সিএনজি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে অসহায়ের মতো লাগল আমার। এ রাস্তা এখন একা পেরুতে হবে। একা এত কিছু করা আমি কেন জানি রাস্তায় খুব বেশি একা বোধ করি। বিশেষ করে বড় রাস্তাগুলোয়, যেখানে শো শো শব্দে বড় বড় বাস-ট্রাক-গাড়ি ছুটে যায়। কিছুদিন আগেও আমার রাস্তায় ভালো লাগত। শো শো শব্দ তুলে আমারও ছুটতে ছুটতে ভাবতে ভালো লাগত। ভাবনা ছেড়ে দিয়ে এবার অনুভূতির দিকে যাচ্ছি বোধহয়। এ রাস্তাটাই তো? ওই তো ওপাশে কফিশপ। এর ঠিক পাশের গলিটাই। সেদিন রাতে সুমন ভাইয়ের সঙ্গে এদিক দিয়েই গিয়েছিলাম সেই বাসাটায়। বুঝতে পারছি না কেন যাচ্ছি। যাওয়ার জায়গা নেই বলেই হয়তো। রাশেদের সঙ্গে ঝগড়াটা না হলে এখন হয়তো ওর সঙ্গেই থাকতাম। মুভি দেখতাম বা শুয়ে থাকতাম অহেতুক। গাধার বাচ্চা মেজাজ চটিয়ে দিল। থাক এখন একা একা।

এখনো ফোন করেনি। মেসেজ দেয়নি। খোঁজে না নাকি আমাকে! মানুষ এমন হয় কীভাবে! দিনের পর দিন আছে আমার সঙ্গে, একটু রাগ করলাম তাই খোঁজ নেবে না! কই গেলাম অফিসের পর, বাসায় গেলাম কিনা, বাসায় সব ঠিক আছে কিনা। জানতে চাইবে না? এ কেমন খচ্চরের পাল্লায় পড়লাম আমি। ইবলিশ ইতর বদমাইশ না হলে কেউ কি এমন করে নাকি!

দুপুরে রাগ করে খাইনি। কুকিস বিস্কুট খাব। কুকিস বিস্কুট এখন প্যাকেটে পাওয়া যায়। আগে টিনের কৌটা ছাড়া কুকিস বিস্কুট পাওয়া যেত না। বেকারির কথা আলাদা। টিনের কৌটাগুলো পরে সুই-সুতা রাখার পাত্র হিসেবে ব্যবহার হতো। চ্যাপ্টা কৌটাটায় কুকিস বিস্কুটের ছবি আঁকা থাকত। সেটা দেখলেও আনন্দ লাগত মনে। অসহ্য লাগছে এখন। ফিরে যাব নাকি? ওই বাসায় গিয়ে করবটা কী? না গিয়েইবা কী করব? নিজের বাসায় গিয়ে সেই একই কম্পিউটার আর নেট-ইউটিউব। অসহ্য। প্রেমিকাসহ প্রেমিক আর মেনে নেয়া যায় না।

একটা ভালো কুকিস বিস্কুটের প্যাকেট দেন

আপা ভাংতি দেন

আচ্ছা আপনাদের এলাকায় কি ভাংতির পার্মানেন্ট সমস্যা থাকে, সেদিনও ভাংতি নিয়ে সমস্যায় পড়লাম?

লোকটা দাঁত বের করে হাসছে। অথচ আমি কথাটা সিরিয়াসলি বলেছি।

আচ্ছা দেন ভাংতি করে আনি।

যার বাসায় যাব তার ফোন বন্ধ। এর চেয়ে মজার তো কিছুই হতে পারে না। ঢাকা শহরের জ্যাম ঠেলে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছতে পেরেছি। এখন ফোন বন্ধ। ফোন বন্ধ মানে দরজা বন্ধ। মানে এখন আমাকে আবার ব্যাক করতে হবে। তবু এগিয়ে গেলাম। গলির শেষ বাসাটাই অপকর্ষ চৌধুরীর। এমন নাম মা-বাবা যে দেয়নি, এটা আমি শিওর। নিশ্চয়ই আর্ট কলেজে পড়ার সময় এ নাম ধারণ করা হয়েছে। লোকটা মজা করে সেদিন বলছিল,

আমাকে অপ অথবা কষ নামে ডাকতে পারো।

কষ কেন সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু অপ কেন?

কষের কী বুঝতে পারছ, বলো।

এটা আর মিনিট দুয়েক পরই প্রমাণ দেবেন আপনি

তাই নাকি? আচ্ছা। অপ নামে ডাকবা এজন্য যে, আমি আসলে অপয়া। যে জন্য আমার দুনিয়ায় কেউ নেই! একেবারে এ, ক আকার কা!

হুম

আচ্ছা তুমি কি জান, তুমি শুধু অসম্ভব সুন্দরীই না, তোমার দাঁত খুব সুন্দর!

ঠিক এ কারণেই আপনাকে কষ নামে ডাকা যায়!

কোন কারণে?

এই যে আপনি এই এক ‘অসম্ভব সুন্দরী’ টার্মটা কষ দিয়ে আমার গায়ে সেঁটে দিতে চাচ্ছেন!

