১৭৭৫ সালে উত্তর ভারতের রামপুরে নতুন প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন ফয়জুল্লাহ খান। শুরু হয় রামপুরের নবাবি আমল। ইংরেজঘেঁষা নীতির কারণে ব্রিটিশ আমলে তাদের অবস্থান ছিল বেশ শক্ত। দিল্লির ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়ার দরুন অনিবার্যভাবেই বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি রামপুর আশ্রয় নেন। রাজকীয় রীতির ঐতিহ্য হিসেবেই সেখানে বিকাশ ঘটে খানসামা ব্যবস্থার। দেশ ভাগের পর নবাব পরিবারের দাপট ক্ষয়ে যেতে থাকলেও টিকে ছিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মসনদে নবাবের পর নবাব বসেছেন, সমান্তরালে বদল ঘটেছে গৃহস্থালির দায়িত্ব। নবাব হামিদ আলি খান রামপুরের ক্ষমতায় ছিলেন ১৮৯৪ থেকে ১৯৩০ সাল অবধি। তার সময়ে নবাবের অধীনে খানসামার সংখ্যা ছিল ১০০ জন। রান্নার সুবিধার জন্য তিনটি পৃথক রান্নাঘরই ছিল সেই সময়। একটায় পশ্চিমা, একটায় ভারতীয় ও বাকিটাতে মিষ্টান্ন প্রস্তুত হতো। পুত্র সৈয়দ রেজা আলি খানের (১৯৩০-১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে সংখ্যাটা বেশ কমে যায়। অবশ্য তিনিই কিংবদন্তি আশিক খানসামাকে বিলেত পাঠান রান্না শেখার জন্য। বিলেত থেকে ইউরোপীয় ও ইংলিশ ঘরানার নানা রকম রান্না রপ্ত করে এসে পরিবেশন করেন নবাব পরিবারে। সৈয়দ রেজা আলি খানের মৃত্যুর পর খাসবাগ প্রাসাদের রান্নাঘরগুলো আর সঙ্গে ৩০ জন বাবুর্চিকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন বড় ছেলে মর্তুজা আলি খান। ততদিনে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছে। বদলে গেছে অনেক পরিস্থিতি। সেই সময়ে মর্তুজা আলি খানের স্ত্রী সাকিনা বেগমের জন্য হরেক কিসিমের রান্না প্রস্তুত করতেন আশিক খানসামা। সেই ধারাবাহিকতাতেই রামপুর খাসবাগ প্রাসাদের রসুইঘরে প্রবেশ করেন আশিক খানসামার পুত্র মজিদ। পিতৃপ্রদত্ত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
অনেক পরে রামপুর বাংলোতে পুত্রবধূ হয়ে প্রবেশ করেন লেখিকা তারানা হোসাইন খান। ২০২১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বেগম অ্যান্ড দ্য দাস্তান’ বইয়ের জন্য তিনি সুপরিচিত। রামপুরের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও লিখেছেন বই ‘রামপুর কুইজিন: ফুড ফ্যাবলস, মেমোরিজ অ্যান্ড রেসিপিজ’। ঔপনিবেশিক সেই বাংলোতে থাকা অবস্থায় লেখিকার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মজিদ খানসামার। দীর্ঘদিন কথোপকথনে মজিদ খানসামা তুলে ধরেন নিজের শৈশব, কৈশোর আর নবাববাড়ির সঙ্গে আটকে থাকার গল্প।
