আধুনিক কালে মানুষ তার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কাটায় কোনো না কোনো ছাদের তলায় এবং চার দেয়ালে ঘেরা পরিবেশে। সহজ কথায় বললে ঘর বা ভবনের ভেতরে। ঘরোয়া পরিবেশে আটকা থেকে থেকে আমরা একসময় বাইরের আলো-বাতাস খেতে আগ্রহী হয়ে পড়ি। আমাদের বাইরে সময় কাটানোর এ আকুতি স্পষ্ট করে দেয় যে আমরা জীবনের অনেকটা সময় ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকি। একে তো আমরা নিজেদের ঘরে ঘুমাই, থাকি, তার ওপর আমরা কাজ করি অফিসে, কারখানায়, হাসপাতালে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, জাদুঘরে... তালিকাটা শেষ হওয়ার নয়।

বিজ্ঞানীদের হিসাবমতে, মানুষ দুনিয়ায় আছে ১৯ লাখ বছর ধরে। ইতিহাসের দলিল পাওয়া যায় বড়জোর ছয় বা সাত হাজার বছরের। মানুষ কবে ঘর বানাতে শিখল, তা এখানো নির্দিষ্ট নয়। শুরুর দিকে ঘর মানে প্রকৃতির বিভিন্ন আঘাত থেকে বাঁচার আশ্রয় ছিল নিশ্চয়ই। এখন আবদ্ধ ঘর থাকলে তাতে যে চিন্তাশীল মানুষ বিভিন্ন ধরনের ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতে চাইবে, তা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এ প্রবণতা এড়ানো এখন যেমন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি অতীতেও ছিল না। আধুনিক যুগে মানুষের নিজের ঘরবাড়ি ছাড়াও অফিস, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, দোকান, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ কেউই ইন্টিরিয়র ডিজাইন করা থেকে বিরত নয়। তবে অবশ্যই ইন্টেরিয়র ডিজাইনের ধরন যুগে যুগে বদলে গেছে, সামনের দিনেও যাবে। মধ্যযুগের খামারজীবন, দুর্গ, সাধু-সন্ন্যাসী বা পীরদের আস্তানা, ভূস্বামীদের গৃহ, জমিদারদের প্রাসাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই আজকের মানুষের ঘর, অ্যাপার্টমেন্টের ডিজাইন মিলবে না।

মানুষের প্রথম আশ্রয় বা ঘর কেমন ছিল? সাধারণ জ্ঞান আর বিবেচনাবোধ থেকেই বোঝা যায় এ আশ্রয় ছিল গুহা। ‘গুহামানব’ শব্দটি নৃবিজ্ঞানে একেবারে আদিম মানুষকে বোঝাতে ব্যবহূত হলেও প্রাচীনকালে বিরাট একটা সময় হোমো স্যাপিয়েন্সরা গুহাতেই বসবাস করেছে। গুহার সংখ্যা অগণিত নয় এবং প্রাচীন আমলে এর চেয়ে নিরাপদ কোনো আশ্রয় মানুষের জন্য ছিল না। শউভেট, ল্যাসকক্স এবং আলতামিরার গুহা প্রাচীন মানবের বসতি হিসেবে বিখ্যাত। এসব গুহায় প্রাচীন মানুষের আঁকা দেয়ালচিত্র এখনো টিকে আছে। প্রাকৃতিক গুহা বাদে মানুষও হয়তো কিছু আশ্রয় নিজে তৈরি করেছিল। তার মধ্যে টেকসই উপাদান দিয়ে তৈরি কিছু নিদর্শন আজো টিকে আছে। গাছপালা, পশুর চামড়া কিংবা হাড় থেকে তৈরি আবাস আজ আর টিকে নেই। তবে পাথর দিয়ে তৈরি কিছু প্রাচীন আবাস আজকের দিনেও টিকে আছে। এ ধরনের আবাসের মধ্যে অ্যালাইনমেন্ট ও ডলমেনস অব ব্রিটানি বিখ্যাত। আরো আছে ব্রিটেনের আলোচিত স্টোনহেঞ্জ। তবে এ স্টোনহেঞ্জ মানুষ ব্যবহার করত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালনে।

