শীতের মধ্যরাত। মহাজগতের অজস্র রাতের মতোই একটি রাত। এমন এক রাতে পৃথিবীর কোনো এক অংশের এক প্রান্তিক গৃহে উচাটন মনে চৌকিতে শুয়ে কেবল এপাশ ওপাশ ফিরছে এক তরুণ। লেপের ভাগাভাগিতে ঠাণ্ডা আর উষ্ণতার লুকোচুরি খেলা চলছে। মুখে-চোখে আর পায়ের পাতার ঠাণ্ডা-গরমের ভাগাভাগি নিয়ে যখন টানাহেঁচড়া চলছে, তখন সিঁদেল চোরের মতো হিমেল তাপ লেপের ফাঁকা আর ফুটো হয়ে যাওয়া পথে প্রবেশ করছে। সে এক নিদারুণ পরিস্থিতি! তবে এ বেশিক্ষণ চালানোও যাবে না। হাতে আর সময় বেশি নেই। শার্টের ওপর চাদর জড়িয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। ঘরের কাউকে না জানিয়ে, নির্বিঘ্ন স্বপ্নে অথবা ঘুমে ডুবিয়ে রেখে নিঃশব্দে প্রস্থান করতে হবে। স্কুলের পেছনে রাজন অপেক্ষা করবে। সেখান থেকে নিয়ে শেকু মামা রওনা হবেন। তরুণ হাসানের মনের মধ্যে রোমাঞ্চ-ভয়-আনন্দ আর দ্বিধা জট পাকিয়েছে। ভয়টা বেশি কাজ করছে নাকি রোমাঞ্চ, সে নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হতে পারে!

মনোদৈহিক এমনি এক পরিস্থিতির মাঝে দ্বারের বাইরে পা বাড়াল হাসান। গতকালই শেকু মামা বলেছিলেন, রথ দেখা আর কলা বেচা এক সঙ্গেই হবে। শেকু মামা হাসানের বন্ধু রাজনের মামা, গরু ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ী মানে সীমানার ওপার থেকে গরু নিয়ে আসেন। গরুপ্রতি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ঝুঁকির মাত্রার সঙ্গে টাকার পরিমাণের সমানুপাতিক সম্পর্ক এখানেও। সপ্তাহে দু-একদিন গরু নিয়ে এসে মামা বাকি দিন খেয়ে আর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেন। মামা খুব একটা পড়াশোনা করেছে বলে রাজনের জানা নেই। শেকু মামাই রাজনের হিরো। রাজন মামার গল্প করতে করতে বলত— স্কুলের পড়া শেষ করে সেও মামার মতো হবে। মামার গল্পে গল্পে কত দিন যে স্কুল থেকে বাড়ি চলে এসেছে, ইয়াত্তা নেই। এলাকার সব গরু ব্যবসায়ীর কীর্তিগাথা শুনতে শুনতে রাজনও সফল গরু ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখে।

বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে হাসান এখন রাস্তায়। তেলবিহীন ধূসর চুলের মতো আঁধার নেমেছে চারদিকে। রাতের আঁধারে কুয়াশা নেমেছে দলছুট মেঘের মতো। কোথাও হাঁটতে হাঁটতে পেজা তুলোর মতো কুয়াশা আলত স্পর্শে জড়িয়ে ধরে গা। আবার খানিক পর মিলিয়ে যায়। এমনই মায়াময় রাতে কৈশোরিক স্থিরহীন চিত্তের অনির্বচনীয় অনুভূতি নিয়ে হাসান এগিয়ে যাচ্ছে। শীতের হিম তার রোমাঞ্চের উত্তাপের কাছে হার মেনেছে। বিন্দু বিন্দু ঘামছে হাসান। হাসানের গৃহকোণের দারিদ্র্য আর বয়সের কৌতূহলকে সীমান্ত পারের হাতছানি উস্কে দিয়েছে। কেবল নতুনের আবাহন ধ্বনিত হচ্ছে তার কানে। আজ চলতে চলতে যে রাস্তার ধারের কবরস্থানকে ও ভয় পাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, যেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর; মৃত্যুর চেয়েও রোমাঞ্চকর অথবা তার চেয়েও সুন্দর কোনো মুহূর্তকে সে উন্মোচন করতে চলেছে।

