বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী চলমান একটি বিষয় নিয়ে সবাই তর্কে-বিতর্কে মেতে উঠেছে এবং তা হলো নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের অবসান ঘটলে দুনিয়ার সবকিছু বদলে যাবে কিনা। সারা বিশ্বের রাষ্ট্র-সমাজ, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, বৈশ্বিক অর্থনীতি, সামাজিক নিয়ম-কানুন এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর এ মহামারীর সম্ভাব্য পরিবর্তিত প্রভাব সম্পর্কে পণ্ডিতেরা বিভিন্ন ধরনের তত্ত্ব, দৃশ্যকল্প এবং আগামী দিনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি উপস্থাপন করেছেন। অতীতের বিভিন্ন সময়ে আবির্ভূত মহামারী কতটুকু বিধ্বংসী ছিল, তা দেখার জন্য অনেকেই এরই মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে অতীতের সেসব মহামারীর তুলনা করা শুরু করেছেন। এ তুলনামূলক কাজের জন্য প্রায়ই সার্স, মার্স, ইবোলা ও এইচ১এন১ মহামারীগুলোর সময় ও স্থায়িত্বকাল ব্যবহার করা হয়। যা হোক, বিংশ শতাব্দীর এসব মহামারী ইতিহাসের একমাত্র মহামারী নয়, যাদের সঙ্গে কেবল পণ্ডিতেরা তুলনা করছেন।
অতিসম্প্রতি
কয়েকজন পণ্ডিত স্প্যানিশ ফ্লুর সঙ্গে তুলনা করা শুরু করেছেন, যা ১০০ বছরেরও আগে আবির্ভূত হয়েছিল। বলা বাহুল্য, আধুনিক কালে সবচেয়ে মারাত্মক প্রাদুর্ভাব হিসেবে স্প্যানিশ ফ্লুকে গণ্য করা হয়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ১০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছে। এছাড়া একই সময়ে ৫০ কোটিরও বেশি লোক আক্রান্ত হয়েছিল। বলা হয়, স্প্যানিশ ফ্লু একটা গোটা প্রজন্মকে আতঙ্কিত করেছিল। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই মহামারীতে মারা গিয়েছেন, যেমন—জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স ওয়েবার, অস্ট্রিয়ান অঙ্কনশিল্পী গুস্তাভ ক্লিমট ও ফরাসি কবি গিয়োমে অ্যাপোলিন্যায়র।
এছাড়া
বহু বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন যারা স্পেনিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, কিন্তু বেঁচে যান। এদের মধ্যে আছেন উড্রো উইলসন, ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, যিনি পরে ১৯৩২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ। এছাড়া স্প্যানিশ ফ্লু আক্রান্তের তালিকায় ছিলেন প্রখ্যাত লেখক ও শিল্পী, যেমন—ফ্রাঞ্জ কাফকা, জর্জিয়া ও’কিফ ও কার্টুনিস্ট ওয়াল্ট ডিজনি। এ রোগের প্রাদুর্ভাবের পরিধি ও প্রভাব সম্পর্কে বিপুল সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে স্প্যানিশ ফ্লুর ওপর বিভিন্ন ধরনের উপাদান বা তথ্য আর্কাইভ থেকে নেয়া হচ্ছে, যা অধ্যয়ন করার মাধ্যমে নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে তুলনা করা শুরু হয়েছে। এমনকি মহামারীর ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন খবরাখবর পুনঃপ্রচারের সময় ১৯১৮ সালের চাক্ষুষ নথিপত্রও ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সমগ্র বিশ্বে।
মহামারী প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে জনসাধারণকে সতর্ক করার জন্য তারা যেসব সাবধানতা অবলম্বন করবে, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা পোস্টার তৈরি করেন। সেসব পোস্টার এবং যা কিছু সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হবে, তাতে নিউইয়র্কের রাস্তায় তোলা অনেক ছবিই ব্যবহূত হয়েছে। বর্তমানে নিউইয়র্ক শহরকে আরেকটি মহামারীর প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালের ওয়ার্ডের রোগীরা হরেক রকমের মুখাবরণ (মাস্ক) পরিধান করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুর ওপর নির্মিত নেটফ্লিক্সের তথ্যচিত্র ‘মহামারী: কীভাবে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা যায়’-এর প্রথম পর্বে সচিত্র উপকরণের অনেক কিছুই দেখানো হয়েছে। এ নভেল করোনাভাইরাস মহামারী সময়ে সাধারণ মানুষের মনমানসিকতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাদৃশ্য দেখে অনেকে রীতিমতো অবাক হচ্ছেন।
