সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারত সফরে আসেন ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার। খেয়াল করেন মোগল দরবারে খান-ই-সামান নামক বিশেষ পদের উপস্থিতি। বাজার, রান্না, খাবারের সংরক্ষণ ও তদারক করার মতো বিষয়গুলোর দায়িত্ব ছিল তার হাতে। মোগল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটলেও ভারতের বিভিন্ন অংশে বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই খানসামা নামে টিকে থেকেছে খান-ই-সামানের সংস্কৃতি। ১৮১৪ সালে অযোধ্যার নবাব গাজিউদ্দিন হায়দার শাহ তার পিতার খানসামা আগা মীরকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। এ থেকে খানসামার অবস্থানগত তাত্পর্যও সহজে অনুমেয়। মূলত ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক সমাজকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অভিজাত পরিবার এবং সেনাবাহিনীতে জারি ছিল খানসামা রাখার সিলসিলা। ক্ষমতা দখলের সঙ্গে একে নিজেদের অংশ করে নেয় ব্রিটিশ সরকারও। দেশ ভাগের পর ভারতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটে অনেকটাই। ফলে খানসামা ব্যবস্থার সর্বশেষ আশ্রয় হয়ে থাকে পাকিস্তানের সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও শহুরে অভিজাত পরিবারগুলো। উপরন্তু বড় পরিবারে সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী নিযুক্ত রাখা হতো একাধিক খানসামাকে। কেউ মোগল দরবারি খাদ্যে বিশেষজ্ঞ, কেউ ইউরোপীয় ঘরানায়। খানসামা হলেন সেই বিশেষজ্ঞ তদারককারী আর কেবল রান্নার জন্য থাকত বরচি।

পশ্চিমা রান্নায় এমন এক উস্তাদ খানসামা ছিলেন সিন্ধের নবি বক্স। খানসামা না বলে জাদুকর বলাই বোধ হয় যৌক্তিক হবে। যে তার রান্না খেয়েছে, সে-ই আটকে গেছে অবিচ্ছেদ্য মন্ত্রে। বারবার ছুটে এসেছে পাকিস্তানের হায়দরাবাদের ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে ১৭ সিভিল লাইনের বাংলোতে। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সেখানে কাজ করেছেন নবি বক্স। বাংলোটা ছিল দেশভাগ-পরবর্তী প্রভাবশালী সরদার মুহম্মদ আলি শাহ জামুতের। রাজনৈতিক টানাপড়েনের সময়ও সেখানে তখন স্থিতিশীলতা। সৈয়দ বংশীয় এ সরদারের বাংলো সরগরম ছিল অতিথি, আত্মীয়, রাজনৈতিক নেতা, সামরিক অফিসারদের আগমনে। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব পাওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজেও অতিথি হতেন প্রায়ই। স্বাভাবিকভাবেই খাবার থাকত আকর্ষণীয় অনুষঙ্গ হিসেবে। অতিথিরা মুখিয়ে থাকতেন নবি বক্সের জাদু দেখার অপেক্ষায়। বিশেষ করে রাতে প্রমাণ মিলত তার মুনশিয়ানার। তখন প্রস্তুত করা হতো বাদাম আর টমেটোর স্যুপ। সঙ্গেই রাখা হতো ফল আর শ্রিম্প ককটেল। শেষ হতে না হতেই হাজির হতেন ভুনা মাংস নিয়ে। থাকত স্যাডল অব ল্যাম্ব, পুদিনার সসের সঙ্গে মাটন চপ, স্টেক অ্যান্ড কিডনি পাই। এখানেই শেষ না। মুহূর্তে চলে আসত টার্টার সসের সঙ্গে মাছ। ডেজার্ট হিসেবে কাজুবাদামের সুফ্লে আর পুডিং ছিল তুলনাহীন। আয়োজনের ইতি টানা হতো কমলার খোসায় নির্মিত বাক্সে কমলা কেটে ও শান্তিলি ক্রিম পরিবেশনের মাধ্যমে। নবি বক্স যাকে একবার পরিবেশন করেছেন, তার জিহবা নবি বক্সকে ভুলতে পারবে না।

