তুকারয় যুদ্ধের পর বাংলার ভাগ্য মোগলদের হাতে চলে যায়। ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল সম্পাদিত হয় কটকের চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলা ও বিহারের প্রায় পুরোটাই দিল্লির অধিকারে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন দাউদ খান। তার হাতে থাকে কেবল ওড়িশা। কিন্তু বাংলার শাসকদের স্বাধীন থাকার যে চিরকালীন স্বভাব। দাউদ খান তার ব্যতিক্রম হবেন কীভাবে? সেটাই হয়েছে পরবর্তী সময়ে। তার কারণে অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজমহলের যুদ্ধ। বাংলায় আফগানি শাসনের কফিনে শেষ পেরেক এ যুদ্ধ।
কটকের চুক্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মুনিম খান জীবিত থাকা অবস্থায়ই আফগানরা বিহার ও বাংলাজুড়ে নানাভাবে বিদ্রোহ দেখাতে থাকে। বিদ্রোহের জন্যই মুনিম খান রাজধানী তান্ডা থেকে গৌড়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে উঠল মহামারীতে। দীর্ঘ ১০ দিন রোগে ভোগার পর ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করলেন মুনিম খান। তার মৃত্যুর খবর যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল বাংলাজুড়ে। খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে কটকের চুক্তিকে খারিজ করে দিলেন দাউদ খান। জোর দেন হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারে। ভদ্রকের মোগল সেনাপতি নছর বাহাদুরকে হত্যা করেন। জলেশ্বরের মোগল সেনাপতি ভয়ে পালিয়ে গেলেন তান্ডায়। মোগল কর্মকর্তারাও গৌড় ও তান্ডা ত্যাগ করে পাটনার দিকে যেতে লাগলেন। দাউদ খান দখল করে নিতে সমর্থ হন প্রায় তেলিয়াগড় পর্যন্ত। তেলিয়াগড় গিরিপথ বন্ধ করে দিলে বেকায়দায় পড়ল শত্রুপক্ষ। এভাবে কররানি বংশের এ শেষ শাসক উড়িষ্যাসহ পশ্চিম ও উত্তর বাংলার বড় অংশেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করলেন। আরো একবার প্রমাণিত হলো বাংলার ‘বুলগাকপুর’ অভিধা। পূর্ব বাংলায় তখন ঈসা খান ও তার মিত্রর দখলে রেখেছেন। ঈসা খান মোগল নৌবহরকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। মোগল বাহিনীর জন্য সময়টা সামগ্রিকভাবেই বেশ প্রতিকূল। একদিকে মহামারীর আঘাত, অন্যদিকে দাউদ খানের স্বশাসন এবং পূর্বে ঈসা খান ও বারো ভুঁইয়ার আধিপত্য।
এমন পরিস্থিতিতে খান-ই-জাহান হোসেন কুলী বেগকে দায়িত্ব দিলেন সম্রাট আকবর। খান জাহান ছিলেন সেনাপতি বৈরাম খানের বোনের ছেলে। বাহিনীতে তার সহযোগী হিসেবে পাঠানো হলো টোডরমলকে। যেসব মোগল বাংলা ত্যাগ করে যাচ্ছিল, খান জাহান ভাগলপুরে তাদের গতিরোধ করলেন। নতুন করে নিলেন মোকাবেলার প্রস্তুতি। সে সময় তিন হাজার সৈন্য নিয়ে আয়াজ খান খাইলের নেতৃত্বে আফগানরা তেলিয়াগড় দুর্গে অবস্থান নিয়েছিল। দুই পক্ষের প্রবল সংঘর্ষের মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় সেখানে। তবে তারা সামনে এগিয়ে যেতে চাইলে ব্যর্থ হয়। দাউদ খান পরিখার মাধ্যমে রাজমহলের গিরিপথে তাদের আটকে রাখেন সাত মাস পর্যন্ত। গিরিপথ অতিক্রম করার আর কোনো উপায় না পেয়ে মোগলরা আটকে থাকে। বড় কোনো সংঘাত না হলেও বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘাত হয় এ সময়। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সবার ওপরে খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহের ঘাটতি মোগল বাহিনীকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এরই মধ্যে সম্রাটের নির্দেশে বিহারের গভর্নর মুজাফফর খান তুরবতি পাঁচ হাজার ঘোড়সওয়ার এবং নৌকা বোঝাই খাদ্য ও গোলাবারুদ নিয়ে খান জাহানের সহায়তায় রাজমহলে উপস্থিত হন। নতুন করে শক্তি পায় মোগলবাহিনী। অন্যদিকে দাউদ খানও প্রস্তুতি নিতে থাকেন অনিবার্য যুদ্ধকে মেনে নিয়ে। শক্তি বৃদ্ধি করেন কালাপাহাড়, ভাই জুনায়েদ ও ওড়িশার শাসক কতলু খানের সহযোগিতায়। এ নেতারাও কখনই কটকের চুক্তিকে স্বীকৃতি দেননি। সুবিধাজনক অবস্থানেই ছিলেন দাউদ খান। কিন্তু সমতলে নেমে এসে মুখোমুখি সংঘাতের সিদ্ধান্তটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল।
বর্ধিত শক্তি নিয়ে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই রাজমহলের সমতলে মুখোমুখি হয় মোগল ও দাউদ খানের বাহিনী। দাউদ খান নিজে সৈন্যবাহিনীর মধ্যভাগ, ভাই জুনায়েদ বাম অংশ এবং কালাপাহাড় ডান দিকের নেতৃত্ব দেন। বাহিনীর অগ্রভাগের নেতৃত্বে থাকেন কতলু খান। অন্যদিকে মোগল মধ্যভাগের নেতৃত্ব ছিল খান জাহানের ওপর। সেনাবাহিনীর ডান প্রান্তের নেতৃত্বে ছিলেন মুজাফফর খান এবং বাম প্রান্তের টোডরমল। পেছন দিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ইসমাইল কুলী খান ও কিয়া খান। সম্মুখ ভাগে ছিলেন শাহাম খান ও মুরাদ খান। রাজমহলে ‘সড়ক-ই আজিম’-এর উভয় পাশেই যুদ্ধ মারাত্মক রূপ নেয়। আগের রাতে মোগল কামানের আঘাতে আহত হওয়ার পরও যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির হন জুনায়েদ। তারপর তিনি যুদ্ধে অংশ নেন ও ময়দানেই মৃত্যুবরণ করেন। একইভাবে আহত হন কালাপাহাড়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে পালিয়ে যান তিনি। দুই মহারথীর হঠাৎ প্রস্থানে দুর্বল হয়ে পড়ে দাউদের শিবির। দাউদ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়তে থাকে। তারাও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায় ও অনেকে আত্মসমর্পণ করে। কতলু খানও পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী রণাঙ্গন ত্যাগ করেন। পরিস্থিতি হাতছাড়া বুঝতে পেরে দাউদ খান ময়দান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঘোড়া কাদায় আটকে যাওয়ায় তিনি ধরা পড়েন ও বন্দি হন। কতলু খানের পালিয়ে যাওয়াটা ছিল মূলত ষড়যন্ত্রমূলক। তিনি আগেই খান জাহানকে আভাস দিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাগ করার। এর বিনিময়ে কতলু খানকে ওড়িশা দিয়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে উজির শ্রীহরি ও তার ভাইয়েরাও দাউদের পতনের আগেই মোগলদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। দাউদ খান কথাটি শুনতে পেলেও বিশ্বাস করেননি আগে। মূলত শ্রীহরির পক্ষত্যাগ দাউদকে ব্যাপকভাবে আশাহত করে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে থাকা কৌশলগত ও সুবিধাজনক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসেন। আরো কেউ পক্ষ ত্যাগ করার আগে দ্রুত শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে কূটনীতি ও কৌশলগত উভয় দিক থেকেই বিজয়ী হয় মোগলবাহিনী।
