রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীর রাজনৈতিক মতবিরোধের মূল বিষয় ছিল অসহযোগ আন্দোলন। তার প্রায়োগিক দিক, তার নেতিবাচকতা-ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় তার পশ্চাদমুখীনতার প্রবণতা ও কর্মবিমুখতায় প্রশ্রয় দান, এগুলো রবীন্দ্রনাথের চোখে কদর্য ঠেকেছিল, তার মনের সুকুমারবৃত্তিকে তারা আঘাত করেছিল এবং এদের চূড়ান্ত পরিণাম যে সমষ্টিজীবনে কোনো মঙ্গল বয়ে আনবে না, এ আশঙ্কায় তিনি বিচলিত বোধ করেছিলেন। তবে অসহযোগের আদর্শিক ধারণায় কিন্তু তার কোনো বিদ্বেষ ছিল না, বরং তাকে তিনি তার শ্রেয় কল্পনায় মহত্ত্বের উত্তুঙ্গ শিখরেই বসিয়েছিলেন। তা সম্ভবত গান্ধীর নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগেই। কিশোর বয়সে হিন্দুমেলার যুগেই ব্রিটিশরাজের সঙ্গে অসহযোগিতার আবেগে তিনি তার গানে, বালসুলভ হলেও ফুটিয়ে তোলেন: ‘ব্রিটিশ বিজয় করিয়া ঘোষণা/ যে গায় গাক আমরা গাব না/ আমরা গাব না হরষ গান/ এস আমরা যে কজন আছি, আমরা ধরিব আরেক তান।’
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ অবশ্য ‘ব্রিটিশ বিজয়’কে ‘মোগল বিজয়’ বানিয়ে গানটি তার স্বপ্নময়ী নাটকে ব্যবহার করেন। পরে ১৯০৯ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রায়শ্চিত্ত নাটক ছেপে বেরোয়। এখানেই তিনি অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার ও অসহযোগ আন্দোলনের ধারণাকে ধনঞ্জয় বৈরাগীর জনগণকে অহিংসার নৈতিক শক্তিতে উদ্বোধিত করে অশুভ রাজশক্তির মুখোমুখি হতে প্রেরণা জোগানোয় ফুটিয়ে তোলেন। স্পষ্টতই এটা বঙ্গভঙ্গ রদের জন্য সহিংস স্বদেশী আন্দোলনের প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিমুখতার প্রকাশ। কিন্তু যা চোখে পড়ে তা হলো ধনঞ্জয় বৈরাগী যেন জাতীয় জীবনে গান্ধীরই পূর্বগামী ছায়া। আচার-আচরণে, বেশভূষায়, অহিংসা ও সত্যনিষ্ঠায় মনে হতে পারে সে যেন গান্ধীর আদলেই গড়া। কিন্তু গান্ধী তখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং তার প্রথম বিখ্যাত রচনা হিন্দ-স্বরাজ বা ইন্ডিয়ান হোম রুল ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হলেও প্রায়শ্চিত্ত লেখার সময় রবীন্দ্রনাথের তা পড়ার বা সে বিষয়ে জানার কোনো সম্ভাবনা থাকার কথা নয়। হতে পারে ১৯০৬-০৮-এর ভেতরে দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ নিয়ে গান্ধীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার খবর তার কাছে পৌঁছেছিল, এবং তিনি তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন; আপন সত্যের পথের সঙ্গে তিনি তার মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু তার সত্যের পথ নিজের অন্তরের আলোকেই কেটে কেটে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন এবং স্বদেশী আন্দোলনের অভিঘাতে তা ভেতর থেকেই আকার পাচ্ছিল, এটা অনুমান করাই বোধহয় অনেক বেশি সঙ্গত। বাস্তব সংকটের মুখে দুই যুগ পুরুষ আলাদা আলাদাভাবে একই রকম ভাবছেন, এমন উদাহরণ মানুষের হয়ে ওঠার ইতিহাসে বিরল