অলিভার বার্কম্যান । অনুবাদ: শওকত হোসেন
লাখো মানুষ তার পরাবাস্তব গল্পগুলো পড়ছে কিন্তু নিজের জনপ্রিয়তায় বিমূঢ় জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি। নোবেল পুরস্কারের বরাবরের প্রিয় প্রার্থী তার বইয়ের সংকট সময়ে আবেদন সৃষ্টির কারণ তুলে ধরেছেন।
ম্যানহাটনে আমাদের সাক্ষাতের আগের দিন শেষ সকালে সেন্ট্রাল পার্কে দৌড়াতে গেলে জনৈক মহিলা হারুকি মুরাকামির পথ আটকে দাঁড়ান। ‘মাফ করবেন,’ জানতে চান তিনি, ‘আপনিই তো সেই বিখ্যাত জাপানি উপন্যাসিক, তাই না?’ প্রশ্ন করার কিঞ্চিৎ বেখাপ্পা ঢঙই বটে, তবে মুরাকামিও স্বভাবসুলভ জুতসই ভঙ্গিতেই উত্তর দেন। ‘আমি বললাম, নাহ, আমি আসলে একজন লেখকমাত্র। যাক, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুশি হলাম! তারপর করমর্দন করলাম আমরা। লোকে যখন এভাবে আমার পথ রোধ করে, খুবই অবাক লাগে, কারণ আমি তো একজন সাধারণ মানুষ। লোকে কেন আমার সঙ্গে পরিচিত হতে চায় সত্যিই বুঝি না।’
একে মেকি সৌজন্য ভাবা ভুল হবে আবার খ্যাতির ব্যাপারে সত্যিকারের বিড়ম্বনা ভাবাও সমান ভুল হবে। বলা যেতে পারে, ৬৯ বছর বয়সী মুরাকামি তার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তাকে উপভোগ বা অপছন্দ, কোনোটাই করেন না। তার দৃষ্টিভঙ্গি কৌতূহলী, তবে কিছুটা বিহ্বল দর্শকের মতো— তার অবচেতন থেকে উঠে আসা পরাবাস্তব কাহিনী এবং জাপানি ও তর্জমায় লাখ লাখ পাঠকের গোগ্রাসে গেলার বাস্তবতার দুটোই। মুরাকামির প্রধান চরিত্রগুলোর সমান নিস্পৃহ দর্শক হওয়ার ব্যাপারটা কাকতালীয় নয়: প্রশান্ত, সামাজিকভাবে প্রত্যাহূত এবং প্রায়ই নামহীন মধ্যবয়সী কেউ; ব্যাখ্যাহীন ফোনকল কিংবা হারানো বিড়ালের খোঁজে নেমে বিস্ফোরিত কুকুর, ভেড়ার পোশাকে মানুষজন, হেঁয়ালিময় তরুণী আর অবয়বহীন মানুষে ভরা স্বপ্নের মতো সমান্তরাল বিশ্ব দেখে যাকে শঙ্কিত হওয়ার চেয়ে বরং কৌতূহলীই ঠেকে।
মুরাকামির ধারণা, এ সম্মোহনী সাহিত্যিক ফর্মুলা বিশেষ করে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সময় আবেদন সৃষ্টি করে। ‘নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পাল্টে যাওয়ার সময় রাশিয়ায় আমি জনপ্রিয় ছিলাম— ভীষণ বিভ্রান্তি চলছিল আর ধন্ধে থাকা লোকজনই আমার বই পছন্দ করে,’ আমেরিকান লিটারেরি এজেন্টের অফিসে পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলছিলেন তিনি। ‘জার্মানিতে বার্লিন প্রাচীর লুটিয়ে পড়ার সময় বিভ্রান্তি ছিল— লোকে আমার বই পছন্দ করেছে।’ একথা ঠিক হলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা এবং ব্রেক্সিট ব্রিটেন তার ১৪তম উপন্যাস ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল ও টেড গ্রোসেন অনূদিত এবং ৯ অক্টোবর যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত মুরাকামির রহস্যময়তার কড়া ডোজ ৬৭৪ পৃষ্ঠার কিলিং কমেন্ডোটোরের সুফলা বাজার প্রমাণিত হবে।
তার গল্পের প্লটের সারসংক্ষেপ টানার প্রয়াস ফায়দাহীন। তবে এটুকু বলাই হয়তো যথেষ্ট হবে যে বইয়ের নামহীন কথক সম্প্রতি স্ত্রী পরিত্যক্ত এক শোকার্ত পোর্ট্রেট আঁকিয়ে, সবকিছু ছেড়ে তার পূর্ব জাপানের পাহাড়ে পালানোর প্রয়াস শেষ পর্যন্ত এক রহস্যময় প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, রাতে আপনাআপনি বেজে ওঠা ঘণ্টা, ভূগর্ভস্থ মন্দির— মুরাকামির ট্রেডমার্ক কুয়ো ও মাটির নিচের বিভিন্ন প্রকোষ্ঠসহ হারানো বিড়াল এবং চিলেকোঠায় পাওয়া চিত্রকরের একটা পেইন্টিংয়ের ক্যানভাস থেকে উঠে আসা অদ্ভুত আলাপী দুই ফুট দৈর্ঘ্যের সামুরাই সৈনিক নিয়ে এক লম্বা-চওড়া অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়েছে (তরুণ বয়স থেকে এফ. স্কট ফিটজেরল্ডের ভক্ত পাঠক লেখকের পক্ষে এসব উপকরণ দ্য গ্রেট গ্যাটসবির প্রতি শ্রদ্ধাই প্রকাশ করে— নতুন উপন্যাসটি এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে এ দাবি কিছুটা সম্ভাবনা হারাতে থাকে।)
রাজনৈতিক উদ্বেগের সময় মুরাকামির উপন্যাস জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ব্যাপারটা বোধগম্য: পাঠকের ওপর এটা সম্মোহনী, অনেক সময় প্রায় ঘোরের প্রভাব সৃষ্টি করে, আবেগীয় বৈচিত্র্যহীনতায় ফিকে হয়ে ওঠা প্লটের বিকাশের রহস্যময়তা বাস্তব দুনিয়া এবং এর বাড়াবাড়ি থেকে এক ধরনের স্বস্তিকর আশ্রয় মনে হতে পারে। একবার এক সাক্ষাৎকেরকারীকে মুরাকামি বলেছিলেন, তিনি বেসবল পছন্দ করেন, ‘কারণ খেলাটা একঘেয়ে’ এবং তার ২০০৭ সালের স্মৃতিকথা হোয়াট আই টক হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং— অতিরিক্ত আবেগ থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় হিসেবে দৌড়ের আনন্দ, যদি ঠিক শব্দ হয়ে থাকে— এর তারিফ করেছে।
যাহোক, মুরাকামি আপনাকে তার রচনার রহস্যময় উপাদানের মানে খোলাসা করবেন আশা করা ঠিক হবে না। অবচেতনে অটল বিশ্বাস থেকে কাজ করেন তিনি: ওই অন্ধকার অন্তঃস্থ প্রাচীর থেকে কোনো ইমেজ উঠে এলে স্বভাবতই সেটা অর্থপূর্ণ ধরে নেন এবং বিশ্লেষণের বদলে বরং যা উঠে এসেছে সেটাই তুলে রাখা তার দায়িত্ব (এটা ‘বুুদ্ধিমান লোকের’ কাজ)। যেমন— তার ২০০২-এর উপন্যাস কাফকা অন দ্য শোরে একটা দৃশ্যে আকাশ থেকে শিলাবৃষ্টির মতো মাছ খসে পড়তে থাকে। “লোকে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মাছ কেন? আর আকাশ থেকেই বা পড়ছে কেন?’ আমার কাছে এর কোনো জবাব নেই। আমার স্রেফ মনে হয়েছে আকাশ থেকে একটা কিছু পড়তে হবে। তারপর ভেবেছি: আকাশ থেকে কী পড়া উচিত? নিজেকে বলেছি: মাছ! মাছই দারুণ হবে।”