যুদ্ধ শেষে খান জাহান কঠোর ভাষায় দাউদ খানকে কটকের চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। চুক্তি ভঙ্গনের দায়ে তাকে ভর্ৎসনা করা হয়। দাউদ একেবারে নিশ্চুপ ছিলেন না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, চুক্তি ছিল মুনিম খানের সঙ্গে। ফলে নতুন চুক্তির সময় এসেছে। রোদে তৃষ্ণার্ত হয়ে দাউদ খান একসময় পানি চাইলেন। কেউ একজন নিজের জুতায় ভরে পানি আনলে তিনি পান করতে অস্বীকৃতি জানালেন। তাকে হত্যা করতে ইচ্ছুক ছিলেন না খান জাহান। ব্যক্তিগত পানপাত্র থেকে পানি দেয়ার মতো উদারতাও ছিল। কিন্তু উপস্থিত অমাত্যরা চাইছিলেন দাউদের মৃত্যুদণ্ড। ফলে সে শাস্তিটাই স্বীকৃত হলো। জল্লাদ তার তরবারি দিয়ে দাউদ খানের ঘাড়ে দুবার আঘাত করে। তৃতীয় আঘাতে তার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। কর্তিত মাথাটি সৈয়দ আবদুল্লাহ খানের মাধ্যমে মোগল সম্রাট আকবরের কাছে পাঠানো হয়। দাউদ খানের মা নওলাখার সঙ্গে কয়েকজন আফগান সেনানায়ক সাতগাঁওয়ে জড়ো হয়েছিলেন। সাতগাঁও হুগলী জেলায় অবস্থিত বন্দর, তখনো পর্যন্ত এ বন্দরের কার্যকারিতা নষ্ট হয়নি। দাউদের মা খান জাহানের আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু খান জাহান আশ্রয়দানের পেছনে আত্মসমর্পণের শর্ত জুড়ে দেন। দাউদের মা ও অন্যান্য পরিবার-পরিজন খান জাহানের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। দাউদ খানের পতনের মধ্য দিয়ে রাজমহলের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। সমাপ্তি ঘটে বাংলায় আফগান শাসন ও স্বাধীন শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের। যুদ্ধে মোগল শক্তির সহযোগিতার প্রাপ্তি হিসেবে কতলু খান ও শ্রীহরি যথাক্রমে ওড়িশা ও যশোহর পেলেন। বাংলায় বিস্তৃত হলো মোগল আধিপত্য। তবে বারোভুঁইয়াদের প্রধান ঈসা খানের নেতৃত্বে আফগান প্রতিরোধ আরো প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অবশ্য দাউদের পতন ও মৃত্যু আফগান ও বারোভুঁইয়াদের হতভম্ব করে দিয়েছিল কিছুটা।
রাজমহলের যুদ্ধ অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলার পরিপূর্ণ বিজয় এখনো সুদূরপরাহত হলেও এ বিজয়ের ফলে রাজধানী তান্ডাকে কেন্দ্র করে নয়া এলাকায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫৭৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মাসে খান জাহান সম্রাটের নিকট বাংলার সুসংবাদ পাঠান। আকবর তখন পাঞ্জাবের ঝিলাম নদীর তীরে শিকার ও আনন্দ ভ্রমণ করছিলেন। খান জাহান সংবাদ দেন যে বাংলা শান্ত, কোথাও কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ নেই। সংবাদ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা থেকে নিয়ে আসা উপহারগুলো সম্রাটকে দেয়া হয়, উপহারের মধ্যে ছিল ৫৪টি হাতি। তারপর টোডরমল ও ইতিমাদ খান সম্রাটকে বিস্তারিত অবহিত করেন বাংলার অধীনতা সম্পর্কে। তুকারয় দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা পরিণতি পেল রাজমহলে। এরপর মাত্র ৩০ বছরের মধ্যেই সমগ্র বাংলায় বিস্তৃত হয় মোগল আধিপত্য।
আহমেদ দীন রুমি: লেখক