নবাব রেজা আলি খানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় ১৯৬৬ সালের ৬ মার্চ। কাকতালীয়ভাবে সেদিনই মজিদ খানসামার প্রথম কাজের দিন। খুব কাছে থেকে দেখেছেন নবাববাড়ির পরিবর্তন। আগের সেই জৌলুস নেই। এক এক করে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে খানসামা আর বাবুর্চিরা। রসুইঘরের চৌহদ্দি ছেড়ে কেউ বেছে নিচ্ছে বিকল্প পেশা। অথচ তখনো আনুগত্যের স্বাক্ষর হিসেবে পড়ে থেকেছেন ঐতিহ্য ধরে। মজিদ খানসামার অধিকাংশ সময় কেটেছে মর্তুজা আলির দিল্লির প্রাসাদে। পরিবারের একান্ত বিশ্বাসভাজন ও ভরসাস্থল হয়ে ওঠায় দায়িত্ব নেহায়েত কম ছিল না। নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন হরেক কিসিমের রান্নায়। সাকিনা বেগম ক্যানসার চিকিৎসার জন্য মুম্বাই অবস্থান করলে তিনিই ছিলেন সঙ্গে। নবাব মর্তুজা আলি এবং তার স্ত্রী সাকিনা বেগমের মৃত্যুর পরও দায়িত্ব ফুরায়নি মজিদের। রান্না করেছেন তাদের কন্যা শাহজাদি নাঘাত আবেদির জন্য। বিশ বছরের বেশি সময় তার রান্নার স্বাদেই বেড়ে উঠেছেন শাহজাদি। অবশেষে বয়সের জন্য শরীরের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হন একদিন। বের হয়ে আসেন নবাবি বৃত্তের বাইরে। নিজের পুত্র না থাকায় দুজন বিহারি তরুণকে শিখিয়ে দেন সব অভিজ্ঞতা। তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। রান্নার মুনশিয়ানা কেবল উপাদান আর পদ্ধতিতে না। রান্নাকারীর হাতেও থাকে হয়তো। সেই জন্যই তরুণদ্বয় তার শিক্ষা আর ধরে রাখতে পারেনি।
মজিদ খানসামা চুপচাপ মানুষ। স্বভাবসুলভ মিতভাষ হোক কিংবা বয়সের ক্লান্তিতে। তার পরও খাসবাগ প্রাসাদের রান্নাঘরের প্রসঙ্গ উঠলে শব্দ করে হাসতেন। সাগ্রহে তুলে আনতেন অতীতের স্মৃতি। খাসবাগের রান্নাঘরে কয়লায় আগুন জ্বালানো হতো প্রতি ভোরে, সেই আগুন থাকত মাঝরাত অবধি। সারা দিন লেগে থাকত রান্নার উৎসব। সাকিনা বেগম নিজে প্রতিদিন খাবারের মেনু বলে দিতেন। সেই আদেশ মুনসারিমের মাধ্যমে চলে আসত খানসামার কাছে। ১৯৭০-এর দশকে প্রাসাদের অংশ হিসেবেই একটা হোটেল খোলেন সাকিনা বেগম। সেখানে টেবিল সাজানো, তরকারি কাটাকুটি আর খাবার পরিবেশন তদারক করতেন মজিদ খানসামা।
লাতাফাত আলি খান রামপুরি ‘শাহি দস্তরখানা’ বইতে আলোচনা করেছেন রামপুর দরবারের বিভিন্ন চমকপ্রদ রান্না। সেখানে ‘সাবুত রান কাবাব’ হিসেবে আস্ত রানের কাবাব তৈরির নিয়মাবলি লিপিবদ্ধ রয়েছে। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। তবে উদ্ধৃত পদ্ধতির চেয়ে পরবর্তীকালের তৈরি রান কাবাবের প্রস্তুতির প্রণালি ভিন্ন। বস্তুত রামপুরি রানের প্রস্তুতি মোগল ও অযোধ্যার রান কাবাবের চেয়ে অনেক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র। ফলে এটা পরবর্তীকালের রামপুরে রসুইঘরে উদ্ভাবিত বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। মজিদ মিয়া এর উদ্ভাবনকারী না হলেও যোগ্য উত্তরসূরি। এক্ষেত্রে তার তুলনা সে নিজে। মোগল রান কাবাবে কোর্মার মতোই রানের চারপাশে থাকে গ্রেভি। খাসির রানের সঙ্গে এই মোটা স্তরের স্বাদ সবার পছন্দ না। সেই হিসেবে রামপুরি রানে আদা, রসুন ও মসলা থাকে তুলনামূলকভাবে অনেক কম। কোনো বাড়তি সুগন্ধিও যুক্ত করা হয় না। মাংসের ওপরে থাকে না সসের অস্বাভাবিক আস্তরণ। উপরন্তু যে মেরিনেডটুকু ব্যবহার করা হয়, তা মাংসের মধ্যে পুরোপুরি ঢুকে যায়। আকর্ষণীয় ছাপ থেকে যায় স্বাদে।
