অনুবাদ: এম এ মোমেন

এ চিঠির ধরন ভিন্ন। এগুলো প্রিয়জনকে লেখা চিঠি নয়। ১৯৭১ সালে সমর সেন সম্পাদিত ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্য ফ্রন্টিয়ার’-এ রাজনৈতিক আদর্শপুষ্ট পাঠকরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, রাষ্ট্রের বুর্জোয়া চরিত্র, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সম্ভাবনা ও দেশটির ভবিষ্যৎ— এ ধরনের বিভিন্ন বিষয়ে চিঠিপত্র লেখেন। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের আশাবাদ ও সংশয় দুই-ই ছিল। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীকে হটানোর পর সাধারণ মানুষ আবার কোনো শাসকের শোষণের শিকার হতে পারে, এ আশঙ্কাও তারা প্রকাশ করেন।

ফ্রন্টিয়ারের রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যারা সহমত ছিলেন, এমনকি বাংলাদেশেও তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক ডিগবাজি দিয়ে বিভিন্ন সময় সুবিধাবাদের রাজনীতি অনুসরণ করেছেন এবং তাদের সেই রাজনৈতিক আদর্শের বিপরীতে অবস্থানকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রী হয়েছেন। মুনতাসির মামুন সংকলিত ও সম্পাদিত Media and the Liberation war of Bangladesh, Volume 2 (Selection from the Frontier) থেকে কয়েকটি চিঠির বাংলা অনুবাদ উপস্থাপিত হলো—

১০ এপ্রিল ১৯৭১, কলকাতার সত্যেন সিনহার যে চিঠি প্রকাশিত হয়েছে, তার অনুবাদ

অত্যাচারী-নিপীড়কের বিরুদ্ধে কেমন করে লড়াই করতে হয়, পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তা দেখিয়ে দিয়েছে। লড়াই করার এ শক্তি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিবাদন জানাতে আমাদের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এগিয়ে এসেছে। কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরে যদি একই ধরনের অভ্যুত্থান ঘটে, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো কী করবে, তা জানা নেই। কেন্দ্র ও রাজ্য সম্পর্কে কথা যদি বিবেচনা করতে হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সরকারের চরিত্রের মধ্যে ব্যবধান সামান্যই। রাইফেল চালিয়ে কাশ্মীরিদের লড়াই গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, অন্য যেকোনো সংগ্রামও এভাবে নস্যাৎ করে দেয়া হবে।

নয়াদিল্লির অনুরাধা নন্দী ও শিখা রায়ের চিঠিও একই দিনে প্রকাশিত

বাংলাদেশের বীরভ্রাতা ও বীরভগ্নিদের জন্য আমাদের শ্রদ্ধা ও গুণমুগ্ধতার কথা জানাতে চাই। নিজ দেশে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা একই উদ্যম ও প্রত্যয় নিয়ে লড়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। তারা লড়বে লক্ষ কোটি মানুষের মুক্তি ও সমৃদ্ধির জন্য।

ভিয়েতনাম আমাদের শিক্ষা দেয়, পাশবিক শক্তি কখনো জনগণের স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে পারে না। উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।

ফ্রন্টিয়ারের ২৪ এপ্রিল ১৯৭১ সংখ্যায় প্রকাশিত খড়ফপুর মেদিনীপুর থেকে পাঠানো বিবেক রক্ষিতের চিঠি

সম্প্রতি পূর্ব বাংলায় যা ঘটেছে, তাতে আমার মনে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলোর উদয় হয়েছে: 

১. সাম্প্রতিক উড়োজাহাজ হাইজ্যাক করার ঘটনাটি (কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী হাইজ্যাকাররা উড়োজাহাজটি লাহোরে নিয়ে আসে এবং সেখানে উড়িয়ে দেয়) কি পাকিস্তানের উৎসাহ ও প্ররোচনার ফল? তাই যদি হয়, এতে পাকিস্তানের স্বার্থ কী? এর ফলাফল তো পাকিস্তানের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে?