নয়। পরে মুক্তধারা নাটকে ধনঞ্জয় বৈরাগী চরিত্রের মারফত এ ভাবনা আরো স্পষ্ট, আরো জীবন্ত ও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে আরো বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ফুটে ওঠে। তখন ১৯২২ সালে—গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলনের বড় বড় দুটো ঢেউ জনজীবনকে তোলপাড় করে বয়ে গেছে। অহিংসা ও সত্যাগ্রহ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। সাফল্য এসেছে, এসেছে ব্যর্থতাও। এবং প্রবলভাবে অহিংসার অসিধারা ব্রত থেকে বিচ্যুতি। মুক্তধারায় ধনঞ্জয় বৈরাগী যেন গান্ধীরই প্রতিরূপ। বোঝা না বোঝা, ত্রুটি-বিচ্যুতি, বিপর্যয় ও বিফলতাকে ঠেলে ঠেলে অটল বিশ্বাসে সম্মুখে এগিয়ে চলেন অবিচল। রবীন্দ্রনাথ এ আদর্শের কাছে মাথা নত করেন, কিন্তু তার মোহাবিষ্ট প্রায়োগিক তামসিকতাকে মেনে নিতে পারেন না। অহিংসার আলো চেতনায় পুরোপুরি না জ্বেলেই জনগণকে আন্দোলনে উত্তেজিত করায় তিনি মানসিকভাবে পীড়িতবোধ করেন। তার সংশয় ও বিরূপতাকে প্রয়োজনে তীব্র ভাষায় প্রকাশ করতে এতটুকু দ্বিধা করেন না।
ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে নিবর্তনমূলক রাওলাট আইন পাস করলে গান্ধী অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দেন। কিন্তু হরতালের সময় ৩০ মার্চ দিল্লিতে হাঙ্গামা বাঁধে। পুলিশি দমনের প্রতিবাদে গান্ধী ৬ এপ্রিল আবার হরতাল ডাকলে সারা দেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। পাঞ্জাব সরকার ১০ এপ্রিল সেখানে সামরিক আইন জারি করে অমৃতসরের কর্তৃত্ব জেনারেল ডায়ারের হাতে ছেড়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ ১২ এপ্রিল গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ সম্বোধন করে এক খোলা চিঠিতে তাকে তার উদ্বেগ ও আপত্তির কথা জানান। তাদের মতবিরোধের প্রথম প্রকাশ ঘটে এ চিঠিতেই।
এ চিঠি লেখার একদিন পরেই ঘটে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড। রবীন্দ্রনাথের আশঙ্কা অনেকটাই সত্য হয়ে দেখা দেয়। গান্ধী তখন এক রকম অন্তরীণ। রবীন্দ্রনাথের অন্তর্জ্বালা প্রতিবাদ হয়ে বিস্ফোরিত হয় তার ‘স্যার’ উপাধি বর্জনে। বছরখানেক পর গান্ধীও ফিরিয়ে দেন তার ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ পদক। দুটোই ছিল পরাধীন মানবাত্মার আহত বিবেকের মর্যাদাদীপ্ত সাহসী উদ্ভাসন।
এদিকে অসহযোগের উন্মাদনায় রবীন্দ্রনাথের দুশ্চিন্তা বেড়েই চলে। ছাত্রছাত্রীদের স্কুল-কলেজের পড়াশোনা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বলা তার মনে হয় অজ্ঞানতাকে প্রশ্রয় দেয়ার শামিল, মনে হয় অন্যায় জবরদস্তি। আধুনিক সভ্যতার দানকে অস্বীকার করার মত্ততা তার কাছে শুধু অরুচিকরই ঠেকে না, বিপদজ্জনকও বোধ হয়। তিনি ভয় পান, অসহযোগ দেশকে বুঝি নিঃসঙ্গতার দিকে, সংকীর্ণতার দিকে, চিন্তায় জড়ত্বের দিকে টেনে নিয়ে যায়। তিনটে চিঠিতে তিনি তার মনের উদ্বেগের কথা জানান। গান্ধীও ১৯২১-এর ১ জুনের ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় তার জবাব দেন এবং তা রবীন্দ্রনাথের তিরস্কার শিরোধার্য করেই।