‘কি জানেন, আমার মনে এমন ভাবনা এলে— গভীরতর অবচেতন থেকে আসা কিছু— হয়তো বা এতে একটা কিছু সারবত্তা থাকতে পারে, কিছু পাঠকের ভেতর যা অনুরণন তোলে। সুতরাং পাঠক ও আমার একটা গোপন মিলন কেন্দ্র রয়েছে, অবচেতনের গোপন একটা জায়গা এবং ওই জায়গায় হয়তো আকাশ থেকে মাছ ঝরে পড়াই পুরোপুরি মানানসই। একত্রিত হওয়ার জায়গাটাই আসল, প্রতীক বা এ ধরনের কিছুর বিশ্লেষণ নয়। এ কাজটা আমি বুদ্ধিজীবীদের হাতে ছেড়ে দেব।’ নিজের সম্পর্কে মুরাকামির ধারণা অনেকটা পাইপলাইনের মতো কিছু— অবচেতন এবং পাঠকের ভেতর একটা সংযোগ— ব্যাপারটা এত স্পষ্ট যে কথা প্রসঙ্গে নিজেকে ‘স্বাভাবিক গল্প বলিয়ে’ উল্লেখ করেই শোধরানোর জন্য বিরতি পর্যন্ত দিয়েছেন। ‘নাহ, আমি গল্পকথক নই। আমি গল্প দর্শক।’ ওইসব গল্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্বপ্নের সঙ্গে স্বপ্নের দর্শকের সম্পর্কের মতো, হয়তো এতেই রাতে তার কখনো স্বপ্ন না দেখার দাবির ব্যাখ্যা মেলে। ‘বেশ, হয়তো মাসে এক-আধবার স্বপ্ন দেখি,’ বলেন তিনি। ‘কিন্তু এমনিতে স্বপ্ন দেখি না। মনে হয় জেগে জেগে স্বপ্ন দেখি বলেই ঘুমোনার সময় স্বপ্ন দেখি না।’
লেখক হিসেবে মুরাকামির আবির্ভাবের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষণগুলো তার সজাগ নিয়ন্ত্রণাতীত কোথাও থেকে উঠে আসার এ অনুভূতির অংশীদার। কিয়োতোয় ১৯৪৯ সালে জাপানে যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকান দখলদারির সময় মুরাকামি তার পোষা প্রাণী পিটার ক্যাটের নামে একটা জ্যাজ ক্লাব খুলে করপোরেট ক্যারিয়ার প্রত্যাখ্যান করে মা-বাবাকে হতাশ করেন। কয়েক বছর পর একটা বেসবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে আমেরিকান খেলোয়াড় ডেভ হিল্টনের ব্যাট থেকে একটা বল আকাশে ভাসতে দেখে সহসা উপন্যাস লেখার চিন্তা মনে আসে। এ অলীক ভাবনাই হিয়ার দ্য উইন্ড সিং (১৯৭৯)-এর দিকে নিয়ে গেছে তাকে। এর অল্প পরে জাপানি সাহিত্য পত্রিকা গানযো এক সাপ্তাহিক ছুটির দিন টেলিফোনে ঘুম ভাঙিয়ে নতুন লেখক পুরস্কারের জন্য তার উপন্যাস মনোনীত হওয়ার খবর জানায়। ফোন রেখে স্ত্রী ইয়োকোর সঙ্গে হাঁটতে চলে যান তিনি। একটা আহত কবুতর দেখতে পেয়ে সেটাকে হাসপাতালে নিয়ে যান তারা। ‘রোববারের ওই দিনটা ছিল ঝলমলে, পরিষ্কার। গাছপালা, দালানকোঠা আর দোকানপাটের জানালাগুলো বসন্তের রোদে ঝিলিক খেলছিল,’ বেশ কয়েক বছর পর লিখেছেন তিনি। ‘তখনই ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢোকে। পুরস্কার জিততে যাচ্ছি। কিছুটা হলেও সাফল্যের দেখা পাওয়া একজন উপন্যাসিক হতে যাচ্ছি। চিন্তাটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ ছিল কিন্তু ওই মুহূর্তে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে এমনটা ঘটবে। একদম নিশ্চিত। আদৌ তাত্ত্বিক কিছু নয়, বরং সরাসরি এবং স্বজ্ঞামূলকভাবে।’
জাপানে সমালোচনামূলক প্রশংসা দেরিতেই এসেছে। ‘জাপানি সাহিত্যিকজগতে আমি কুলাঙ্গার ছিলাম,’ স্মৃতিচারণ করেছেন মুরাকামি। অংশত তার বইগুলোর জাপানে শিকড় থাকার কোনো ধারণার অনুপস্থিতি এবং সেগুলোর অসংখ্য আমেরিকান রেফারেন্স ‘বড্ড বেশি আমেরিকান ধরনের’ ভাবা হয়েছে (বিপরীতে আজকাল নোবেল পুরস্কারের সামনের কাতারের প্রার্থী হিসেবে তার নাম আলোচিত হচ্ছে, যদিও লেখালেখির দিকে মনোযোগ দিতে চান বলে এ বছর