২. শেখ মুজিবের শ্রেণী চরিত্র কী? আওয়ামী লীগের দাবিনামায় শ্রমজীবী শ্রেণী, কৃষকদের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির কোনো প্রতিশ্রুতি রয়েছে কি?

৩. জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলে সেখানকার শ্রমিক ও কৃষকের তাত্ক্ষণিক কী লাভ হবে?

৪. কোনো প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন চালাতে গেলে অন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তা নিয়ে কি পূর্ণ নৈতিক শক্তি ধারণ করা সম্ভব? সাম্রাজ্যবাদ কি আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেবে?

৫. পাকিস্তান কেন সাম্রাজ্যবাদী সামরিক জোট থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে, অন্যভাবে বলতে গেলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কেন পাকিস্তানের প্রতি অবান্ধব হয়ে উঠছে? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী অনেক ঘাঁটি এর মধ্যেই গুটিয়ে নেয়া হয়েছে।

৬. ভারত কি আসলে পূর্ব বাংলায় হস্তক্ষেপ করছে, নাকি করছে না? অধিকাংশ সামরিক সহায়তা কি ভারত দিচ্ছে, না দিচ্ছে না? বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ প্রশ্নে কেন একই রকম জবাব দিচ্ছে? কেবল ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকাই কেন সংকট অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে? পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিফৌজের বীরত্বপূর্ণ লড়াই কেন সে দেশের কেন্দ্রে হচ্ছে না?

৭. আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত স্বাধীন বাংলাদেশ কি ভারতের উপনিবেশ না হয়ে টিকে থাকতে পারবে?

৮. আমরা কি এ উপসংহারে পৌঁছতে পারি যে, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ভারত উপমহাদেশকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছিল। ভারত-পাকিস্তান বিভাজনে এখন আর তাদের স্বার্থ নিহিত নেই? বাংলাদেশ সৃষ্টি করে পূর্বাঞ্চলের একটি শ্রেণীকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়া হবে, এ অঞ্চলে ক্রমেই বেড়ে ওঠা কৃষক বিপ্লব নস্যাৎ করার এ এক নাশকতামূলক কৌশল।

২৪ এপ্রিল ১৯৭১ প্রকাশিত আসানসোলের মাধবী সেনের চিঠি

যেভাবেই রঙ মাখানোর চেষ্টা করা হোক না কেন, এখন এটা আর অস্বীকার করা যাবে না, চীন বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঙ্গে নেই; বরং ইসলামাবাদের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ নিয়েছে। ইতিহাসের এ কী পরিহাস!

চীন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ইসলামাবাদের শাসকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে, কোনো অনিশ্চিত শর্তে নয়; বরং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ এনে ভারতকে গালাগাল দিয়েছে। চীনের ভারতবিদ্বেষ (যার জন্য দায়ী শাসকশ্রেণীর প্রতিক্রিয়াশীল নেতাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি ও কর্মকাণ্ড) তার দৃষ্টিকে ঘোলাটে করে রেখেছে। যে চীন ঔপনিবেশিক ও আধা ঔপনিবেশিক শাসনে পিষ্ট মানুষের মুক্তির কথা বলে, সেই বিপ্লবী শক্তি কেমন করে সামরিক ফ্যাসিস্ট জান্তাকে সমর্থন করে, যারা আধুনিক যুদ্ধের অস্ত্র ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে মানবতার বিরুদ্ধে গণহত্যার মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ চালিয়ে যায়, যে অস্ত্রের সরবরাহকারী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, এমনকি চীনও। সেই চীন, কেমন করে উদ্ধত কণ্ঠে পুরে বিষয়টিকে ‘পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে আখ্যা দেয়।

১ মে ১৯৭১ (মিস) সুমনা মজুমদারের একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। তিনি রানাঘাট থেকে চিঠিটি লিখেছেন