তিনি বলেন, অসহযোগ যদি সফল না হয়, তবে তার কারণ এই নয় যে গোড়াতেই গলদ রয়েছে ওই অসহযোগের ভেতরেই, বরং তা এই যে অসহযোগের সর্বাত্মক প্রয়োগ অচরিতার্থ থেকে যাচ্ছে। পাশ্চাত্যের সঙ্গে বিভেদ রচনা করা অসহযোগের উদ্দেশ্য, এ ধারণা যথোচিত নয়: ‘অসহযোগের উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার ভিত্তিতে প্রকৃত, সম্মানজনক ও স্বাধীন সহযোগিতার পথ উন্মোচন করা। বর্তমান আন্দোলন বাধ্যতামূলক সহযোগিতার বিরুদ্ধে, বিরুদ্ধে একপেশে যোগাযোগের এবং জবরদস্তি করে চাপিয়ে দেয়া সভ্যতার নামাবলি গায়ে শোষণের আধুনিক পন্থা-পদ্ধতির। অসহযোগ হলো অনিচ্ছায় ও অসচেতনভাবে অমঙ্গলে লিপ্ত হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।’ ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুল-কলেজ বর্জনের ডাক সমর্থন করে তিনি লেখেন, ‘সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মনুষ্যত্বকে অবদলিত করেছে... আমাদের তা যা করার তাই করেছে: কেরানি আর দোভাষী। আপাতদৃষ্টে শাসিতের স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করা যদি অন্যায় বলে মনে করি, তবে সেসব প্রতিষ্ঠানই আমাদের সবার আগে ধরা দরকার, যেখানে আমাদের সংযোগ মনে হয় সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত। যুবশক্তি একটি দেশের আশা-ভরসা। যে মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারি, এ শাসনব্যবস্থা পূর্ণত অথবা প্রধানত অমঙ্গলের প্রতিভূ, তখনই আমি মনে করি, আমাদের ছেলেমেয়েদের তার সঙ্গে যুক্ত করার যেকোনো প্রয়াসই হবে পাপ।’
রবীন্দ্রনাথ যে অভিযোগ করেন, অসহযোগ সবটাই নেতিবাচক, তা কিছু সৃষ্টি করে না, শুধুই অস্বীকার করে, তার জবাবে গান্ধী শেষে যোগ করেন, “আমি মনে করি, কবি অসহযোগের নেতিবাচক দিক নিয়ে অহেতুক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আমরা ‘না’ বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সরকারের মুখের ওপর ‘না’ বলাটা মনে করা হতো আনুগত্যহীনতা, প্রায় এক অপবিত্র অপকর্ম। কৃষক যেমন বীজ বোনার আগে জমির আগাছা পরিষ্কার করে, সহযোগিতার স্বতঃপ্রণোদিত এ অস্বীকৃতিও তেমনি। অসহযোগ প্রকৃতপক্ষে সরকারের কাছে জাতির দেয়া শর্ত মেনে সহযোগিতারই আহ্বান— ওই শর্ত প্রতিটি জাতির স্বাভাবিক অধিকার এবং তা মানা প্রতিটি সুশাসকের অবশ্য কর্তব্য।”
বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী একই জায়গায় চোখ ফেললেও তাদের দৃষ্টির প্রক্ষেপণে দেখায় তফাৎ হয়ে যাচ্ছে। কল্যাণ কামনায় দুজনই আন্তরিক। এ বিষয়ে তারা নিজেরাও নিশ্চিত। এ কারণে মতবিরোধের বেদনা তাদের কাছেই সবচেয়ে বেশি তীব্র। তবু আত্যন্তিক সততা তাদের কাউকেই চুপ থাকতে দেয় না। মানুষের কাছে নিজেদের যে দায়বদ্ধতা সেটিই পায় অগ্রাধিকার। মতান্তরের যাতনা সহ্য করতেই হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বা বন্ধুত্বের আনুগত্য অবশ্য ক্ষুণ্ন হয় না।
