর্ক
দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সিরাজুল ইসলাম অধিক খ্যাতিমান, রচনাগুণেও দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক। আবু তালিব ফকির মজনু শাহ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।
আবু তালিব লিখছেন, ফকির ও সন্ন্যাসীদের আন্দোলন ‘আজাদী আন্দোলনের আদিধারা’ আর সিরাজুল ইসলাম বলছেন ‘তথাকথিত ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন’। তিনি বলছেন ‘তাদের কর্মস্থল প্রধানত কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন বীরভূম, বিষ্ণুপুর মেদিনীপুর, রংপুর, দিনাজপুর, চব্বিশ পরগণা ও উত্তর পশ্চিম ময়মনসিংহ। এ জেলাগুলো ১৭৬৯-৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষে সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত যায়। দুর্ভিক্ষের ফলে এ জেলাগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়। যারা জীবিত ছিল তাদের অকেকেই জীবনধারণের জন্য বাড়িঘর ছেড়ে ভ্রাম্যমাণ জীবন অবলম্বন করে দস্যুবৃত্তি গ্রহণ করে। এ দস্যুরা বহু সুসংগঠিত দলে বিভক্ত ছিল। ফকির-সন্ন্যাসীরা ছিল তাদের সেরা।’
মূলত দুজনের বিরোধই আমাকে খানিকটা পড়াশোনা করতে বাধ্য করেছে। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই কিন্তু পাঠক হিসেবে আমার কাছে দুটো বিষয় স্পষ্ট হয়েছে:
১. ধর্মীয় আবেগকে শীর্ষে রেখে গ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে অধ্যাপক আবু তালিব যথেষ্ট অতিকথন করেছেন।
২. সম্ভবত হাতের কাছে পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ ও গ্রন্থ-সমর্থন না পেয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ‘শোনা কথা বলার মতো’ করে বলে দিয়েছেন তারা আসলে দস্যু। এটাও তার মতো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিকের জন্য বেমানান।
সিরাজুল ইসলামের ওপর নির্ভর করলে ধরে নিতে হবে ফকির ও সন্ন্যাসীরা সবাই বাংলার অধিবাসী, ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে তাদের ডাকাত বানিয়েছে। বাস্তবে তাদের কেউই বাঙালি নন, তাদের কেউ বাংলায় জন্মগ্রহণ করেননি। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ইংরেজি ১৭৭০-৭১ সালের। এটা মেনে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই যে ১৭৭০-৭১ বা তার পরে ফকির-সন্ন্যাসীদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। আরো ১০ বছর আগের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির চিঠিপত্রে সন্ন্যাসীদের উল্লেখ্য রয়েছে। কোম্পানির দুই কর্মকর্তা বিলেতে কাউন্সিলকে বর্ধমান আক্রমণের কথা জানিয়েছেন। খাজনা থেকে মুক্তির দাবিকে ডাকাতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা অদূরদর্শিতাই, এটি পুরো রাজনৈতিক দাবি। বাংলার কৃষক আন্দোলনের এর সম্পৃক্ততা সুপ্রকাশ রায় পর্যাপ্ত যুক্তি ও উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন। মন্বন্তরের সাত বছর আগে ওয়ারেন হেস্টিংস ফকির অধ্যুষিত বাকেরগঞ্জের সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত পত্র লিখেছেন। কোম্পানির ঢাকা ফ্যাক্টরি ফকিরদের আক্রমণের শিকার হওয়া এবং ফ্যাক্টরির দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির সাহেবের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিও মন্বন্তরের সাত বছর আগের। একই বছর রাজশাহীর রামপুর-বোয়ালিয়া ফ্যাক্টরি সন্ন্যাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের বিলেতি সদর দপ্তরে পাঠিয়েছেন।
একটি বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করতে হবে যে লুণ্ঠনও তাদের লক্ষ্য ছিল। সেকালে প্রজারা দিন-আনা দিন-খাওয়ার চেয়ে ভালো অবস্থায় যে ছিল না তা মানতেই হবে। ক্ষুধার রাজ্যে আইন অচল। তারাও ফকির-সন্ন্যাসীদের দলে ভিড়ে যেতে উদ্বুদ্ধ হয়।
নাটোরের রানী ভাবানীকে লেখা ফকির মজনু শাহর লক্ষ্য স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, আগে ফকিররা একা ভিক্ষা করত, এখন দলবদ্ধ হয়ে ভিক্ষা করে। ইংরেজরা ফকিরদের ঐক্য পছন্দ করেন না।