দেশের ভেতরে ও বাইরে বিপ্লবী আদর্শ চর্চার জন্য আমি গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের গুণমুগ্ধ। কিন্তু পূর্ব বাংলার প্রশ্নে চীনের রাজনীতি আমাকে হতবুদ্ধি করে রেখেছে। ‘পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীন পাকিস্তান সরকারকে সহায়তা করছে’— চীন বলছে, এটি তাদের বিরুদ্ধে একটি অপবাদ। বেশ, চীনের কাছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু অন্যত্র চীন বলেছে, ‘চীন ও চীনের জনগণ সবসময় পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের জনগণকে বিদেশী আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রবলভাবে সমর্থন করে।’ এ দুটি বিষয়ের সমন্বয় কেমন করে হবে? অবশ্যই তা পরস্পরবিরোধী।

পূর্ব বাংলার মানুষ একটি ন্যায়সম্মত কারণের জন্য লড়াই করছে। কারণ গত ২৩ বছর পশ্চিম পাকিস্তান তাদের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। আর এ দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ লড়াই, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের সমার্থক।

কাজেই পাকিস্তানের জাতীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব অবশ্যই পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যায়। অধিকন্তু পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে গঠিত পাকিস্তানকে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র বলা যায় না। উপমহাদেশের মুসলমান ধনবাদীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ইসলাম ধর্মীয় পরিচিতি রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে বরং দুটি পাকিস্তান হতে পারত। কাজেই যত তাড়াতাড়ি বর্তমানের পাকিস্তান ভেঙে দুটি জাতি ও রাষ্ট্রে পরিণত হয়, ততই মঙ্গল— বিপ্লবী শক্তির বিকাশের জন্যও।

২৪ এপ্রিল ১৯৭১ ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত কলকাতার মনি গুপ্তের চিঠি

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাত মাসের মধ্যেই (প্রকৃতপক্ষে সাড়ে চার মাস) পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দুর্ভাগ্য তাদের আরো একটি দুর্যোগের শিকার হতে হয়েছে। এবার রাজনৈতিক দুর্যোগ। বাস্তবিকই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ যে মহাদুর্যোগের মোকাবেলা করছে, তাতে বিপ্লবী মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্টরা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না।

যে সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে টেনে আনা হয়েছে, তার প্রকৃতি কী? একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, পাকিস্তানের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং জনগণের বিপ্লবী মনোভাবকে নিজেদের প্রয়োজনে শোষণ করছে সাম্রাজ্যবাদী, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তাদের পোষ্য কুকুরগুলো। আর কাজটি তারা করছে ‘মুক্তির সংগ্রাম’, ‘মুক্তি ফৌজ’, ‘গেরিলা যুদ্ধ’— এ ধরনের বিপ্লবী বুলি আমদানি করে। দেখে মনে হয়, রাতারাতি সাম্রাজ্যবাদীরা মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট হয়ে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ প্রয়োগ করছে। চীনকে জড়িয়ে তারা এর মধ্যেই তাদের কল্পিত সাফল্যের আনন্দ-উৎসব করতে শুরু করেছে। তারা বলছে, ‘দেখো, চীন কেমন উভয় সংকটে পড়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা না পারছে সমর্থন করতে, না পারছে এর বিরোধিতা করতে।’

তবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের পোষ্য কুকুর পৃথিবীর বিপ্লবী জনগণকে যত ভ্রুকুটিই করুক না কেন, তারা ন্যক্কারজনকভাবে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যোদ্ধাদের বোকা বানানো যাবে না। কিসের কী পরিণতি, তাদের জানা আছে। পাকিস্তানের মহান জনগণ অবিলম্বে বুঝতে পারবে কোন ষড়যন্ত্রে তারা দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। তারা অবশ্যই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নিরন্তর সংগ্রামে যোগ দেবে।

২৪ এপ্রিল ১৯৭১-এ প্রকাশিত বিশাখাপত্তম থেকে আবদুল রেহমানের চিঠি&dquote;&dquote;