গান্ধী যে বলেছিলেন, পূর্ণ অহিংস অসহযোগ এক বছর যদি চালানো যায়, তবে স্বরাজ আসবেই, এতে কোনো ভুল ছিল না। শুধু যে সরকার তাতে বিকল হয়ে পড়ত, তাই নয়, উপনিবেশবাদের অর্থনৈতিক শোষণের ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের পথগুলোও সব বন্ধ হয়ে যেত। সেখানে প্রভুত্বের শাসন আর কোনোক্রমেই বজায় রাখা সম্ভব হতো না। বাস্তবতার যৌক্তিক পরিণামের এ অন্যতম পথরেখা রবীন্দ্রনাথ ঠিক অনুমান করতে পেরেছিলেন কিনা বলা শক্ত। তার সমাজ দর্শনের বক্তব্যও নতুন পাঠ দাবি করত। তবে ঘটনা এই, পূর্ণ অহিংস অসহযোগ অব্যাহতভাবে একটানা এক বছর কখনই চালানো যায়নি। দেশের সবার স্বার্থ অসহযোগের সঙ্গে মেলেনি। শাসনের ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মের বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করলে তার জায়গা নেয়ার মতো বিকল্প কোনো ব্যবস্থাও তখন ভেতর থেকে গড়ে ওঠেনি। তার ধারণাটুকু তুলে ধরে জনগণকে তাতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে মাত্র। অবকাঠামো বা ওপর কাঠামো, কোথাও তার সুস্পষ্ট দাগ পড়েনি। চাইলাম আর হয়ে গেল, এমনভাবে ইচ্ছাপূরণের ব্যাপার সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাগ্য পরিবর্তনে কখনো ঘটে না। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের যে প্রবল আশঙ্কা, অহিংসার সংযম ও শৃঙ্খলা সমগ্র জনগণের ভেতর সঞ্চারিত করা দুঃসাধ্য এবং গান্ধীর আদর্শ সবার জীবনে একইভাবে পালন করা প্রায় অসম্ভব, তা বাস্তবে সত্য প্রমাণিত হতে থাকে বারবার। অহিংস অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দিয়েও তাই গান্ধী তাকে চূড়ান্ত পরিণামে নিয়ে যেতে পারেন না। প্রতিবারই মাঝপথে তাকে প্রত্যাহার করতে হয়। অবশ্য প্রতিটি আন্দোলনই গণসচেতনতা বাড়ায়। ভবিষ্যতের গণ-আন্দোলনের ক্ষেত্রকে তা প্রস্তুত করে। তবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় আরো অনেক উপাদান—কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত উঠে আসে, যা অহিংস অসহযোগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। গান্ধীর জবাবে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত রচনা ‘দ্য কল অব ট্রুথ’ ছাপা হয় মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় ১৯২১-এর অক্টোবরে। এরই বাংলা রূপ ‘সত্যের আহ্বান’। তিনি লেখেন, ‘মহাত্মা তার সত্য প্রেমের দ্বারা হূদয় জয় করেছেন, সেখানে আমরা সকলেই তার কাছে হার মানি। এই সত্যের শক্তিকে আমরা প্রত্যক্ষ করলুম এজন্য আজ আমরা কৃতার্থ। ... কিন্তু সত্যকে প্রত্যক্ষ করা সত্ত্বেও সত্যের প্রতি আমাদের নিষ্ঠা যদি দৃঢ় না হয় তা হলে ফল হলো কী। প্রেমের সত্যকে প্রেম দিয়ে যেমন মানি, বুদ্ধির সত্যকে বুদ্ধি দিয়ে তেমনি আমাদের মানতে হবে। দেশের হূদয়ের গভীরতা থেকে সাড়া বের করা এই বিদ্যায় প্রেম যে কত বড় সত্য জিনিস, সেই কথাটা আমরা মহাত্মাজির কাছ থেকে বিশুদ্ধ করে শিখে নিতে বসেছি, এ সম্বন্ধে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ন থাক। কিন্তু স্বরাজ গড়ে তোলবার তত্ত্ব বহু বিস্তৃত, তার প্রণালি দুঃসাধ্য ও কালসাধ্য; তাতে যেমন আকাঙ্ক্ষা এবং হূদয়াবেগ তেমনি তথ্যানুসন্ধান ও বিচারবুদ্ধি চাই। তাতে যারা অর্থশাস্ত্রবিদ, তাদের ভাবতে হবে যন্ত্রতত্ত্ববিদ তাদের খাটতে হবে, শিক্ষাতত্ত্ববিদ রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ সকলকেই ধ্যানে এবং কর্মে লাগতে হবে।’
