কলকাতায় তিন খানসামার নামে তিনটি পাকা সড়ক আছে, বাংলাদেশে খানসামা নামের একটি উপজেলা আছে।

ব্রিটিশ আমলে খানসামা নিজ দায়িত্বের কারণে যতটা গুরুত্ববহ, বাস্তবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করে। অধিকন্তু লোকটি কার খানসামা, তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদার ব্যারোমিটার ওঠানামা করত।

১৮৬৯ সালে রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন আট বছর, তখন মিঞাজান দারোগার একরারনামা প্রকাশিত হয়। মিঞাজান কেমন করে দারোগা হলেন সেটি জানা বেশি প্রয়োজন: মিঞাজানের বোন জেলার ইংরেজ কালেক্টর সাহেবের রক্ষিতা আর জামাইবাবু সেই কালেক্টরেটে খাস খানসামা ছিলেন। দুজনের তদবিরের ঠেলায় মিঞাজান মাত্র ২০ বছর বয়সেই পুরোদস্তুর দারোগা হয়ে গেলেন। তারপর দারোগাকে আর পায় কে?

রাবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পদ্যে ও গদ্যে খানসামাকে স্মরণ করেছেন। তার পদ্যের খানসামা মিঞাজান দারোগার বোনের স্বামীর মতো করিত্কর্মা নয়।

         গাব্বু রাজার পাতে

                 ছাগলের কোরমাতে

         যবে দেখা গেল তেলা

                 পোকাটা

         রাজা গেল মহাচটে

                 চীত্কার করে উঠে

                 ‘খানসামা কোথাকার

                 বোকাটা!’

ফার্সি ভাষায় সৃষ্ট পেশাদার পদবিটি রবীন্দ্রনাথকে আকর্ষণ করেছে। ১৮৯৫ সালের ১১ মার্চ ছিন্নপত্রে লিখেছেন: ঘণ্টাও বাজছে না, সলজ্জ খানসামা এসেও সালাম করছে না। যোগাযোগ উপন্যাসে পানের সোনার বাটি হাতে নিয়ে খানসামা সাহেবের পেছন পেছন হাঁটে। জীবনস্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন শাহজাদাপুরের একটি ঘটনা। খানসামার আসতে দেরি হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ রাগ করলেন। তাকে ধমক দিলেন। খানসামা জানায়, রাতে তার শিশুকন্যাটির মৃত্যু হয়েছে। সবকিছু সামলে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল বলেই সে বিছানাপত্র ঝাড়তে শুরু করলেন।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘আম্র-তত্ত্ব’ কাহিনীর খানসামা অবাঙালি। খানসামা আবার ডাকিল, আট বাজ গিয়া সাহেব... জাগিয়ে। (সাহেবের ঘুম ভাঙল না।) অবশেষে খানসামা মশারির ভেতর হস্ত প্রবেশ করাইয়া দিয়া সাহেবের হাঁটু ধরিয়া নাড়া দিয়া বলিল, জাগিয়ে হুজুর। আট বাজ গিয়া।

নাশতার টেবিলে দেয়া খাবার সাহেবের পছন্দ হলো না আর কী আছে জানতে চাইলে খানসামা বললেন, ‘মটন চাপ হ্যায়, ঠান্ডা রোস্ত হ্যায়, কারি ভাত হ্যায়।’

মুরগির তরকারি ভীষণ গরম ও অসেদ্ধ, তিনি চটে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘ক্যায়া হুয়া? ইয়ে ক্যায়া হ্যায়? ইউ ড্যাম উল্লুক কা বাচ্চা।’

