ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

ললিতা চট্টোপাধ্যায়। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোট মেয়ে। পেশায় চিকিৎসক। তিনি বাবা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের চাকরিজীবন, পারিবারিক জীবন, লেখকজীবন, তার লেখালেখির মেকানিজম, জীবনবোধ, বাবাকে নিয়ে প্রচল অজস্র মিথ, তার নিজস্ব দ্বন্দ্ব-সংশয়সহ নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। বাবার কথায় ললিতার নিজের জীবনের কথাও এসেছে এ সাক্ষাৎকেরে। ছোট কাগজ ‘গল্পসরণি’র পক্ষ থেকে ললিতা চট্টোপাধ্যায়কে বেশ কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়। তার ভিত্তিতেই এ সাক্ষাৎকার—

প্রশ্ন: শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যখন আনন্দবাজার পত্রিকার সঙ্গে দীর্ঘ ১৮ বছরের সম্পর্ক, নিশ্চিন্ত নিরাপদ কর্মজীবন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন ১৯৭৬-এর শেষাশেষি, আপনি তখন নেহাতই বালিকা, তবু এমন একটা বয়স, সবই মনে থাকার কথা। কোনো অনিশ্চয়তা ও দুর্ভাবনা কি কাজ করেছিল আপনার বাবার মধ্যে? কোনো প্রভাব কি অনুভব করেছিলেন পরিবারে বা তার লেখকসত্তায়? সে সময়টা কীভাবে তিনি সামলে উঠেছিলেন?

ললিতা চট্টোপাধ্যায়: আপনি যে সময়টার কথা জানতে চাইছেন, সে সময়টা আমাদের কাটে ৫০/১ প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়িতে। একটু আগে থেকে বলি। ’৭২ সালের মাঝামাঝি আমরা চম্পাহাটি থেকে চলে আসি, লরিতে চড়ে, দুপুরে খেয়ে উঠেই— যে জিনিসটা যেমন পড়ে আছে, সেভাবেই ফেলে রেখে। প্রতাপাদিত্য রোডের একটা দোতলা বাড়ির পেছনের একটা ঘরে। নভেম্বর নাগাদ ৫০/১-এ আসি। ’৭২-এর নভেম্বর। এরপর বাবার লেখালেখির সঙ্গে মেশামেশিও বাড়ে। বন্ধুদের যাতায়াত বাড়ে। কৃত্তিবাস— নতুন পর্যায়ের জন্য টাকা তোলা, বিশেষ সংখ্যা সম্পাদনা, লেখা— অগস্ত্যযাত্রা, পরীর সঙ্গে প্রেম ইত্যাদি চলতে থাকে। এ সময় জাপান, ফিলিপাইন যান। বাবা যেখানেই যেতেন, সে রাজস্থানই হোক বা জাপানই, রোজ দুই লাইনের চিঠি পিকচার পোস্টকার্ডে— ‘ললি বাবু এটা একটা আগ্নেয়গিরি। অনেকদিন বাদে বাদে জেগে ওঠে। এখন ঘুমোচ্ছে। চুমু নিও।’ ১৯৭৬-এর মাঝামাঝি বাবা আনন্দবাজার ছাড়েন। বাবার কথায় ‘মন ভেঙে গিয়েছিল।’ চতুরঙ্গ পত্রিকায় এ নিয়ে বাবার লেখা আছে। কেউ না পড়েই ভেবে নিয়েছেন শ্যামল মারপিটে অভ্যস্ত ছিলেন। আমি একটু অন্য কথা বলি। বাবা নিজেই চাকরি ছেড়ে আসেন। বাবার বয়স তখন ৪৩ বছর। অবস্থা তখন— বাড়িভাডা, দুই মেয়ের স্কুল, নাচ, পিয়ানো ক্লাস, কাজের লোক, দাবিহীন সমবয়সী স্ত্রী। একটা অ্যাম্বাসেডর গাড়ি, ড্রাইভারসহ। কাজ করার লোক একজন। এ সময়ে পরপর যে ঘটনাগুলো আমাদের সংসারে ঘটে— দাদুর মৃত্যু, বাবার একটা হার্ট অ্যাটাক এবং আমাকে একটা কাছের কম খরচের স্কুলে ভর্তি করা, যাতে দরকারে পায়ে হেঁটেও চলে যাওয়া যায়।

বাবা তখন দু’হাতে লিখছেন। আরো লেখার জায়গা খুঁজছেন। মাঝে মাঝে চম্পাহাটির ধান বিক্রির টাকা নিয়ে আসতেন মা। সেদিনটা, বোধহয় উত্তেজনা চাপা দিতে বাবা আমাদের দুই বোনকে নিয়ে বাড়ি থাকতেন না। ভবানীপুরের উজ্জ্বলা, ভারতী, বিজলী বা পূর্ণতে পরপর শোতে টিকিট কেটে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। মা ধান বিক্রির টাকার সঙ্গে বড় বড় ক্ষীরকদম কিনে আনতেন, কখনো মধু বা ঘি! ওটাই আনন্দ।