তিনি আরো লেখেন, ‘বিশ্বপ্রকৃতি যখন মৌমাছিকে মৌচাকের সংকীর্ণ জীবনযাত্রায় ডাক দিলেন, তখন লক্ষ লক্ষ মৌমাছি সেই আহ্বানে কর্মের সুবিধার জন্য নিজেকে ক্লীব করে দিল। আপনাকে খর্ব করার দ্বারা এই যে তাদের আত্মত্যাগ এতে তারা মুক্তির উলটো পথে গেল। যে দেশের অধিকাংশ লোক কোনো প্রলোভনে বা অনুশাসনে নিজের শক্তির ক্লীবত্ব সাধন করতে কুণ্ঠিত হয় না, তাদের বন্দিদশা যে তাদের নিজের অন্তরের মধ্যেই। চরকাকাটা একদিকে অত্যন্ত সহজ, সেই জন্যেই সকল মানুষের পক্ষে তা শক্ত। সহজের ডাক মানুষের নয়, সহজের ডাক মৌমাছির।’
চরকার ব্যাপারে যেমন, তেমনি বিদেশী কাপড় বর্জনের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ তার আপত্তি ও অসন্তোষ গোপন করেন না। খোলাখুলি জানিয়ে দেন, ‘কাপড় ব্যবহার বা বর্জন ব্যাপারে অর্থশাস্ত্রিকতত্ত্বের ঘনিষ্ঠ যোগ আছে, এ সম্বন্ধে সেই তত্ত্বের ভাষাতেই দেশের সঙ্গে কথা কইতে হবে—বুদ্ধির ভাষা মান্য করা যদি বহুদিন থেকে দেশের অভ্যাসবিরুদ্ধ হয়, তবে আর সব ছেড়ে দিয়ে ওই অনভ্যাসের সঙ্গেই লড়াই করতে হবে, কেননা ওই অনভ্যাসই আমাদের পক্ষে গোড়ায় গলদ, Original sin. সেই গলদটারই খাতিরে সেই গলদকেই প্রশ্রয় দিয়ে আজ ঘোষণা করা হয়েছে বিদেশী কাপড় অপবিত্র, অতএব তাকে দগ্ধ কর। অর্থশাস্ত্রকে বহিষ্কৃত করে তার জায়গায় ধর্মশাস্ত্রকে জোর করে টেনে আনা হলো। কিন্তু কোনো কাপড় পরা বা না পরার মধ্যে যদি কোনো ভুল থাকে, তবে সেটা অর্থতত্ত্বের বা স্বাস্থ্যতত্ত্বের বা সৌন্দর্যতত্ত্বের ভুল—এটা ধর্মতত্ত্বের ভুল নয়।’
গান্ধী প্রত্যুত্তরে যা লেখেন, তা পৃথিবীর যেকোনো সাহিত্যে সেরা রচনার তালিকায় স্থান পাওয়ার যোগ্য। মডার্ন রিভিউ-তে রবীন্দ্রনাথের ভিন্নমত ছেপে বেরোবার দুই সপ্তাহের ভেতরেই ১৯২১-এর ১৩ অক্টোবর সংখ্যার ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ প্রকাশ করে তার প্রতিক্রিয়া, ‘দ্য গ্রেট সেন্টিনেল’—মহান প্রহরী। সত্য ও যুক্তির পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যে তিনি কবিকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি লেখেন, ‘যারা আমাদের সঙ্গে একমত নন, তাদের বিরুদ্ধে আমরা যারা অধৈর্য হয়ে অসহিষ্ণু, এমনকি হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠি, তাদের জন্যে তার (রবীন্দ্রনাথের) প্রবন্ধ এক যথার্থ সতর্কবাণী । আমি মনে করি, কবি আমাদের এমনই একজন প্রহরী, যিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি, আলস্য, অসহিষ্ণুতা, অজ্ঞতা, জাড্য ও এই রকম আর সব শত্রুদের বিষয়ে সব সময় সাবধান করে দেন।’