তুমি সত্যিই অসম্ভব সুন্দর! সাংঘাতিক!

আমাকে অসম্ভব সুন্দর মনে করা লোকের বাসায় আমি একা যাওয়ার সাহস পাচ্ছি এই ভেবে যে, এ লোক সুন্দরের অপমান করবে এমন মনে হয় না আমার। এর পরও পুরুষ মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। দেখা গেল তলোয়ার উঁচিয়ে যুদ্ধে নেমে গেছে। এমন হলে লাথি দিয়ে চলে আসব। এমনিতেই মেজাজ খারাপ প্রচণ্ড। চুপচাপ বসে থাকা দরকার কোথাও। কিন্তু একা চুপচাপ বসে থাকতেও বিশ্রি লাগে। এ, ক আকার কা ধরনের মানুষ এ ধরনের অবস্থায় ভালো সঙ্গী হতে পারে। চুপচাপ বসে থাকবে। আমি চা খেতে চাইলে চা বানিয়ে দেবে। আর রাশেদ সাহেব তার অন্যের বউ প্রেমিকাকে মেসেজ করতে থাকুক এ পৃথিবীর পরে। যত্তসব!

দারোয়ানকে বললাম অপকর্ষ চৌধুরী আছে কিনা বাড়িতে। জানালো আছে। এ তো মহামুশকিল। ফোন না করে, না জানিয়ে যাই কি করে! বারবার ফোন বন্ধ বলছে। শিশুরা ব্যাডমিন্টন খেলছে বাড়ির সামনে অল্প জায়গাটায়। কুকিস বিস্কুট খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। খেলা দেখতে দেখতে বিস্কুট খাই।

আপনি অপ’র বাসায় এসেছেন?

একজন নারী আমাকে প্রশ্ন করল অমাবস্যার চাঁদের মতো। একেবারেই হতভম্ব হয়ে গেলাম। এখানে কোনো নারীর থাকার কথা না। আর আমাকে এভাবে প্রশ্ন করা অনেক পরের ব্যাপার! কিন্তু আমি স্বাভাবিক ভাব বজায় রাখলাম। কুকিস খেতে খেতেই উত্তর দিলাম, হু।

তাহলে যান এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?

নারীটির কণ্ঠে ঝাঁঝ।

ফোন বন্ধ, না জানিয়ে যাই কীভাবে?

ফোন সারা জীবন বন্ধ থাকবে, তাই আপনি কি সারা জীবন এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিস্কুট খাবেন? যান, যান। ও উপরে আছে।

খাইছে! এই নারী কি আমাকে কম্পিটিটর ভাবা শুরু করল নাকি। আমি তো দুধভাত। এমনি আসছি এখানে আজকে প্রথম। অন্যদিন কাজে আর আজকে এমনি এমনি। এই নারী কে? তাঁকে এখন আমি কীভাবে বোঝাই। বোঝানোর আগেই সিঁড়ি দিয়ে অপকর্ষকে নেমে আসতে দেখা গেল। ক’দিন গোসল দেয় না কে জানে। এক মাথা সাদা হয়ে যাওয়া চুল দাঁড়িয়ে গেছে উত্তেজনায়। নারীটি তার অপ সাহেবকে দেখেই বাইরের দিকে রওনা দিয়ে দিলেন। আর তার পিছু পিছু কষ সাহেব। আমাকে বললেন,

ও তুমি?

আসো আসো এদিকে আসো।

আমি এবার বুঝলাম চিন্তা করে লাভ নেই। যা হওয়ার হয়ে গেছে। এ, ক আকার কা মানুষটা আজ একা ছিল না। এবং আমি একটা ঝামেলায় পরিস্থিতিতে উপস্থিত হয়েছি। এখন স্বাভাবিক থাকাই শ্রেয়। আমিও পিছু পিছু গেলাম। একটা দুদিক থেকে চাপা হয়ে আসা গলি, প্রথমে হাঁটছেন রাগান্বিত নারী, তার কিছু পেছনে অপকর্ষ আর শেষে আমি। আমি কেন হাঁটছি জানি না। আমার হাতে কুকিস বিস্কুটের প্যাকেট। নারীটি রিকশা ভাড়া করে ফেললেন। যাওয়ার সময় আমার দিকে চোখ দিয়ে আগুন নিক্ষেপ করে গেলেন। সর্বনাশ। এ নারী তো দারুণ জেলাস!

রাশেদ ফোন করা শুরু করেছে। একের পর এক কল করেই যাচ্ছে। করুক। এ ফোন আমি ধরব না। বদমাইশ ছেলে।

অপকর্ষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছে।

আচ্ছা কী হয়েছে? আমি চলে যাব?

আরে না। কিছু হয়নি। আসো, উপরে, বলতেছি সব

আমার সব জানার দরকার নেই।

হাতে কী? দুপুরে খাওনি?