প্রাচীন মানুষ থেকে এবার নজর ফেরাই প্রাচীন গ্রিসে। সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থানে ভবনগুলো সাধারণত আবদ্ধ হতো না। যেমন গ্রিক থিয়েটারে ছাদ নেই। গ্রিক শহরগুলোয় দেখা যেত প্রকাশ্য স্থান বা আগোরা, যেগুলো একই সঙ্গে বাজার এবং সভাস্থল হিসেবে ব্যবহূত হতো। পরিধিজুড়ে দোকান ও গুদামের জন্য কক্ষ থাকত। এগুলোর সামনে থাকত বারান্দা, যেখানে সারি সারি স্তম্ভের ওপর রয়েছে ছাদ। মানুষের ঘরবাড়ি ছিল রাস্তার পাশে। রোদে শুকানো ইট ব্যবহার করা হতো ভবন তৈরিতে। বাড়ির ভেতরে থাকত ফাঁকা চত্বর। এ চত্বরের সঙ্গে ছিল বসার ও রান্নার ঘর। এগুলোর পরে ভেতরের দিকে থাকত শোয়ার ঘর, নারী ও শিশুদের কক্ষ। গ্রিকদের ঘরগুলো দ্বিতল কমই হতো। টেরাকোটাসহ বাথটাব থাকত অনেক ঘরেই।

গ্রিকদের ব্যবহার করা আসবাব খুব বেশি টিকে নেই। তবে গ্রিকদের চিত্রকলা থেকে তাদের ঘরের অভ্যন্তরের সাজ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ধনীদের জন্য ক্লিসমস নামে বিলাসবহুল এক ধরনের চেয়ার ছিল। এসব চেয়ারের পায়া সুন্দরভাবে নকশা করা হতো। আসনে ব্যবহার করা হতো চামড়া।&dquote;&dquote;

রোমানদের জীবনে গ্রিকদের বেশ প্রভাব ছিল। রোমানদের ভবনের একটি সাধারণ ধরন ছিল, যা ব্যাসিলিকা নামে পরিচিত। ব্যাসিলিকায় একটা বড় হলরুম থাকে। এখানে সভা, বিচার-আচার হতো। রোমানদের বাজার বা বাণিজ্যিক ভবনগুলো আধুনিক শপিংমলের মতোই ছিল। ঘরের ভেতরের আসবাবের মধ্যে ছিল পাথরের চেয়ার ও টেবিল। ব্রোঞ্জের নানা তৈজসপত্র, বাতি, ফ্রেসকো চিত্র, মোজাইক করা নকশা ছিল রোমানদের ঘরের অভ্যন্তরের সজ্জার অংশ। রোমানদের আসবাব মূলত গ্রিকদের অনুসরণ করেই তৈরি হয়েছিল। এগুলোতে বিশদ নকশা দেখা যেত। মেঝেতে থাকত মোজাইকের নকশা। এ নকশায় অনেক সময়ই ফুটিয়ে তোলা হতো জীবন্ত প্রাণীর চিত্র।

 