তবে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনও করেন। চরকা বা বিদেশী কাপড়ের ব্যাপারে যে শুধু আবেগতাড়িত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, এ কথা তিনি বিশদভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। খুব জোরালো ভাষায় তিনি বলেন, ‘যখন আমার চারপাশে সবাই খাবার না পেয়ে মারা যাচ্ছে, তখন আমার একমাত্র কাজ হলো ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার জোগান। আমার বিশ্বাস, গোটা দেশ যে আজ ক্ষিদেয় মারা যাচ্ছে, তার কারণ খাবার যে কিনবে, তার জন্যে মানুষের হাতে কাজ নেই।... শহরগুলোই আমাদের দেশ নয়। সাড়ে সাত লক্ষ গ্রামই আমাদের দেশ এবং ওই গ্রামগুলোর ওপরই টিকে থাকে শহর। অন্য দেশ থেকে তারা কোনো সম্পদ আনে না। শহরের মানুষ হলো ইউরোপ আমেরিকা ও জাপানের বড় বড় কারবারের দালাল আর কমিশন এজেন্ট। ওইসব কারবারের সঙ্গে জোট বেঁধে শহর দুশ বছর ধরে দেশের রক্ত শুষে নিয়েছে। আমার বিশ্বাস, দেশ ক্রমাগত গরিব হচ্ছে। তার পায়ে রক্তসঞ্চালন প্রায় বন্ধ এবং আমরা যদি সতর্ক না হই, তবে তার বিনাশ অনিবার্য।’
তারপর তার সেই স্মরণীয় উক্তি, ‘ক্ষুধার্ত ও বেকার জনগণের কাছে ঈশ্বর কেবল একটিমাত্র রূপেই দেখা দেবার কথা ভাবতে পারেন, আর তা হলো খাবার এবং খাবারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ। ঈশ্বর কাজ করে খাবার জন্যে মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন এবং বলেছিলেন, কাজ না করে যারা মুখে খাবার তোলে, তারা তস্কর। দেশের আশি ভাগ মানুষ আজ বছরের অর্ধেক সময় বাধ্য হয়ে এই রকম চুরি করে। এই ক্ষুধাই হলো চরকার দিকে মানুষকে ঠেলে দেবার জন্যে আমার যুক্তি। এতে মনের বিকাশ রুদ্ধ হবে তারাই বলতে পারেন, যারা মনে করেন, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কায়িক শ্রম তেমনটি করে।’
বিদেশী কাপড় বর্জন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিদেশী কাপড়ের প্রতি আমাদের আসক্তি চরকার মর্যাদা হরণ করেছে। তাই বিদেশী কাপড় পরা আমি পাপ মনে করি। বিদেশী কাপড় পুড়িয়ে আমি আমার অপমানকেই দগ্ধ করি। নগ্ন মানুষের আশু প্রয়োজন কাজ। তা তাকে না দিয়ে যাতে তার প্রয়োজন নেই, সেই বিদেশী কাপড় এনে আমি তাকে কখনই দেব না। আমি তাদের পৃষ্ঠপোষক হতে চাই না। যদি জানি, তাদের দারিদ্র্যের আমিও কারণ হয়েছি, তবে তাদের দয়া দেখাব না, কাপড়ও কেড়ে নেব না বরং আমি যা খাই পরি তাই তার সঙ্গে ভাগ করে নেব এবং নিজেকে তার কাজের সঙ্গে যুক্ত করব।’
গান্ধী তার বক্তব্য শেষ করেন এই বলে, ‘কবিরের ভজন গেয়ে দুস্থ মানুষকে সান্ত্বনা দেয়া, আমি দেখেছি, অসম্ভব। ক্ষুধার্ত জনতা একটি কবিতাই চায়—জীবনদায়িনী খাদ্য। তাদের তা দিয়ে দয়া দেখানো যাবে না। তাদের অবশ্যই তা অর্জন করতে হবে এবং তা তারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলেই কেবল অর্জন করতে পারে।’