খানসামা বহাল আছে রবীন্দ্রনাথের ‘ল্যাবরেটরি’তে। ভারতে দু-চার মাস কাটিয়ে গেছেন এমন কোনো বিলেতি লেখক খানসামাকে উপেক্ষা করতে পারেননি। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রুডিয়ার্ড কিপলিং, বিখ্যাত শিকারি ও লেখক জিম করবেট, জজ অরওয়েল কোনো না কোনোভাবে সবার লেখায় খানসামা এসেছে—কিন্তু তাদের কেউই ‘ড্যাম উল্লুক কা বাচ্চা’ নয়। প্রথম বাঙালি আমলা লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তো খানসামা পরিরেষ্টিতই থাকতেন। বিষবৃক্ষ উপন্যাসের খানসামা তাচ্ছিল্য করার মতো নয়। ব্যক্তিজীবনে চাকরিকালে গন্তব্যে পৌঁছাতে অধিক রাত হয়ে যাবে, পথটাও নিরাপদ নয়, তাই খানসামা মুরলীর পরামর্শে এক জমিদার বাড়িতেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মধ্যরাতে দরজায় কড়া নাড়া শুনে ভাবলেন নিশ্চয়ই খানসামা। কিন্তু তা নয়, কেউই নেই। দূরে খানসামা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। আরো কয়েকবার কড়া নড়ল, তিনি দরজা খুললেন। কেউ নেই। তারপর হাতে ছুরি নিয়ে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। কড়া নাড়লে এবার আর ছাড়বেন না। সত্যি কড়া নড়ল, দরজা খুলতে দেখলেন এক কিশোরী। বলল সে রাতে এই ঘরে এসে থাকে। বঙ্কিম তাকে ধরতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কিশোরী নিরুদ্দেশ হয়ে যায়নি। দেখলেন দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। বাকি রাত না ঘুমিয়ে কাটল। খানসামা মনে করল যত তাড়াতাড়ি বাবুকে নিয়ে কেটে পড়া যায় ততই মঙ্গল। বঙ্কিমচন্দ্র তখন কাঁথির ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন আর জমিদার বাড়িটি ছিল তিন মহলা।

প্রাণকৃষ্ণ দত্তের কলিকাতার ইতিকথায় খানসামা আছে। একালে আনিসুজ্জামানের স্মৃতি কথায়ও আছে। বঙ্কিমের সূর্যমুখী যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন তাকে অনুসরণ করল খানসামা। সূর্যমুখী তাকে দেখে ক্ষুব্ধ হলো এবং বলল, ‘আমাকে ফিরাইবার তুই কে?’ সন্ত্রস্ত হলেও খানসামা দাঁড়িয়ে থাকলে সূর্যমুখী তাকে বললেন, ‘তুই যদি এখানে দাঁড়াইবি তবে এই পুস্করিণীর জলে আমি ডুবিয়া মরিব।’ খানসামা অকল্যাণ ঘটতে পারে এ আশঙ্কায় দ্রুত গিয়ে নগেন্দ্রকে খবর দিল।

রাজনারায়ণ বসুর ‘সে কাল এ কাল’ বাঙালি বাবু ও খানসামার কথা লিখেছে—দুই বাঙ্গালি বাবু ইউলসনের হোটেলে আহার করতে গেলেন। গোমাংস ভক্ত এক বাঙ্গালি বাবু গরুর কোমল মাংস স্টেক কিংবা অক্স টাং (ষাঁড়ের জিহ্বা) খেতে চাইলেন। খানসামা এটা নেই, ওটা নেই, ‘ও ভি নেহি হ্যায়’ শোনার পর তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। অপর বাঙ্গালি বাবুর গরুর প্রতি ভক্তি থাকতে পারে তিনি মাংসের ভক্ত নন। তিনি খানসামাকে বললেন, গরুর যখন কিছুই নেই তবে বাবুর জন্য গোবরই নিয়ে এসো।

শুরু থেকে এতগুলো ভিন্ন ঘরনের খানসামাকে উপস্থাপন করা হলো। খানসামার কাজটা আসলে কী? বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহূত বিদেশী শব্দের অভিধানে খানসামার অর্থ বহুবিধ: পরিচালক, সম্ভ্রান্ত গৃহের তত্ত্বাবধানকারী, কর্মচারী, বর্তমানে পাশ্চাত্যের অনুকরণে দেশীয় অভিজাত শ্রেণীর চাকরবিশেষ; টেবিলে আহার পরিবেশন করে যে; খাবার পরিবেশনকারী ভৃত্য।’ যেমন জজ সাহেবের খানসামা। সম্ভবত পরিচালক না হয়ে পরিচারক হবে।

জজ সাহেব প্রসঙ্গ যখন আনলামই বলতেই হয় আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত নতুন জেলায় দায়রা জজদের কোনো গাড়ি বরাদ্দ ছিল না। আমি অনেক দিন সিরাজগঞ্জের প্রথম জেলা জজ আবু মুসা চৌধুরীর সঙ্গে সঙ্গে হেঁটে তার অফিস পর্যন্ত পৌঁছেছি। বিশেষ সাদা পোশাক এবং কাঁধ থেকে নেমে আসা রঙিন কাপড়ের ব্যাজ পরা খানসামাই ছিল আমার আকর্ষণের কেন্দ্রে। জজ সাহেবকে মানুষ যত না চিনত তার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষের চেনা ছিল তার খানসামা।