নবি বক্সের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক ভারতে। বালক বয়সে দিল্লিতে বসবাসরত অবস্থায় ব্রিটিশ পরিবারের গৃহস্থালি বিষয় তদারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বয়স আর অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই দায়িত্ব প্রসারিত হলো রান্নাঘরে। সেখানকার খানসামাদের কাছ থেকে নবি বক্স সাগ্রহে রপ্ত করে নেন ভারতীয় ও ইউরোপীয় রান্নার সব রীতি পদ্ধতি। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক বণ্টনের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলো। দিল্লির মুসলমানদের নিয়ে যে ট্রেনটা পাকিস্তানে পৌঁছায়, সেটা ধরেই নতুন ঠিকানার উদ্দেশে যাত্রা দেন নবি বক্স। বাবা-মাকে নিয়ে থিতু হন সিন্ধের হায়দরাবাদে। অনেক রকম অনিশ্চয়তাকে সঙ্গে নিয়েই মুহাজির নবি বক্স মনোযোগ দিলেন লব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগানোর যথাযথ জায়গা অনুসন্ধানে। খানসামার দায়িত্ব নিয়ে পুরনোর পাশাপাশি নতুন কিছু রান্না উদ্ভাবন করতে। হায়দরাবাদ এসে প্রথম কোথায় নবি বক্স সেই সুযোগ পেয়েছিলেন, সেই খবর কেউ জানে না। তবে ১৭ সিভিল লাইনে সেই বাংলোতে এসেছিলেন ১৯৫৪ সালের দিকে। মুহম্মদ আলি শাহ জামুতের বাংলোতে।

১৭ সিভিল লাইনের ডাইনিং রুমটা গোল আকৃতির। কাঠামোতে গড়পড়তা হলেও এক কোনায় রাখা অভিজাত রেফ্রিজারেটর। বাহারি রঙের টাইলস, মসৃণ সাদা দেয়াল আর একটা মাত্র জানালা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও ঘরটা বাড়ির অন্যান্য স্থানের চেয়ে শীতল। মাথার ওপরে একটা মাত্র বৈদ্যুতিক পাখা। তার নিচে আপ্যায়িত অতিথিরা থালা নিয়ে টেবিল ঘিরে বসেন। সামনেই তাকে থাকত পানীয়র ব্যবস্থা। মোটা দাগে এটাই নবি বক্সের রাজ্য। অবশ্য অতিথি ১০ কিংবা ১২ জনের বেশি হয়ে গেলে আপ্যায়ন করা হতো বাংলোর সামনে বাগানে। একদিকে চম্পা ও তালের মতো সারি সারি সবুজ গাছ আর অন্যদিকে পাথুরে বেড়ার মধ্যে রঙবেরঙের ফুল। মাঝখানে পাথর দিয়ে নির্মিত বেঞ্চ সময়কে বেশ উপভোগ্য করে তোলার জন্য যথেষ্ট। শীতের সন্ধ্যায় শামিয়ানা টানানো হতো। নবি বক্স তার নিচে পরিবেশন করতেন সবার সামনে। টেবিলে থরে থরে সাজানো থাকত ফল, হায়দরাবাদের বিখ্যাত বোম্বে বেকারি থেকে আসা কেক এবং অন্যান্য সুস্বাদু ভোগ্যপণ্য। আতিথেয়তা আর দানশীলতার জন্য সুপরিচিত ছিল জামুত পরিবার। খরচ করার ক্ষেত্রেও কোনো প্রকার কার্পণ্য ছিল না। নবি বক্স তার শৈল্পিকতা প্রকাশের জন্য মোক্ষম একটা সুযোগ পেয়েছিলেন, প্রমাণও করেছেন। সেই সময়ে কেবল নবি বক্সের মাসিক বেতনই  ৭৫ রুপি। ষাটের দশকে এই বেতন গেরস্থালি অন্য যেকোনো কর্মচারীর চেয়ে ঢের বেশি।