ভাবতে ভাবতে বাজার চলে এসেছে সামনে। বাজার পেরুলেই স্কুল। হঠাৎ করে শরীরটা ভয়ে জমে গেল হাসানের। একই ভুতুড়ে জায়গা দিয়ে হাঁটছে ও! এই কি বাজার নাকি শত বছরের পুরনো পরিত্যক্ত শহর? একটি আলো ফুটে উঠলেই যে জায়গাটা ফেরিওয়ালা-দোকানি আর ক্রেতাদের হাঁক-ডাক আর দরদামের চেঁচামেচিতে সরগরম থাকে, এখন সেই একই জায়গায় কেমন কবরের সুনসান নীরবতা। হাসান দ্রুত লয়ে জায়গাটা ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়, স্কুলের মাঠে ঢুকে পড়ে। কিন্তু মাঠের মাঝ দিয়ে পেরুতে গিয়ে হাসানের নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ বোধ হলো। মনে হলো যেন অন্ধকার রাত্রিরে সুবিশাল আকাশের নিচে বৃহৎ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে সে একা। পৃথিবীর শ্বাপদসঙ্কুলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলেছে। খুব একা নিঃসঙ্গ। নিঃসঙ্গতা সর্বস্য দার্শনিক অনির্বচনীয় বোধ জাগছে ওর মনে। সহসা অন্য এক হাসানের সত্তাকে অনুভব করছে ও। গত ষোলো-সতেরো বছর যে মানুষগুলোর সঙ্গে বাস, আজ এক রাতেই তাদের অন্ধকারে রেখে কেমন স্বার্থপরের মতো বেরিয়ে চলে এল! স্কুলের পেছনে পৌঁছে রাজনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ মুহূর্তে ঠিক এই বোধটা হাসানকে পোড়াচ্ছিল। শীতের অন্ধকারে রাজনের আবছা অবয়ব দেখে হাসানের অব্যবহিত পূর্বের সব আতঙ্ক-অস্থিরতা প্রশমিত হতে শুরু করল। এতক্ষণ হাসান ভীতসন্ত্রস্ত ছিল, তা কিন্তু নয়। তবু রাজনকে দেখামাত্র অনেকটা নির্ভার অনুভব করল সে।

কি রে! তুই ভয় পাইছির মনে কয়। বলে হাসতে লাগল রাজন। রাজনের গায়ে কোনো চাদর নেই। কেবল একটা শার্টের ওপর সে আরেকটা পরে চলে এসেছে। কেমন নির্ভার। হাসান আশ্বস্ত হলো রাজনের কথায়।

আরে নাহ্ ভয় না। বারির কাউরে না কইয়ে আইসি। তাই মনডা কেরাম কেরাম কইত্তিছে। হাসান বলল।

ধুর শালা! ভয় পালি অয়? মামা আছে না! সে কি সরল আত্মবিশ্বাসের হাসি রাজনের কণ্ঠে।

আমার এরাম সমস্যা নেই। আমি কইয়ে আইসি যে, মামার সাথে বর্ডারের ওই পারে যাব। গরু আনব। বলতে থাকে রাজন।