‘সোয়াইন’ শব্দটা এবং একটি চড়ের প্রভাব সংসারে পড়েনি? আমি তো ভাবি এই মানুষটা সেই সময় পিঠের চামড়ায় অপমান মেখে কী কী লেখা লিখেছেন। নবকল্লোলের মধুসূদন মজুমদার (দৃষ্টিহীন) বাবার জন্য দরজা খুলে দিয়েছেন। মনের আর কাগজের। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২-এর মধ্যে বৃহন্নলা নতুনভাবে অর্জুনের অজ্ঞাতবাস নাম নিয়ে বেরোয় মিত্র ও ঘোষ থেকে। এছাড়া আবিষ্কার, অলীকবাবু, ঈশ্বরীতলার রূপকথা, চন্দনেশ্বর জংশন, স্বর্গের আগের স্টেশন, হিম পড়ে গেল, স্বর্গের পাশের বাড়ি, পরবর্তী আকর্ষণ, জলপাত্র, গোলকধাম, একদা ঘাতক ইত্যাদি নবকল্লোল ও যুগান্তর শারদীয়ায় প্রকাশিত হয়। এর একটিও আনন্দবাজার গোষ্ঠীর কোনো কাগজে বেরোয়নি। তখন সেখানে বাবার প্রবেশ নিষেধ। বাবার লেখা ও নাম ছাপাও বারণ। অর্থাৎ তিনি তখনই লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। কোনো বিশেষ বাজারের লেখক নন। কুস্তি করা বুকের ছাতি, কোঁকড়া কালো চুল বাঁ দিকে সিঁথি করে আঁচড়ানো, ভালোবাসতে জানা চোখ আর ওজনদার পাঞ্জা; যার চড়ের ভয়ে অনেকেই বাবাকে ঘাঁটাত না। এ প্রসঙ্গে বলি, এ লেখাগুলো পাঠককে খুশি করার পাশাপাশি আমাদের স্কুলের ফি, স্কুলের বই, পুজোর জামা, জুতো, মায়ের শাড়ি— এগুলোও দিয়েছে।

প্রশ্ন: তার লেখালেখির প্রবাহ দেখলে দেখা যায়, অমৃত পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেয়ার পর শ্যামল বাবুর লেখালেখিতে একটি পজিটিভ পরিবর্তন আসে, কোয়ালিটি কোয়ান্টিটির একটা বিপুল পরিবর্তন, সঙ্গে তরুণ লেখকদের আবিষ্কার, উৎসাহ দেয়া— যাকে বলে একটা জোয়ার— যা শ্যামল বাবুর জীবনেও নতুন। এ সময়টা আপনার মনে আছে?&dquote;&dquote;

ললিতা: ’৭৬-এর শেষ বা ’৭৭-এর শুরু— এ সময় বাবা যুগান্তরে যোগ দেন। তার কিছুদিন আগে থাকতেই লেখার জোয়ার আসতে থাকে। অমৃতর সম্পাদক হয়ে চেয়ারে বসে পত্রিকাটিকে গড়ে তোলার জেদটাকেই উসকে দিয়েছিলেন। নতুন কবি, গদ্যকার, সমালোচক, ইলাস্ট্রেটর, প্রাবন্ধিক— এদের একটা পুল তৈরি করেছিলেন।

অগ্রজদের মধ্যে মহাশ্বেতা দেবী শারদীয়া সংখ্যায় উপন্যাস লিখেছেন। গজেন্দ্রকুমার মিত্র ধারাবাহিক লিখেছেন আদি আছে অন্ত নেই। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সোনার হরিণ নেই। সমসাময়িক বরেন গঙ্গোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখেছেন বনবিবির উপাখ্যান। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরের বাগান। শিল্পী পরিতোষ সেন বড় গদ্য অমৃততেই প্রথম লেখেন— বোধহয় আত্মকথা জিন্দাবাহার।

বাবা নিজে হাওয়াগাড়ি লেখেন— ধারাবাহিক উপন্যাস। এ সময় আমাদের বাড়িটা ছিল একটা জ্যান্ত বাড়ি। বাবার লেখার সময় বা অমৃততে যাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে বাকি সময়টা ছিল আড্ডার, মেশামেশির বা লাভ, লাভ অ্যান্ড লাভের সময়। কেউ অগ্রজ, কেউ সমবয়সী, কেউ ১৫-২০ বছরের ছোট।

প্রশ্ন: আপনাদের দুই বোনেরই বিয়ে খুবই অল্প বয়সে হয়। যাদের সঙ্গে বিয়ে হয়, তারা দুজনেই আপনার বাবার লেখালেখির তরুণ বন্ধু। এদের সঙ্গে প্রেম, পরে বিয়ে— কখনো আনকমফরটেবল মনে হয়নি? এত অসম বয়সের বিয়েতে পরিবারের অন্যরা, স্বজনরা প্রশ্ন তোলেননি?

