ওকসানা মারাফিতি । অনুবাদ: মাহমুদ আলম সৈকত
ক. তাকে খুঁজে পেতে
শোয়ার ঘরের মেঝেতে আদিকালের ডিজাইনের একটা ঘাগরা পরে থেবড়ে বসে ছিলাম, আর পুরনো ছবিগুলো পাখার বেমক্কা বাতাসে বিক্ষুব্ধের মতো চারপাশে উড়ছিল। সাদা-কালো ছবিগুলোয় জড়িয়ে আছে কত পুরাণকথা আর অগুনতি অচেনা স্বজনের স্মৃতি, যাদের গল্পগুলোই আমাকে আমি হওয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছে। বেশকিছু ছবির খুব বেহাল দশা, জায়গায় জায়গায় কালি লেপটে গেছে, কোথাও কোথাও কালি সরে গিয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে। আবার কিছু ছবি দারুণ ঝলমলে অবস্থাতেই আছে।
খুঁজে পেলাম দাদাভাই-দাদিমা, বাবা-মা, চাচা-চাচি-খালা আর একদঙ্গল চিত্তাকর্ষক তুতো ভাই-বোনদের ছবি। তাম্বুরিন আর গিটার হাতে নিয়ে নানা ভঙ্গিমার ছবি, ঐতিহ্যবাহী রোমানিয়ান বাহারি পোশাক পরা ছবি, ঢোলা হাতা কাঁচুলি আর ফুলকো ঘাগরা পরা নারী, সিল্কের শার্ট-চোগা পাতলুন-হাঁটুইস্তক ঢাকা বুট পরা সুদর্শন পুরুষ। এমন সাজ নিত্যদিনের নয় বোঝাই যায়, বিশেষ করে বললে কোনো গানের কনসার্টের জন্য পরা হতো। দাদাভাইয়ের পরিচলনায় গানের একটা দল ছিল। ওই দলটা ১৯৪০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত তত্কালীন গোটা সোভিয়েত ইউনিয়ন চষে বেড়িয়েছে বলা চলে।
১৯৭৯-এর একটা ছবিতে দেখতে পাচ্ছি, বাবা-মা মঞ্চে। মনে পড়ল, আমার দেখা মা-বাবার বেশির ভাগ ছবিই এ রকম মঞ্চের। বেড়ে উঠতে উঠতে আমি দেখতে পেলাম, তাদের জীবন নানা প্রেক্ষিতে ঝলমলে এবং একই সঙ্গে দিনের আলোর মতো প্রকাশিত। কেমন কেমন করে দলে ভিড়ে যাওয়া হলো আমারও! বছরখানেক পর এ মুগ্ধতা বা আকর্ষণ যা-ই বলি, আমাকে ভাবাল যে, মা-বাবার জীবন নিয়েই তো কিছু লিখে ফেলা যায়! এই যে এই ছবিটায়, বাবার হাতে ধরা ১২ তারের অ্যাকুইস্টিক গিটার... মায়ের গানের সঙ্গে বাবা বাজাতেন। ঠিক কোন গানটা, মনে নেই। তবে এটা পষ্ট মনে আছে, একবার মা-বাবার পরিবেশনার বারোটা বাজিয়েছিলাম। কারণ কোনো একটা গান চলার সময় আমি দৌড়ে মঞ্চে উঠে গিয়েছিলাম।
বয়স তখন পাঁচ বছর, নাচতাম খুব, বাই উঠেছিল নাচার, তাই দৌড়ে যাওয়া... অথচ দাদাভাই খুব রেগে গেয়েছিলেন।
এক হাতে চ্যাংদোলা করে সাজঘরে টেনে নিয়ে গেলেন আমাকে। হলরুম থেকে সাজঘরে আসা পর্যন্ত তার বুটজোড়া বিশ্রী রকমের শব্দ করতে করতে এসেছে। সাজঘরে পৌঁছে আমাকে একটা চেয়ারে গুঁজে দিতে গেলে আমি টের পেলাম, দাদাভাইয়ের গালে লাগানো পাউডারও যেন রাগে তেতে উঠেছে। দাদার বয়স তখন প্রায় ৬০ এবং এই ৬০ বছরেও তিনি প্রতিটি সন্ধ্যায় মঞ্চে নামতেন। নিজেকে পেশাদার ভাবতে তিনি খুব গর্ববোধ করতেন।
এ ঘটনায় স্বভাবতই আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
আমার কপালে তর্জনি ঠেকিয়ে বললেন, নট নড়নচড়ন। তার ৭ ফুট দীর্ঘ শরীরের উপস্থিতিই ছিল আমার জন্য ভীতিকর, তাতে আর কিছু বলার জো আছে! অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত ঠায় বসে রইলাম সেদিন। দলপতিকে অমান্য করা কারোর সাধ্যে নেই। তার মানে একবার যে ভয় পেয়েছিলাম, তার দরুন আর কখনো তেমন দুষ্কর্ম করিনি, সেটাও নয়।
করেছিলাম। সে এক চরম অবাধ্যতা! কিংবা এও বলা যায়, যে শিশুটি কখনো সীমারেখার বোধ নিয়েই বড় হয়নি, তার কথা কে কাকে বোঝাবে?