রাজনরা পাঁচ ভাইবোন। রাজনের বাবা একসময় গরু ব্যবসায়ী ছিলেন। দশ বছর আগে গরু আনতে গিয়ে ওইপারের সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা খেলে, তারা দু-পায়ে গুলি করে। পরে সীমান্তরক্ষী জওয়ানরা চলে গেলে তার সহযোগীরা তাঁকে উদ্ধার করে সীমান্তের এপারে নিয়ে আসে। কীভাবে যে তিনি বেঁচে গেলেন, তা রাজনের বাবার কাছে এক বিস্ময়। কারণ সেদিন তার দু-পা থেকে সদ্য জবাই করা গরুর মতো রক্ত ঝরতে দেখেছেন স্বচক্ষে। কোরবানির গরুকে যেভাবে জবাই করার জন্য দড়ির মারপ্যাঁচে বেঁধে ফেলে দেয়, ঠিক তেমনি তিনি সেদিন অসহায়ের মতো মাটিতে পড়ে রইলেন। কেবল যেন মৃত্যুর অপেক্ষা। ওই ঘটনার পর থেকে গরু আনতে আর কখনই যাননি এবং গরুর মাংস খাওয়াও বাদ দিয়ে দিলেন সারা জীবনের জন্য। তার এ সিদ্ধান্তের পশ্চাতে গরু-সম্পর্কিত কোনো ব্যাখ্যাতীত বিশ্বাস কাজ করছিল। ওই ঘটনার পর দাড়ি রাখলেন লম্বা। লম্বা জুব্বা পরা শুরু করলেন। আর মাথায় টুপি স্থায়ী আসন গেড়ে নিল। কিন্তু জীবিকা তো আর বন্ধ করা যাবে না। তাই নতুন জীবিকা উপার্জনের ধান্ধায় নেমে পড়লেন। হ্যাঁ, ধান্ধা। কারণ স্বল্প শ্রমে অধিকত উপার্জনের যে স্বাদ তিনি আস্বাদন করে ফেলেছেন! তাকে জয় করে ওঠা সহজসাধ্য ছিল না। শুরু করলেন ফেনসিডিল পাচার। আর এভাবে গো-সমাজের অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করে ভালোই চলতে লাগল জীবন। কিন্তু দুই বছর আগে এক নতুন অফিসার কি বুঝে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আদালতে চালান করে দিলেন। আর দুই বছর শেষে জেলের পর্ব ঘুচিয়ে আবার গ্রামে ফিরলেন। লোকজন ভেবেছিল, তিনি আবার নতুন বেশ ধারণ করে নতুন ফন্দি-ফিকিরে নেমে পড়বেন। তত দিনে তিনি দেখলেন তাঁর আর সেই সময় নেই। দুই বছরের কারাজীবন তাঁর জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছে। সময়বিনাশী নদীর স্রোতের মতো শরীর ভেঙে দিয়ে গেছে। তবে এরই মধ্যে উপার্জিত অর্থে গৃহে প্রাচুর্য চলে এসেছে। বড় ছেলে বিদেশে উপার্জন করছে। মেঝো ছেলে সময় সুযোগ বুঝে কখনো গরু, কখনো ফেনসিডিল পাচার করে। সন্তানরা সুখেই রাখছে তাকে। তবে সুদীর্ঘ সময়ের অভ্যাস কালেভদ্রে ঝালাই করার সুযোগ পেলে ছাড়েন না আজো!

২

রাজনের আপাতমর্জি হলো হাসানকে নিয়ে দ্রুত যাত্রা করা। শেকু মামা বলেছেন, তিনি স্কুলের  পেছনে আসবেন না। তাতে অনেকটা পথ বেশি ঘোরা হয়ে যাবে। বরং রাজনরাই মামার নির্ধারিত স্থানে চলে যাবে। সোনাই নদীর ধারে অপেক্ষা করবে। নদী পার হলেই ভিন দেশ। লোকালয় যেখানে শেষ, সেখানেই নদীপাড়ের শুরু। পাড় ভাঙতে ভাঙতে মানুষের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে সোনাই নদী। এ নদীই এখন দুই দেশের সীমারেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে নদী আজীবন কেবল যুক্ত করে গেছে নিকট-দূর, মানুষে মানুষে। আজ সেই নদীই বিভেদের সীমারেখা! তবে মানুষের কল্পনাপ্রসূত নতুন নামকরণ-ভাবনা নদীর শাশ্বত ধারা পাল্টাতে পারে না। নদী বহমান থাকে। প্রাণবন্ত নদী পৃথিবীর বুকে, আর মৃত নদী বয়ে চলে মানুষের স্মৃতিতে-কল্পনায়।