ললিতা: দিদির বিয়ের বয়স ৩৯ বছর, আমার ৩৫ বছর। দিদির বিয়ে ১৭ বছর পাঁচ মাস বয়সে— চার মাস প্রেমের পর। আর আমার ১৭ বছর চার মাসে— চার বছর প্রেমের পর। হ্যাঁ, ওরা বাবার বন্ধু শুধু শেষ দিন অবধিই। সমমানসিকতাটা জরুরি, যেটা আমার ক্ষেত্রে অসচেতনভাবেই ঘটে গেছে। বাবার বন্ধু হলে অসুবিধা কোথায়? যারা বাবার সঙ্গে মিশেছেন, তারা এ প্রশ্ন করবেন না। ওভাবে মিশতে তো আর কেউ পারলই না।

বাবা মদ্যপানের আড্ডা ছেড়ে আসার সময় সমীরকে (সমীর চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোট জামাই) প্রস্তাব দিতেন— ‘ললিকে ভয় পাস? ডিভোর্স দিয়ে আমার কাছে থাক।’ আর আমাকে বলতেন, ‘দুই বেণি করে ফ্রক পরে ফিরে এসো। অনেক শ্বশুরবাড়ি হয়েছে। আমার মেয়ে আমি ফেরত নিয়ে যাব।’ এত আদর করে কে ডাকে? আমাদের দুর্ভাগ্য, ৬৮ বছরেই বাবা প্রয়াত হন। তুষারদা (কবি তুষার চৌধুরী, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বড় জামাই) বয়স হয়ে মারা যাননি। সিরোসিসে মারা গেছেন। মন দিয়ে মদ্যপান করায় মৃত্যু এগিয়ে এসেছে। সেটাই সবাই মনে রাখে। ওর কবিতা, পড়াশোনা বা রসবোধ— সেখানে বয়স কোথায়?&dquote;&dquote;

সমীরের সঙ্গেও আমার বয়সের পার্থক্য আছে। এখন পর্যন্ত অসুবিধা হয়নি। হয়তো আরো বুড়ো হলে হবে অথবা হবে না। আসলে ভালো লাগা আর ভালো থাকার বোধটা যার যেমন তৈরি হয়। আমার ওস্তাদজি আমার বাবা।

অনেকেই বলেছেন, হাত-পা বেঁধে শ্যামল দুই মেয়েকে জলে ফেলে দিচ্ছে। তবে ওটা পুষ্করিণী ছিল না। দুই জামাই-ই ছয়-সাত পেগের কমে থামত না। আত্মীয়রা বলতেই পারে। আমাদের জীবন, স্বাধীনতা, পড়াশোনা, সংসার, বই পড়া, আড্ডা কিছুই থেমে থাকেনি। মনে তো হয়, জলে পড়িনি।

প্রশ্ন: যে সন্তোষকুমার ঘোষের সঙ্গে মনোমালিন্য শ্যামল বাবুর আনন্দবাজার ছাড়ার প্রধান কারণ, তার সম্পর্কে অগাধ শ্রদ্ধা যে আপনার বাবা লালন করতেন, তার প্রমাণ শ্যামল বাবুর চতুরঙ্গ পত্রিকায় লেখা প্রবন্ধটি, যেখানে শ্যামল বাবু সব গুজবের নিরসন ঘটিয়ে আসল ঘটনা তুলে ধরেছেন। পরে সন্তোষ বাবু বা আনন্দবাজার বা কৃত্তিবাসের অন্য বন্ধুদের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল শ্যামল বাবুর?

ললিতা: সন্তোষ জেঠুর (সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষ) সঙ্গে বাবার সম্পর্ক শেষ দিন পর্যন্ত একই দেখেছি। মালিন্য দেখিনি। বাকি বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ হয়নি। কোনো মান-অভিমান যদি কখনো হয়ও সেসব খুব একটা চোখে পড়েনি। তবে বৃত্তগুলোর কেন্দ্র ক্রমে আলাদা হচ্ছিল। সে তো সব মানুষের জীবনেই হয়। পরস্পরের লেখা পড়ে ফোনে মতামত জানানো, কখনো নিজেদের আড্ডা— কম হলেও সবই ছিল। তবে সন্দীপন কাকু (সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়) শেষ পর্যন্ত আসতেন। তার আসা, নীরবতা অনেক অসহায়তা ব্যক্ত করত। বাবা সুস্থ থাকাকালীন রোজ আমার সঙ্গে কথা হলেও দেখা হতো না। অসুস্থ অবস্থায় বাবা আমার কাছেই ছিলেন। অনেকেই এসেছেন। সে সময় বা মৃত্যুর পরে স্মরণসভায় অনেকেই বক্তৃতা দিয়েছেন। দেখুন, বাবার বন্ধু তারা, স্বনামধন্য সাহিত্যিক একেকজন। কেউ বলেছেন, শ্যামল শুরু করত ভালো, শেষটা হতো না। কেউ বলেছেন, শ্যামল ভণ্ড আবার কেউ বলেছেন, শ্যামল নাটুকে। কারুর মতে, শ্যামলের লেখায় নারীরা পণ্য। তারা তাদের মতো বলেছেন, যা মনে করেছেন। একটা কথাই বলতে পারি, যে পাঠকরা শ্যামলকে মিট করেনি, তারা কী বলে দেখা যাক। তাদের কাছে তো শ্যামল শুধু তার লেখায় উপস্থিত।

প্রশ্ন: শ্যামল বাবুর খামখেয়ালিপনা বা আনপ্রেডিক্টেবল বিহেভিয়ার প্রায় মিথ। অন্যদিকে আপনার মা ছিলেন শান্ত, ধীরস্থির, সর্বংসহা। কীভাবে চলত সবকিছু?