ইউরোপীয়দের ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ধারাবাহিকতা ও সমধারা দেখা যায়, যা এশিয়ায় নেই। এশিয়ার বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে কালিক ও ভৌগোলিক পার্থক্য দেখা যায়, যা তাদের ইন্টেরিয়র ডিজাইনেও প্রকাশিত। জন পাইল ও জুডিথ গরা তাদের আ হিস্ট্রি অব ইন্টেরিয়র ডিজাইন গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এশিয়ার বিভিন্ন সভ্যতা যেমন— ভারত, চীন, কোরিয়া ও জাপান প্রত্যেকের নন্দনতত্ত্বের বিকাশের কয়েক হাজার বছরের ঋদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ইসলামী ডিজাইন একটু ভিন্ন বিষয়। কারণ এটা ধর্মীয় চিন্তা ও নীতি এবং বিস্তৃত সাংস্কৃতিক প্রভাব দিয়ে নির্ধারিত; ভৌগোলিক প্রভাব এতে কম। অন্যদিকে ইসলামের ইতিহাসও তুলনামূলক কম সময়ের এবং এর বিভিন্ন আঞ্চলিক বিস্তৃতি আছে যেমন— পশ্চিমে স্পেন, পর্তুগাল; ভারত; উত্তর আফ্রিকা।’

৬২২ খ্রিস্টাব্দে নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত করেন। এ সময় থেকেই মুসলমানদের হিজরি সনের গণনা শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক শতকে ইসলাম ধর্ম অবিস্মরণীয় সফলতা লাভ করে এবং দুনিয়ার নানা প্রান্তে বিকশিত হয়। পশ্চিমে ইসলাম স্পেন পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং পূর্ব দিকে ভারত ও চীনে হাজির হয়। ইসলামী ডিজাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো মানুষ কিংবা কোনো প্রাণীর ছবি, প্রতিকৃতি তৈরি না করা। এ কারণে ইসলামী নকশা অবশ্যম্ভাবীভাবে জ্যামিতিক নকশা কিংবা অনেক ক্ষেত্রে গাছপালার চিত্রায়ণ দিয়ে প্রভাবিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের ক্যালিগ্রাফি। মুসলিম শাসকদের অনেকের প্রাসাদের নকশায় অমুসলিম ঐতিহ্যের ছাপ পাওয়া যায়, কিন্তু ইসলামী বিধিনিষেধ মোতাবেক নির্ধারিক শিল্পকলার মিশ্রণ সেগুলোকে ভিন্ন করে তোলে।&dquote;&dquote;

মুসলিম সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হচ্ছে মসজিদ। মসজিদে মুসলমানরা নামাজ আদায়, কোরআন পাঠ করেন। মসজিদ অবশ্যই কাবামুখী হয়। ইসলামী স্থাপনায় আসবাবের ব্যবহার কম। নিচু আসনগুলো নকশা করা কাপড় কিংবা কার্পেট দিয়ে ঢাকা থাকত। কার্পেটে দেখা যেত জটিল জ্যামিতিক নকশা ও ক্যালিগ্রাফি। আবার মানুষ, পশু-পাখির উপস্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে ফুল ও গাছের চেহারা ফুটিয়ে তোলা হতো। জায়নামাজেও এসব নকশা দেখা যেত। বহু শতক ধরে ইসলামী দুনিয়ায় কার্পেট তৈরি হচ্ছে। ত্রয়োদশ শতকে আনাতোলিয়ার জ্যামিতিক নকশার কার্পেট বিখ্যাত ছিল। সে সময় এ কার্পেট প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো। ষোড়শ শতক নাগাদ পারস্য কার্পেট তৈরিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। এসব কার্পেটের পরিধিতে দেখা যেত কোনো ফিগারের পুনরাবৃত্তি এবং মাঝের দিকে অলংকরণ। লাল ও নীল রঙের প্রাধান্য ছিল, সঙ্গে থাকত হলুদ ও সবুজ। পরবর্তীকালে এল কারখানার যুগ, কিন্তু এসব কারখানার উৎপাদনেও পুরনো আমলের নকশার প্রাধান্য রয়ে যায়, যা আজ অবধি অব্যাহত আছে।

বাংলাদেশে বছর ২৫-৩০ আগেও মফস্বলে কাঠের ঘরবাড়ি বেশ দেখা যেত। এখনো হয়তো দু-একটা টিকে আছে। ভারতীয় সভ্যতার শুরু সিন্ধু বা হরপ্পা দিয়ে। এ সভ্যতায় মাটির ইটের ব্যবহার হতো। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ এ সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ২০০ থেকে ১০০ অব্দে দেখা যায় কাঠের ব্যবহার। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন মন্দিরে কাঠের কারুকাজ করা নকশা দেয়া যায়।