স্মৃতিরা ধোঁয়া-সংকেতের মতোই চালিত হয়। ফলে আরো আরো ছবির ভেতর দিয়ে পরিত্রাণের দিকে ছুটে যাই আমি। ঠিক এই মুহূর্তে আমার বয়স ৩৬, যুক্তিসঙ্গতভাবেই আমি বুদ্ধিমান এবং এ ঘরে বস্তুত লুকানোর জন্যই সেঁধিয়েছি। অবশেষে নিজের ১৫ বছর বয়সের একটা ছবি, যে ছবিতে আমাকে বেশ গম্ভীর আর ভাবুক লাগছে, বেছে নিলাম। ছবিটা আমাকে একবাক্যে বোঝার জন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র।
খ. বহ্ন্যুৎসবের আগে
সবসময়ই চেয়েছি লেখালেখি করব, এমনকি সেটা কীভাবে সম্ভব, তা জানার আগে থেকেই। গল্প পড়তে শেখার আগে থেকেই আমার মুখ দিয়ে মুড়ি-মুড়কির মতো গল্প বেরোত। সেই গল্পগুলো শিশুদের মতোই, কৈশোরে আমার পড়ার টেবিল-বিছানা-ঘরময় ছড়িয়ে থাকত হাতে লেখা কাগজ। আমার উদ্দেশ্যহীন সেই লেখা থামতই না।
এ অনুভবটা বেশ দারুণ। আমাকে ভরিয়ে রাখত।
স্মৃতিকথা লেখার গল্পটা অবশ্য ভিন্ন। অবিশ্বাস্য কাঙ্ক্ষা, সেই সঙ্গে দারুণ অস্থিরচিত্তে আমি লিখি কেবল অন্যরা আমার লেখা পড়বে এই আশায়। আর একবার একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যাওয়া মানেই সুনিশ্চিত বিজয়।
কিন্তু এখন আমি আমার লেখাগুলো ধ্বংস করে ফেলতে চাই।
প্রত্যেকটি বই।
আমার বাড়ির সামনে যে লনটা আছে, সেখানে বইগুলো পোড়াতে চাই, যাতে প্রতিবেশীরা সেটা সচক্ষে দেখতে পায়। মনে হলো, কিছুক্ষণের জন্য যেন সেই বহ্ন্যুৎসবের আঁচ পেলাম!
ছবির মেয়েটা অপেক্ষা করছে।
আমার তাকে বলার অনেক কথা আছে। কিন্তু শব্দরা মুখের ভেতর হুটোপুটি জুড়ে দিলেও বেরিয়ে আসতে পারছে না। ফলে মেয়েটাকেই আগ বাড়িয়ে কথা শুরু করতে হলো।
‘তো, কী পেতে চাও?’
‘কীসে তোমার মন ভরবে?’
‘কাউকে শিখিয়ে?’
‘কিছু একটা বানিয়ে?’
‘কিছু বলার নেই?’
দেয়ালে হেলান দিয়ে বুনো ষাঁড়ের মতো ভোঁস ভোঁস নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগলাম আমি।
গ. কখনো একটা কানফুল চুরি করতে নেই
গেল সপ্তাহে স্থানীয় এক বইমেলায় আমরা লেখকরা সারি দিয়ে বসেছিলাম লম্বা একটা টেবিলে। টেবিলে বসে আমরা নিজ নিজ বইয়ের ক্রেতা-পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছিলাম। দোলনায় রাখা গ্রন্থশিশুদের গর্বিত মা-বাবার মতো দেখাচ্ছিল আমাদের!