ললিতা: শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় খামখেয়ালি? শ্যামল বাবু আনপ্রেডিক্টেবল? বন্ধু মতি নন্দীর বড শ্যালিকা অবিবাহিত। তার ১৭টি সম্বন্ধ এসেও ক্লিক? করেনি। অথচ তিনি সুন্দরী, শান্ত। কোনোটায় দাবি ছিল রিস্টওয়াচ?, কোনোটায় গলার চেন বা সাইকেল। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের বউ দরকার ছিল। ইতির দরকার ছিল বিয়ের নিশ্চিন্ততা। বিয়ে হলো। টিউশনির টাকায় বানানো সামান্য কিছু গহনা ইতির (শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ত্রী ইতি গঙ্গোপাধ্যায়) গায়ে। বাবা বিয়ের দিন মার খান জেঠুর কাছে। বরকর্তা সন্তোষ জেঠু। বৌভাতের ক্যাটারার বিজলি গ্রিল। টাকা শোধ ইনস্টলমেন্টে। পাঁচ বছর যৌথ পরিবারে থেকে চার বছর আর আড়াই মাস বয়সের দুটো মেয়েকে নিয়ে ক্যানিংয়ের কাছে চম্পাহাটি পাড়ি দেন এ দম্পতি। বাবার সব পাগলামিতে সঙ্গী এই মহিলা। সেটা খালকাটা, ইটখোলা করা, বাড়ি বানানো বা চাষ করা। মা গম্ভীর থাকতেন বলে চাষীরা বলতেন, মা ঠাকরুন ‘ময়াটে চটা’। মা নীরব, সর্বংসহা কিন্তু ভীতু নন, তখন তো ছিলেনই না! এবং ন্যাগিংও নন। নন হস্তক্ষেপকারী বা দাবিসর্বস্ব। তবে আমাদের পরিবারে একমাত্র শান্ত ব্যক্তিত্ব মা। নীরবে বাজার থেকে ইলেকট্রিক বিল জমা দেয়া ও আমাদের প্রয়োজন মেটানো, রান্না করা— সবই করতেন।

একটা বয়স পর্যন্ত বা জীবনে বাবা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষাই শুরু করতেন, সেগুলো চালিয়ে যেতেন মা। এই চরম সহযোগিতা ভাবাই যায় না। চম্পাহাটি পর্বে সব কাজ বাবা শুরু করলেও শো চালু রাখতেন মা। আমাদের দুই বোনের বিয়ে মা-বাবার ৪৯ বছরের মধ্যে কমপ্লিট। তারও কয়েক বছর পর এ বিপরীতধর্মী দুটি মানুষের সম্পর্কে নির্ভরতা থাকলেও নিবিড়তা কমে যায়।

প্রেম ও সমান্তরাল দুই নারীকে নিয়ে পরীক্ষামূলক জীবনযাপন করতে চাওয়া— এতে শেষ হাতুড়ির ঘাটা মারে মা, এই প্রথম বাবার প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেন। মানা যায় না। একজন নিশ্চিন্ততাকে আশ্রয় করতে চেয়ে কষ্ট পেয়েছেন। আরেকজন চরম অবুঝের মতো এত বছরের পারিবারিক সব সম্পর্ক পকেটে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছেন। যত সহজে বলছি, এত সহজ ছিল না। আমি চরম বিরোধিতা করি। বাবার মনের জোর, স্বভাবের জোর, লেখার জোর ছিল; ছিল না অর্থের জোর। এ অনিশ্চিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা; তবে আমার চাওয়ায় এ সম্পর্ক ভাঙেনি; ভাঙার ছিল, তাই ভেঙেছে। প্রেম মানে আকর্ষণ, বিকর্ষণ, মায়া, স্নেহ, আঘাত, প্রতিঘাত সবই। যে মানুষ ইতি, ললি (ছোট মেয়ে ললিতা চট্টোপাধ্যায়), মলি (বড় মেয়ে মল্লিকা চৌধুরী), তাদের ছেলেমেয়ে আর গদা (শ্যামলের ভাই তরুণ গঙ্গোপাধ্যায়), তপা (শ্যামলের ভাই তাপস গঙ্গোপাধ্যায়), রমাকে (শ্যামলের বোন রমা মুখোপাধ্যায়) বাদই দেবে না, তার প্রেম টেকে নাকি! মা ক্রমে নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন। বাবা নন। একটু একটু করে অসুস্থতা শরীরটাকে কমজোরি করতে লাগল। আমি বোধহয় প্রসঙ্গ থেকে একটু সরে গেলাম।

তবে অসুস্থতার শেষ বছরটায় সামান্য ব্যথা পেলেও বাবা চিৎকের করতেন, ‘ও ইতি, বাঁচাও।’ মা কিন্তু টালিগঞ্জেই থাকতেন। আসতে চাননি। কখনো না।

প্রশ্ন: জীবন নিয়ে ঝুঁকি নিয়েছেন আজীবন। মাঝে মাঝেই চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতেন। অথচ ছিলেন ভীষণ পারিবারিক, দায়িত্বশীল, স্নেহপ্রবণ এবং বন্ধুতার কাঙাল। খুলতে চেয়েছিলেন ‘লাভ লাভ অ্যান্ড লাভ কোম্পানি’। সম্পূর্ণ বিপরীত মনে হয়। সবই তো মেয়ে হয়ে ফেস করেছেন।