ত্রয়োদশ শতকে ভারতে ইসলামী শাসন পোক্ত হয়। এ সময় হিন্দু ও বৌদ্ধ রীতির স্থাপনা ছাপিয়ে মসজিদ, সমাধি ও বিভিন্ন ধরনের প্রাসাদের আধিপত্য দেখা দেয়। এ সময় ইসলামী স্থাপত্যকলায় ভারতে প্রচুর স্থাপনা তৈরি হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পারস্যের স্থাপত্যকলা ভারতীয় হিন্দু রীতির সঙ্গে মিশে যায়। তবে ভারতের স্থাপনায় প্রাক ও ইসলাম-পরবর্তী যুগের নকশার মূল পার্থক্য হলো প্রাণী ও মানুষের চেহারা ও প্রতিকৃতি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। তাই বিভিন্ন স্থাপনায় হিন্দু রীতির নকশা, খোদাইয়ের পরিবর্তে জ্যামিতিক ও আরবি ক্যালিগ্রাফি দেখা যেতে শুরু করে।

১৫৭১ সালে আকবরের রাজধানী হিসেবে যাত্রা করে ফতেহপুর সিক্রি। নির্মাণের কিছুদিন পরই অবশ্য এ রাজধানী পরিত্যাগ করা হয়। এখানে নির্মিত সব ধরনের ভবন এখানো অত্যন্ত ভালো অবস্থায় টিকে আছে। দিল্লিতে অবস্থিত জামা মসজিদের চারপাশে বিরাট চত্বর রয়েছে। মসজিদের মাঝে রয়েছে বড় গম্বুজ এবং তারপর পাশে ছোট ছোট গম্বুজ। মসজিদের দেয়ালে লতা-পাতার নকশা করা।&dquote;&dquote;

ভারতীয় ইতিহাসে ঘরের অভ্যন্তরে আসবাবের ব্যবহার কম ছিল। ছোট ছোট গদিওয়ালা চেয়ার নয়তো মাটিতে পাটি বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা ছিল। নিচু টেবিল ও কাঠের তৈরি টুল আধুনিককালে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দ্বিতীয় শতকের কিছু খোদাই করা বৌদ্ধ ধর্মীয় নিদর্শনে সিংহাসন দেখা যায়। এসব সিংহাসন কাঠ বা পাথরের তৈরি এবং অপেক্ষাকৃত নিচু। পেছনের হেলান দেয়ার প্লাটফর্মটিও নিচু।

ভারতে সিংহাসন বলতে সেরা কাজটি সম্ভবত শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসন। বিস্তৃত কারুকাজ ও রত্নপাথরের ব্যবহার সিংহাসনটিকে এক রকম পৌরাণিক মর্যাদা দিয়েছে। মুসলমানদের আগমনের মধ্য দিয়ে ভারতে বড় বিছানা, সিন্দুক ও নিচু টেবিলের ব্যবহার শুরু হয়, কিন্তু এগুলো ব্যাপক জনগণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে ঘরের ভেতরে ফার্নিচারের ব্যবহার কম হলেও সেটা ভারতে কিছুটা পুষিয়ে গেছে কার্পেট ও টেক্সটাইলের ব্যবহারে। ভারতের আবহাওয়া ও জলবায়ু কাঠের তৈরি আসবাবের জন্য উপযুক্ত নয়। তাই ধনীরা হাতির দাঁত, পাথর ও ধাতুর তৈরি নানা জিনিস তৈরি করতেন। এভাবে ধনীদের মধ্যে কাঠ ছাড়া অন্য উপাদানের তৈরি আসবাবের ব্যবহার ছিল।