ভোর হতে ঢের বাকি। পুব আকাশে এখনো ঈষৎ আলোটুকুও ফোটেনি। রাতের হিমেল আঁধার কেটে দ্রুত লয়ে পা ফেলছে হাসান আর রাজন। নিঃসীম আকাশে একাকী চাঁদের নিঃসঙ্গতা অজস্র তারার অস্ফুট উপস্থিতিতে ঘুচে গেছে।

রাজন যেতে যেতে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। হাসান থেকে থেকে হুঁ-হাঁ বলে দায়সারা সাড়া দিচ্ছে। সংশয় কাটছে না হাসানের। নিজের ভেতরে প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। কী ঘটতে পারে না পারে! কী হলে কী করবে? ইত্যাকার প্রশ্ন। তবে নিজেকে কিছু প্রশ্নের জবাব গোঁজামিলভাবে দেয়া গেলেও কিছু উত্তরহীন রয়েই গেল।

সোনাই নদীর ধার থেকে তখনো একটু দূরে থাকতেই বসে থাকা চারটি কালো মূর্তি দেখতে পেল। মূর্তিবৎ বসে থাকা এ মানুষগুলোর একজনের ঠোঁটে সিগারেটের আগুন। আরেকটু কাছে যেতেই দেখা গেল ধূমপায়ী লোকটা আর কেউ নয়, রাজনের মামা। ধূমপায়ী লোকটার তৈলাক্ত চুলের সিঁথির ভাঁজ চাঁদের পেলব আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছে। মামার পাশে গিয়ে বসল রাজন। তার পাশের জন তখনো গামছা মাথায় পেঁচিয়ে দুই হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে ঝিমুচ্ছে। অন্য দুজন চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে। তখনো মূর্তিবৎ বসে থাকা দুটি মানুষের মাঝে প্রাণের সঞ্চার ঘটেনি। এ দুজন হাসান-রাজনদের মতো শেকু মামার মক্কেল না তো? হাসান তাদের দিকে বেশ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করল।

রাজন মামাকে হাসানের কথা বলতেই মামা যেন তার গল্পের ঝুলি খুলে বসলেন।

আরে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তোর বয়সে আমিও ওই পার গিছি। তন কাঁটা তারের বেড়া ছিল না। গুঁড়া দুধ থেকে শুরু করি গরম মসলা, ডাইল, গরুর পাল কিনা আনিছি। এ বছর গরু আনতে গেলে এট্টু সমস্যা হচ্ছে। হুর! কোনো ব্যাপার? গুলি ওরা করেই। কোনোবার কইয়ে, কোনোবার না কইয়েই করে। তাই বরং এ সময়টাই বালা। কি কইস তোরা? বলেই হাসলেন শেকু মামা।

রাজনের পাশের জন হাসির কিংবা কথার শব্দে অথবা কাকতালীয়ভাবে ঘুম ভেঙে চোখ খুললেন। আমাদের দেখে বললেন, চলে আইসে ওরা?