অভিজাত পরিবারের কর্তারা যেদিকেই সফর করতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন খানসামা। সফর লম্বা হোক বা খাটো, নানা প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে তাঁবু স্থাপন করতে হতো। সব অবস্থাতেই ভোজন পর্বের তদারক করত খানসামা। বাড়ি থেকে দূরে থাকার পরও গৃহকর্তার পছন্দের খাবারগুলো যেন তালিকা থেকে কোনো অজুহাতে বাদ না পড়ে যায়। জামুত পরিবারও নিয়ে যেত নবি বক্সকে। রান্নাঘর আর চিরপরিচিত রন্ধনসামগ্রী থেকে দূরে থেকেও নবি বক্স অদ্ভুত মুনশিয়ানা অর্জন করেছিলেন স্বাদ অক্ষুণ্ন রেখে খাবার তৈরিতে। খোলা আগুনে ভেজিটেবল স্যুপ তৈরি করতেন তিনি। উত্তপ্ত কয়লায় রান্না করতেন তিতির আর খরগোশের মাংস। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সফর করেন জর্ডানের রাজা কিং হুসাইন। তিতির শিকারের জন্য বের হন সিন্ধের তান্দো মুহম্মদ খান নামক অঞ্চলে। সেখানে রাজাকে আপ্যায়নের জন্য পাঠানো হয় জামুত পরিবারের বিখ্যাত নবি বক্সকে।

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নবি বক্স বসবাস করতেন হায়দরাবাদেই। ১৭ সিভিল লাইনের বাংলোতে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করতেন সাইকেলে। শিক্ষিত মানুষ। সকালের কাজ শুরু করার আগেই পত্রিকা পড়ে নেয়ার অভ্যাস ছিল। আরেকটা অভ্যাস ছিল উল্লেখ করার মতো। রোববার সাইকেলে করে সোজা চলে যেতেন সিন্ধু নদীতে মাছ ধরার জন্য। নবি বক্স বেশ গম্ভীর ও চুপচাপ থাকার মানুষ। সবার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে খুব একটা মিশতেন না। তার পরও জামুত পরিবারের ড্রাইভার আবদুল গনি ও ব্যক্তিগত চাকরের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল অদ্ভুত সখ্য। তিন বন্ধু মিলেই বাংলোটার চারপাশে তৈরি করেছিল অদ্ভুত নিরাপত্তার দেয়াল।

১৯৬১ সালে মারা যান মুহম্মদ আলি শাহ। বড় ছেলে জুলফিকার আলি শাহ হায়দরাবাদ থাকলেও ছোট ছেলে শাফকাত আলি শাহ স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। কন্যা বীণা শাহ বর্তমানে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ও সংস্কৃতিকর্মী। সত্তরের দশকে বীণা শাহের পরিবার পাকিস্তানে ফিরে এসে করাচিতে থিতু হয়। নবি বক্স তখনো নিয়মিত হায়দরাবাদ থেকে করাচিতে যাওয়া-আসা করতেন। কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করে রান্না করতেন তার বিখ্যাত আর বাহারি স্বাদের খাবার। নবি বক্স তখন বয়সের ভারে অনেকটাই ক্লান্ত। তবু ছোট জামুত পরিবারের রসনাবিলাসের জোগান দিতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। বরং শেষ বয়সে আবদুল গনি আর নবি বক্স মিলে জামুত পরিবারকে আরো বেশি করে আগলে রাখে যেন। শাফকাত আলি শাহের মেয়ে বীণা শাহকে নিয়ে মেতেছেন হরেক রকম খেলায়। যেভাবে একজন দাদা বা নানা তার নাতির সঙ্গে সময় কাটায়। নিজের দাদা না থাকার কারণে বীণা শাহের কাছে নবি বক্সই হয়ে উঠেছিলেন বিকল্প কেউ।

১৯৮১ সালের দিকে জুলফিকার আলি শাহের বাগানবাড়ি রিসালে ডাক পড়ে নবি বক্সের। হায়দরাবাদ থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে তান্দো-আল্লাহ-ইয়ার নামক ছোট শহরে। সেখানে লেবাননের অ্যাম্বাসেডরের জন্য পশ্চিমা ঘরানার রান্না করতে হবে। অঞ্চলটা একেবারে গ্রামের দিকে হওয়ার কারণে অমন কাজে ধৈর্য ও অধ্যবসায় দরকার। নবি বক্সের বয়স আর শক্তি আগের মতো নেই। তাছাড়া সারা জীবন ধূমপানে অভ্যস্ত নবি বক্স শেষ বয়সে অ্যাজমা বাধিয়ে বসেছেন। জামুত পরিবারও তার কাজের পরিমাণ কমিয়ে আনা ও কাজের পরিবেশ সুবিধাজনক করে দিলেন। ব্যবস্থা করলেন পর্যাপ্ত চিকিৎসাপত্র প্রদানের। তার পরও তিনি রিছালে গেলেন পশ্চিমা রান্নার দায়িত্ব নিয়ে।