না, রাগ। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ।

ভেরি গুড। চলো উপরে। আজকে আমার খারাপ দিন। মরি নাই যে এটাই বেশি। আরেকটু হলে হার্ট অ্যাটাক হতো।

বাসায় ঢুকলাম। বিছানার কোনায় জানালার পাশে বসলাম গিয়ে। রাশেদ মেসেজ পাঠাচ্ছে। কোথায় তুমি, আমি তোমাকে রাস্তায় খুঁজি। তুমি কোথায়। বাবু প্লিজ! উত্তর দাও। যা মর। এখন আমাকে খোঁজা কেন! উত্তর দিই, গা-জ্বালা করে যেন। আমি বাইরে, একা না। পরে কথা হবে। তুমি কোথায়? প্লিজ! তুমি আসো। ইশ্ কী শখ! যা তোর প্রেমিকার কাছে যা। আমার কাছে কী তোর। বেয়াদব।

 

আচ্ছা বাথরুম কোন দিকে?

বাথরুমে যাবা?

এটা বলেই হাসি শুরু করল কষ।

এতে হাসির কী হলো? আপনি বাথরুমে যান না?

হাসির কী আছে পরে বলব।

প্যানে বসে বাথরুমের উপরের দেয়াল দেখে ভয় ধরে গেল। জং ধরা রড বের হয়ে আছে। পুরনো বাসা। বড় একটা জানালা আছে বাথরুমে। জানালায় সম্ভবত কোনো গাছ লাগানো। দেয়ালে সেঁটে আছে সেই গাছের শিকড়। একটু খেয়াল করে দেখা গেল, গাছটা আসলে ঘরের বাইরে, শিকড় উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে, তাই ঘরের  ভেতর চলে এসেছে। বেসিনের উপরে একটা সবুজ রঙের বাতি রাখা, ব্রাশ বা পেস্ট নেই। একটা সাবানও না। বরং বাথরুমের দেয়ালে একটা একতারা লাগানো আছে। এই একটাই বাথরুম এ বাসায়। এর পরও কেন এ দশা হবে! বাথরুমের দরজায় ছিটকিনিও নেই। হাত ধোয়ার সময় দেখলাম অন্তত সাত রঙের টিপ লাগানো আয়নায়। রাশেদ মেসেজ করছে। জাদু আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ! তুমি আসো আই মিস ইউ। উহ্, কী ঢঙ!

ঘরে ঢুকে দেখা গেল অপকর্ষ চৌধুরী বিছানার অন্য কোনায় বসে আছেন। আমি আমার কোনায় বসলাম।

আমি তো ভাবছিলাম তুমি বাথরুমে ঢুকেই বের হয়ে চলে আসবা।

কেন?

ছিটকিনি নেই যে!

ওহ এজন্য হাসছিলেন আপনি, এখন বুঝলাম। আমি ভাবলাম আপনার বাথরুমে সাবানের জায়গায় সবুজ রঙের বাতি রাখা এজন্য হাসছেন!

ও তাই সবুজ বাতি রাখা নাকি?

আচ্ছা নারীটি কে?

ওর সঙ্গে আমার বিয়ে হইছিল। অন্য জায়গায় থাকে। ওর জিনিসপত্র নিতে আসছিল।

কত দিন পর আসল?

এক বছর হবে

আর এসেই তিনি বাসার নিচে আমাকে কুকিস বিস্কুট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন?

হ্যাঁ।

তাহলে এখন ভেবে দেখেন কে অপয়া!

আরে না, ভালো হইছে এতে। ভাববে আমি প্রেম করে বেড়াই সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে।

আচ্ছা, আপনি প্রেম করেন না তার মানে? এমনি এমনি কেটে যাচ্ছে দিনকাল?

না করি না। তুমি প্রেম কর নাকি?

না আমিও প্রেম করি না। ভাবি যে আমি প্রেম করি। কিন্তু আমি তো প্রেম করি না।

তোমাদের জেনারেশনের এই এক সমস্যা। ভাত খাও তো? নাকি ভাবো যে ভাত খাও কিন্তু আসলে খাও না?

এ পর্যায়ে দরজায় শব্দ শোনা গেল। এ বাসায় কলিংবেল নেই। অপকর্ষ তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।

ওই যে আবার আসছে!

আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। আগুন চোখের নারীটি ঘরে এসে ঢুকলেন। এসে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি অমায়িক গলায় বললাম, বসেন না, দাঁড়িয়ে কেন।

নারীটি বসলেন।

আমি স্যরি, আপনাকে চিনতে পারিনি।

এখন চিনতে পেরেছেন?

হ্যাঁ উনি বললেন...

কী বললেন? আমরা আগে একসঙ্গে থাকতাম, এখন থাকি না।

এ বলেই নারীটি অপকর্ষের মতোই তড়াক করে দাঁড়িয়ে গেলেন। অপকর্ষ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। বসতেও পারছেন না ভয়ে।

থাকেন আপনারা। আমি যাই। কাজ আছে কিছু।

আমি বললাম, কুকিস খান না একটা? বসেন একটু গল্প করি।

অন্যদিন গল্প হবে। আজ যাই।

ঘরটাকে একা করে দিয়ে নারীটি চলে গেলেন। অপকর্ষ দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে বিছানায় তার কোনাটিতে বসতে বসতে বললেন, আমি ভাবি সে আসে, কিন্তু সে তো আসে না।