স্প্যানিশ
ফ্লু সম্পর্কে অজস্র চাক্ষুষ ও লিখিত তথ্যাদি থাকা সত্ত্বেও প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে মানুষের যন্ত্রণার তেমন কোনো শিল্পকর্ম তৈরি হয়নি। হয়তো ফ্লুই মহামারীর সাক্ষী এবং ভুক্তভোগীরা মনে করতে চান না অথবা ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালের ঘটনা সম্পর্কে তারা মৌন থাকতে পছন্দ করেন। সেই মহামারীর ব্যাপকতার মাত্রা বিবেচনাা করে সহজেই বলা যায়, তখন বহুসংখ্যক মানুষ ছিল না, যারা স্প্যানিশ ফ্লুর প্রভাব থেকে নিজেদের মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে দূরে রাখতে পেরেছিল। যা হোক, স্প্যানিশ ফ্লুর ব্যাপ্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্পী বা লেখক মহামারীকে উপজীব্য করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চাননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদিও মহামারীর তাত্ক্ষণিক ঘটনার সময়কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সোনালী প্রজন্ম’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে, তবে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং এফ স্কট ফিটজেরাল্ড সেই ফ্লুর ক্রান্তিকালকে তাদের লেখার মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেননি। অন্যদিকে স্প্যানিশ ফ্লু সম্পর্কে কয়েকজন লেখকের লেখায় বিস্তারিত প্রকাশ পেয়েছে। সেসব ব্যতিক্রম রচনার মধ্যে উইলা ক্যাথারের পুলিত্জার পুরস্কার বিজয়ী ‘ওয়ান অব আওয়ার্স’ এবং থমাস উলভের ‘লুক হোমওয়ার্ড অ্যাঞ্জেল’ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। নিঃসন্দেহ বলা যায়, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা ছিল ক্যাথেরিন অ্যান পোর্টারের ‘পেইল হর্স, পেইল রাইডার’। তবে আরো বলা যায়, স্প্যানিশ ফ্লুর স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে আজ পর্যন্ত যত কল্পবিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ রচিত হয়েছে, পরিমাণ অর্থাৎ সংখ্যার দিক থেকে তা অপ্রতুল।
উপরন্তু আগের মহামারীর বর্ণনা নিয়ে শিল্পসম্মত কাজ রয়েছে, যেমন—পিটার ব্রুগেলের ‘ট্রায়াম্ফ অব ডেথ’ ও আর্নল্ড বকলিনের ‘প্লেগ’, যা গোটা ইউরোপে সংক্রমিত প্লেগ নিয়ে আঁকা। তবে স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে তেমন বেশিসংখ্যক উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম নেই। যা হোক, দুটি ব্যতিক্রম আছে। স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ে বেঁচে থাকা দুজন বিশিষ্ট ইউরোপীয় চিত্রশিল্পী ছিলেন এবং তারা উভয়ই মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অস্ট্রিয়ান চিত্রশিল্পী এগন শীলা, যিনি বিখ্যাত ‘দ্য ফ্যামিলি’ চিত্রটি অঙ্কন করেছিলেন, স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা যান; অন্যদিকে নরওয়েজিয়ান চিত্রকর এডভার্ড মুংখ স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েও বেঁচে যান।
স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে মুংখের দুটি চিত্রকর্ম রয়েছে, ‘সেল্ফ