কোনো অর্থনৈতিক যুক্তি এটা প্রমাণ করে না যে দলবদ্ধভাবে ভিক্ষা করলে তাদের বেশি প্রাপ্তিযোগ্য ঘটবে না। তাহলে এটা স্পষ্ট, তারা কোনোভাবে সনাতন ভিক্ষুক ছিলেন না। তারা ছিলেন অনেকটা সংগঠিত ডাকাত অথবা বিল্পবী অথবা এ দুয়ের মিশ্রণ। তারা ডাকাত ছিলেন এটা যুক্তিযোগ্য করে ফেলা কষ্টকর হবে। একসঙ্গে সহস্র বা ততোধিক ডাকাতের সমাবেশ অন্তত ভারতবর্ষে কোথাও দেখা যায়নি। কোনো সন্দেহ নেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক কিংবা ধর্মভিত্তিক কিংবা দার্শনিক ঐক্য তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। ব্যাপারটা ডাকাতি হলে আর্থিক প্রণোদনাই প্রধান বিবেচ্য থাকত—অধিকতর যোগ্য বেশি লভ্যাংশ বা লুটের অংশ চাইতেন, ধনবাদী কাঠামোতে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতো, নেতৃত্বের জন্য খুনাখুনি হতো। সুপ্রকাশ রায়ের ‘ভারতের কৃষক-বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত। নিঃসন্দেহে আবু তালিব জ্ঞাত কিংবা অজ্ঞাতসারে সুপ্রকাশ রায়ের মতামত গ্রহণ করেছেন বলেই ‘আন্দোলনের আদিধারা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। কিন্তু সুপ্রকাশ রায় স্পষ্ট বলেছেন, ১৭৬৩ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত চলতে থাকা ভারতের কৃষক ও কারিগরদের প্রথম আন্দোলনটিই সন্ত্রাস বিদ্রোহ নামে পরিচিত। লেস্টার হাসিনসনও তাদের বিদ্রোহকেই ভারতের সন্ত্রাসবাদী বিদ্রোহের অগ্রদূত বলে চিহ্নিত করছেন।
ওয়ারেন হেস্টিংস কী বলেছেন তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এ মন্তব্য এড়িয়ে তাদের ‘তথাকথিত’ বলার সুযোগ খুব কম: এদের (ফকির-সন্ন্যাসীদের) ইতিহাস বড় অদ্ভুত। এরা বাস করে অথবা বলা যেতে পারে কাবুল থেকে চীন পর্যন্ত তিব্বতের পার্বত্য দেশের দক্ষিণ অঞ্চলজুড়ে যে বিশাল ভূভাগ অবস্থিত, সেটি এদের অধিকারভুক্ত। এরা কাপড় পরা জানে না, এদের কোনো শহর বাড়িঘর এমনকি পরিবার-পরিজনও নেই। এরা অনবরত ভ্রমণরত থাকে। এরা পথে কোনো স্বাস্থ্যবান শিশু দেখলে তাকে চুরি করে নিজেদের দলের সংখ্যা বাড়ায়। তাই এরা ভারতবর্ষের সবচেয়ে সবল ও কর্মঠ লোক। এদের অনেকেই ব্যবসায়ী, এরা তীর্থ পথিক, তাই জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবাই এদের ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। এজন্য এদের প্রতি তারা এত সম্মোহিত যে এদের চলাফেরা বা এদের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদটিও তাদের কাছে পাওয়ার উপায় নেই। এমনকি কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রদেশের অভ্যন্তরভাগ থেকে এরা এমন আকস্মিকভাবে আবির্ভূত যে মনে হয় এরা বুঝি আকাশ থেকে পড়েছে। এরা অত্যন্ত পরিশ্রমী, সাহসী, প্রশংসাতীত, উদ্যমী ও আস্থাভাজন। এই সেই সন্ন্যাসী, পাক ভারতের বেদুইন।
দি অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল খ্যাত ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের বর্ণনায় অধ্যাপক ইসলাম প্রভাবিত মনে করা অসমীচীন হবে না। তিনি তাদের বলেছেন ‘এ সেট অব ব্যান্ডিট’—আবু তালিব দুজনের মূল বক্তব্য এবং বাংলা অনুবাদ সংযোজন করেছেন। হান্টারের কথায় সহজ মানে হয় এই যে সন্ন্যাসী ও ফকির নামধারী একদল দুর্বৃত্ত দল বেঁধে সারা দেশব্যাপী চুরি-ডাকাতি লুটতরাজ ইত্যাদি করে ফিরছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা ধর্মপ্রচারক অর্থাৎ তীর্থপথিক। কিন্তু আসলে তারা দস্যু তস্কর ব্যতীত কেউ নয়।
হান্টার সাহেবের কথাতেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারা সাধারণ ডাকাত নয়, রাজনৈতিক ডাকাত বলা যেতে পারে। তাদের কেবল ডাকাত জানলে পঞ্চাশ হাজার মানুষ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তারা নিশ্চয়ই তাদের মুক্তিদাতা মনে করেছে।
আবু তালিবের বক্তব্যের প্রধান ত্রুটি তার মধ্যে ঐতিহাসিকের নৈর্ব্যক্তিকতা নেই, তিনি নিজেই যেন জেহাদে নেমেছেন, এমন একটি ভাষায় বইটি রচনা করেছেন। যথেষ্ট সত্য তার বিবরণীতে রয়েছে; কিন্তু তা যেন পূণ্য কামাই করার উদ্দেশে ব্যবহার করছেন। এ কারণে বইটির ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