বাংলাদেশে জাতীয় বুর্জোয়া নেতৃত্বে পরিচালিত স্বাধীনতা আন্দোলনের উদ্দেশ্য সামরিক শাসন হটিয়ে কিছু দাবিদাওয়া আদায় করে তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে সংসদীয় গণতন্ত্র কায়েম করা। সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করার পর শ্রমজীবী জনতার উচিত হবে জমিজমা, শিল্প খনি, বন্দর— সব দখল করা এবং জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার জন্য অস্ত্র হাতে সজাগ থাকা। বিপ্লবী জনতাকে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকে পরিচালিত করতে হবে। তাহলেই কাজটি সম্পন্ন হবে। তারা যদি এ সুযোগ হাতছাড়া করে, তাহলে জাতীয় বুর্জোয়াশক্তির বিরুদ্ধে আবারো আত্মত্যাগ করতে হবে।

৮ মে ১৯৭১ ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত এসপি বসুর চিঠি। চিঠিটি বল্লভপুর, মেদিনীপুর থেকে পাঠানো। চিঠির শিরোনাম ‘পূর্ব বাংলা’। বাংলাদেশে যা ঘটছে, তা নিয়ে আমার কতগুলো প্রশ্ন রয়েছে—

১. শেখ মুজিবের শ্রেণী চরিত্র কী? তিনি কি জাতীয় বুর্জোয়া কিংবা একচেটিয়া পুঁজির প্রতিনিধিত্ব করেন? বাংলাদেশে কি মুত্সুদ্দি বুর্জোয়ার অস্তিত্ব রয়েছে? যদি থেকে থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগের ছয় দফা তাদের স্বার্থকে কতটা শক্তিশালী করে তুলবে?

২. জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রক্রিয়ায় অস্ত্র চলে গেছে শ্রমিক ও কৃষকের হাতে। আওয়ামী লীগের উপরের দিকের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে এসেছেন। বাংলাদেশের মাটি থেকে পকিস্তানি সৈন্য হটাবার পর তারা কি নিজেদের বুর্জোয়া নেতৃত্বের কাছে নিভৃতে সঁপে দেবেন?

৩. এটা কি সত্য যে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ কেন বেছে নিয়েছেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মাও জে দং বলেছেন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে চীনের জনগণ সে ব্যবস্থায় সুলভ গণতান্ত্রিক অধিকার ও কথা বলার স্বাধীনতা পায়নি? অব্যাহত সামরিক শাসনে পাকিস্তান কি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, যেমন সামরিক প্রশাসনের সমালোচনা করার অধিকার পেয়েছে?

৪. এটা কি সত্য এফএলএন (আলজেরিয়ার ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট) নাসেরের মতো (মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের) কমিউনিস্টবিরোধীর কাছ থেকে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রকাশ্যে সহযোগিতা গ্রহণ করছে এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর আলজেরিয়া সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের উপনিবেশে পরিণত হয়নি?

৫. এটা কি সত্য নয় যে, পাকিস্তান সিয়াটোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি এবং সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে নিয়মিত অস্ত্র সহযোগিতা পেয়ে আসছে?

৬. স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে সাধারণত সীমান্তবর্তী এলাকা সংকটের পীঠস্থান হয়ে ওঠে না— যেমন আমরা দেখেছি কম্বোডিয়া, ফিলিস্তিন ও বার্মায়?

৭. মার্ক্সীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকার আছে কি নেই? ভিন্ন জাতীয়তার পরিচিতির জন্য যা প্রয়োজন, বাংলাদেশের কি তা আছে?

৮. এটা কি সত্য যে, পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে হাইজ্যাক করা উড়োজাহাজটি উড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং হাইজ্যাকারদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হয়েছে?

৮ মে ১৯৭১-এ প্রকাশিত ২৪ পরগনার সুমন ব্যানার্জির চিঠি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে এখন চীনবিরোধী মন্তব্যের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। কখন, কেন, কোন প্রেক্ষাপটে কমিউনিস্টরা একটি জাতীয় আন্দোলনকে সমর্থন করবে?