পোর্ট্রেট উইথ দ্য স্প্যানিশ ফ্লু’ ও ‘সেল্ফ পোর্ট্রেট আফটার দ্য স্প্যানিশ ফ্লু’। এ দুটি চিত্রকর্মে মহামারী প্রাদুর্ভাবের সময় এবং পরে শিল্পীর ভয়াবহ মানসিক যন্ত্রণার ছবি ফুটে উঠেছে। জীবনের শুরু থেকে মৃত্যু, অসুস্থতা এবং নিরবচ্ছিন্ন অবসাদ ছিল মুংখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার আংশিক কারণ ছিল শৈশবে তিনি নিকটতম আত্মীয়দের হারিয়েছেন, যারা যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং বাকি অংশের কারণ ছিল তার নিজেদের ভগ্ন স্বাস্থ্য। মুংখ এসব বিষয়কে তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় চিত্রকর্মের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তার অঙ্কিত বিভিন্ন চিত্রকর্ম ও চরিত্রে অন্ধকার আবহের মাধ্যমে তিনি মৃত্যুর দূতকে উপস্থাপন করেছেন, যা তার কাজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। মৃত্যুপথযাত্রীর পাশে দাঁড়ানো ক্রন্দনরত মানুষ এবং যন্ত্রণা, বেদনা ও বিষাদ ছিল তার বিখ্যাত কাজ ‘ফ্রিজ অব লাইফ’-এর শেষাংশের সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত বিষয়। ইউরোপে যখন স্প্যানিশ ফ্লু আঘাত হানে, তখন তিনিও ছিলেন সংক্রমণে আক্রান্তদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ফ্লু থেকে আরোগ্য লাভের সময় প্রথম ছবিটি আঁকেন। সেই ছবিতে দেখা যায়, তিনি ঢিলেঢালা পোশাক পরে একটি ফাঁকা কক্ষে বিছানার পাশে চেয়ারে বসে আছেন। তার চেহারায় মলিনতা ও অবসন্নের ছাপ ফুটে উঠেছে। চিত্রটি তার আগের আত্মপ্রকৃতির ছবির মতোই নিঃসঙ্গ। তার অবসাদগ্রস্ত মুখমণ্ডল এবং খোলা মুখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্প্যানিশ ফ্লুর সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত উপসর্গ, অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধা। এসব চিত্রকলার মধ্যে দ্বিতীয়টিতে দেখা যায় মুংখ দাঁড়িয়ে আছেন। যদিও তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি ছিল স্থির, কিন্তু সোজা ছিল না। তার মুখমণ্ডলের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই হতাশা এবং ক্লান্তির মিশেল, যা সেই রোগের কারণে হয়েছে। স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ে অঙ্কিত তাই এ দুটি প্রতিকৃতি আগের অঙ্কিত মৃত্যু ও অসুস্থতার চিত্রকর্ম থেকে আলাদা। হতাশা এবং দুঃখ, যা তার মধ্যে রোগ সৃষ্টি করেছে, থাকা সত্ত্বেও তিনি এসব চিত্রকর্মে মৃত্যুকে তুলে ধরার জন্য কোন কংকাল আঁকেননি, কিংবা মৃত্যুদূতকেও উপস্থাপন করেননি। তার মনের অসুস্থতা ও মানসিকতার প্রভাব থাকলেও তা জীবনের অন্তিম সীমানাকে অতিক্রম করে গেছে। আগের যেসব চিত্রকর্মে তিনি অসুস্থতাকে তুলে ধরেছিলেন, যেখানে প্রিয়জন অসুস্থ রোগীর শিয়রে দুশ্চিন্তা এবং এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষায় ছিল, তিনি নিজেকে সেসব ঘটনার শিকার বলে মনে করেন। সুতরাং মুংখের কাছে স্প্যানিশ ফ্লুর আয়ুস্কালে এমন কিছু আছে, যা ‘সাধারণ’ অসুস্থতা এবং মৃত্যু থেকে পৃথক।
দুর্ভাগ্যবশত
আমাদের কাছে স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে অঙ্কিত এমন ধরনের অধিকসংখ্যক চিত্রকর্ম নেই, যা আমরা শিল্পীদের অনুভূতি বোঝার জন্য ব্যবহার করতে পারি। অনেক মানুষ আছেন, যারা ভুলে যাওয়ার আগ্রহ নিয়ে সন্দিহান, এমনকি ১৯১৮ ও ১৯১৯ সালের ঘটনাকে তুলে ধরার জন্য অনেকেরই অনীহা ছিল, যখন ভয়ানক অসুস্থতা বিশ্বের অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল কিংবা ভয় দেখিয়ে আতঙ্কে রেখেছিল। এছাড়া অনেকে স্প্যানিশ ফ্লুকে ‘ভুলে যাওয়া মহামারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ধ্বংস, মৃত্যু ও ব্যাপক ক্ষতি সত্ত্বেও মরণব্যাধি মহামারী সমগ্র বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছিল। অথচ বর্তমানে অনেকে তা স্মরণ করে না। স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে রচিত গ্রন্থে লরা স্পিনে সম্মিলিতভাবে এ ভুলে যাওয়ার প্রবণতাকে তুলে ধরেছেন। তার মতে, ‘ব্যক্তিগতভাবে
