পাবনা জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। জেলার সর্ব পশ্চিম-উত্তরের উপজেলা ঈশ্বরদী। একসময় পদ্মার কোলঘেঁষা এ উপজেলার বেশির ভাগ মানুষ ছিল কৃষিজীবী। আখ, গম, মসুর, ছোলা, ধান, পাট, পেঁয়াজসহ নানা জাতের সবজির পাশাপাশি আম, লিচুর জন্য উর্বর ঈশ্বরদীর মাটি। সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জমিতে কাজ করার একঘেয়েমি, বিরক্তিকর ও কষ্ট দূর করতে কৃষকরা আশ্রয় নিতেন লোকগল্প ও লোকসাহিত্যের। কেউ গান ধরতেন, কেউ গল্প বলতেন। বাকিরা হয় কান পেতে শুনতেন নয়তো তাল দিতেন। সেই সঙ্গে চলত হাত। একসময় পুবের সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়ত। তাদের গল্প-গান শেষ হতো না। কাজ শেষে গৃহস্থের বাড়িতে ফিরতেন।
দূরের মাঠে কামলাদের সঙ্গে গৃহস্থও কাজ করতেন। ফিরতেন সবাই একসঙ্গে। ঘরে ফিরে গৃহস্থ ছুটতেন হাট কিংবা বাজারে। সদাই পাতি এনে গৃহিণীর হাতে দিতেন। রান্না হতো। রাতের খাবার খেয়ে কামলারা চলে যেতেন বাড়িতে। গৃহস্থের বাজারে যাওয়া এবং গৃহিণীর রান্না শেষ করার দীর্ঘ সময়টা কৃষকরা কাটাতেন বাড়ির উঠোনে কিংবা বাগানের বড় আমগাছের নিচে বসে। খেজুর পাতার পাটি পেড়ে জমাতেন গল্প—গানের আসর। বাড়ির শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যোগ দিত সেই আসরে।
লোকগল্পকে পাবনার ঈশ্বরদীর ভাষায় ‘হাস্তর’ বা ‘শাস্তর’ (শাস্ত্র) বলা হয়। শাস্তর জানা লোকের বিশেষ কদর থাকে এসব আয়োজনে। রাজা-রানী, রূপসী রাজকন্যা, শেয়ালপণ্ডিত, ট্যাটন (চালাক ব্যক্তি), প্রামাণিক (গ্রামের মাতবর) ইত্যাদি অতিপ্রাকৃত চরিত্ররা এসব শাস্তরের নায়ক। গ্রাম, অঞ্চল ও বক্তা ভেদে চরিত্রগুলো হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময়। বিদ্যুৎ ও টেলিভিশন আসার আগ পর্যন্ত চেনা-জানা এ দৃশ্য, গল্প আবহমানকাল ধরে চলে এসেছে। কিছু গল্প ছিল বড়দের জন্য। কিছু গল্প সবার জন্য। কিছু গল্প শুধু ছোটদের। নির্ঘুম বাদশার শাস্তর শোনেনি এমন কোনো শিশু এ এলাকায় নেই। সাধারণত শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য এ গল্প বলা হতো। কোনো শিশু যদি রাতে বিছানায় শুয়ে বাবার কাছে শাস্তর শোনার বায়না ধরত, বাবার শরীরে যদি ভর করত সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ক্লান্তি, তবেই বলা হতো নির্ঘুম বাদশার শাস্তর। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘটনাটা হতো এমন—‘আব্বা, আমাক একটা শাস্তর শুনান।’ শিশুর বায়নায় ক্লান্ত বাবা বলতেন, ‘এহন তো পারব না রে বাপ। শইল ভরা ঘুম।’ ‘না না আমাক শাস্তর শুনানি লাগবিই।’ ‘তালি শোন, তোক নির্ঘুম বাদশার শাস্তর শুনাই। কিন্তু একটা শর্ত আছে। এই শাস্তর শুনার সময় কোনো কথা কওয়া যাবিনি। প্রশ্ন করা যাবিনি। চুপচাপ শুনা লাগবি।’