আমার সামনেই উপস্থিত ছিলেন একজন শিল্প সমালোচক— বিষয়টা আমার নজরে আসে বেশকিছু সময় পর— কিন্তু সেটা জানার আগে থেকেই আঁচ করছিলাম, লোকটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কেউ, বেশ জ্ঞানগম্যি রাখে। দেখতে দশাসই, হাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রেসলেট, কানে তামার রিং। মস্কোয় থাকতে খুব ওয়েস্টার্ন পড়তাম, বাস্তবে দেখা পেলাম যেন! মনে পুলক জাগল এই ভেবে যে, আমার আশপাশেই একজন ক্লিন্ট ইস্টউড বিরাজ করছে।
আমার দিকে হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টিতে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমি ফ্রেড।’ বলেই আমার বইর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল।
‘রোমানিয়ান পরিবারে বেড়ে ওঠার স্মৃতিকথা।’
ঝট করেই হাতটা থুতনি পর্যন্ত উঠিয়েই নামিয়ে নিল ফ্রেড।
‘বেশ, তাহলে আমার কানের দুটো রিংয়ের একটাও যাতে খোয়া না যায়, সেটার খেয়াল তো আমাকেই রাখতে হবে!’
তারপর সে চুপ হয়ে গেল।
ঘ. আপনি মূর্খ নন, এটা জাহির করতে
হ্যাঁ। বিষয়টি সত্য বটে যে, আমি একটা ছবির সঙ্গে কথা বলছি। তার মানে এই নয় যে, আমি উন্মাদ। তা বোকাদের আমি চিনি সেই ছোটবেলায় পড়া রূপকথার গল্প থেকে। আমি, মানে ঠিকঠাক করে বললে ‘বোকা’ শব্দটায়, জানি যে সমস্যাটা ঠিক কোথায়।
সমস্যা, তো?
বলছি শুনুন।
রোমানিয়ান কাউকে বোকাপাঁঠা ডেকে অপমান করাটা সামাজিকভাবেই সিদ্ধ।
যে কেউই যেকোনো জায়গায় চাই সে হোক বন্ধুর পার্টিতে কিংবা ধোপাখানায়, একজন জিপসির (‘জিপসি’ শব্দটা নিতান্তই অসম্মান অর্থে) সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। আর কোনোভাবে যদি সেখানে তার রোমানিয়ান ঐতিহ্যের প্রকাশ ঘটে যায়, ব্যস শুরু হয়ে গেল। চেতনে, অবচেতনে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে।
ওই শিল্প সমালোচকের সঙ্গে সাক্ষাতের সেই মুহূর্তটার উত্কৃষ্ট উদাহরণ এর চেয়ে আর কিছু হতেই পারে না।
ঙ. অনুশীলনের পাঁয়তারা নিতান্তই বোকাটে
বইটি বেরোনোর আগে আমি আমার পরিচয় বা পটভূমি যা-ই বলি গোপন করেছিলাম। কারণ রাশিয়ায় বড় হওয়া শিশু হিসেবে প্রচুর উত্তম-মধ্যম খেতে হতো আমাকে। সেই দিনগুলোয় আমি দ্রুত শিখেছি অন্যকে কষ্ট দেয়াটা মানুষের স্বাভাবিক আনন্দেরই অংশ। আর এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়াটাও প্রকৃতির সব প্রাণীরই সহজাত প্রবৃত্তি।
বইটি বেরোনোর আগে জীবন সহজ ছিল।
এখন আমি রাজত্ব হারিয়েছি।
অতএব, এখন এ ছবির সঙ্গে কথোপকথন।
আমার বেশ ভালো একজন বন্ধু একবার বলেছিল, নিজের অল্প বয়সের সঙ্গে কথোপকথনের অনুশীলন কখনো কখনো নিজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলোকে নিখুঁত করে তুলতে সাহায্য করে। কিন্তু নিজের সঙ্গে আমার আরো ভালোভাবে পরিচিত হওয়া জরুরি। ৩৬ বছরের আমি কৈশোরের আমার চেয়ে কম একগুঁয়ে। ফলে কৈশোর আমাকে দিয়ে স্মৃতিকথা লেখানোর যে ফন্দি এঁটেছিল, তা তো ভুল নয়।
কিন্তু এসবের সে কতটুকু জানে?
