[ভারতীয় প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক পঙ্কজ মিশ্রর আলোচিত, প্রশংসিত গ্রন্থ ফ্রম দ্য রুইনস অব এম্পায়ার: দ্য রিভল্ট অ্যাগেইনস্ট দ্য ওয়েস্ট অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব এশিয়া (২০১২)। এ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন ইস্ট এশিয়া, দ্য ম্যান ফ্রম দ্য লস্ট কান্ট্রি’। এখানে এ অধ্যায় থেকে নির্বাচিত কিছু অংশ অনূদিত হলো]

শ্রী অরবিন্দের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ওরিয়েন্টাল জ্ঞানচর্চা দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, যা ভারতের ক্ল্যাসিক্যাল অতীতকে মহিমান্বিত করেছিল। আধুনিক প্রতীচ্য নিয়ে বাঙালিদের কিছু সন্দেহও তার মনে ঠাঁই পেয়েছিল। ১৮৮১ সালে নিজের জীবনের শুরুর দিকেই রবীন্দ্রনাথ তার ব্যবসায়ী পিতামহের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে নিজের পার্থক্য ঘোষণা করেন। তার পিতামহের ছিল আফিম বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ততা। রক্ষণশীল অভিজাত পরিবার ও পশ্চিমা ঘরানার শিক্ষা থেকে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও অধ্যাত্মিক সফর তাকে সমসাময়িক বাঙালিদের তুলনায় একেবারে ভিন্ন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।

এক্ষেত্রে ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সালের মধ্যে বাংলার গ্রামাঞ্চলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ভারতীয় গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক কলকাতায় থাকা মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার বিশ্বদৃষ্টির ফারাক সৃষ্টি করে। গ্রামের অভিজ্ঞতা তার মধ্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতি ভালোবাসা, নিত্যদিনের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও গ্রামের গরিবদের দুর্দশার বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি নির্মাণ করেছিল। নিজের বাকি জীবনে তিনি যান্ত্রিক আধুনিক সভ্যতার চেয়ে প্রাক-শিল্পায়িত সভ্যতার নৈতিক উত্কর্ষ নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন। এছাড়া তিনি মনে করতেন ভারতের পুনরুজ্জীবনের শুরু হতে হবে গ্রাম থেকেই।

১৯০১ সালে তিনি বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্রামীণ পটভূমিতে নীরিক্ষাধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতন গড়ে তোলেন। এখান থেকেই শিক্ষা নিয়েছেন সত্যজিৎ রায় ও অমর্ত্য সেনের মতো ভারতের সেরা শিল্পী ও চিন্তকদের অনেকে। একই বছর রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতা শিরোনামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেন। এ রচনাতেই তিনি গ্রামীণ সংহতি ও নগরের আগ্রাসীভাব, গ্রামকেন্দ্রিক সমাজ ও জাতিরাষ্ট্রের বৈপরীত্য বিষয়ে প্রথমবারের মতো তার তত্ত্ব বিকশিত করেন। তার মতে, প্রাচ্য সামাজিক সংহতি ও অধ্যাত্মিক মুক্তিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। আর প্রতীচ্য নিবেদিত জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং চীনে বক্সার বিদ্রোহে ভারতীয় সেনারা যুক্ত ছিল। এসব ঘটনা রবীন্দ্রনাথের সন্দেহকে নিশ্চিত করে। ১৯০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ কবিতায় লিখেলেন—‘শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে/ অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে/ অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিনী’। কবিতার শেষ ভাগে ফিলিপাইনে শ্বেতাঙ্গ মানুষদের সভ্য করার দায় মাথায় তুলে নেয়ার উৎসাহ দেয়া কবি রুডইয়ার্ড কিপলিংকে তীব্র ভর্ত্সনাও করলেন—কবিদল চিত্কারিছে জাগাইয়া ভীতি/ শ্মশানকুক্কুরদের কাড়াকাড়ি-গীতি।

১৯০৫ থেকে ১৯০৮ সময়ে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি দারুণ আকর্ষিত ছিলেন। ১৯০৫ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জাপানের বিজয়ে এশিয়ার বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীর মতো তিনিও আনন্দিত হয়েছিলেন। জাপানের বিজয়ের সংবাদে তাত্ক্ষণিক বিজয় শোভাযাত্রা করেছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের মতে, ইউরোপীয় নকশায় রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারাটাই সভ্যতার একমাত্র প্রমাণ নয় কিংবা এটাই এশিয়ার মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়ার কোনো কারণ নেই।

১৯১৩ সালে নোবেল পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ একজন আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। প্রাচ্যের মানুষের মুখপাত্র হিসেবে তাকে গণ্য করা হতো। এটা ছিল তার জন্য এক বিরল সুযোগ, কারণ তখন বিশ্ববাসী শুনবে এমন কোনো এশীয় ব্যক্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। লু শুন যেমন বলেছেন, ‘দেখা যাক কারা কারা নির্বাক জাতি। আমরা কি মিসরের স্বর শুনতে পাই? কিংবা আন্নাম এবং কোরিয়ার? ঠাকুর ব্যতীত ভারতের আর কোনো কণ্ঠস্বর শোনা যায় কি?’