হ্যাঁ! এই আমার বাইগনে। আর ওইডে ওর দোস্ত।

আমাদের দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

একবার এক লাইনে বেয়াল্লিশটা গরু নিয়ে আইলাম। তোর মনে আছে শেকুবাই। শাবানার নামে, ববিতার নামে নাম মিলায়ে আমরা গুঁরা দুধের প্যাকেট নি আসতাম।

মামার পাশের লোকটা নেশার ঘোরে কিংবা ঘুমের ঘোরে কোত্থেকে বলা শুরু করে দিল। কণ্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছিল।

এ পার কোশ, ও পার কোশ, ওরে! টাহা দিলি সবগুলি ঠাণ্ডা। তয় এহন এট্টু চাপাচাপি বেশি। দেহা মাত্তর গুলির নিদ্দেশ।

এ কথা শুনে হাসানের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। ও একবার রাজনের দিকে আরেকবার শেকু মামার দিকে তাকায়। কিন্তু অবাক কাণ্ড! কারো কোনো বিকার নেই!

আরে ট্যাকা দেখলে মূর্তিও হাত বাড়ায়, শুনিছ নাই?

বলেই কটাক্ষের হাসি হেসে উঠলেন লোকটা।

ট্যাকা বারায়া দিলি গুল্লিও বারোয়না।

শেকু বাই তোর মনে আছে? আমরা যখন পয়লাবার ওই পার গিলাম, তহন আমাগির বয়স কতইবা ছিল? ঊনিশ-কুড়ি। আর ইগির তো ইয়েই গজায়নি। তায় এরা আবার ওপার যাতি চাসসে।

শেকু মামা মাথা নাড়ে আর বিড়িতে টান দেয়।

ওপার যাআর কি নিশা দেখ। কতজন কত কারণেই না যাই। কারণ না থাকলে বিনা কারণে যাই।

রইচ তোর মনে আছে? বাদনাতলার রামের বাই সংকর সে কি ফুটবল খেলত! স্বপ্ন দ্যাখত ফুটবলার হবে। গরম বাদলার কোনো মানামানি নেই। সেই দুপুর থিকি খেলা শুরু ক‘রছে, মাগরিবের আযান প‘ড়ছে। সেদিকে ওর খেয়ালও নেই। খেলি যাসসে তো যাসসে। ভালো কোনো দলে ঢোকতি পাল্ল না। একসময় ওর মনে অলো ও আর ফুটবলার হতি পারবি না। সেই দুঃখে সেও সীমানার ওপারে চলি গ্যাল। ওই যাওয়াই শ্যাষ। আর আসল না।

হাসান বুঝল নেশা কিংবা ঘুমের ঘোরে যে বক্তা এর আগে কথা বলছিলেন তিনি রইছ্।

‘আরেকবার জয়নাল খুড়ার সাথে দেখা বাজারে’। শেকু মামা এবার বলতে শুরু করলেন।’ আমারেই দেখিই কইল, ‘সগ্গলি গেল, আমার তো কেউ নিল না।’ ওরে জিজ্ঞিস কললাম, জয়নাল খুরা তুমি যায়ে কি করবা। তুমি চিকিত্সাও করাবা না, গরুও আনবা না। তালি কি করবা যায়ে? একবার স্টোক করে তার বাম হাত বাম পা সঅ শরীরের বাম দিক প্রায় অচল হয়ে গেছিল। আমারে কলেন। ‘শেকুরে খালি বাইচা থাকা আর টাহা কামানোই কি জীবন। মানুষের মনডা চায় সীমানা ডিঙ্গাইতে। কেউ যায় নতুন জীবনের লাগি, কেউ যায় ঘরের চুলাতে আগুন জ্বালাইয়া রাখার জন্যি, আর কেউ মনে কর যায় আরেকটা নতুন মানুষ দেখার জন্যি। সীমানা ডিঙ্গাইতে তার কোনো কারণ লাগে না।’ আমি খুড়ার কথা থিকি যা বুঝতি পালাম তা অল ওই পার যাতি তার মন টানতিছিল। ওপারে তারও যাওয়ার বন্দোবস্ত কললাম। সাথে একজন হেলপার দিলাম। ঘুইরা আসার কিছু দিন পর মারা গিলেন জয়নাল খুড়া।’