মোগল শাসনের শেষ দিকেই ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয়দের প্রভাবে আসবাব তৈরি বৃদ্ধি পায়। এ সময় ভারতে তৈরি আসবাব প্রচুর পরিমাণে ইংল্যান্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে রফতানি শুরু হয়। এসব আসবাবে ইউরোপীয় ধারণা ব্যবহূত হলেও সেগুলোয় বিস্তৃতভাবে ভারতীয় নকশা-সজ্জা দেখা যেত।

ভারতীয় কার্পেটের নকশা অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতো। এগুলো স্থানীয়ভাবে যেমন ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হতো, তেমনি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও এসব কার্পেটের চাহিদা ছিল। কার্পেটের বুননে পারস্যের রীতি ভারতে সূচনা করেন সম্রাট আকবর। ১৫৮০ সালে তিনি লাহোরে একটি কার্পেট তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। এর পর থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে কার্পেট তৈরির অনেক কারখানা স্থাপিত হতে থাকে। পারস্যের রীতি অনুসরণ করলেও ভারতে তৈরি কার্পেটে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মোটিফ ব্যবহারের বেশি ব্যবহার দেখা যায়। লাল জমিন, নীল বর্ডার ও গাছপালার নকশা— এটাই ছিল ভারতীয় কার্পেটের সাধারণ চেহারা। আবার সপ্তদশ শতকের একটি কার্পেটে দেখা যায়, এক প্রাসাদ আর পুরো জমিনে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন প্রাণী, যার মধ্যে দেখা যায় একটি টানা গাড়িতে করে একটি বাঁধা চিতা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।&dquote;&dquote;

ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হওয়ার পরে ভারতীয় উপমহাদেশে পশ্চিমা স্থাপত্যকলার নিদর্শন দেখা যায়। এ অঞ্চলের অনেক ভবনের নকশা পশ্চিমাদের করা। যেমন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির নকশা ও পরিকল্পনা অনেকটাই করেছেন ইংরেজ স্থাপত্যবিদ এডউইন লুটেনাস। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের রাজধানী চণ্ডীগড়ের নকশা করেছেন ফরাসি স্থাপত্যবিদ লা করবুসে। মার্কিন স্থাপত্যবিদ লুই আই কান আহমেদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট ও ঢাকার সংসদ ভবনের নকশা করেছেন। বিশ শতকে দক্ষিণ এশিয়ায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ ভবন নির্মিত হয়েছে, সেগুলো ভারতীয় স্থানীয় রীতির পরিবর্তে পশ্চিমা স্থাপত্যকলা দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে।

