‘আমি তাকে খুব পছন্দ করি। সে খুবই ভালো, নম্র ও বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ...। সে আমার জন্য দারুণ স্বস্তিদায়ক’— কথাগুলো বলেছিলেন রানী ভিক্টোরিয়া তার পুত্রবধূ ডাচেস অব কনাট লুইজিকে। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৩ নভেম্বর বালমোরে হয়েছিল এই কথোপকথন। কথাগুলো রানী কাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, সেটা শুনলে যে কারোরই খটকা লাগতে পারে। তিনি এসব কথা তার স্বামী অ্যালবার্টকে উদ্দেশ করে বলেননি। অ্যালবার্ট মারা গিয়েছিলেন ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে। নিজের বিশ্বস্ত স্কটিশ ঘিল্লি (শিকারের সহযোগী) জন ব্রাউনের উদ্দেশেও এসব কথা নয়, এই ব্রাউন বিভিন্নভাবে অ্যালবার্টের শূন্যস্থান পূরণ করছিলেন। ব্রাউন মারা গিয়েছিলেন ১৮৮৩ সালে। স্বামী অ্যালবার্ট কিংবা ঘিল্লি জন নয়, রানী ভিক্টোরিয়া এমন প্রশংসা করেছিলেন তার ২৪ বছর বয়সী ভারতীয় ভৃত্য আবদুল করিমের। রানীর সঙ্গে করিমের সম্পর্ক রাজদরবারে ঝড় তুলেছিল এবং তার ৬৪ বছরের শাসনামলের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়ে পরিণত হয়।

পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে রূপ নিয়েছিল যে, ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র রাজা এডওয়ার্ড তার মা ও করিমের মধ্যে সম্পর্কের সব দলিল-চিঠিপত্র, আলোকচিত্র ধ্বংস করে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু করিমের পরিবার গোপনে কিছু চিঠি, ছবি এবং করিমের একটি ‘হারানো ডায়েরি’ সংরক্ষণ করে রেখেছিল একশ বছরের বেশি সময় ধরে। এসব উপাদান রানী ও করিমের সম্পর্কে নতুন আলো ফেলেছে।

এসব দলিল জানাচ্ছে কীভাবে করিম ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে পৌঁছেছিলেন এবং কীভাবে তার চেয়ে ৪২ বছরের বড় রানীর প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। আগ্রার এক সামান্য কেরানি কী করে রানীর সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের একজন এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী বন্ধু হয়ে উঠলেন, সে গল্পই উন্মোচিত হয়েছে এসব দলিলে। রানী ও ভারতীয় ভৃত্যের এই বিস্ময়কর সম্পর্ক নিয়ে লেখক শ্রাবণী বসু ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ গ্রন্থ রচনার পরে শ্রাবণী বসু উপরে আলোচিত দলিলগুলো আবিষ্কার করেন। শ্রাবণী বসুর পিতা সি আর বসু ছিলেন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। তিনি ঢাকা ও কাঠমান্ডুতে দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রাবণীর স্কুলজীবনও কেটেছে এই ঢাকা ও কাঠমান্ডুতে।

করিমের ডায়েরিটি নিশ্চয়ই ইতিহাসের এক অমূল্য আবিষ্কার। মূল গল্পের চেয়ে এই আবিষ্কারের গল্পটিও নেহাত কম রোমাঞ্চকর নয়। বসুর কথায়, ‘একজন ইতিহাসবিদের জন্য এটা গুপ্তধন খুঁজে পাওয়ার মতো ব্যাপার।’ কিন্তু কীভাবে তিনি এ ডায়েরি খুঁজে পেলেন? বইটি নিয়ে গবেষণা করার সময় তিনি আগ্রায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। করিম এখানেই বাস করতেন এবং তার কবরও এখানেই। দেশভাগের পর তার বাড়ি দখল হয়ে যায়, তার পরিবার পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। বাড়ির দখলকারীরা জানতেনও না করিম কে ছিলেন। করিমের কোনো সন্তান ছিল না, তাই বসুর মনে হচ্ছিল তিনি একটি বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বসুর কথায়, ‘আমি জানতাম এই কঠিন পরিস্থিতিতে কেউ না কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তাই প্রত্যেক সাক্ষাত্কারে আমি বলতাম যে, আমি করিমের কোনো বংশধরের খোঁজ করছি এবং আমি নিশ্চিত জানি যে, সে রকম কেউ অবশ্যই আছেন।’ বসুর প্রত্যাশার চেয়ে কম সময়ে তিনি উত্তর পেয়ে যান। তার বোনের এক বন্ধু বসুকে জানান যে, বেঙ্গালুরুতে বসবাস করা তার শাশুড়ি করিমের আত্মীয় হন। ‘এই পরিবারটিকে আমার বোন তিন-চার বছর ধরে চিনত!’

