তিন বছর আগে, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৩, ৯৪ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন মিখাইল কালাশনিকভ।
লেনিন, স্তালিন, পেরেস্ত্রোইকা— যে কোনো রুশ শব্দ, রুশ নামের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত, অনেক বেশি বৈশ্বিক শব্দ/নাম কালাশনিকভ।
বিপ্লবী নেই এমন কোনো দেশ পৃথিবীতে নেই। বিপ্লবীদের প্রিয় অস্ত্র একে-৪৭; সন্ত্রাসী নেই এমন দেশও বিরল হয়ে উঠছে, সন্ত্রাসীদেরও প্রিয় অস্ত্র একে-৪৭। কারো তৈরি কোনো যন্ত্র কোনো দেশের জাতীয় পতাকায় স্থান পায়নি— একমাত্র ব্যতিক্রম কালাশনিকভের রাইফেল। মোজাম্বিকের জাতীয় পতাকাটি যেন একে-৪৭-এরই প্রদর্শনী।
আভতোমাত কালাশনিকোভা ১৯৪৭ (একে-৪৭)— অটোমেটিক বা স্বয়ংক্রিয় কালাশনিকোভা রাইফেল ১৯৪৭ মডেল।
কালাশনিকভ কবিতা লিখতেন। তিনি কবিই হতে চেয়েছিলেন। তাঁর ছয়টি গ্রন্থ, কবিতা লিখেই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেবেন— এটাই ঠিক করেছিলেন। কিন্তু তা হয়ে উঠল না।
মাইকেল কালাশনিকভের বাবা টিমোফি আলেক্সান্দ্রোভিচ কালাশনিকভ স্বল্পশিক্ষিত চাষী, তার মা আলেকজান্দ্রা ফ্রোলোভনা কাবেরিনা কখনো লেখাপড়া শেখেননি। তাঁদের উনিশ সন্তানের মধ্যে আটজন টিকে যায়, অন্যদের জন্মলগ্নে বা শৈশবে মৃত্যু হয়। কালাশনিকভ সপ্তদশ সন্তান (রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দেবেন ঠাকুরের চতুর্দশ সন্তান)। ছয় বছর বয়সে তিনিও মৃত্যুর প্রায় কাছাকাছি এসে ফিরে গেছেন।
রুশ বিপ্লবের পর থেকে অবস্থাপন্ন কৃষকদের জীবনে দুর্ভোগ নেমে আসে। ১৯৩০ সালে টিমোফি আলেক্সান্দ্রোভিচকে ‘কুলাক’-জোতদার সাব্যস্ত করে বাস্তুচ্যুত করে এবং স্তালিন শাসনামলে গোটা পরিবারকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেয়া হয়। তরুণ কালাশনিকভের জন্য তা ছিল এক ভয়ঙ্কর জীবন।
১৯৩৮ সালে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হয়, প্রথমদিকে ট্যাংক ড্রাইভার ও মেকানিক। যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজে তাঁর দক্ষতা তাঁকে স্বতন্ত্রভাবে পরিচিত করিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বাদশ ট্যাংক ডিভিশনের ২৪ রেজিমেন্টে তিনি ট্যাংক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪১-এর অক্টোবরে ব্রায়ানস্ক প্রতিরক্ষার সময় তিনি জখম হন, চিকিত্সা ও সুস্থতার জন্য তাকে ছয় মাসের ছুটি মঞ্জুর করা হয়। হাসপাতালে থাকার সময়ই সাধারণ সৈন্যদের আলাপ তাঁর কানে এল: জার্মান অস্ত্র স্বয়ংক্রিয়, তাদের অস্ত্র হাতে টানা।
সে সময় অপর একজন সৈন্য তাঁকে সরাসরি বললেন, ‘আমাদের তিনজন সৈন্যের জন্য কেন একটা রাইফেল অথচ জার্মানদের হাতে অটোমেটিক বন্দুক।’
কালাশনিকভ বললেন, সে জন্যই আমাকে অটোমেটিক রাইফেল আবিষ্কার করতে হলো।
সেই অস্ত্র একে-৪৭; যেকোনো ঘাতকের প্রিয়— বিপ্লবী কিংবা সন্ত্রাসী। পদাতিক বাহিনীর ব্যবহার্য অস্ত্র সম্পর্কে তিনি বিশদ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। হাসপাতালে থাকা অবস্থায়ই তিনি একটি সাব-মেশিনগানের ডিজাইন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের জন্য দাখিল করেন। তাঁর সে ডিজাইন অনুমোদিত হয়নি, কিন্তু তিনি যে এ কাজে পারঙ্গম তা স্বীকৃত হয়ে যায়। ১৯৪২-এ তাঁকে চিফ আর্টিলারি ডাইরেক্টরের অধীনে সেন্ট্রাল সায়েন্টিফিক ডেভেলপমেন্টাল ফায়ারিং রেঞ্জ ফর রাইফেল ফায়ার আর্মস বিভাগে দায়িত্ব দেয়া হয়।
