১৫৭৫ সালে ওড়িশার বর্তমান বালাসোর জেলার তুকারয় গ্রামের কাছে সংঘটিত হওয়া যুদ্ধ ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছে তুকারয়ের যুদ্ধ নামে। এ যুদ্ধের পরিণতি ছিল মোগল ও আফগানদের মধ্যে সম্পাদিত কটক চুক্তি। ১৫৭৫ সালের ১২ এপ্রিল এ চুক্তি সম্পাদন হয়। মোগল সম্রাট আকবরের ব্যশতা স্বীকার করেননি বাংলার সুলতান দাউদ খান কররানি। সে সূত্র ধরেই সংগঠিত হয় তুকারয় যুদ্ধ।
মোগল সেনাবাহিনীর দক্ষ পরিকল্পনা ও টোডরমলের শক্ত অবস্থানের কাছে পরাজয় নিশ্চিত ছিল সুলতান দাউদের। দাউদ খান প্রথমে যুদ্ধ করার ইচ্ছায় অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পরাজিত হলেন মোগল সৈন্যদের কাছে। পরাজিত দাউদ কটকে চলে যান। পরিস্থিতি সামলাতে দাউদ খান চুক্তির প্রস্তাব দেন মোগল সেনাপতি মুনিম খানকে। টোডরমলের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চুক্তির প্রস্তাবে সেনাপতি মুনিম খান রাজি হলেন। অবশ্য মুনিম খান নিজেও এতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু মোগল সেনাবাহিনীর একটি অংশ ছিল যুদ্ধ ক্লান্ত, তারা চেয়েছিলেন যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান হোক। দাউদ খানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলো মোগল বাহিনী। বার্তা বিনিময়ের পর মোগলদের ঘাঁটিতে দাউদ খানকে ডাকা হয়। ১৫৭৫ সালের ১২ এপ্রিল দাউদ খান তার কর্মকর্তাদের নিয়ে মোগলদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার সম্মানে মুনিম খান দুপুরে ভোজের আয়োজন করেন। এরপর মুনিম খান ও দাউদ খান চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা কটক চুক্তি নামে ইতিহাসে পরিচিত। চুক্তির পর দাউদ মোগল সম্রাটের জন্য হাতি ও অন্যান্য মূল্যবান উপহার দেন। আবুল ফজল লিখেছেন—
“সম্রাট আকবরের প্রতি তার আনুগত্যের প্রকাশ হিসেবে দাউদ তার মুখ মোগলদের রাজধানীর দিকে ঘুরিয়ে প্রণত হলেন এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ মহম্মদকে তার আনুগত্যের নিশ্চয়তা হিসেবে সম্রাট আকবরের দরবারে প্রেরণ করেন। মুনিম খান সম্রাটের পক্ষ থেকে দাউদকে একটি দামী খিলাৎ, একটি তরবারি ও স্বর্ণখচিত বেল্ট উপহার দেন।”
এভাবে কটক চুক্তির মাধ্যমে কাগজে-কলমে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার সার্বভৌমত্ব আফগানদের হাত থেকে মোগল সাম্রাজ্যে বিলীন হয়।
সে সময়ই মুনিম খান বাংলার রাজধানী তান্ডা থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন। কটকের সন্ধিতে দাউদ খান বাংলা ও বিহারকে মোগলদের কাছে ছেড়ে দেন এবং নিজে উড়িষ্যায় রয়ে যান। অবশ্য আফগান শিবিরের অনেকেই কটক চুক্তি মানতে রাজি হননি। বাংলা ও বিহারে মোগলদের সঙ্গে বিভিন্ন আফগান দলের সংঘর্ষ চলতে থাকে। এভাবে কটক চুক্তি খুব একটা কার্যকর হয়নি।
ছয় মাস পর প্লেগ ছড়িয়ে পড়লে মুনিম খান ৮০ বছর বয়সে, সে বছর ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর পরই দাউদ খান বিদ্রোহ করে বসেন। কটক চুক্তি ভঙ্গ করে দাউদ খান পুনরায় গৌড় অধিকারের জন্য উড়িষ্যা থেকে ফিরে আসেন। মূলত কটক চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার কারণেই রাজমহল যুদ্ধের জন্ম। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে দাউদের পরাজয় বাংলায় আফগান শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়।
হোসাইন সুহি: লেখক