চীনের জীবনযাপন রীতি দুনিয়ার অন্য অঞ্চলগুলো থেকে একটু ভিন্ন। ঐতিহাসিক সময় থেকেই চীন এক ধরনের রক্ষণশীল আবহাওয়া বিরাজ করছে। দ্বিতীয় শতকের আগে চীনা সংস্কৃতিতে আসবাবের কোনো ব্যবহার ছিল না। ছিল কেবল মেঝেতে বিছিয়ে বসার জন্য পাটি বা ম্যাট। এরপর চীনে দক্ষ হাতের কাঠের তৈরি টুল, চেয়ার ও সিন্দুকের ব্যবহার শুরু হয় এবং এসব আসবাব তৈরিতে কোনো আঠা কিংবা পেরেক ব্যবহার করা হতো না। সে আমলের কিছু নিদর্শন টিকে আছে। তবে রক্ষণশীল সংস্কৃতি হওয়ার কারণে পরবর্তীকালের আসবাব যে সেই প্রাথমিক সময়ের তুলনায় অনেকটা বদলে গেছে সেটা নয়। চীনা আসবাবের সেরা সময় ছিল মিং রাজত্ব (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রি.)। শক্ত কাঠ দিয়ে এ সময় হাতাওয়ালা চেয়ার তৈরি হতো। প্রাসাদ ও ধনীদের গৃহসজ্জায় কাউচ, খাট, ক্যাবিনেট ও টেবিল তৈরি হতো। লাল ও অন্যান্য রঙের বার্নিশ এসময় দেখা যায়। বেশির ভাগ চীনা আসবাব অলংকরণহীন। কাঠের আলমারিগুলোয় কোনো অলংকরণ বা নকশা দেখা যেত না। কেবল পিতলের কিছু অংশ থাকত, যেখানে হয়তো সামান্য নকশা দেখা যেত। চীনারা ছবি আঁকত কাগজের ওপর কালি ব্যবহার করে। চীনা ওয়ালপেপারে জায়গা পায় প্রকৃতি, পশু-পাখি, মানব আকৃতি। চীনা নকশা নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় জানা-শোনা খুব বেশি ছিল না, মার্কো পোলো ও অন্য অভিযাত্রীরা তেরো শতকে সিল্ক রোড ধরে চীনা আসবাব সম্পর্কে ধারণা পেয়েছিলেন। উনিশ শতকে এসে চীনা ইন্টেরিয়রে পশ্চিমা প্রভাব নজরে পড়া শুরু করে। কারণ এ সময়ে প্রচুর চীনা স্থাপত্যবিদ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পড়াশোনা করেছেন এবং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। চীনা ভবনগুলোর অভ্যন্তরে পশ্চিমা ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন জনপ্রিয়তা পেয়েছে।&dquote;&dquote;

আধুনিককালের পশ্চিমা দুনিয়ার যাত্রা এক অর্থে রেনেসাঁর মাধ্যমে। মধ্যযুগের সমাজকাঠামো ভেঙে আধুনিকতার ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল রেনেসাঁর মাধ্যমে। মধ্যযুগের দুর্গসদৃশ বাড়ি রেনেসাঁয় এসে প্রয়োজনীয়তা হারায়। এর পরিবর্তে নগরের প্রাসাদ ও গ্রামের ভিলাগুলো সৌন্দর্যমিশ্রিত আরামদায়ক আবাসন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শহরের প্রাসাদগুলোর উচ্চতা তিন-চারতলার সমান। নিচতলায় থাকত প্রবেশপথ, আস্তাবল ও গুদাম। দ্বিতীয় তলায় থাকত পিয়ানো হল, জায়গা থাকলে বেডরুমও থাকত। পরিবারের সদস্যদের জন্য স্যুটও থাকত। একটি ব্যক্তিগত স্যুটে বিছানা এবং পড়ার ঘর থাকত, দাপ্তরিক কাজের স্থান, আলোচনার জায়গা থাকত। এসব স্যুটে বাথরুম থাকত, যেটা আধুনিক বাথরুমের কাছাকাছি। এখানে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকত। ঝরনা বা কুয়া থেকে পানি আনা হতো। অনেক বাড়ির তলায় কূপ খনন করা হতো। সেখান থেকে শ্যাফট ব্যবহার করে বালতি বা অন্য কোনো ধরনের পাত্র দিয়ে প্রাসাদ ভবনে পানি তোলা হতো। তৃতীয় তলায় থাকত শোয়ার ঘর, তবে এ তলার ছাদের উচ্চতা কম। চতুর্থ তলাতেও উচ্চতা কম থাকত এবং এ তলায় মূলত চাকরদের থাকা ও ঘুমানোর ব্যবস্থা হতো। এ আমলে সিঁড়িগুলো হতো পেঁচানো। মূল সিঁড়ির বাইরে একটা অতিরিক্ত সিঁড়ি থাকত সব প্রাসাদের, তবে এ সিঁড়ির অবস্থান হতো একটু আঁধার কোণে।&dquote;&dquote;