নোবেল পুরস্কার স্থগিতের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত ‘বিকল্প নোবেল’ থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন)। ‘যুদ্ধের অব্যবহিত পরে জন্ম নেয়ায় আমরা আমেরিকান সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছি: আমি জ্যাজ আর আমেরিকান পপ শুনতাম, আমেরিকান টিভি শো দেখেছি— অন্য এক বিশ্বের জানালা ছিল সেটা। তবে যা-ই হোক, একসময় নিজের স্টাইলের দেখা পাই আমি। জাপানি বা আমেরিকান নয়, আমার স্টাইল।’
সমালোচকরা যা-ই ভেবে থাকুন না কেন, তার বাণিজ্যিক সাফল্য ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে এবং ১৯৮৭ সালে তরুণ বয়সের ভালোবাসার স্মৃতিকাতরতার করুণ কাহিনী নরওয়েজিয়ান উডের সুবাদে সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে যায়। প্রকাশের এক বছরের মধ্যেই বইটির ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়ে যায়। এক ধরনের বাস্তববাদী লেখা হয়েছে এটি, উপন্যাসের বেলায় মুরাকামি আর কখনো যে ধারায় ফেরেননি— যদিও পেছনে তাকিয়ে মাছ ঝরে পড়া বা অলৌকিকভাবে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া নারীর গল্পগুলো বাস্তব না হওয়ার ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। ‘এটা আমার বাস্তবতা,’ বলেছেন তিনি। ‘আমি অনেকটাই গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মতো, তবে নিজের লেখাকে তিনি জাদুবাস্তবতা মনে করেননি। এটা ছিল তার বাস্তবতা। আমার স্টাইল আমার চোখের চশমার মতো: ওই লেন্সের ভেতর দিয়ে জগৎ আমার কাছে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
সম্মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখির দৈনন্দিন রুটিন নিখুঁত করে তুলতে শুরু করেন তিনি, যে কারণে তর্কসাপেক্ষে যেকোনো উপন্যাসের মতোই তিনি বিখ্যাত: রাত ৪টায় ঘুম থেকে উঠে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টায় দিনে ১০ পৃষ্ঠা লিখে তারপর কমপক্ষে ছয় মাইল দৌড়ানো কিংবা হয়তো সাঁতার কাটা। ‘একটা জ্যাজ ক্লাবের মালিক হওয়ায় জীবনটা বড্ড বেশি অগোছালো আর বিভ্রমময় ছিল— রাত ৩টা বা ৪টায় ঘুমোতে যাওয়া— তো যখন লেখক হলাম, নিরেট জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি: খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, সকাল সকাল ঘুমোতে যাওয়া, হররোজ ব্যয়াম করা,’ বলেন মুরাকামি। ‘আমার বিশ্বাস, শক্তিশালী কিছু লিখতে আমাকে দৈহিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে।’ তিনি হয়তো স্রেফ পাইপলাইন হতে পারেন কিন্তু ওই পাইপলাইনকে ভালো রাখা তার দায়িত্ব। বাইরে থেকে সেটা কাজ করছে বলেই মনে হয়— তাকে ৫০ বছর বয়সী বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে— কিন্তু ছন্দটুকু গভীর সুখেরও উৎস, যেটা সম্ভবত তার বইগুলোর দৈর্ঘ্যের ব্যাখ্যা জোগায়। ‘ওইসব দিন প্রীতিকর, তো যত বেশি দিন তত আনন্দ আর আরো বেশি পৃষ্ঠা,’ বলেন তিনি। ‘লোকে কেন আমার দীর্ঘ উপন্যাস পছন্দ করে সত্যিই জানি না।’ কিন্তু এতটুকু ঔদ্ধত্যের আভাস ছাড়াই বললেন কথাটা, ‘আমি বেশ জনপ্রিয়।’