ললিতা: বাবার শৈশব— খুলনার বড় পরিবার, ভৈরব-রূপসায় ঝাঁপানো, ঠাকুরমার কাছে ইংরেজি কবিতা শোনা, গল্প শোনা, অপরিসীম দৌরাত্ম্য, দাদাদের মার খাওয়া, ছোট ভাইবোনদের নিজের টিম মেম্বার করা— এসব নিয়ে। দেশভাগ, নিজের দাদার আত্মহত্যা, ঠাকুরমার অসুস্থতা, ভাইদের বড় হওয়া থেকে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠা, বেকারত্ব, প্রেম এবং প্রেমহীনতা সবই— বাবার লেখায় সরাসরি জীবন থেকে উঠে এসেছে। নিজেকে বিপন্ন করে যে সংকটকে সামনে পেতেন, তার অনায়াস মসৃণ ব্যবহার করতেন লেখায়।

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বরং বাবাকে তাড়া করেছে। বাবাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না, রাজসিক মানুষটার চলত কীভাবে! ভালোবাসতেন সবাইকে পুজোয় উপহার দিতে। নিজের হাতে কিনতেন। খাওয়াতে ভালোবাসতেন। আদর করতে জানতেন।

দিদি মেয়ে হিসেবে শাসিত হয়েছে, হয়তো প্রথম সন্তান বলে। আমি একটু এলেবেলে। আমাকে বকা বা মার— এসব কমই হতো। বরং বহুক্ষেত্রে আমার রাগ থামাতেন। বাধ্য হতেন।

বাবার লেখা পড়তে শুরু করে দেখলাম— ক্রমে আমিও বন্ধু হয়ে যাচ্ছি। আগেও ছিলাম। পরে আরো বেশি। ভিনটেজ কারে বাবা, দিদির সঙ্গে বসে আছি। হুড খোলা। রাস্তায় টিউবের ঝলমলে আলো। গাড়ি ঠেলছেন কয়েকজন মহিলা— নিজে থেকেই— যারা রাস্তার মোড়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়েছিলেন। কী অনুভূতি তখন হয়েছিল মনে নেই। এখন এ বয়সে এসে বলতে পারি, বাবার সঙ্গে যতটুকু থাকতে পেরেছি, তা অন্তত আমাকে জীবনকে সহজে গ্রহণ করতে সাহায্য করেছে, যখন যেভাবেই থাকি না কেন।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: ব্যবহারিক জীবনে শ্যামল বাবু ছিলেন খুবই রসিক, উচ্ছ্বাসপ্রবণ, আগ্রহী— যাকে বলে জোভিয়াল। কিন্তু তার লেখার জগৎ একদম আলাদা। যখন লেখায় বুঁদ হয়ে থাকতেন, তখন কি বাবাকে অন্য রকম মনে হতো? রুটিন অব রাইটিং কেমন ছিল?

ললিতা: বাবার লেখার বিষয়ে মুখ খুলব না। পাঠকরা বলুক। রুটিনটা বলি। ছোট ছোট কাগজে, সিগারেটের বাক্সের সাদা অংশে, ছোট ডায়েরিতে নোট করতেন; যার পেছন দিকে পুজোর জামার হিসাবও লেখা থাকত। ভোরে, প্রয়োজনে রাতেও লিখতেন, খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে। শীতে প্যান্ট-শার্ট পরে, মশা থেকে বাঁচতে মোজা পরেও। ক্লান্ত হলে ঘুমিয়ে নিতেন। ব্রহ্মপুরে বারান্দার সাইজে মশারি বানিয়ে টাঙিয়ে তার মধ্যে টেবিল-চেয়ার নিয়ে শাহজাদা দারাশুকো লিখেছেন। আড্ডা মারতে হলে আপনাকেও তাতে ঢুকে পড়তে হবে। মোড়া নিয়ে। বেলায় বেলায় মাকে গরম গরম নতুন নতুন খাবার দিতে হবে। যত রাতেই মদ্যপান করে শুয়ে থাকুন না কেন, লেখা থাকলে ভোরে উঠে লেখা মাস্ট। রিফ্লেক্স দারুণ। একমাত্র ক্লান্ত হলে, মন খারাপ বা অপমানিত হলে অন্যমনস্ক হতেন। লেখা শেষ হওয়ার আগে প্রায়ই অফিসে সমীরের কাছে ফোন যেত— ‘আর কত অফিসের টেবিল-চেয়ার চাটবে। এবার এসো। আসার সময় বুড়ো শ্বশুরের জন্য একটু গরুর ওষুধ নিয়ে এসো।’ কোনো লেখা লেখার আগে প্রায়ই গল্পটা বলতেন। আবার বলতেন। আবার। অনেক কিছু না বুঝেই বলতাম, ‘লেখো না! ভালোই তো।’ আমার বাড়িতে ফোন ছিল না। বাবার চেষ্টায় ফোন আসে। রোজ ১৩-১৪ বার ফোন। ‘কী বাজার করলে? কী রাঁধলে? কোথায় গিয়েছিলে? নার্সিংহোম? কারো বাচ্চা হলো? কী হলো— ছেলে?’ তার পরই একটা চিৎকের— ‘ও ইতি, আমাদের সময় একটাও ছেলে হওয়ার ডাক্তার পাইনি। কোথায় গেলে?’

আবার কখনো— ‘ললি বাবু আমি এটা লিখতে চাই। লেখাটা লোকে পড়বে তো?’ এভাবেই বাবার শৈশবের ‘সাধু কালাচাঁদ’ আমার শৈশবে। কিন্তু সব লেখা পড়ে হাসতে পারিনি। পারি না। চুপ করে গেছি।

প্রশ্ন: বাবা হিসেবে কী বলতেন— মন দিয়ে পড়াশোনা করো, ক্যারিয়ার বানাও, নাকি নিজের মতো চলো? মানুষকে বোঝো। জীবনবোধ যা তার সাহিত্যজুড়ে, তা কি কখনো জীবনে চর্চা করতে আপনাদের উদ্বুদ্ধ করতেন?