গ্রামের ভিলাগুলো শহরের প্রাসাদের চেয়ে ছড়ানো এবং এগুলোর উচ্চতা দুই বা তিন তলার সমান। তবে সুযোগ-সুবিধার ধরন প্রাসাদের মতোই। রেনেসাঁ আমলের ইন্টেরিয়র ডিজাইনে প্রাধান্য পেয়েছিল ক্লাসিক্যাল জমানার ধারণা। দেয়ালগুলো ছিল মসৃণ ও সরল। অনেক সময় বিভিন্ন নকশায় রঙ করা থাকত। থাকত ম্যুরাল ফ্রেসকো পেইন্টিং। সিন্দুক ধরনের বাক্স ব্যবহূত হতো এবং তাতে থাকত নকশা। ছাদগুলো জেল্লা ছড়াত এবং এই ছাদ ও বাক্সে উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করা হতো। মেঝেতে ব্যবহার করা হয় ইট, মার্বেল বা টাইলস এবং এগুলো দিয়ে মেঝেতে জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা হতো। ফায়ারপ্লেস ছিল প্রাসাদে তাপের একমাত্র উৎস। এগুলোতে ভাস্কর্যও যুক্ত হতো। পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসেও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার দেখা যেত।

মধ্যযুগের চেয়ে রেনেসাঁ আমলে আসবাবের ব্যবহার অনেক গুণ বেড়ে যায়। তবে আধুনিক কালের তুলনায় সেটা অনেক কম। চেয়ার বা বেঞ্চে কুশন ব্যবহার করা হতো। খাটগুলো ছিল এলাহি, একটা প্লাটফর্মের ওপর খাট স্থাপিত হতো। খাটে ওঠার জন্য সিঁড়ি ছিল, চারকোণে স্তম্ভ স্থাপিত হতো। খাটের নকশা এবং জাঁকজমক নির্ধারিত হতো মালিকের সম্পদ ও রুচি দ্বারা।

আধুনিক যুগ অসম্ভবের সম্ভবের যুগ। একুশ শতকে এসে ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা এমন এক পরিস্থিতিকে হাতে পেয়েছেন, যা ইতিহাসে অভূতপূর্ব। ভবনের অভ্যন্তরে মানুষের জীবন আমূল বদলে গেছে। এখন শুধু সজ্জাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও স্থাপত্যবিদরা মাথা ঘামাচ্ছেন। আগে স্থাপত্যবিদরা কেবল মাথা ঘামাতেন প্রথাগত আসবাবের জায়গা বণ্টন নিয়ে। এখন তাদের আসবাবের পাশাপাশি আধুনিক জীবনের অপরিহার্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গ্যাজেটের জন্য জায়গা নির্ধারণ করতে হচ্ছে।&dquote;&dquote;

এ সময়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে যে গুরুতর নিরীক্ষা চলছে, সেটা আসবাব নিয়ে। নতুন ধরনের আসবাবে ব্যবহার ও নকশার ভেদ ঘুচে যাচ্ছে। আসবাবে দেখা যাচ্ছে ধারণা, ভিজুয়াল এক্সপ্লোরেশন, প্রযুক্তি। অর্থাৎ চেয়ার শুধু বসার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, কিংবা আলমারি শুধু জিনিসপত্র রাখার জন্য নয়। এখনকার ইন্টেরিয়র ডিজাইন শুধু কাপড় বাছাই ও আসবাবের বিলিবণ্টন নয়। ডিজাইনাররা এখন কেবল পর্দার রঙ বাছাই করা আর আসবাব সাজানোর কায়দা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন না।

একবিংশ শতক যে মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে, সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। জনসংখ্যার বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, বিভিন্ন দেশে জমির সংকট মানুষের জীবনযাত্রা একেবারে বদলে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ঘরের অন্দরশৈলীতেও। এ যুগের অন্দরশৈলীর ভাবনাকে কোনো নির্দিষ্ট ছকে ফেলা সম্ভব নয়। নকশা, প্রযুক্তি, উপযোগিতা, যোগাযোগ ইত্যাদি মিলেমিশে এখন ইন্টেরিয়র ডিজাইনে ভূমিকা রাখছে।