৮৫ বছর বয়সী এই নারী ছিলেন বংশের শেষ প্রজন্ম। ‘তিনি চমত্কার মানুষ, পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন, তিনি জন্মেছিলেন আগ্রা হাউজে। সেখানে তার অনেক স্মৃতি আছে।’ এই নারী শ্রাবণী বসুকে জানান যে, করিমের পরিবারের বাকি সদস্যরা করাচিতে বাস করেন এবং তাদের কাছেই সেই ডায়েরি আছে। এর পর বসু ছুটলেন লন্ডন পাকিস্তানের ভিসার জন্য (তিনি ব্রিটিশ নাগরিক)। দুই মাস পরে শ্রাবণী বসু লন্ডন থেকে পাকিস্তানের করাচিতে উড়ে গেলেন করিমের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। করিমের সেই ডায়েরি তার কাছে হস্তান্তর করা হলো। সোনালি কিনারার বাদামি রঙের চমত্কার এক জার্নাল, দেখেই বোঝা যায় উইন্ডসর প্যালেসে ব্যবহূত জিনিস। এই ডায়েরিতে করিমের ১০ বছরের লন্ডনবাসের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। পাতায় পাতায় সাঁটা আছে আলোকচিত্র ও ম্যাগাজিন কাটিং। ১৯৪৭ সালের দাঙ্গা-দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিতে করিমের পরিবার পাকিস্তানে চলে যায়, ডায়েরিটাও তাদের সঙ্গে ভারত ছেড়ে যায়। বসু দেখার আগে এত দিন এ ডায়েরি পরিবারের কাছে সযত্নে গচ্ছিত ছিল। করিম নিজে ডায়েরিটি প্রকাশিত হোক, তা চেয়েছিলেন; কিন্তু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তা হতে দেয়নি।

ডায়েরি পাওয়ার পর বসুর অনুভূতি, ‘ডায়েরিটা দেখতে পাওয়া ছিল অসাধারণ অনুভূতি— পুরো গল্পটা এবার সমাপ্ত হলো!’ করিমের ডায়েরি ইংরেজিতে লেখা, তাই মনে হয় তিনি এটা প্রকাশ করতেই চেয়েছিলেন। ‘এটা খুব বেদনাবিধুর। তিনি (করিম) একজনের জন্য অনেক কথা লিখে রেখেছিলেন, যার হাতে এই ডায়েরিটা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু হাতে পেলাম আমি! এটা একটা দারুণ অনুভূতি। কারণ ভিক্টোরিয়ার পরিবার এটা মুছে দিতে চেয়েছিল।’ ডায়েরিতে রানীর একটি চিঠির প্রত্যয়িত কপি রয়েছে। চিঠিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল চিঠিটি তার পুত্র পঞ্চম এডওয়ার্ড পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। করিম ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর তিন মাসের মাথায় রানী এ চিঠি লিখেছিলেন। তিনি চিঠিতে করিমকে সেখানে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন, কারণ তিনি তাকে পছন্দ করেন এবং তিনি চান করিম যেন তাকে হিন্দি ভাষা শিক্ষা দেন। রানী এ চিঠি লিখেছিলেন কারণ করিম আগ্রায় ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আগ্রা কারাগারের কেরানি, তাই এই সামান্য ভৃত্যের কাজ তার পছন্দ হচ্ছিল না। শ্রাবণী বসু করিমের ডায়েরিকে ব্যবহার করে যখন তার ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আবদুল বইটি পরিমার্জন করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা যুক্তরাজ্যে ঝড় তুলেছিল। ডেইলি টেলিগ্রাফ, টাইমস, ডেইলি এক্সপ্রেস ও ডেইলি মেইল বেশ কভারেজ দিয়েছিল।

বিস্ময়কর হচ্ছে, করাচির সেই পরিবারটি কখনই তাদের কাছে গচ্ছিত থাকা করিমের ডায়েরিটা পড়েনি। বরং ইতিহাসে করিমকে তার প্রাপ্য স্থান ফিরিয়ে দেয়ার জন্য পরিবারটি শ্রাবণী বসুকে ধন্যবাদ দিয়েছে। বসু বেঙ্গালুরুর পরিবারটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাদের কাছে রানীর সঙ্গে তোলা করিমের ছবি থাকা সত্ত্বেও তারা এত দিন বিষয়টি নিয়ে চুপ ছিলেন কেন? কারণ তারা করিমকে নিয়ে লজ্জিত ছিলেন। তাদের কাছে করিম ছিলেন ধান্দাবাজ প্রকৃতির মানুষ। ‘অবশ্যই তিনি এমন ছিলেন। আমি বলছি না যে তিনি সন্ত ছিলেন। তবে পরিস্থিতিটা আমি করিমের জায়গা থেকে দেখতে চাই। তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ এবং তার সুযোগ ছিল রানীর কাছ থেকে সুবিধা নেয়ার এবং সবাই সে সময় বিভিন্ন সহযোগিতা চাইতেন’— শ্রাবণী বসুর মূল্যায়ন। বসু এর পর এই ডায়েরি ও রানী ভিক্টোরিয়ার হিন্দুস্তান জার্নাল ব্যবহার করে তার বইটি পরিমার্জন করেন।