কিছুটা অবান্তর হলেও অন্য একটা প্রসঙ্গ এখানে টেনে আনি। স্বাধীনতা ও সক্ষমতা বিষয়ে অসাধারণ কাজ করে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন গোটা পৃথিবীর বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার চিন্তার সূত্র কিন্তু তিনি টেনেছেন প্রধানত অ্যাডাম স্মিথ ও কার্ল মার্কস থেকে। গান্ধীর ধারণা বিশ্ব থেকেও তিনি কিন্তু তার ভাবনার বীজ পেতে পারতেন। অর্থতত্ত্ব, রাষ্ট্রতত্ত্ব বা সমাজতত্ত্বের সঙ্গে নৈতিকতাকে মেশানোয়। রবীন্দ্রনাথের কটাক্ষের যে জবাব সেদিন গান্ধী দিয়েছিলেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক এবং গান্ধীবাদী না হলেও অমর্ত্য সেনও তাকে উপেক্ষা করতে পারেন না। প্রকৃতপক্ষে শ্রমবিভাজন ও শোষণের বিষয়ে মার্ক্স ও গান্ধী দুজনে দুইদিক থেকে চিন্তা করে একই উেস গিয়ে পৌঁছেছেন। পাশ্চাত্য চিন্তা পদ্ধতি গান্ধী অনুসরণ করেননি, এতে তার বক্তব্যের গুরুত্ব কমে না। রবীন্দ্রনাথ-গান্ধী বিতর্ক আবার সংবাদ মাধ্যমে জায়গা করে নেয় ১৯৩৪-এ বিহারে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর। গান্ধী বলে বসেন, এ হলো অস্পৃশ্যতার পাপে ঈশ্বরের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। বিরক্ত রবীন্দ্রনাথ গান্ধীর ‘হরিজন’ পত্রিকাতেই প্রতিবাদ করে চিঠি লেখেন। এ হলো তার মতে যুক্তিহীনতার কাছে আত্মসমর্পন এবং এই যুক্তিহীনতাই মুক্তি ও আত্মসম্মানের উদ্বোধনের বিপক্ষে সব তামসিক শক্তির এক মূল উৎস। গান্ধী এর জবাবে যা লেখেন, তাকে মানা না গেলেও এ নিয়ে আর তর্ক করা যায় না ‘অতিজাগতিক প্রপঞ্চ ও মানুষের ক্রিয়াকলাপের ভেতর যোগাযোগ আমার কাছে এক জীবন্ত বিশ্বাসের ব্যাপার, তা আমাকে আমার ঈশ্বরের আরো কাছে নিয়ে যায়, প্রণত করে ও তার মুখোমুখি হবার জন্যে আমাকে আরো প্রস্তুত করে। এই বিশ্বাস হবে শুধুই এক কুসংস্কার, যদি আমার চরম অজ্ঞানতায় আমার প্রতিপক্ষকে তিরস্কার করার জন্য আমি তার প্রয়োগ ঘটিয়ে থাকি।’ বিশ্বজগতে সবকিছুর ভেতর অন্বয় দেখার আস্তিক্যবোধ হয়তো পরিপূর্ণভাবে গান্ধী আয়ত্ত করেছিলেন। মানবিক অস্থিতিবাদ যেমন বলে থাকে, ঈশ্বর যদি না থাকেন, তবে সবাই সবকিছুর জন্য দায়ী, তেমনি তারই বিপরীতে অখণ্ড ঈশ্বর বিশ্বাস বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সার্বিক সামঞ্জস্যের পেছনে দেখে তারই সক্রিয় নির্দেশ। এ সামঞ্জস্যে বিপর্যয় ঘটলেই মানতে হয় মানুষী তত্পরতায় কোথাও এই নির্দেশের লঙ্ঘন। গান্ধীর কাছে এ বোধ ছিল অপ্রতর্ক্য। নির্দেশের লঙ্ঘনকে তিনি দেখেন মানুষের সব রকম অন্যায়ে, শোষণ ও অবিচারে। অস্পৃশ্যতার অপরাধে বিশ্ববিধান বিচলিত হলে ভূমিকম্পের আঘাত যেন তারই ঈশ্বর নির্ধারিত পরিণাম। গান্ধী তার নিজস্ব চেতনায় এ বোধকে হয়তো এক সমন্বিত পূর্ণতায় স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মুশকিল বাঁধে যদি সবার জন্য তাকে সত্য বলে মানি। অন্ধ কুসংস্কারে তার পতন ঘটতে পারে সহজেই এবং ঘটেও থাকে অধিকাংশ মানুষের বেলায় এ রকম। রবীন্দ্রনাথের আপত্তির কারণ এখানেই।
খেয়াল করলেই বোঝা যায় গান্ধীর আন্দোলন প্রতিটি মানুষের শ্রেয়োচেতনার আলাদা আলাদা উজ্জীবন দাবি করে। তাকে টপকে যৌথ চেতনায় পরিণাম ফল দেখতে গেলেই ঘটে স্ববিরোধ। এ স্ববিরোধ নিয়েই ছিল রবীন্দ্রনাথের যত দুশ্চিন্তা এবং তা অমূলক ছিল না।
সনৎকুমার সাহা: প্রাবন্ধিক ও অর্থনীতিবিদ