প্রচলিত ধাঁচেই মেরিনেড তৈরি হয় মজিদ খানসামার হাতে। বিশেষত্ব রান কাবাবে। আদা, রসুন, হলুদ আর কাঁচা পেঁপে বাটার সঙ্গে লবণের মিশেল। প্রথমে খাসির মাংস থেকে তেলটুকু ছাড়িয়ে নেয়া হয়। তার ওপরে ভালো করে মাখানো হয় মেরিনেড। এরপর কাঁচা পেঁপের গা কেটে রস ফেলা হয় রানের ওপর। পেপের সাদা রস রান প্রস্তুতির জন্য দুর্দান্ত। অন্যদিকে রানটার মাংস কেটে প্রস্তুত করা হয়। বের হয়ে আসে হাড়। ফাঁপা করে সরিয়ে নেয়া হয় কিছুটা মাংস। তারপর মেরিনেড মেশানো হয় ভালো মতো, যেন কাটা অংশগুলো দিয়ে ভেতরের হাড় অব্দি পৌঁছাতে পারে। মসলা আটকে রাখার জন্য ছুরি দিয়ে মাংসের গায়ে ক্ষত তৈরি করা হয়। মাংসে প্রবেশ করতে থাকে মেরিনেড। এই অবস্থায় পুরো একদিন রাখা হয় ফ্রিজে।
দ্বিতীয় দিন শুরু হয় পরবর্তী কর্মযজ্ঞ। নতুনভাবে মেরিনেড তৈরি করা হয়। এবার থাকে দই, কাজুবাদামের বাটা, ননি ও ঘি। ভাজা পিঁয়াজ ও অন্যান্য মসলাকে ভালো করে মেশানো হয় ঘিয়ের সঙ্গে। কোনো রকম পানি যুক্ত না করেই সব উপাদানকে পাটায় পিষে নেয়া হয়। এবার ফ্রিজ থেকে বের করে আনা হয় আগের দিন রেখে দেয়া রানটিকে। আগে ফাঁপা করার জন্য যে মাংসটুকু আলাদা করা হয়েছিল তা এবার সাবধানে ছোট করে কাটা হয়। পরিমাণমতো সঙ্গে মেশানো হয় রসুনের বাটা, শুকনা মরিচ, কাঁচা মরিচ, লবণ ও গরমমসলা। কেবল কাঁচা গন্ধ দূর করার জন্য ফাঁপা মাংসটুকুকে ঘিয়ে উত্তপ্ত করা হয় কিছুক্ষণের জন্য। তারপর ঠাণ্ডা হলে সেই মাংসকে রানের গায়ে আটকে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। হাড়ের উপরে মাংস যেন আটকে থাকে, তার জন্য তামার তার দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হয়।
যেহেতু মাংসকে আগুনের খুব কাছে রাখতে হয়। ফলে রান কাবাব তৈরির জন্য আবদ্ধ চুলার চেয়ে উন্মুক্ত চুলা উত্তম। এক্ষেত্রে অবশ্য মাটিতেই ইট বসিয়ে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে নেয়া যায়। কয়লায় অনবরত আগুনের সরবরাহ থাকবে। ওপরে স্কিউয়ারে বসানো থাকবে রান। নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ শুরু করার কিছুক্ষণ পরই ঘ্রাণ জানিয়ে দেবে মজিদ খানসামার মুনশিয়ানা। রামপুরি বিশেষ রান কাবাব। স্বাদের দিক থেকেও স্বতন্ত্র এ রান্না। বিশেষ করে মাংসের ভেতর অবধি পৌঁছে যায় মসলার স্বাদ। ফাঁপা করে দেয়ার কারণে মাংস হয়ে ওঠে নরম। এমনকি খাওয়ার সময় কাটার জন্য কোনো প্রকার চাকু ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। মিঠে সুগন্ধ আর অকৃত্রিম স্বাদ মিলে এক অনন্য উপাদেয় যেন। রামপুর নবাবি যুগ কবেই শেষ হয়ে গেছে। মজিদ খানসামা অতিক্রম করছে তার জীবনের শেষ সময়। হঠাৎ কোনো একদিন হারিয়ে যাবেন তিনি। পুত্র নেই। তৈরি হয়নি এই শিল্পের যথার্থ উত্তরাধিকারীও। ফলে তার সঙ্গে হারিয়ে যাবে নবাবি যুগের অভিজাত ঐতিহ্যের গোপন জাদু।
মুহম্মদ আল-মুখতাফি: লেখক





