ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিতটি ছিল তাদের আমলাতন্ত্র। আবার এ কর্মকর্তাদের বাড়িতেও দেখা যেত নানা পদে কর্মরত কর্মীদের একটি বাহিনী, যার পদ ও দায়িত্বের বিন্যাস আমলাতন্ত্রের মতোই সুনির্দিষ্ট ছিল। এদের কাজ ছিল মেমসাহেবরা যেন ভিনদেশে এসে বিন্দুমাত্র ঝামেলায় না পড়েন সেটা নিশ্চিত করা। খিদমতগার, বাবুর্চি, মশালচি, পাংখাওয়ালা, আয়া—এমন বহু পদের চাকর ছিল কর্মকর্তাদের বাড়িতে। এদের চূড়ায় থাকতেন খানসামা। 

এ পদটি ছিল ঘরের ম্যানেজারের মতো। বাজার করা থেকে শুরু করে কী ধরনের খাবার রান্না হবে তার জোগাড়যন্ত্র তিনিই করতেন। সহজে বললে, চুলায় রান্না করা ছাড়া তিনি রান্নার সবই করতেন।

অবশ্য খানসামা পদটি এ উপমহাদেশে ইংরেজদের আগমনের আগে থেকেই ছিল। সুলতানি, মোগল যুগে তৈরি হয়েছিল এ পদ। খাদ্যরসিকরা তখন টাকাকড়ি থাকলে বাড়িতে খানসামা রাখতেন। কারণ এরা নানা দেশের পদ তৈরির সূত্র জানতেন। কোন রান্নায় কোন উপাদান কী পরিমাণে প্রয়োজন হবে তা খানসামারা ভালো জানতেন। আর খাবার পরিবেশনের শিল্পটাও তাদের ভাণ্ডারে রক্ষিত থাকত। তাই অভিজাতদের ঘরে খানসামারা আরাধ্যই ছিল। 

অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান খাবার বিষয়ক লেখক ব্রিজেত কুমার-হোয়াইট জানিয়েছেন, ব্রিটিশ যুগে খানসামারা আসতেন মূলত মধ্য ও পূর্ব ভারত, গোয়া, মাদ্রাজ, নেপাল ও বাংলাদেশের মগ সম্প্রদায় থেকে। এবং এই খানসামাদের মধ্যে রান্নার বিষয়ে ধর্মীয় অগ্রাধিকার ছিল না, যে কেউ গরু, শূকর—সব ধরনের মাংস রান্না করতেন। খানসামাদের কেরামতি নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে—তারা পুরির মধ্যে চড়ুই পাখি রেখে সেটা ভাজতে পারতেন এবং খাওয়ার জন্য সে পুরি ছিঁড়লে দেখা যাবে পাখিটি জীবিত এবং উড়ে যাবে।

খানসামা যত দক্ষই হন, ব্রিটিশরা শুরুর দিকে স্থানীয় খাবারের প্রতি আগ্রহী ছিল না। ভারতীয় খাবারকে তারা অস্বাস্থ্যকর ও মসলাদার বিবেচনা করে দূরে রাখত। মেমসাহেবরা তাদের খানসামাদের ইউরোপীয় খাবার-দাবার রান্না শেখাতেন। এভাবেই এ অঞ্চলে স্যুপ, রোস্ট, পাই, পুডিংয়ের মতো খাবারের জন্ম হয়। নিজেদের দক্ষতা আর আন্তরিকতায় তারা মেমসাহেবদের আস্থা অর্জন করে নেন। অ্যানা চিটি নামে এক ইংরেজ নারী লিখেছেন, মাদ্রাজের আদিয়ার ক্লাবের খানসামাদের সবচেয়ে বড় রহস্যটি হলো তাদের নিম্বু পানি (লেবুর শরবত)। এসব থেকে বোঝা যায় পারিবারিক ও পাবলিক স্পেসে খানসামারা ব্রিটিশ পরিবারগুলোর অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন।

জন্মসূত্রে ব্রিটিশ, কিন্তু ভারতে জীবন কাটানো রাসকিন বন্ডের একটি গল্পের বই আছে টাইগারস ফর ডিনার নামে। এ বইতে তিনি তাদের বাসায় একদা কাজ করা মেহমুদ খানসামার কাছে শোনা গল্পগুলোই শুনিয়েছেন। সেটা ছিল ব্রিটিশ শাসনামল। এই মেহমুদ খানসামা রাসকিনদের বাসায় এসেছিল বড় রেফারেন্স নিয়ে। তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত শিকারি জিম করবেটের খানসামা। সব মিলিয়ে খানসামা ব্রিটিশ ভারতের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ।

ক্লাব, আর্মি মেস ও ঘরে খানসামারা ইংরেজদের বিশ্বস্ত শ্রেণী হিসেবে আবির্ভূত হন। ঘরের অন্য সব চাকরের তদারকের দায়িত্ব দেয়া হয় তার ওপর। তাদের দায়িত্ববোধ দেখে উইনস্টন চার্চিলও মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালে পুনেতে তিনি খানসামাদের কাছ থেকে দেখেছিলেন। খানসামাদের প্রশংসা করে তিনি লিখেছিলেন, ‘তাদের পুরো জীবন কাজের প্রতি উৎসর্গ করেছে। কোনো পরিশ্রমই তাদের জন্য কঠোর নয়, কোনো কাজের সময় দীর্ঘ নয়।’