ললিতা: কিছুই বলতেন না আমাকে। দিদিকে বলতে হতো। তবু অত্যাচার করে পড়ানো— কোনো দিনই মুখোমুখি হইনি। সবসময় সঙ্গে থাকতাম। বাজারের ব্যাগে করে গল্পের বই কিনে দিতেন। নাচ, পিয়ানো, সাঁতার— ভর্তি করে দিয়েছিলেন। বরং পড়া থেকে তুলে লেখা আনতে পাঠিয়েছেন অমৃতর জন্য। বিশ্বাস করতেন জীবনটা মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। জীবন যাপন করে জীবনকে জানতে হয়। ফার্স্ট বা লাস্ট হওয়া নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। শেষের দিকে একটা স্কুলের সেক্রেটারি হয়েছিলেন। শিক্ষকরা টেস্টের রেজাল্টের দিন ভয় পেতেন। বাবা গিয়ে সব গুবলেট করে দেবেন। হেডমাস্টার মশাই হয়তো কড়া গলায় অনুত্তীর্ণ ছাত্রের মাকে দুটো কথা বলছেন। বাবা সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। উঠতে উঠতে বাবার বক্তব্য— ‘সমর, ওনার কী দোষ। ওনাকে বকছ কেন? ছেলেগুলোকে পাস করিয়ে দাও। কোনো ক্ষতি হবে না। আপনি বাড়ি যান মা। আপনার ছেলে পাস।’ সব টিচার চুপ। হেডমাস্টার সমর ভট্টাচার্য চাপা গলায় বললেন, ‘এ ভয়টাই পাচ্ছিলাম। শ্যামলদা, আপনি ঠিক এ সময়েই?’ নতুন টিচার জয়েন করলে তাকে নিজের মায়ের হাতের রান্না সেক্রেটারির জন্য নিয়ে আসতে হতো একদিন। পোস্তর বড়া, মৌরলা বা পুঁটির ঝাল। আমি বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এ দৃশ্য দেখে বিস্মিত।

প্রশ্ন: একলব্যের মতো গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আপনাদের বলতেন? সাহিত্য পড়তে উৎসাহ দিতেন? নিজের লেখা পড়তে বলতেন?

ললিতা: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সত্যিই গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। আমার অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর ঠাকুরমার ঝুলির পাশাপাশি যে বইগুলো হাতের নাগালে ২৪ ঘণ্টা পেতাম, তাপথের পাঁচালি, অপরাজিত, অনুবর্তন, দেবযান ! বলতে চাইছি, এ বইগুলোর অস্তিত্ব আমাদের বাড়িতে সর্বকালীন। আস্তে আস্তে পড়ে গেছি, সব তো ওই বয়সে বোঝা যায় না। বারবার গল্প পড়ার তখন থেকেই শুরু। আমার মেয়ে যখন সাত মাস, তখন আমাকে, সুচরিতা (ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সুচরিতা রায়) আর মাকে ব্যারাকপুরে রমা দেবীর (কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী) কাছে নিয়ে গেছেন। তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও (কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে) বাবাকে নিজের বড় ভাই বলতেন। আসলে বাবা কোনো ঘটনার তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কোনো লেখা লেখার কথা ভাবতেন না। চিরকালীন রেলেভেন্সের কথা ভাবতেন, যা বিভূতিভূষণের লেখাজুড়ে। বহুবার বলতেন, ‘আমি কি ওনার মতো টিকব? টিকে যাব?’ সাহিত্য পড়তে উৎসাহ দিতেন? কীভাবে বলি? বই কিনে দিতেন। বলতেন না, ‘এটা পড়ো।’ জিজ্ঞেস করতেন, ‘কী পড়লে? কেমন লাগল?’ কিছুটা নিজের কথা বলতেন। ক্লাস সেভেন-এইটে লোলিটা পড়তে দেখে বলেছিলেন, ‘আর ক’দিন পরে পড়লে হতো না?’

নিজের লেখা বাড়িতে রাখতেন না। আমি সিক্স বা সেভেন থেকে বাবার লেখা ধরি। বরং বলতেন— ‘এখনই কেন? এগুলো পডলে বাবাকে ভুল বুঝবে।’ যখন দেখতেন এসব বলে হবে না, ছেড়ে দিলেন।

প্রশ্ন: বাবার লেখা পড়েছেন ধরে নিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আজ থেকে ১০০ বছর পরের যে পৃথিবী, তার আমূল বদলে যাওয়া চেতনা, তখনো কি পাঠক শ্যামল বাবু পড়বে? প্রাসঙ্গিক, জরুরি থাকবেন? অবশ্য যদি তদ্দিন বাংলা ভাষা টিকে থাকে।

ললিতা: আপনার এ প্রশ্নটার আমি শেষ থেকে উত্তর দেব। সেটা আমার সুবিধা হবে।

প্রথম. বাংলা ভাষা টিকে থাকবে কিনা ১০০ বছর। কোন বাংলা? কলকাতার, বীরভূমের, বাঁকুড়ার, উত্তরবঙ্গের, মেদিনীপুরের, নদীয়ার, ঢাকার, চাটগাঁয়ের, কুমিল্লার? কোথাকার?