স্প্যানিশ ফ্লুকে স্মরণ করা হয়, কিন্তু দলগতভাবে নয়। ঐতিহাসিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং লক্ষাধিক অসংলগ্ন ব্যক্তিগত বিয়োগান্তক ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়।’ স্প্যানিশ ফ্লুর ঘটনাটি মানুষ ভুলে যেতে পছন্দ করে। এটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পাদটীকা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
কীভাবে
নভেল করোনাভাইরাসের দিনগুলো শিল্পী ও লেখকরা মনে রাখবেন, তা নিয়ে সবার মাঝেই কৌতূহল ও আগ্রহ থাকবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপস্থিতি এবং ক্যামেরায় ও ভিডিওসহ কিছু কিছু মাধ্যমের ব্যাপক হারে সহজলভ্যতা আগামী প্রজন্মের জন্য চাক্ষুষ পণ্যের এক বিস্তৃত ভাণ্ডার রেখে যেতে সক্ষম। এসব জিনিসের অধিকাংশই আমাদের শহরের সবচেয়ে জনবহুল কেন্দ্র ও ঘুলিঘুপচির ফাঁকা সংস্করণ, পরিত্যক্ত রাস্তাঘাটের রহস্যাবৃত দৃশ্যাবলি, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখাবরণ পরা মানুষজন এবং মুদি দোকানের সম্মুখে একজন আরেকজনের কাছ থেকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখা, হাসপাতালে অসুস্থ লোকজনের ছড়াছড়ি এবং বডি ব্যাগের ভেতর, স্ট্রেচারে ও কফিনের মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত মরদেহের দৃশ্য। এসব ছবি গণমাধ্যমে এতই দৃশ্যমান যে হঠাৎ করে দেখাও প্রায় অসম্ভব। যেসব লোক তাদের প্রিয়জন হারিয়েছে, অথচ ভালো করে তাদের শেষ বিদায় জানাতে পারেনি, তাদের গল্প প্রতি রাতের খবরে সম্প্রচারিত হচ্ছে। যা হোক, আগামীতে শিল্পী ও লেখকরা কীভাবে এ দিনগুলোকে তুলে ধরবেন, সেই দেখাটা আরো বেশি আকর্ষণীয় হবে।
আমরা কি তা ব্যক্তিগত রাখতে পছন্দ করব, নাকি আমরা অসংখ্য শিল্পকর্ম পাব, যেখানে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে আসা সর্বজনীন যন্ত্রণা, কষ্ট, ভয় ও মৃত্যুকে তুলে ধরা হবে?
সংক্রমণ
ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রত্যেকটি প্রধান সংবাদ মাধ্যম ‘আইসোলেশন’, দুশ্চিন্তা
ও আতঙ্কের দিনগুলোকে ধাতস্থ করার জন্য একজন পরামর্শদাতা বা মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করেছে। বিভিন্ন দেশের মানুষ যখন আক্রান্ত হওয়ার পর সংক্রমিতের সংখ্যার বক্ররেখা সমতল করতে সক্ষম হবে, তখন দেখব আমরা কীভাবে এ দিনগুলোকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করি এবং কেমন করে শিল্পী ও লেখকরা নভেল করোনাভাইরাসের আতঙ্কিত সময়কে ধারাবাহিকভাবে অঙ্কন বা লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করেন। এ দিনগুলোকে মনে রাখার জন্য এরই মধ্যে আমরা অনেক সাংকেতিক শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, যেমন ‘সোস্যাল ডিস্ট্যান্সিং’, ‘আইসোলেশন’,
‘সেল্ফ-কোয়ারেন্টিন’, ‘ভেন্টিলেটর’,
‘এন৯৫ মাস্ক’, ‘ট্রাভেল
রেস্ট্রিকশন’, ‘স্টে
অ্যাট হোম অর্ডারস’ ও ‘মোবাইল মরচুয়ারিজ’। উপরন্তু এমন অনেক ওষুধ আছে, যেগুলো কেউ বানান করে লিখতে অথবা উচ্চারণ করতে পারবে না। কিন্তু প্রত্যেকেই একটা শহর, যার নাম উহান, নিয়ে গল্পগুজব করে। অথচ মানচিত্রে কেউ দেখিয়ে দিতে পারবে না, কোথায় সেই শহরের অবস্থান। তবে সবাই জানে উহান বলতে কী প্রতিনিধিত্ব করে এবং একটি রোগ, যা সবাইকে অসুস্থতা ও মৃত্যু সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
[নিবন্ধটি তুরস্কের ‘ডেইলি সাবাহ’ পত্রিকায় ৯ এপ্রিল ২০২০-এ প্রকাশিত]





