দ্বাদশ শতকের শুরুর দিক থেকে বর্তমান সময় অবধি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর ভাণ্ডার বলা হয় মাদ্রিদের মস দেল প্রাডো বা চলতি ভাষায় প্রাডো মিউজিয়ামকে। কিন্তু পিটার ব্রোগেলের অনুপম সৃষ্টি দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ পুনরুদ্ধার করা সহজ কাজ ছিল না। একে তো প্রাচীন চিত্রকর্ম, তাছাড়া এটা পৃথিবীর অন্যতম বিশাল আকৃতির মিনিয়েচারগুলোর একটি। কাঠমোগত স্থিতিশীলতা এবং এর মূল রঙগুলো পুনরুদ্ধার করে দর্শনার্থীর সামনে সেই সাড়ে চারশ বছর আগের একটি সৃষ্টিকর্মকে তুলে ধরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। পিটার দ্য ব্রোগেলের কাজকে তুলনা করা হয় শেক্সপিয়ারের সাহিত্যের সঙ্গে; যার ব্যাপ্তি, সূক্ষ্মতা ও মহত্ব অতি উচ্চমানের। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের রচনা যেমন ৪০০ বছর পর এসেও সমসাময়িক। তার লেখা সমাজের প্রাসঙ্গিকতাকে তুলে ধরে এবং বৈচিত্র্যময়তা প্রকাশক করে। তেমনি পিটার ব্রোগেল দ্য এলডারের চীত্রকর্মের মাঝেও সেই সাদৃশ্যগুলো দেখতে পাওয়া যায়।
পিটার ব্রোগেলের জন্মস্থান বা জন্মসাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ধারণা করা হয়, তার জন্ম ১৫২৫ সালে নেদারল্যান্ডসের কোনো এক গ্রামে। তার পারিবারিক পটভূমি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু কার্ল ভ্যান মান্ডারের মতো প্রাচীন শিল্প ইতিহাসবিদ ও সমসাময়িক সমালোচকরা তার কৃষক ঘরানার দৃশ্যের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপের কারণে মনে করেন, তিনি কৃষিনির্ভর বা সংশ্লিষ্ট কোনো পরিবার থেকে এসেছেন। বিগত অর্ধশত বছরে তাকে নিয়ে যেসব গবেষণা হয়েছে, সেখান থেকে উঠে এসেছে তার কাজের বৌদ্ধিক বিষয়। এটা প্রতীয়মান হয় যে তিনি সংবেদনশীল ও মানবতাবাদী একজন মানুষ ছিলেন। তার বিচরণ সমাজের সম্মানিত ও মর্যাদাবানদের সমাজে হলেও সার্বিক সামাজিক প্রেক্ষাপট তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করেছেন, সেটা প্রকাশ পায় তার সৃষ্টির পটভূমিতে।
এটাও প্রকাশ পায়, তিনি সাধারণ জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতি তুলির টানে তুলে এনেছেন, কিন্তু সেকালের প্যাটার্নে ছবির সঙ্গে সময়ের যথাযথ যোগাযোগ স্থাপন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। মর্ডান আর্টের বস্তুনিরপেক্ষতার ধারণার সঙ্গে সেটার সাদৃশ্য কম। চিলড্রেন্স গেম, দ্য পেশেন্ট ওয়েডিং, দ্য বেগার, দ্য পেশেন্ট ড্যান্স, দ্য হান্টার ইন দ্য স্নো—এসব কাজেই স্কষ্টতার সঙ্গে ঘটনাক্রম ও তত্কালীন সময়ের মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে। আর এখান থেকেই স্কষ্ট হয় যে তার বহুল আলোচিত সৃষ্টি ‘দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ’ সামগ্রিক পরিস্থিতির আগ্রাসনের কথা বলে।
‘দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ’ চিত্রকর্মটি ব্রোগেলের তত্কালীন বসবাসরত স্থান নেদারল্যান্ডসের অস্থির সময়কে তুলে ধরেছে। সমগ্র চিত্রে উঠে এসেছে মৃত্যুর অগ্রাসন। এখানে মৃত্যু ও ধ্বংসের সামগ্রিক একটি চিত্রের মুখোমুখি হয় দর্শক। এত বিস্তারিত অংকনশৈলী ও ঘটনাক্রমের ব্যাপ্তি কাজের নিরিখে যেমন সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে, সেই সঙ্গে এটাও প্রতীয়মান হয় যে চিত্রকর কত নিগূঢ়ভাবে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে অবলোকন করেছেন। এ মৃত্যুর মিছিলে কেউ বাদ যায় না। কংকালের সেনাদল প্রতিটি বয়সের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষের দিকে ধেয়ে আসছে। কেউ সেই বিক্ষিপ্ত কুচকাওয়াজের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা রাখে না। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকেই কংকাল ফৈজকে প্রতিহত করার চেষ্টায় রত। এক নারী কংকালের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত, মৃত মায়ের কোলে থাকা শিশুকে রক্ষার চেষ্টা করছে একটি শীর্ণ কুকুর। চিত্রকলার শীর্ষে আকাশে লাল আভা ও ধোঁয়া নিমজ্জিত। পুড়ে যাওয়া প্রকৃতি হয়তো এ ধোঁয়ার উৎস। কেননা যে কয়টা গাছ দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, তার প্রায় কোনোটাতেই পত্রপ্ললবের চিহ্ন নেই। কদাচিৎ যে দু-একটা অবশিষ্ট পাতা দেখা যায় সেটাও মলিন, যা প্রকাশ করে আশার অভাব। এটা হতে পরে বেঁচে থাকার আশা, হতে পারে বিপদকে প্রতিহত করার আশা। সমুদ্রে ভাসমান জাহাজগুলো থেকেও ধোঁয়ার আভাস। জাহাজগুলো বেঁচে থাকার রসদ নিয়ে উপকূলে পৌঁছে যাওয়ার আগেই পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। রসদবিহীন মানুষের বাঁচার উপায় নেই, এটাও মৃত্যুর অন্য একটি সংকেত। নগরের মাঝখান দিয়ে ধেয়ে আসছে কংকাল সঞ্চালিত কার্ট। কার্টে জমা করা আছে সংগৃহীত কংকাল, যারা হয়তো এর আগে মৃতদেহ ছিল। কংকাল সঞ্চালিত কার্ট চলছে একটি জীর্ণ ঘোড়ার মাধ্যমে এবং ঘোড়ার পিঠে একটি কাক। তত্কালীন ব্ল্যাক ম্যাজিকের চর্চা ও অশুভ শক্তির সংকেত এই কাক। চিত্রকর্মটিতে যে কয়টি জীবিত মানুষ ও প্রাণী দেখা যাচ্ছে, সবার অভিব্যক্তিতেই আতঙ্ক ও হতাশার স্কষ্টতা। তাসের জুয়াড়ি, অভিজাত ও গির্জার যাজক, কেউ এ মৃত্যুকে ঠেকাতে পারেনি। দৃশ্যপটের একদিকে গির্জার বিরাট ঘণ্টা দড়ি দিয়ে টেনে টেনে বারবার করে বাজানোর অভিব্যক্তি বিপত্সংকেত প্রকাশ করে। কাঠের কফিনগুলোয় লাশের সংকুলান হয় না। তাই এলোমেলোভাবে পড়ে থাকে আরো অসংখ্য কংকাল। পথের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার থলে। যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত, ধেয়ে আসা মৃত্যুর কাছে সবকিছুই মূল্যহীন। তাই মুদ্রাগুলো অবহেলায় পড়ে আছে এবং সেদিকে কারো ভ্রূক্ষেপ নেই। চিত্রের মাঝামাঝি এসে দেখা যায়, কঙ্কালরা জনসাধারণকে একটি টানেলের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে, টানেলের অন্য পাশে মৃতদের মাথার খুলির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। টানেলের শুরুতে ক্রুশ চিহ্নিত। কিছু অস্থি, খুলি ও অক্ষত কংকাল বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে আছে। তত্কালীন সময়ে অন্যান্য চিত্রকর্মে যেমন—খ্রিস্টীয় ধর্মকে উপশমের পথ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়, এ দৃশ্যপট সেখান থেকে একেবারেই আলাদা। শিল্পী এখানে ধর্মকে কোনো হাতিয়ার বা উপশমের উপায় হিসেবে প্রদর্শন করেননি। বরং ধর্ম রক্ষাকারী সবাই এখানে আক্রান্ত। তাদের কংকালে আটকে থাকা ক্রুশ অসহায়তা ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ করে না। সমগ্র দৃশ্যে ধর্মের উপশমের চেয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কিছু সমালোচকের মতে, ‘দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ নির্দিষ্ট বার্তা প্রেরণ করে। প্রত্যেককে মৃত্যুর উদাসীন হাতে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। দর্শককে এখানে এ ইঙ্গিত দেয়া হয় যে সব কদর্যতা নিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে।’ (রেফারেন্স, উড ওয়ার্ড, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, মে ৩১, ২০১৭)
দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ নিয়ে ব্যাখ্যা ও গবেষণা প্রসঙ্গে শিল্প ইতিহাসবিদ জেমস স্নাইডার বলেছেন, ‘জ্বলন্ত বন্ধ্যা পৃথিবী, চোখ যত দূর দেখতে পাবে কোনো জীবন বিহীন।’
পিটার ব্রোগেলের জন্ম ও তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, ‘দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ’ নামের এ দৃশ্যপট তৈরির নেপথ্যে কোনো বাস্তব ঘটনা জড়িত, নাকি এটা শুধুই কল্পনা। এটা নিশ্চিত যে চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে প্লেগের মহামারী যে ‘কালো মৃত্যু’ বয়ে এনেছিল, তার প্রভাব রয়েছে এ চিত্রকর্মে। একই সময়ে পুরো ইউরোপে প্লেগে আক্রমণে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু জন্ম দিয়েছিল ড্যান্স অব ডেথ নামে চিত্রকলার একটি ধারণা, যেখানে মৃত্যুকে দেখা যায় কংকালের চেহারায় নৃত্য করতে। এটাও নিশ্চিত, মৃত্যুর আগ্রাসন থেকে মুক্তি দেয়ার মতো সাধ্য, শক্তি ও উপায় কারো নেই। মৃত্যু বয়স মানে না, সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে না এবং ধর্মের মোড়ক দিয়ে মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করা যায় না। সাড়ে চারশ বছর আগে আঁকা এ ছবির নিগূঢ় সত্য সর্বকালের সব সময়ের জন্য সমসাময়িক। তাই দ্য ট্রায়াম্ক অব ডেথ একটি মাস্টার পিস।
সামিয়া কালাম: লেখক