তিনি ১৯৪৪ সালে গ্যাস-চালিত কার্বাইনে ৭.৬২–৩৯ মিমি কার্তুজের একটি রাইফেল ডিজাইন করেন। এর বেশ কয়েকটি মানোন্নয়ন পর্ব অতিক্রম করার পর তা একে-৪৭ নাম নিয়ে রণাঙ্গনের জন্য মজুদ হতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালের মধ্যে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর অস্ত্রধারী প্রতিটি সৈন্যের সঙ্গে এই রাইফেলের পরিচিতি ঘটে। যখন দেশে দেশে বিপ্লব রফতানি হতে শুরু করে, অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে বিপ্লবের হাতিয়ার হয়ে ওঠে কালাশনিকভের রাইফেল।
কালাশনিকভের হাতে একে-৪৭-এর বিভিন্ন ভার্সন তৈরি হতে থাকে। আরপিকে, একেএম, একেএনএস, একে-৪৭, একে ১০১, একে ১০৩/১০৪, একে ১০৭/১০৮ সিরিজ।
আইজমাশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি কালাশনিকভ রাইফেল তৈরি করতে থাকে।
একে-৪৭-এর বৈশিষ্ট্য
ধরন: অ্যাসল্ট রাইফেল
ডিজাইনের সময়কাল : ১৯৪৪-৪৬
চূড়ান্ত অনুমোদন: ১৯৪৭
ওজন: খালি ম্যাগাজিনসহ ৪.৩ কিলোগ্রাম
দৈর্ঘ্য: বাঁটসহ ৩৪.৩ ইঞ্চি
বাঁট ভাঁজ করে ২৫.৪ ইঞ্চি
বর্ধিত বাঁটসহ ৩৪.৪ ইঞ্চি
ব্যারেলের দৈর্ঘ্য: ১৬.৩ ইঞ্চি
কার্তুজ: ৭.৬২–৩৯ মিমি
প্রক্রিয়া: গ্যাসচালিত, ঘূর্ণায়মান বোল্ট
গুলি চালনা: মিনিটে ৬০০ রাউন্ড
প্রায় সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই একে-৪৭; এখনো এটি সবচেয়ে জনপ্রিয় রাইফেল। এমনকি শিশু সৈন্যদের হাতে যে রাইফেল, সেটিও একে-৪৭। তবে এ কথা সত্য অ্যাসল্ট রাইফেল প্রথম জার্মানদের হাতেই তৈরি হয়। কালাশনিকভের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল আবিষ্কারের ঘটনাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেনি, ঘটেছে জার্মান রাইফেলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ১০ কোটিরও বেশি কালাশনিকভ রাইফেল বৈধভাবে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়েছে, এখনো অবৈধভাবে কালাশনিকভের নামে একই ডিজাইনে প্রতি বছর অন্তত ১০ লাখ রাইফেল তৈরি হচ্ছে— এর বেশি অংশের সরবরাহ হচ্ছে যুধ্যমান দেশগুলোয়। যুদ্ধ, সামরিক অভ্যুত্থান, সন্ত্রাসী আক্রমণ, ডাকাতি ও অন্যান্য ধ্বংসযজ্ঞের জন্য প্রধান সহযোগী একে-৪৭ রাইফেল।
অরণ্যে হোক কি মরুভূমিতে হোক-এর চেয়ে বিশ্বস্ত এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব মারাত্মক অস্ত্র আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এম-১৬-এর চেয়ে অনেক বেশি ভালো।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যরা তাদের এম-১৬ ছুড়ে ফেলে নিহত কিংবা গুরুতর আহত ভিয়েতনামি সৈন্যের একে-৪৭ ছিনিয়ে নিয়েছে।
সত্তর বছর পরও রুশপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিন বলছেন: ‘কালাশনিকভ রাইফেল হচ্ছে জনগণের সৃজনশীলতার প্রতীক।’
মোজাম্বিকের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কালাশনিকভের রাইফেলকে ঠাঁই দিয়েছে তাদের জাতীয় পতাকায়। মোজাম্বিকের অনেক বিপ্লবী তাদের পুত্রসন্তানের নাম রেখেছে কালাশ।
ভেনিজুয়েলার উগো চাভেজ এই অস্ত্রটির সঙ্গে এতই পরিচিত যে, ক্ষমতাসীন হয়েই ১ লাখ একে-৪৭-এর ক্রয়াদেশ দিয়েছিলেন।
এটি ইয়াসির আরাফাতেরও প্রিয় অস্ত্র। ফিদেল কাস্ত্রোর হাতে একে-৪৭ রাইফেল— এই ছবিটির নাম হয়ে গেছে কাস্ত্রো কালাশনিকভ।
চে গুয়েভারার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল কালাশনিকভের এই অস্ত্র। সান্দানিস্তা গেরিলারা একে-৪৭ দিয়ে জয় করলেন নিকারাগুয়া।
কুর্দি ও কারেন বিদ্রোহীদের হাতে কালাশনিকভ। ওসামা বিন লাদেনের হাতে তো বটেই। কবি হলে কি কালাশনিকভ এমন লাখো হাতের হাতিয়ার হতে পারতেন?