অতিপ্রজ রুটিন তাকে বাড়তি ক্ষমতা জোগায়, সেই ক্ষমতা ছোটগল্প, নন-ফিকশন (সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ১৯৯৫ সালে টোকিও মেট্রোর সারিন গ্যাসে ক্ষতিগ্রস্ত এবং সেই সঙ্গে এর জন্য দায়ী আউম শিনরিকো কাল্টের সদস্যদের সঙ্গে অসংখ্য সাক্ষাৎকেরভিত্তিক আন্ডারগ্রাউন্ড) লেখা এবং পাঠকদের কেবল তার বই সম্পর্কিত নয়, বরং ব্যক্তিগতভাবে এক ধরনের সমস্যা সমাধানকারী ভূমিকায় প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কাজে লাগান (‘আমার সামনেই তিরিশ অপেক্ষা করছে কিন্তু অর্জন করতে পেরেছি বলে মনে হয় এমন কিছুই নেই,’ ৩ হাজার ৭১৬টি প্রশ্নের একটা শুরু হয়েছে এভাবে, জাপানে ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটা ই-বুকে এর উত্তর দিয়েছেন তিনি)। মুরাকামি জাপানি ভাষায় আমেরিকান কাহিনীর একজন নেতৃস্থানীয় অনুবাদকও: ফিটজেরল্ড, ট্রুম্যান কাপোতে, গ্রেস প্যালি, জিডি সেলিঞ্জার ও অতিসম্প্রতি জন শিভার।
ইংরেজি তর্জমায় নিজের লেখা পড়তে পছন্দ করেন তিনি, কারণ মনে হয় আনকোরা উপন্যাস পড়ছেন। ‘এসব বড় বই অনুবাদে এক বা দুই বছর লাগে,’ বলেছেন তিনি। ‘সুতরাং আমি তর্জমা পড়ার সময় নাগাদ সবকিছু ভুলে যাই’— পৃষ্ঠা ওল্টানোর ভঙ্গি করছিলেন তিনি। ‘এরপর কী হবে?’ তখনই অনুবাদক ফোন করেন: ‘হাই হারুকি, আমার অনুবাদ কেমন লাগল?’ আমি উত্তর দিই: ‘দারুণ গল্প! খুবই ভালো লাগছে!’
অনিবার্যভাবে যেমন হওয়ার কথা, আমাদের আলাপচারিতা আমেরিকার রাজনীতি প্রসঙ্গে বাঁক নিতেই অনেকটা লেখকসুলভ দায়িত্ব হাতে তুলে নেন তিনি। যে দেশের সংস্কৃতিকে এত ভালোবাসেন, সে দেশের সংকট নিয়ে তার চিন্তার কথা জানতে চাইলে ঝাড়া ১ মিনিট ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকলেন। তারপর বললেন: ষাটের দশকে আমি তরুণ ছিলাম যখন, সেটা ছিল আদর্শবাদিতার বয়স। আমরা বিশ্বাস করেছি চেষ্টা করলে দুনিয়াটা ভালো হয়ে উঠবে। আজকের দিনে লোকে এটা বিশ্বাস করে না। আমার মনে হয় এটা খুবই দুঃখজনক। লোকে বলে, আমার বইগুলো রহস্যময় কিন্তু ওই রহস্যময়তা ছাপিয়ে শ্রেয়তর একটা জগৎ থাকা উচিত। সেই ভালো জগতে যাওয়ার আগে আমাদের স্রেফ রহস্যময় অভিজ্ঞতা নিতে হবে। আমার গল্পগুলোর এটাই মৌলিক কাঠামো: ‘আলোর দেখা পেতে হলে আপনাকে অন্ধকার হয়ে মাটির তলা দিয়েই যেতে হবে।’
মুহূর্তের সঙ্গে মানানসই এক ধরনের আশার মতো মনে হয়েছে একে। মুরাকামির কোনো প্রধান চরিত্র এটুকু জেনেই উপন্যাস শেষ করে এমন নয়, নিখুঁত সুখের ক্ষেত্রে তো নয়ই; কিন্তু সাধারণত তাকে অকেজো স্বপ্নজগৎ থেকে মুক্ত করে প্রশান্তি ও স্থিরতার জায়গায় পৌঁছে দেয়। জীবন হয়তো চিররহস্যময়, মুরাকামির বইগুলো যেন বলতে চায়, দুঃস্বপ্নের শেষ আছে। হারানো বিড়াল খুঁজে পেতে পারেন আপনি।