বাবার শর্তে সায় দিলে শুরু হতো নির্ঘুম বাদশার শাস্তর। ‘এক দেশে ছিল এক বাদশা। তার নাম নির্ঘুম বাদশা...।’ বাবা চুপ করে থাকতেন। কথা বলতেন না। সন্তানও শর্তে রাজি হয়েছে-প্রশ্ন করবে না, কথা বলবে না। সে চুপচাপ শুয়ে থাকত। একটু পরে ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ আসত সন্তানের পাশ থেকে।
এ অঞ্চলে চাঁদ সওদাগরের শাস্তর ছিল অন্যতম জনপ্রিয়। চাঁদ সওদাগরের গল্প পাবনা-ঈশ্বরদীর নিজস্ব গল্প না। গল্পটা দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছে বিভিন্ন নামে, নানাভাবে। মানুষকে কুমির বানানোর জাদুর জন্য চাঁদ সওদাগরের খ্যাতি ছিল দূরদূরান্ত। একদিন তার স্ত্রী বায়না ধরলেন মানুষকে কুমির বানানো দেখবেন। কিন্তু চাঁদের তো সাগরেদ থাকে। যাকে সে জাদু দিয়ে কুমির বানায়। আবার কুমির থেকে মানুষ বানায়। এত রাতে সাগরেদকে পাওয়া যাবে না। ওদিকে স্ত্রীর আদুরে আবদার, আজ রাতেই সে জাদুটা দেখবে। নিরুপায় হয়ে চাঁদ সওদাগর দুটি পাত্রে পানি পড়ে দিলেন। স্ত্রীকে বললেন, প্রথমে এ পাত্রের পানি আমার শরীরে ছিটিয়ে দেবে। আমি কুমির হয়ে যাব। তোমার দেখা হয়ে গেলে অন্য পাত্রের পানি ছিটাবে কুমিরের গায়ে। আমি কুমির থেকে মানুষ হয়ে যাব। স্ত্রী রাজি হলেন। কথামতো স্ত্রীর ছেটানো পানির জাদুশক্তিতে মানুষ থেকে কুমির হয়ে যান চাঁদ সওদাগর। কুমির দেখে ভয় পেয়ে যায় তার স্ত্রী। ছুটে পালাতে গিয়ে পায়ের ধাক্কায় অন্য পাত্রের পানি পড়ে যায়। চাঁদ সওদাগর আর মানুষ হতে পারেন না। সারা রাত বাড়ির উঠোনে অপেক্ষা করে ভোর হলে চলে যান জলাশয়ে। বাকি জীবন কুমির থেকে যান।
শাস্তরের নাম করে, ছন্দ মিলিয়ে ধাঁধাঁ খেলাও ছিল গ্রাম্য মজলিসের জনপ্রিয় একটা দিক। কোনো এক বক্তার যদি শাস্ত্রর বলতে ইচ্ছে না করত, তিনি ঘটনাকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবার উদ্দেশে ধাঁধাঁ ছুড়ে দিতেন। এমন একটা ধাঁধাঁ—
শাস্তর জানি না
বস্তর জানি না
শাস্তরেরই ধনী
এক ফড়িংয়ে খেয়ে গেল
চার পুকুরের পানি।
কঠিন মনে হলেও গ্রাম্য শিশুদের জন্য এসব ধাঁধাঁ ছিল একেবারে ডালভাত। এসব ধাঁধাঁয় সাধারণ জ্ঞানের পাশাপাশি পরিবেশ, মনোজগৎ, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি উঠে আসত। এ অঞ্চলের শিশুদের মাঝে প্রচলিত আরেকটি জনপ্রিয় ধাঁধাঁ এমন—
লাল ভাই লাল ভাই
টোকা দিলে পয়সা পাই।
কেন্নো পোকার স্বভাব রূপকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ ধাঁধাঁয়।
কৃষকের ঘরে পাকা ধানের ঘ্রাণ আর ব্যস্ততা নিয়ে আসত হেমন্ত। ধান ঘরে উঠে গেলে দীর্ঘ অবসর। এ সময়ে গ্রাম্য কবি ও গায়েনদের নিয়ে বসত পুঁথি পাঠের আসর। কবিগান, সারিগান, পালাগানের আসরে হাজির হতো আশপাশের চার-পাঁচ গ্রামের মানুষ।