উনিশ শতকে আগাথা ফ্লোরেন্স জেমস নামের এক ইংরেজ লিখেছেন, ভারতের মাটিতে ভালো, শুদ্ধ খাবার খেতে হলে অবশ্যই বিশ্বস্ত খানসামার প্রয়োজন। তিনি ১৮৯৮ সালে লিখেছেন, ‘পরিবারের দায়িত্ব আছে এমন ইংরেজ নারীদের দৈনিক রুটিন ভারত কিংবা ইংল্যান্ডে প্রায় একই রকম। সকালে দ্বিতীয় ব্রেকফাস্টের (প্রথম প্রাতরাশটি ছিল ভোরে ঘোড়ায় চড়তে যাওয়ার আগে একেবারে সামান্য কিছু খাওয়া) পরপরই খানসামাকে নির্দেশনা দিতে হয়। যাবতীয় খরচের টাকা তাকে বুঝিয়ে দেয়া। সঙ্গে ঘরে দিনের যাবতীয় কাজের জন্য নির্দেশনা দেয়া।’

ভারতে যে ব্রিটিশ তরুণরা বিয়ে করেননি বা স্ত্রী ছাড়াই বসবাস করতেন তাদের খাবারদাবারের সব দরকার খানসামারাই মেটাত।

একসময় ব্রিটিশরা স্থানীয় অনেক উপাদান তাদের পদে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। আর এতে রন্ধনশালায় রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল আর বলাই বাহুল্য সেটা হয়েছিল খানসামাদের হাতে। ব্রিজেত কুমার-হোয়াইট লিখেছেন, ‘খানসামারা ব্রিটিশ পদ ভারতীয় পদ্ধতিতে তৈরি শুরু করে। স্যুপে যুক্ত হলো জিরা ও মরিচ; রোস্টে মিশল লবঙ্গ, গোলমরিচ আর দারুচিনি। ভারতীয় ফ্লেভারের খাবার নিয়ে ব্রিটিশ ক্রেজ তৈরি হয়েছিল। আর এমন পরিপ্রেক্ষিতে উরস্টাশায়ার সস এই ভারতীয় খানাসামাদের হাতেই সৃষ্টি। কথিত আছে আমাদের সময়েও জনপ্রিয় শিক কাবাব এসেছিল নবাব সিরাজদ্দৌলার খানসামা শেখ শাহনেওয়াজের হাত ধরে। নবাবের জন্যই শাহনেওয়াজ এ কাবাব উদ্ভাবন করেন।’

ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসির রান্নাঘর সামলাতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল শেখ করিম বক্সকে। এটা ১৮৪৮ সালের কথা। এরপর লর্ড মিন্টো পর্যন্ত ভারতের সাতজন গভর্নর জেনারেলের প্রধান খানসামা হিসেবে কাজ করেছেন করিম বক্স। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লর্ড মিন্টো করিমের একটি প্রতিকৃতি আঁকিয়েছিলেন। তেলরঙের এ প্রতিকৃতিটি গভর্নর হাউজের দেয়ালে শোভা পেয়েছিল। 

অবশ্য খানসামাদের নিয়ে নাক উঁচু অনেক ইংরেজের অভিযোগও ছিল। যেমন মেমসাহেবদের জন্য লেখা এক কুকবুকে লেখক বলছেন, বাবুর্চি বা খানসামার রান্না করা কারি খাওয়ার উপযুক্ত হয় না। তাই তিনি রান্নার সময় মেমসাহেবদের উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেছেন। আর তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে মেমসাহেবরা যেন অন্তত উপাদানগুলোর মান ও পরিমাণ একবার শুরুতে দেখে দেন।

ঔপনিবেশিক কালে এ খানসামা পদটি স্থানীয়দের জন্য বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তাই কোনো গ্রামে একজন সফল খানসামা থাকলে সেখানকার লোকজন খানসামা হতে শহরে চলে আসতেন। কলকাতায় কর্মরত খানসামাদের নিয়ে খানসামাপাড়া গড়ে উঠেছিল। পেশায় সাফল্য পেলে অবশ্য তারা এ পাড়া ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতেন। কলকাতায় বেশ কয়েকটি সড়ক আছে খানসামাদের নামে। এ রকম একটি সড়ক চমরু খানসামা লেন, এর নামকরণ হয়েছিল চমরু খানসামার নামে। ইনি বিরিয়ানি ও মোগলাই খাবার রাঁধতে ওস্তাদ ছিলেন। ভাগ্য ফেরার পর তিনি খানসামাপাড়া ছেড়ে পার্ক সার্কাসে চলে যান।

খানাসামারা যে বিশেষ শিক্ষিত ছিলেন এমনটা নয়। তারা কাজ শিখতেন বংশপরম্পরায়। আর কাজ করতেন নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি দিয়ে। খাদ্য সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা বলেন, খানসামার পাশে দাঁড়িয়ে সব মুখস্থ করলেও খাবারের স্বাদ এক হবে না।

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে খানসামারা সাধারণত ক্লাব, সেনা ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের বাড়িতে কাজ করতেন। ভারতে বন বিভাগের রেস্ট হাউজগুলোতে এখনো খানসামা আছেন। ১৯৮০-এর দশক থেকে ভারতে বাটার চিকেন আর পাঞ্জাবি চায়নিজের দৌরাত্ম্য শুরু হলে খানসামাদের সময়ও শেষ হতে যায়।

 

এস এম রশিদ: লেখক