তাদের কাছে ‘জাতীয় সমস্যা হচ্ছে প্রলেতারিয়েত বিপ্লবের একটি সাধারণ অংশ, প্রলেতারিয়েত একনায়কত্বের সমস্যা’ (স্ট্যালিনের রচনা, লেনিনবাদের সমস্যা)।

... বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে এ প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হলে আমরা দেখতে পাই, ছয় দফা কর্মসূচি কিংবা বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণাপত্রে পৃথিবীর প্রধান শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি নেই। বরং তাজউদ্দীন ও ভাসানীর মতো মানুষ প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মিস্টার হিথের কাছে নৈতিক ও বস্তুগত সহায়তা চেয়েছেন। আসলে তারা মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের সহায়তা পাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিকে নির্দেশিত নয়, এ আন্দোলন বিশ্ব বিপ্লবী আন্দোলনের সহায়তা পেতে পারে না। ভারতের সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল সরকার বস্তুত প্রতি-বিপ্লব রফতানির চেষ্টা করছে, যাতে একদিকে ইয়াহিয়া খানের এবং অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষ ও কৃষকের সত্যিকার বিপ্লবী আন্দোলন মার খেয়ে যায়।

চীন জানে বাংলাদেশের বৈপ্লবিক শক্তিকে আধা ঔপনিবেশিক ও আধা সামন্তবাদী নিপীড়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করতে হলে অনেক আত্মদান করতে হবে। গেরিলা যুদ্ধই হচ্ছে একমাত্র পথ, যে পথে বাংলাদেশের মানুষ জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় আখ্যা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপে বাধা দিচ্ছে। এভাবেই চীন বাংলাদেশের বিপ্লবকে রক্ষা করেছে এবং নিজস্ব সম্পদ ও শক্তির ওপর ভিত্তি করে বেড়ে ওঠা ও বিকাশ লাভের সুযোগ করে দিয়েছে।

 

১৫ মে ১৯৭১ ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত এম হাশিমের চিঠি। চিঠিটি ইম্ফল, মণিপুর থেকে পাঠানো

ভারতের বুর্জোয়া সরকার ও প্রতিক্রিয়াশীল সংসদ সদস্যরা মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখার জন্য ২৪ ঘণ্টাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের বাজনা বাজিয়ে যাচ্ছে— সম্প্রতি যে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল, তাতে খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং আশ্রয়ের যে গলা ফাটানো প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরে গেছেন।

যদি পুরো বাঙালি সম্প্রদায় নিজ নিজ প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পুনরেকত্রীকরণ এবং স্বাধীন-সার্বভৌম প্রজাতন্ত্রী বিশাল বাংলাদেশ গঠন করে, তাহলে দিল্লি ও ইসলামাবাদের কী প্রতিক্রিয়া হবে, তা জানতে ইচ্ছা করে।

চণ্ডীগড় থেকে মিসি রামের চিঠিটি যখন ফ্রন্টিয়ারে প্রকাশিত হয়, তখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২-এ প্রকাশিত চিঠিটি আসলে একাত্তরেরই চিঠি

যারা সততার সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন, তাদের কাছে চেয়ারম্যান মাও নামটিই একটি বড় নৈতিক শক্তি। কাজেই বাংলাদেশে যখন গণহত্যা চলছিল, জনগণ মানবতার এ মুক্তিদাতার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মুখের একটি শব্দ হলেও তা এ প্রতিবাদী মানুষের জন্য বড় প্রেরণার বিষয় হয়ে উঠত। জনগণ অপেক্ষা করেছে, তার মুখের একটি শব্দও তাদের কাছে আসেনি, এমনকি সহানুভূতি জানানো একটি শব্দও না। এতে সহসা পূর্ব বাংলার মাওবাদীরা তাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যারা যুক্তি দেখাবেন, তারা হয়তো আমার মতো মানুষকে বোঝাতে পারবেন, কিন্তু যে চীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর হাতে পূর্ববঙ্গের জনগণের এমন ভোগান্তি, তাদের কেমন করে বোঝাবেন? দরিদ্র জনগণের রক্তের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যে বড়, তাই প্রমাণিত হলো— এ জনগণ বুর্জোয়া নেতৃত্ব অনুসরণের অপরাধে দোষী। কারণ তাদের পরিচালনা করার মতো প্রকৃত মার্ক্সিস্ট-লেনিনিস্ট পার্টি ছিল না।