রবীন্দ্রনাথের শ্বেতশুভ্র এবং প্রবল দৃষ্টি তাকে প্রাচ্য থেকে আসা কোনো ‘প্রফেট’-এর মতো ইমেজ এনে দিয়েছিল। ১৯৬৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়ে জাপানি ঔপন্যাসিক কাওয়াবাতা স্মরণ করেন—‘আমার মতো তখনকার বালকদের কাছে তিনি ছিলেন প্রাচ্যের প্রাচীন জাদুকরের মতো।’

জাপান থেকে আর্জেন্টিনা—সারা বিশ্বজুড়ে আসনপূর্ণ হলগুলো রবীন্দ্রনাথের জন্য অপেক্ষা করত। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সফরের সময় প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানান। সে সময় নিউইয়র্ক টাইমস দুটো সাক্ষাত্কারসহ তার ওপর ২১টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এ আগ্রহ কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ তিনি তার পশ্চিমা শ্রোতাদের শুনিয়েছিলেন যে টাকা ও ক্ষমতার ওপর তৈরি তাদের আধুনিক সভ্যতা প্রকৃতিগতভাবেই ধ্বংসাত্মক এবং একে প্রাচ্যের অধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা দিয়ে ঝালাই করতে হবে।

১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথের সফর ঘোষিত হওয়ার পর পরই চীনা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিতর্কের ঝড় ওঠে। একসময় রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছিলেন ঔপন্যাসিক মাও ডুন। তিনিও চীনের তরুণদের ওপর রবীন্দ্রনাথের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলেন। মাও লেখেন, ‘প্রাচ্যদেশীয় সভ্যতার মুগ্ধ প্রশংসক ট্যাগোরকে স্বাগত না জানাতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমরা আজ দেশীয় সশস্ত্র শক্তি ও বাইরের সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে নিষ্পেষিত। তাই এটা স্বপ্ন দেখার সময় নয়।’ রবীন্দ্রনাথের হোস্ট লিয়াং কিচাও এরই মধ্যে র্যাডিক্যাল তরুণদের আক্রমণের মুখে পড়েন। অপমানের ঢেউ আছড়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথের দোভাষী কবি জু ঝিমোর ওপর।

বিভিন্ন লেকচারে রবীন্দ্রনাথ ‘আত্মায় বিশ্বাস রাখা সামাজিক জীবন গড়ে তোলা’ কনফুসিয়ানিজম ও বৌদ্ধধর্মের প্রশংসা করতে থাকায় বিপদ দেখতে পান চীনের র্যাডিক্যালরা। কমিউনিস্ট পার্টি ও শেন দুজিও তাদের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শেন উদ্বিগ্ন ছিলেন যে ট্যাগোরের প্রভাব চীনা তরুণদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে : ‘আমরা তরুণদের সতর্ক করেছি তার যেন ভারতীয়ত্বকে গ্রহণ করে না নেয়। আর সেটা হলে তারাও একদিন ভারতের মতো ঔপনিবেশিক শক্তির পদতলে নিজেদের কফিনের মধ্যে আবিষ্কার করবে।’

প্রোপাগান্ডা অভিযান কাজে লাগে। হানকৌতে এক সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথকে স্বাগত জানানো হয়, ‘পরাজিত দেশের দাস ফিরে যাও! আমরা দর্শন চাই না, আমরা চাই বস্তুবাদ!’ এই বিক্ষুব্ধ ‘হেকলার’দের বলপ্রয়োগে নিরস্ত করা না হলে তারা হয়তো রবীন্দ্রনাথকে সরাসরিই হেনস্তা করে বসত।

রবীন্দ্রনাথকে নিন্দা করে লিখিত লিফলেট ছড়িয়ে দেয়া হয়। চীনে সেবার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে ভাবনা ফুটে উঠেছিল তার সারাংশ পাওয়া যায় কমিউনিস্ট কবি কু কুয়িবাইয়ের লেখায়, তিনি লেখেন, ‘মি. ট্যাগোর আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু চীনে আমাদের ইতিমধ্যেই অনেক বেশি কনফুসিয়াস ও মেনকিউজেস আছে।’

কিন্তু চীনা র্যাডিক্যালদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের যে চিত্র স্থায়ী হয়ে গিয়েছিল তা পাশে সরিয়ে রেখে দেখা যায় তিনি রুশ বিপ্লবের মতো নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক নীরিক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের চীন সফরের অনেক বছর পর লু শুন স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘আমি বিষয়টি আগে এত স্পষ্টভাবে বুঝিনি, কিন্তু এখন আমি জানি তিনি (রবীন্দ্রনাথ) একজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধীও।’