এ অঞ্চলের বিয়ের গীতকে লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী বলা যায়। বিয়ের দু-তিনদিন আগে থেকে বর কিংবা কনের চাচি, ফুফু, ভাবিরা প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বসে কন্যাকে সামনে বসিয়ে গীত গায়। এসব গীতের বিশেষত্ব হলো গীতের চরিত্রের ভেতর ওই বিয়ের পাত্র-পাত্রীকে বসিয়ে দেয়া হয়। ফলে যার বিয়ে, প্রথম শুনলে মনে হয় শুধু তার জন্যই গীত রচনা করা হয়েছে। সালেহার বিয়ের গীত হয় এমন—
এতদিন তো ছিল্যারে আলতা
দোকানীর দোকানে
আজ ক্যানো অ্যাইলারে আলতা
সালেহারও পায়েতে কি নারে...
একইভাবে পাত্রীর নাম মমতাজ হলে গীতের কথা দাঁড়ায়—
এত দিন তো ছিল্যারে মেনদী (মেহদী)
মালিকেরও গাছে
আজ ক্যানো আইলারে মেনদী
মমতাজের হাতে কি নারে...।
গীতে উঠে আসত এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও পেশার কথা। উঠে আসত স্থানীয় হাটবাজারের কথা। যেমন সুমী নামের এক গৃহবধূ আপন মনে গাইছে—
এক গাছ সুতা কাটিবো
দামাদের গামছা ব্যুনিবো
ও কী যায় রে দামাদ
পাকশীরও হাটে কী নারে...।
পাশ থেকে সুমীর দামাদ (স্বামী) হাট থেকে কার জন্য কী আনবে তার বিবরণ দিচ্ছে—
মায়ের আনব লাল পাড়ের শাড়ি
বোনের আনব কালা পাড়ের শাড়ি
আমার সুমীর আনবো
আগুন কাষ্ঠের শাড়ি কি নারে...।
ঈশ্বরদীসহ পুরো পাবনা অঞ্চলের প্রকৃতি, আবহাওয়া, পরিবেশ ও লোকাচার প্রায় এক ও অভিন্ন। তাই এ এলাকার লোকসংস্কৃতি পাবনা জেলার অন্যান্য এলাকার লোকসংস্কৃতির মতোই অচ্ছেদ্য, এক ও অভিন্ন। বিয়ে, বাণিজ্য ও আবাদের ক্ষেত্রে পাবনা জেলার অন্যান্য এলাকার মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরদীর মানুষের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক ও অবাধ যাতায়াত। ফলে এ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি যেমন বিস্তার ঘটেছে পাবনাজুড়ে, তেমনই অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতিও ভ্রমণ ও আবাস গড়েছে ঈশ্বরদীতে। এভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে পদ্মাপাড়ের এ উপজেলা। যদিও কালের বিবর্তন ও উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়নের অভাবে লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য হুমকির মুখে। এখন বিয়েতে উচ্চ শব্দের সাউন্ডবক্সে বাজে ডিজে। দিন শেষে সবাই বসে টেলিভিশনের সামনে। দুই কিশোর একত্র হলে বসে যায় মোবাইল গেমে। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে হাজার বছরের ঐতিহ্য এভাবে বিপন্ন হয়ে যাবে কে ভেবেছিল?
তথ্যসূত্র
ঈশ্বরদীর ইতিহাস, কামাল আহমেদ
লোকসংগীত, লোকসংস্কৃতি (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি)
হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, গোলাম মুরশিদ
বাংলাদেশ জেলা গেজেটিয়ার, পাবনা
মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ: লেখক ও সাংবাদিক