সংসদ বাংলা অভিধানে খানসামা মানে পরিচারক, খিদমতগার, আহার পরিবেশনকারী ভৃত্য। ফরাসি শব্দ খানসামান থেকে খানসামা উদ্ভূত। অর্থগতভাবে এর মানে দাঁড়ায় মালসামানের সংরক্ষণকারী, কারো মতে, হুকুমবরদার পিয়ন, প্রসেস সার্ভার, এ ধরনের পদ। রাজা রামমোহন রায়ের বাড়ি খানসামা শাসিতই বলা যায়। বহু আধুনিক বাঙালি ও বিলেতির আগমন ঘটে যে বাড়িতে। তার মা অলকাসুন্দরী যতদিন জীবিত ছিলেন রামমোহন খাদ্য নিয়ে ‘অনাচার’ কমই করেছেন, কিন্তু স্ত্রী দিগম্বরী দেবী খানসামা রাজত্ব সংকুচিত করতে পারেননি। গোমাংস ও মদ্য নিত্য আহার্য ও নিত্য পানীয় হয়ে ওঠে। বাবুর্চি খানসামা সব মুসলমান। তার সুহূদ রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরও প্রভাবিত হয়ে মুসলমান বাবুর্চি রাখলেন। খানসামার গুরুত্ব বেড়ে গেল। রামমোহনের বাড়িতে যে মদচর্চা হয় তার খবর আমজনতার কাছেও পৌঁছে। রূপচাঁদ পক্ষী নেশা লাগানো লাল পানি নিয়ে গান বাঁধেন:

         কি মজা আছে রে লাল জলে

                 জানেন ঠাকুর কোম্পানি

         মদের গুণগান আমরা কি জানি

                 জানেন ঠাকুর কোম্পানি।

ব্রিটিশ বাংলায় আধুনিকতার ঢেউ এতটাই লাগে যে সন্দেহ হয় কলিকাল এসে গেছে। স্ত্রীলোকও শ্বশুর-ভাসুর মান্য করে না। স্বামীকে বানিয়ে ফেলেছে তার খানসামা। মুকুন্দ দাস (১৮৭৮-১৯৩৪) এ নিয়ে গান বেঁধেছেন।

                 বাবুদের পায়ে নমস্কার—

         দেখলেম ভাই ঘোর কলিতে এ জগতে

                 ভালো মন্দের নাই বিচার\

         মা যায় উপোসী ভগ্নি দাসী বাবুর বাড়িতে

         সেই ছেলে হয় টিপকদার বেশ্যা বাড়িতে

         বাবু বিদ্যার নামে লব ডঙ্কা

                গুডনাইট গুডমর্নিং যার\

কলিতে বৌ হয়েছে রঙ-এর বিবি, স্বামী মানে না—

শাশুড়ি হন ময়না মাগী, স্বামী খানসামা।

খানসামারা শুরুতেই সবাই মুসলমান কিংবা পারসিক ছিলেন। হিন্দু লেখকদের রচনায় খানসামা মানেই মুসলমান দেখে মীর মশাররফ হোসেন অসন্তুষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। সুতরাং তার লেখাতে হাকিম সাহেবের প্রিয় খানসামার নাম রামহরি।

ঔপনিবেশিক শাসনে সামন্ত প্রথার বিকাশ দেখাতে হলে খানসামাকে বাদ দেয়ার কোনো উপায়ই নেই। এমনকি ছোট জোতদারের কর্মচারী হিসেবে একজন খানসামা রাখা হতো। খানসামার কাজের ধরন বহু ও বিচিত্র। তবে সাধারণ ধারণা পদটা রান্নাঘর ও খাবারদাবারভিত্তিক। অপেক্ষাকৃত বড় জোতদার থেকে শুরু করে জমিদার পর্যন্ত খাবারদাবারের প্রশ্নে শ্রেণীসোপানভিত্তিক তিনটি পদে নিয়োগ দেয়া হতো। নিম্নপদে বাবুর্চি কেবল রান্নাবান্না করত, রান্নার সব উপাদান জোগাড় করে দেয়া এবং দপ্তরখানায় খাবার পরিবেশন করার কাজটি করত উচ্চপদের খানসামা। আর মধ্যপদে থেকে ফুট ফরমাস গেটে সেবা করার দায়িত্ব পালন করত খিদমতগার। তবে এই হায়ারার্কি সর্বত্র মান্য করা হতো এমন নয়। মোগল ও ইংরেজ আমলেও ভারতের কোথাও কোথাও খানসামার অবস্থা ছিল গার্হস্থ্য প্রধানমন্ত্রীর মতো। অন্য সব কর্মচারী তার অধীনস্থ এবং সরাসরি নিয়ন্ত্রণাধীন। কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি ও চাকরিচ্যুতি সবই তার মর্জির ওপর নির্ভর করত।