প্রথম কথা, বাংলা কি ১০০ বছর আগে এ রকমই ছিল? না তো। বাংলা পরিবর্তিত হয়েছে। হচ্ছে। হবেও। বাংলা ভারতের প্রাদেশিক ভাষা, বাংলাদেশের প্রধান ভাষা। বাংলা এমন একটা ভাষা, যাতে পৃথিবীর বহু ভাষার বহু শব্দ এসে বসে বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। কয়টা শব্দ বিশুদ্ধ বাংলা? ভাষায় যত আদান-প্রদান হবে, তত বেশি টিকে থাকবে।

দ্বিতীয়ত. বাংলা শুধু যারা কবিতা লিখছেন, গদ্য লিখছেন, নাটক লিখছেন, নিজেদের সাংস্কৃতিক ভাবছেন, তাদের ভাষা নয়। আমরা যারা এগুলো লিখি না, দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে, কাত হয়ে, চিত হয়ে যেকোনোভাবে বাংলা পড়ে ফেলতে পারি, হাস্য, লাস্য, ঝগড়া, কান্না, স্বপ্ন— সব বাংলায় চর্চা করি, ভাষাটা আমাদেরও।

আমরা হয় বাংলায়, নয় ইংরাজিতে বহির্বিশ্বের টিকে যাওয়া এবং অনুবাদ হওয়া বইগুলো পড়ি। মানে অনুবাদ সাহিত্য। শেক্স?িপয়র, চার্লস ডিকেন্স থেকে মার্কেজ, কুন্দেরা, পামুক, সারামাগো, মুরাকামি— আপনি আপনার জানা দুটি ভাষায় আপনার সামর্থ্যের মধ্যে কিনতে পারছেন। তাই পড়ছেন আর আলোচনা করছেন।

১০ বছর বয়সেও সাহিত্যের আড্ডায় এই এক প্রশ্ন শুনতাম। ১০০ বছর বাদে কী হবে? পরিবর্তনের সঙ্গে সাযুজ্য থাকলে টিকবে। ৪০ বছর তো চলে গেল। ঢোঁড়াই, অনুবর্তন, হাঁসুলীবাঁক— সেই যুগ তো নেই। বইগুলো ফেলে দিতে বা বেঁচে দিতে পেরেছেন? মানুষের সর্বকালীন অনুভূতি, দ্বন্দ্ব্ব, সম্পর্ক, সংকট কয়েক হাজার বছরের বেশি টিকে আছে। রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডিসি, শেক্স?িপয়র এগুলো তার উদাহরণ। সবার কাছে পৌঁছানো চাই। বাংলা সাহিত্য টিকলে, বহমান হলে শ্যামলের নাম থাকবে।

প্রশ্ন: উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে কোন অমূল্য জিনিসটি পেয়েছেন বলে মনে হয়?

ললিতা: জেদ।

প্রশ্ন: চোখ বুজলে বাবার কোন উজ্জ্বল ছবি ভেসে ওঠে?

ললিতা: বাবা ১৬ বছর শারীরিকভাবে বেঁচে নেই। ভুলতে পারলাম কই? আমার তো সব ভঙ্গিই মুখস্থ। ল্যান্ডফোন বাজলে মনে হয়, গলাটা যদি শুনি। ভিড় রাস্তা দেখলে মনে হয়— উল্টো দিক থেকে যদি হেঁটে আসেন হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট পরে। পায়ে কাবলি। হাঁটাটা দেখেছেন কখনো? দেখলে ভুলতেন না।

এখন এ মৃত্যুটা মেনে নিয়েছি। চাইতে গেলে তো বাবার ক্লোন চাইতে হয়। তাতে আরেকজন করে দাদু, ঠাকুরমা, আরেকটা করে ভৈরব, রূপসা, খুলনা— সবই চাইতে হবে। নইলে যে আরেকটা শ্যামল হবে না। যতদিন আমার মস্তিষ্ক সচল থাকবে, বাবার কোনো ভঙ্গি মনে করতে আমাকে চোখ বুজতে হবে না। এখন বাবাকে ছুঁতে ইচ্ছে করলে পড়ি ভিক্টোরিয়ার হিরো, সেই মাছটা, এক কাপ চা বইতো নয়, হাওয়া গাড়ি, ঈশ্বরীতলার রূপোকথা— আরো সব লেখা। বাবার সব লেখায় বাবা উপস্থিত। জীবনে যখন যে পর্ব গেছে, সেই পর্বের লেখা হাতে নিলেই হয়।

প্রশ্ন: মাতামহ ছাড়া শ্যামল বাবুর অন্য কোনো পরিচয় কি আপনার ছেলেমেয়ে বুঝতে পেরেছে?