এভাবে গল্প বলিয়েদের সীমান্তগল্প চার শ্রোতা শুনতে লাগল মন দিয়ে। আর সোনাই নদীর পাড়ে প্রহর বাড়তে লাগল। নদীর জল শান্ত। এই শান্ত জলে বসে স্থির চাঁদও যেন এই মানবিক গল্পের শ্রোতা। এতক্ষণে কুয়াশার কুহকী খেলা বন্ধ হয়ে ঠাণ্ডার প্রকোপ বেড়েছে।

চল আগাই। সময় হইল। সবাইকে তাড়া দিলেন শেকু মামা।

হাসানও উঠে দাঁড়াল অন্যদের সঙ্গে সঙ্গে। এতক্ষণ গল্পে গল্পে আর শীতের হিম টের পাচ্ছিল না। উঠে দাঁড়াতেই মনে হলো পৌষ তার সব হিম ঢেলে দিল গায়ে। দাঁড়াতেই চারপাশ থেকে ঘিরে ধরল ঠাণ্ডা। উপায়ন্তর না দেখে দুই হাত বগলে চেপে হাঁটতে শুরু করল হাসান।

বাইগনে বুঝলি! ওই পারের মানুষ এ পারের মাইনষেরে চেনার লাইগা কতা কতি অয়না বুজলি। দূর থেকে দেখলেই চিনতি পারে। ক্যামনে জানোস?

ক্যামনে? রাজন জিজ্ঞেস করে।

চুলের কাট, হাঁটনের ছিরি। এগুলান দেখলেই কতি পারে।

বলেই আরেক পশলা হেসে নিলেন রইছ মামা।

আর উপায় নাই। ওই পারে গেলেই ধরা। হাসানের স্বগতোক্তি।

ততক্ষণে সবাই শেকু মামাকে সামনে রখে নদীর পাড়ঘেঁষে উত্তর দিকে রওনা দিল। উত্তরের দিকে খানিক এগিয়ে যেতেই দেখা গেল, এই অংশের নদীর পানি অনেকটা শুকিয়ে গেছে। ওপারে পাটক্ষেতের লম্বা সারি। আর এ পারে স্বল্প ঘন জঙ্গল। জঙ্গল দিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল সবাই। হাসান অন্ধকারে কিছুই দেখতে পায় না, তবু ও এদিক ওদিক তাকায়। ভয় হয়, এই বুঝি সব আতঙ্ক বাস্তব রূপ নিল!

খানিক পর কোনো এক আগন্তুক হঠাৎ উদিত হলো এক নতুন খবর নিয়ে।

শেকু ভাই, লাইন ক্লিয়ার। চলেন।

শেকু মামার ঠোঁটে তখন সিগারেটের শেষ অংশটুকু জ্বলছিল। শেষ টান দিয়ে সিগারেট ফেলে দিলেন।

চল্ সবাই। রইচ তুই সবার পিছে পিছে আইবি।

এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত কিংবা অনাহূত কিনা জানি না। তবে ভাগ্যবিধাতা তার নামের প্রতি সুবিচার করেছিলেন। রাজন-রইছরা যখন সীমানা পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ প্রচণ্ড সার্চ লাইটের আলো আর বাঁশির ভীতিকর আওয়াজ যেন যমদূতের মতো হাজির হলো। ওপারের সীমান্তরক্ষীদের সরব উপস্থিতি, সাতজনের সারিবদ্ধ একটি ছোট দলকে দলছুট করে দিল। তবুও শেষমেশ ওপারে পৌঁছেছিলেন অনেকেই। কিন্তু শেকু মামা দেখলেন, সীমান্তস্বাপ্নিক এক তরুণ আর তাদের সঙ্গে নেই। এর কিছুদিন পর নিজ দেশে ফিরে রাজন তার বন্ধুকে কোত্থাও দেখতে পায়নি। তার বাড়ি খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, সেই রাতের পর হাসান আর বাড়িও ফেরেনি।