ব্রিটিশ শাসনের কোম্পানি আমল এবং সিপাহি বিদ্রোহ-উত্তর ব্রিটিশরাজের শাসন উভয় পর্বেই খানসামার পদটি মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী হয়ে ওঠে। খিদমতগারের অবস্থান কোথাও খানসামার ওপরে বলা হলেও ইংরেজি শাসনে তা চলে আসে খানসামার নিচে।

১৮৪১ সালের বেঙ্গল অ্যান্ড আগ্রা অ্যানুয়াল গাইড অ্যান্ড গেজেটিয়ারে উল্লেখ করা হয়েছে বাবুর্চির বেতন ৬-৯ টাকা, খিদমতগারের বেতনও অনুরূপ, কিন্তু খানসামার বেতন ১০-১৬ টাকা। খানসামা রান্না না করলেও রান্না, রান্নাঘর রেস্তোরাঁ, খাবারদাবার এসবের সঙ্গে খানসামা সমার্থক হয়ে পড়ে, বিশেষত ইংরেজ পর্যটক লেখক এবং বিশেষ করে খাদ্যের রেসিপি লেখকদের কল্যাণে।

আবার ইংরেজ লেখক বিশেষ করে ফ্রান্সিস প্যাট্রিক নেপিয়ারের লেখা পড়লে মনে হবে সবচেয়ে ধুরন্ধর মিথ্যাচারী কিন্তু অপরিহার্য মানুষটি হচ্ছে খানসামা। বাকল্যান্ড অভিযোগ করেছেন, তারা ইংরেজ পরিবারের সওদাপাতি ক্রয় করার জন্য সর্বোচ্চ দাম মালিকের কাছ থেকে আদায় করে সর্বনিম্ন দামের দ্রব্য কিনে থাকে। এতে বেতনের অনেক বেশি অর্থ তার কাছে আসে। খানসামা ভারতীয় দুধওয়ালার সঙ্গে আঁতাত করে তার কাছ থেকে কম মূল্যের ভেজালমিশ্রিত দুধ কিনে থাকে। এমনকি ইংরেজ পরিবারের ঘোড়ার গাড়িতে করে স্বজাতির লোক উঠিয়ে তাদের কাছ থেকেও অর্থ আদায় করে। এমন একটি গল্প তখন চালু ছিল যে রাজ খানসামা বলে বেড়াত বড় লাট ওয়ারেন হেস্টিং সাহেবের ভোরের নাশতার জন্য মোটাসোটা একটা শিশু জবাই করতে হয়। কিছু টাকা ঘুস না দিলে পরবর্তী টার্গেট হবে তাদের কোনো বাচ্চা। বলা হতো বড় লাটের খানসামার মাসিক কামাই ছিল ৩ হাজার টাকা।

শামন্ত ভারত ও ব্রিটিশরাজের অধীনে খানসামা গুরুত্বপূর্ণ এ মর্যাদার ধারক হয়ে ওঠে। তাদেরই মনে করা হতো মাস্টার শেফ; কখনো অভিজাতদের জন্য তারা রান্নাও করতেন। ইংরেজদের চোখে খানসামাদের একটি বিভাজনও করা হয়েছে। খানসামাদের কেউ খানসামা হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে, কেউ খানসামাত্ব অর্জন করেছে এবং কারো ওপর খানসামাত্ব আরোপ করা হয়েছে।

কেবল শরাব পরিবেশন করে সাকি হয়ে ওঠে কবিতার সম্রাজ্ঞী। কিন্তু এত খাটাখাটনির পরও কবি ও শিল্পীরা খানসামার দিকে তেমন চোখ তুলে তাকাননি।

 

এম এ মোমেন: সাবেক সরকারী কর্মকর্তা