ললিতা: আমার মেয়ে আমার বাবার ছোড়দি ভাই, ছোট বউ। ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে চলে আসার সময় মরাকান্না কাঁদত। ওর ছোটবেলার সবচেয়ে প্রিয় দুজন— ওর দাদামশাই আর ওর ঠাম্মা। বাবা ওকে কাঁধে করে গঙ্গা দেখাতে নিয়ে যেতেন। ঘাঘরা কিনে দিতেন। ঘুঙুর কিনে দিতেন। সেগুলো পরে সে ‘গাইড’-এর গানের সঙ্গে বা ‘আলিবাবা’র গানের সঙ্গে নাচত। অজস্র বই কিনে দিতেন। পড়ার অভ্যেস ছোটবেলা থেকেই। দাদু সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং শ্রদ্ধাশীল। সব বই নিজের দায়িত্বে সংগ্রহ করে। সব খোঁজ তো আমাদের মাধ্যমেই পায়। বাবার শেষ একটা বছর আমার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে দাদুর দেখাশোনা করত। খাইয়ে দিত। ও দাদু সম্পর্কে একটু পজেসিভ। এগুলো কোনো আলোচনার বিষয় হতে পারে না। ছেলের আট বছর বয়সে বাবা মারা যান। সে বাবা এলে বাবার কাছে আমার ছোটবেলার মতো শুয়ে থাকত। আমার মেয়েও তা-ই করত।

কুন্দনের (ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে) বই পড়ার অভ্যাস বা অ্যানালিটিক্যাল চিন্তাভাবনার সঙ্গে কিছুটা বাবার মিল আছে। আছে পাগলামির সঙ্গেও। তবে ও শান্ত। বাবার ৮০ ভাগ লেখা ওর পড়া।

প্রশ্ন: আপনিই একদিন কথায় কথায় বলছিলেন, অসুস্থ অবস্থায় শ্যামল বাবু আপনাকে একাধিকবার বলতেন, ‘আমার ভায়েরা ছোট, কিছু বোঝে না, তুই ওদের দেখিস।’ তা আপনার দুই কাকা এবং পিসি তো এখনো আছেন। যোগাযোগ রাখেন? কেমন আছেন তারা?

ললিতা: না। তা বলেননি। সারা জীবনই পারিবারিক কোনো কথা উঠলে বলতেন— গদা, তপা, রমা আমার ছোট ভাইবোন। ওরা আমার আদরের। ওদের নামে কোনো খারাপ কথা আমি শুনব না। আমরাও সেভাবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়েছি। বাবার অসুস্থতার পুরো সময়টা যে ডাক্তার আমার পাশে থেকে অকুণ্ঠ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি নারায়ণ ব্যানার্জি। মৃত্যুর দুদিন আগে যখন দেখতে এসেছেন, যাওয়ার সময় বাবা ডেকে বললেন, ‘আপনি তরুণ আর তাপসকে চেনেন? একটু খবর দেবেন?’ তিনি তো সত্যি চেনেন না। ডা. ব্যানার্জি চলে যাওয়ার পর আমি জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে? আমি কি বড় কাকা, তপু কাকাকে ডাকব?’ বললেন, ‘গদা, তপা, রমা ওদের দেখো। ওরা আমার ছোট ভাইবোন।’

আমি একটু হেসেছিলাম। মানুষ ভাইবোনের হাতে ছেলেমেয়ের ভার দিয়ে যায়।

এ তো উল্টো। আর কাকা-পিসিরা জীবনে তো প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত। কয়েক ঘণ্টা পরেই বাবার কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়।

তবে কাকাদের মুখেই বাবার ছাঁচ দেখি। কাকাদেরও বয়স হচ্ছে। একজন ৮০-র ওপর। আরেকজন ৭০ ছাড়িয়েছেন। অসুস্থতা সামলে উঠেছেন। কাজ অব্যাহত। আমার পিসি এখন অনেক কিছু ভুলে গেছেন। গান গাইতে পারেন না। এখনো ভাইয়েরাই তার (পিসির) অ্যাসেট। কিছুক্ষণ এদের সঙ্গে থাকলে মনে হয়, সব আগের মতো আছে। বাবার কথাটা আমার জীবনে অন্যভাবে সত্যি হলো।

এদের মুখের দিকে তাকালে মনে হয়, পৃথিবীতে এখনো শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় কোম্পানির ছাঁচটা আছে। আমার পিসির হাসি এবং দাপট— একই সঙ্গে অতুলনীয়।

প্রশ্ন: জীবনের পথে চলতে চলতে কোন কোন সময়ে, কখন বাবার অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেন?

ললিতা: যখন আমার আনন্দের দিনগুলোয় বাবাকে পাই না। যখন নতুন কিছু পাই— কোনো আনন্দ সংবাদ, নতুন কোনো সুখ।

বাবার ইচ্ছে ছিল দুই নাতনি বড় হলে তাদের বয়ফ্রেন্ডরা আসবে— কোনো অশোক আর বিমল। তাদের সঙ্গে মিশবেন। অশোক আর বিমল এসে গেছে। মানে সাগর (ললিতার মেয়ে সুচরিতার স্বামী সাগর রায়) আর সন্দীপ (মল্লিকার মেয়ে নিশার স্বামী সন্দীপ চক্রবর্তী), মেশার লোকটাই নেই। এখন আমারও দুই নাতি। দিদির এক নাতনি।

আমার ছেলের চেয়ে সামান্য বড় এক যুবক-লেখক যখন শ্যামলকে ‘গুরু’ মানে শুধু লেখা পড়ে— এটা বাবাকে কীভাবে বলতে পারি— এ সবই। (সংক্ষেপিত)

 

[ছোট কাগজ গল্পসরণির শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বিশেষ সংখ্যা: দুই, ১৮২৮/২০১৮ থেকে নেয়া]