সেখানে রান্নাঘরের অবস্থা সুবিধাজনক না। বাতাস চলাচলের খুব একটা সুযোগ নেই। নেই ওভেন অবধি। নবি বক্স সেখানে কয়লা দিয়ে রান্না করতেন। তখন গ্রীষ্মকাল। সময়মতো খাবার সরবরাহ করার তাগিদে রান্নাঘরের সেই বদ্ধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। নিজের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যের ঝুঁকিকে গুরুত্ব না দিয়ে পড়ে থাকতেন সেই ধোঁয়ায়। ফলে যেটা ঘটার, সেটাই ঘটল। একদিন বিদ্রোহ করে বসল তার শরীর। রান্নার উস্তাদ নবি বক্স লুটিয়ে পড়লেন রান্নাঘরের মাটিতেই। সবাই মিলে তাকে হাসপাতালে নিল, কিন্তু বাঁচানো গেল না। এ দুর্ঘটনায় ভেঙে পড়ে জামুত পরিবার। ১৯৬১ সালে আলি শাহের মৃত্যুর পর নবি বক্স যেন বাড়ির মুরব্বি হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘদিন পাশাপাশি বসবাস করে যে আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল, তা রক্তের সম্পর্কের চেয়ে কোনো অংশে কম না। নবি বক্সের রান্নায় অভ্যস্ত জামুত পরিবারের তিন প্রজন্ম। কত সুখ-দুঃখের সাক্ষী। নবি বক্সের হয়তো রিছালে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। হয়তো করাচির আধুনিক পরিবেশে থাকলে ভালো হতো। হয়তো নবি বক্স আরো কিছুদিন সময় কাটাতে পারতেন ড্রাইভার আবদুল গনির সঙ্গে। কিন্তু নিয়তিকে তো আর ইচ্ছা দিয়ে বদলে দেয়া যায় না।

নবি বক্সের সহজ কিছু রান্নার রেসিপি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে জামুত পরিবারে। যদিও পরিমাণ ও উপাদানে রান্নার জাদু নিহিত না। জাদু থাকে যে রাঁধে, তার হাতেও। নবি বক্সের রেসিপি দিয়েই কি আর নবি বক্সকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব! 

নবি বক্সের জেলি রোল

উপাদান: পৃথকভাবে ছয়টি ডিমের সাদা অংশ এবং চারটি ডিমের কুসুম, অর্ধেক কাপ ময়দা, এক টেবিল চামচ বেকিং পাউডার, দুই ফোঁটা ভিনেগার, অর্ধেক কাপ চিনি

প্রস্তুতি

১. প্রথমে ডিমের আলাদা করা সাদা অংশকে নাড়তে হবে। আস্তে আস্তে মেশাতে হবে চিনি।

২. দ্বিতীয় দফায় মিশ্রণে যোগ করতে হবে ডিমের কুসুম। দিতে হবে ময়দা ও বেকিং পাউডার।

৩. একটা পরিষ্কার কড়াইয়ে নিয়ে ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় কমপক্ষে পনেরো মিনিট গরম করতে হবে। উভয় পাশেই সোনালি রঙ ধারণ করা পর্যন্ত চলবে গরম করা।

৪. শেষ ধাপে কড়াই নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। চারপাশে আবৃত করে ফেলতে হবে রাস্পবেরি জেলি দিয়ে। অতঃপর ওয়াক্স পেপার দিয়ে তৈরি করতে হবে রোল।

৫. পেপার খুলে রোলটিকে টুকরো করতে হবে। প্রয়োজনমতো চিনি, ক্রিম ও সস মিশিয়ে নিলেই প্রস্তুত নবি বক্সের জেলি রোল।

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক