প্রাচীন রোমের
সর্বশেষ বিখ্যাত
নিস্পৃহবাদী (স্টোয়িক)
দার্শনিক ছিলেন
সম্রাট মার্কাস
অরেলিয়াস অ্যান্টোনিয়াস।
জীবত্কালের শেষ
১৪ বছর
তাকে মোকাবেলা
করতে হয়
ইউরোপের ইতিহাসের
সবচেয়ে ভয়াবহ
হিসেবে পরিচিত
প্লেগ মহামারী।
দি অ্যান্টোনিন
প্লেগ—তার
নামানুসারেই নামকরণ—এ
রোগের উৎস
ছিল গুটিবসন্তের
ভাইরাস। প্রায়
৫০ লাখ
মানুষ এ
মহামারীতে মারা
যায়। মৃতের
তালিকার রয়েছেন
স্বয়ং সম্রাট
মার্কাস অরেলিয়াস।
১৬৬ থেকে
১৮০ খ্রিস্টাব্দজুড়ে
পৃথিবীতে একের
পর এক
দুর্যোগ ও
মহামারীর পুনরাবৃত্তি
ঘটতে থাকে।
রোমান ইতিহাসবিদের
বয়ানে এ
বিপর্যয় সম্পর্কে
বেশ ধারণাও
পাওয়া যায়।
ব্যাপকসংখ্যক মানুষ
মারা যায়,
গ্রাম ও
শহরগুলো মানবশূন্য
হয়ে পড়ে,
ধ্বংসের মুখে
পতিত হয়
সবকিছু। যার
ভয়াবহ প্রভাব
থেকে বাঁচেনি
খোদ রোম
নগরীও। ঘোড়াচালিত
মালবাহী গাড়িগুলো
প্রতিদিন হাজার
হাজার মরদেহ
তুলে নিয়ে
তখন শহর
ছাড়ত।
প্লেগ মহামারীর
মাঝামাঝি সময়ে
সম্রাট মার্কাস
পাণ্ডুলিপি লিখতে
শুরু করেন।
ভাবা যায়,
ভয়াবহ দুর্যোগের
মধ্যেও একজন
সম্রাট নির্বিকার
হয়ে লিখতে
বসেছেন! মার্কাসের
লেখা পাণ্ডুলিপি
পরিচিত ‘দ্য
মেডিটেশনস’ নামে।
মহামারীর মতো
সংকটের আষ্টেপৃষ্ঠে
বাঁধা পড়েও
মার্কাস তার
পাণ্ডুলিপিতে বেশকিছু
নৈতিক ও
মনস্তাত্ত্বিক উপদেশ
লিপিবদ্ধ করে
গেছেন; মূলত
দুর্যোগের সময়গুলোতে
দাঁড়িয়ে তিনি
নিজেকে কিছু
পরামর্শ দিয়েছেন,
তারই লিপিবদ্ধ
সংস্করণ দ্য
মেডিটেশনস। প্রাত্যহিক
উদ্বেগ, অসুস্থতা,
শোক ও
ব্যথা কাটিয়ে
উঠতে তিনি
নিস্পৃহবাদী দর্শনের
দ্বারস্থ হন
বা এ
দর্শনের প্রয়োগ
ঘটাতে শুরু
করেন। রোজকার
সংকট, সংকীর্ণতার
মাঝে নিজেকে
আটকে না
রেখে জীবনকে
আরো বহৎ
প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে
আস্বাদনের কথা
বলে তার
লেখা বইটি।
সে বিচারে
মহামারী মোকাবেলার
জন্য মানসিক
স্থিরতা ধরে
রাখার নৈপুণ্য
ও দক্ষতা
উন্নয়নের জন্য
দ্য মেডিটেশনস
বইটিকে দিকনির্দেশিকা
হিসেবে ধরে
নেয়ার বিষয়টি
বোধকরি বাড়াবাড়ি
হয় না।
এর প্রথম
কারণটি হচ্ছে,
নিস্পৃহবাদীরা বিশ্বাস
করেন যে
আমাদের চরিত্র
ও কাজের
মধ্যেই আমাদের
সতিকারের মঙ্গল
নিহিত, তারা
প্রায়ই নিজেকে
‘চারপাশের ঘটনাগুলো
মূলত কী
এবং কী
নয়’, তার
মধ্যে পার্থক্য
করার বিষয়গুলোকে
স্মরণ করিয়ে
দেন। আধুনিক
নিস্পৃহবাদীরা একে
‘নিয়ন্ত্রণের বৈপরীত্য’
হিসেবে অভিহিত
করেন এবং
মনে করেন,
এ ধরসের
স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য
মূলত মানসিক
চাপ কমাতে
সহায়ক। আমার
সঙ্গে যা
ঘটে তা
সরাসরি আমার
নিয়ন্ত্রণে নেই,
এগুলো কখনই
সম্পূর্ণভাবে আমার
নিয়ন্ত্রণে আসে
না, তবে
আমি শুধু
আমার চিন্তা
আর কাজগুলোকে
নিয়ন্ত্রণ করতে
পারি, বিশেষ
করে আমার
চিন্তার ধরনকে।
এক কথায়
মহামারী আসলে
আমার নিয়ন্ত্রণে
নেই। তবে
এর বিপরীতে
আমি আমার
প্রতিক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ
করতে পারি।
যতক্ষণ আমার
মনের ওপর
আমার নিয়ন্ত্রণ
আছে বাইরের
কোনো কিছু
আমাকে প্রভাবিত
করতে পারবে
না। সবকিছু
না হলেও
আমাদের চিন্তাভাবনা
আমাদের ওপর
নির্ভর করে।
সুতরাং এ
দর্শন অনুসারে
বিষয়গুলো এমন
যে কোনো
একটি ঘটনা
আমাদের তাড়িত
করছে না,
বরং ওই
ঘটনা ঘিরে
আমাদের নিজস্ব
চিন্তা দ্বারা
আমরা তাড়িত
হচ্ছি। আরো
স্পষ্ট করে
বললে, কোনো
ঘটনা ঘিরে
আমাদের রায়
যেমন, বিষয়টি
সত্যিই খারাপ,
ভয়ংকর, এমনকি
বিপর্যয়কর—ব্যক্তির
এ ধরনের
প্রতিক্রিয়াগুলোই সংকটের
কারণ হয়ে
ওঠে।
এগুলো নিস্পৃহবাদের
অন্যতম প্রাথমিক
মনস্তাত্ত্বিক নীতি।
তাছাড়া এটি
সাইকোথেরাপির শীর্ষস্থানীয়
প্রমাণভিত্তিক ধরন
আধুনিক জ্ঞানীয়
আচরণ থেরাপির
(সিবিটি) প্রাথমিক
ভিত্তি। সিবিটির
প্রবর্তক আলবার্ট
এলিস ও
অ্যারন টি
বেক, উভয়ই
নিস্পৃহবাদকে তাদের
জন্য দার্শনিক
অনুপ্রেরণার বিষয়
হিসেবে বর্ণনা
করেছেন। ব্যাপারটা
এমন যে
ভাইরাস নয়,
বরং ভাইরাসকে
ঘিরে নানামুখী
ভাবনাচিন্তাই আমাদের
আতঙ্কিত করে
তুলছে। তাই
সামাজিক দূরত্ব
মেনে চলার
নিয়মগুলোকে যারা
উপেক্ষা করছেন,
তাদের অবিবেচনাপ্রসূত
কর্মকাণ্ডগুলো আমাদের
ক্ষুব্ধ করছে
না, বরং
তাদের ঘিরে
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই
আমাদের রাগিয়ে
তুলছে।
দ্য মেডিটেশনস বইটি হাতে নিয়ে সূচনা অধ্যায় যেখানে সম্রাট মার্কাস তার বন্ধু, পরিবারের সদস্য, শিক্ষকসহ প্রায় ১৭ জন ব্যক্তির যেসব চারিত্রিক গুণাবলিগুলোকে ভীষণ মূল্য দেন বলে উল্লেখ করেন তা পড়তে গিয়ে অনেকেরই জট পাকিয়ে যায়, যা নিস্পৃহবাদ চর্চার এক ব্যাপ্ত উদাহরণ। মার্কাস নিজেকে প্রশ্ন করতে পছন্দ করতেন যে ‘এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রকৃতি আমাকে কোন গুণাবলিটি দান করেছে?’ এটি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের যে প্রশ্নের দিকে তাড়িত করে তা হলো ‘অন্যরা কীভাবে এ ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে?’
নিস্পৃহবাদীরা প্রজ্ঞা,
ধৈর্য ও
আত্মশৃঙ্খলার মতো
চারিত্রিক দৃঢ়তাকে
নিজেদের মধ্যে
প্রতিফলিত করতে
সচেষ্ট থাকেন,
যা কিনা
প্রতিকূল পরিস্থিতিতে
তাদের আরো
বেশি নমনীয়
করে তোলে।
তারা এ
গুণাবলিগুলোকে বিভিন্ন
উদাহরণের আলোকে
ব্যাখ্যা করতে
চেষ্টা করেন
এবং দৈনন্দিন
জীবনের চ্যালেঞ্জ,
এমনকি মহামারীর
মতো দুর্যোগকালীন
পরিস্থিতিতেও নিস্পৃহ
থাকার সহশীলতা
অর্জন করেন।
অন্যরা পরিস্থিতির
সঙ্গে কীভাবে
নিজেদের মানিয়ে
নিয়েছে, তা
থেকেও এরা
শিক্ষা গ্রহণ
করেন। এমনকি
ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব
কিংবা কাল্পনিক
কোনো চরিত্রকেও
তারা তাদের
রোল মডেল
হিসেবে বেছে
নিতে পারেন।
এসব বিষয়কে
মাথায় নিয়ে
নিস্পৃহবাদের আরো
একটি প্রচলিত
স্লোগানকে বুঝতে
পারাটা সহজ
হয়ে ওঠে;
‘আমরা যেসব
জিনিসকে ভয়
পাই তার
তুলনায় ভয়ের
ধারণাটাই আমাদের
জন্য বেশি
ক্ষতিকারক।’ এটি
সাধারণভাবে অস্বাস্থ্যকর
আবেগগুলোর জন্য
প্রযোজ্য, নিস্পৃহবাদীদের
কাছে এটি
‘প্যাশন’ বা
‘আবেগ’, যা
এসেছে গ্রিক
শব্দ ’প্যাথোস’
থেকে—‘প্যাথোলজিক্যাল’
বা আবেগপূর্ণ
শব্দের উৎসও
এটি। প্রথমত,
অগভীর কাণ্ডজ্ঞানের
ক্ষেত্রে এটি
সত্য। এমনকি
মহামারী থেকে
বেঁচে যাওয়া
৯৯ শতাংশ
কিংবা আরো
বেশি সম্ভাবনা
থাকা সত্ত্বেও
এ-সংক্রান্ত
দুশ্চিন্তা আর
উদ্বেগগুলো স্রেফ
পাগল করে
তুলতে পারে,
যার চরম
পরিণতি হিসেবে
কিছু লোক
নিজের জীবন
পর্যন্ত শেষ
করে দিতে
পারেন।
আমরা যে
বিষয়গুলোকে ভয়
পাই তার
চেয়ে স্রেফ
ভয়ের ধারণা
আমাদের কত
বেশি ক্ষতি
করতে পারে,
এ অবস্থায়
তা বুঝে
ওঠাটা সহজ
হয়ে ওঠে।
কেননা নেহাত
এ ধারণাটাই
আমাদের শারীরিক
স্বাস্থ্য ও
জীবনমানের ওপর
নেতিবাচক প্রভাব
ফেলতে শুরু
করে। নিস্পৃহবাদীদের
কাছে এ
কথাটির গভীর
তাত্পর্য রয়েছে।
ভাইরাস কেবল
আমাদের শরীরের
ক্ষতি করতে
পারে, চূড়ান্ত
পর্যায়ে মৃত্যুর
কারণও হতে
পারে। তবে
ভয় আমাদের
অস্তিত্বের নৈতিক
মূলে প্রবেশ
করে। আমরা
যদি এর
মোকাবেলা না
করি, তবে
এটি আমাদের
মনুষ্যত্বকে ধ্বংস
করে দিতে
পারে। নিস্পৃহবাদীদের
কাছে যা
মৃত্যুর চেয়েও
খারাপ।
তাই পরিশেষে
বলা যায়,
মহামারী চলাকালে
নিজের মৃত্যুর
ঝুঁকি বা
সম্ভাবনার সামনে
দাঁড়াতে হতে
পারে। যেদিন
জন্ম নিয়েছেন,
সেদিন থেকেই
কিন্তু মৃত্যুর
বিষয়টিও লেখা
হয়ে গেছে।
আমাদের মধ্যে
বেশির ভাগই
বালিতে মুখ
গুঁজে থাকার
মতো একে
এড়িয়ে যাই।
কেননা এড়িয়ে
যাওয়াটাই পৃথিবীতে
সবচেয়ে জনপ্রিয়
অনুসরণীয় কৌশল।
আমরা সবাই
একদিন মারা
যাব—স্বতঃস্ফূর্তভাবে
এ চরম
সত্যকে অস্বীকার
করেই আমরা
বেঁচে থাকি।
নিস্পৃহবাদীরা বিশ্বাস
করেন যে
আমরা যখন
মৃত্যুর মুখোমুখি
হই এবং
এর প্রভাবগুলো
সম্পর্কে উপলব্ধি
করতে শুরু
করি, তখন
তা জীবনের
প্রতি আমাদের
দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে বেশ
নাটকীয়ভাবেই পরিবর্তন
করে দিতে
পারে। আমাদের
মধ্যে যে
কেউ যেকোনো
সময় মৃত্যুকে
আলিঙ্গন করতে
পারি। কারণ
জীবন চীরদিনের
জন্য নয়।
মৃত্যুশয্যায় সম্রাট
মার্কাস কী
ভাবছিলেন, ইতিহাসবিদদের
লেখনী থেকে
আমরা তা
জেনেছি। তাদের
মধ্যে একজন
লিখেছেন যে
মৃতুশয্যায় মার্কাস
যখন চরম
মুহূর্তের জন্য
অপেক্ষা করছিলেন
তখন তার
বন্ধুরা শোকে
বিহ্বল হয়ে
পড়লে তিনি
খুব শান্তভাবে
তাদের জিজ্ঞেসা
করেছিলেন যে
কেন তোমরা
আমার জন্য
কান্নাকাটি করছ,
প্রকৃতপক্ষে অসুস্থতা
ও মৃত্যু
উভয় যখন
অনিবার্য, প্রকৃতির
অংশ এবং
মানবজাতির অংশ
হিসেবে আমাদের
সবাইকেই তা
গ্রহণ করতে
হবে। তিনি
তার দ্য
মেডিটেশনস বইটি
জুড়ে বহুবার
এ বিষয়বস্তুটিতেই
ফিরে এসেছেন।
তিনি নিজেকে
বলেছেন, ‘যা
কিছু ঘটে
চলে’ এমনকি
অসুস্থতা এবং
মৃত্যুকেও বসন্তের
গোলাপ কিংবা
শরতের শস্যের
মতোই স্বাভাবিক
প্রচলিত বিষয়
হিসেবে দেখা
উচিত। অন্যভাবে
যদি বলা
হয় তাহলে
কয়েক দশকজুড়ে
নিস্পৃহবাদচর্চার মাধ্যমে
মার্কাস অরেলিয়াস
অবিচ্ছিন্ন প্রশান্তির
সঙ্গে নিজেকে
মৃত্যুর মুখোমুখি
হতে শিখিয়েছিলেন,
যেন তিনি
অতীতে অসংখ্যবার
এমন ঘটনার
মুখোমুখি হয়েছেন।
ডোনাল্ড
রবার্টসনের
হাউ টু
থিংক লাইক
আ রোমান
এম্পেরর: দ্য
স্টোয়িক ফিলোসফি অব মার্কাস অরেলিয়াস অবলম্বনে
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক ও লেখক