করিম ডায়েরির শুরুতে ব্রিটিশ রাজবাড়িতে তার সামান্য অবস্থানের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন, ‘রানী ভিক্টোরিয়ার ছায়াতলে আমি একজন সামান্য কর্মচারী। ডায়েরির পরবর্তী পাতাগুলোতে আমি ১৮৮৭-এর গোল্ডেন জুবিলি থেকে ১৮৯৭ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে রানী ভিক্টোরিয়ার দরবারে আমার জীবনযাপনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাঠকদের জন্য লিপিবদ্ধ করব। আমি এই অপরিচিত দেশে, অচেনা মানুষদের মধ্যে একজন বিদেশী। আমি আমার বিভিন্ন ভুলকে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করে নিচ্ছি। আমার অনুরোধ পাঠকরা লেখকের সব ভুল-ত্রুটি উদারতার সঙ্গে বিবেচনা করবেন।’

এর পর তিনি ইংল্যান্ডে আসার ক্ষেত্রে তার ভাবনাকে বিধৃত করেছেন, ‘১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে কেন্দ্রীয় কারাগারে (করিম এই কারাগারের কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন) আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ড. টাইলারের সুপারিশে আমি ইংল্যান্ডে পৌঁছলাম। আমি এসেছিলাম রানীর আর্দালির পদে কাজ করতে। এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, আমরা ভারতে আর্দালি বলতে বুঝি যে কোনো শাসক, শাহজাদা কিংবা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে সাহচর্য দেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে আর্দালির পদ থেকে আমাদের দেশের আর্দালিরা অনেক উঁচু পদের। আমি ইংল্যান্ডে যেতে রাজি হয়েছিলাম ভারতের আর্দালির পদমর্যাদার বিবেচনায়।’ লন্ডনে পৌঁছে করিম চিড়িয়াখানা ও মাদাম তুঁসো পরিদর্শন করেন। রানীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন করিম তার ডায়েরিতে, ‘ড. টাইলার এবং আমাকে খাবার ঘরের কাছে অপেক্ষা করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। রানীর আগমনে আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে ছিলেন ডিউক অব কনাট ও শাহজাদী বিয়েত্রিস। ড. টাইলার তত্ক্ষণাত্ হাঁটু গেড়ে রানীকে সম্মান জানালেন। আমি একই কাজ করলাম প্রাচ্যের কায়দায়। রানী আমাকে একটা সোনার মোহর উপহার দিলেন। এরপর তিনি টাইলারের সঙ্গে কয়েকটি কথা বললেন। এভাবে ভারতের সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাত্কার সমাপ্ত হলো।’ তবে ভৃত্যের কাজে করিম শীঘ্রই নাখোশ হয়ে উঠলেন। তিনি দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এটা তিনি তার ডায়েরিতে উল্লেখ করেছেন। করিমের সিদ্ধান্ত রানীকে আঘাত দেয়, তিনি করিমকে ফেরাতে তাকে চিঠি লেখেন। চিঠিটির মূল কপি রানীর পুত্র এডওয়ার্ড পুড়িয়ে ফেললেও তার একটি কপি এই ডায়েরিতে যুক্ত আছে। চিঠিতে রানী করিমকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘জেনারেল ডেনহে তোমার আবেদন আমাকে পড়ে শুনিয়েছে... তোমার সঙ্গে বিচ্ছেদ আমাকে দুঃখ দেবে। কারণ আমি তোমাকে পছন্দ ও সম্মান করি। আমি আশা করি, তুমি এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত এখানে থেকে যাবে যাতে আমি কথা বলার মতো কিছুটা হিন্দুস্তানি তোমার কাছ থেকে শিখতে পারি। আমি আনন্দের সঙ্গে তোমার জন্য ভারতে একটি পদের জন্য সুপারিশ করব। এবং আশা করি, তুমি মাঝে মাঝে ইংল্যান্ডে এসে আমাকে দেখে যেতে পারবে।’ এর পর রানী করিমকে তার মুনশি (শিক্ষক) হিসেবে নিয়োগ দেন। করিম এতে মহাখুশি। তিনি ডায়েরিতেও এটা লিখেছেন।

করিমের ডায়েরিটি রানী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি দালিলিক প্রমাণসহ তুলে ধরেছে। প্রকৃত সত্য এটাই যে, এই করিম ছিলেন রানীর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী, তিনি বিধবা রানীকে একাকিত্বে মানসিক সমর্থন ও আনন্দ দিয়েছেন।