চ. ‘স্বাভাবিক’ হতে হবে
১২ বছর বয়সে আনুষ্ঠানিকভাবে নাচের মহড়া দিতে হয়েছিল আমাকে। আমার দাদি ছিলেন মশহুর গায়িকা। ভেবেছিলেন, ঠিকঠাক উতরে গেলে তার দলে ভিড়িয়ে নেবেন। সেই মোতাবেক মাসখানেক ধরে তারই একটা গানের সঙ্গে মহড়া করি। ওই যে গানটা, যেটা রুশি চলচ্চিত্র ‘জিপসিস গো টু হেভেন’-এ ব্যবহূত হয়েছে সেটা। দাদাভাইয়ের করা সব গানের সুরই রোমানিয়ার লোকসংগীতের সুরকে ভর করে রচিত। আর এ ধাঁচটা সোভিয়েতের আপামর জনগণেরও বেশ মনপছন্দ। যা-ই হোক, যেমনটা আগেই বলেছি, আমার বাবাও বেশ ভালো বাজাতেন। কিন্তু বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বোতলের পর বোতল স্তলিচনায়া সাবড়ে একদিন তিনি সাব্যস্ত করলেন, পড়াশোনায় উচ্চতর ডিগ্রি নেবেন। একদিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচালকের কাছে গিয়ে নিজের ইচ্ছার কথা পাড়লেন। টেবিলের অন্য পাশে বসা পরিচালক উঠে দাঁড়িয়ে বাবার সঙ্গে করমর্দন করলেন। দ্বিধাভরা কণ্ঠে জানালেন, ‘আপনার ইচ্ছেটাকে আমি সম্মান করি। কিন্তু মাফ করবেন আমায়, একজন ডিগ্রিধারী জিপসি? সম্ভব নয়। বরং আপনি আপনার গিটার বাদনেই আরো মনোযোগী হচ্ছেন না কেন!’
আমিও নাচের মহড়া থেকে ছিটকে পড়েছিলাম সেবার। দাদিমা মাথায় ঠোনা মেরে বললেন, ‘হবে কী করে? এসব তোর ভেতরে থাকতে হবে তো! তোকে আর দোষ দিয়ে কী হবে। তুই তো রোমানিয়ান নস।’
সুতরাং বুঝতে পারছেন, আমার মা এ দেশের মানে রোমানিয়ার নন। আর সেটা কোনো ঘোরপ্যাঁচে এসে আমার নাচের সমূহ ভবিষ্যৎ ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে গেল। সেই সন্ধ্যার পর আমি টানা তিনদিন নিজেকে একটা কামরায় বন্দি করে রেখেছিলাম।
সেই প্রথম আমি আপাত স্ববিরোধিতার মুখোমুখি দাঁড়ালাম।
অনুভূতিকে বিকারগ্রস্ত মনে হলো।
মুশকিল! এখানে বৈষম্যও দেখছি বৈষম্যমূলক।
ছ. কারোর নিজের পাগলামির মধ্যেই অনুপ্রেরণা খোঁজার প্রবণতা
ওই শিল্প সমালোচকের ওপর ভয়ানক রেগে গেলাম। নিজের ওপরও কখনো এতটা রেগে যাইনি আগে। রাগে প্রায় স্নায়ুবৈকল্যের দশা। তবে আমি যেহেতু আধুনিক, আর মামুলি একটা বইও যখন স্নায়বিকতার প্রশ্নে হাজির হয়, তখন তো আরো প্রাগ্রসর আধুনিক।
কোনো একটা বইয়ে স্বাক্ষর শুরু করার আগেই চোর হিসেবে গণ্য হওয়াটা বিশেষ কিছু— প্রচারণার জন্য আরো! এখানে আত্মসম্মান বলে কিছু নেই এবং হঠাৎই বুঝতে পারলাম, এসব চলতে থাকবে নিরন্তর। জগতের ফ্রেডরা দলে দলে হাজির হবেই।
মেঝেতে বসে ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেলায় বই স্বাক্ষর করার সেই মুহূর্তটি আমাকে কাঁদিয়ে দিল। নিজের জন্য দুঃখবোধ করাটা আমি ঘৃণা করি। চোখের গরম জল আর গালের তেতে ওঠা তাপ আমাকে একটা ফাঁপানো বেলুনে রূপান্তর করল।
‘হুঁ, তুমি এসবের কিছুই বোঝো না। আমি জানি, ব্যাপারটা এভাবে কাজ করে না। তুমি কোনো সাহায্যই করছ না। তুমি একটা বোকা কিশোরী ছাড়া আর কিছু নও।’ ছবিগুলো উল্টাতে উল্টাতে বললাম।
‘হয়তো বাচ্চারাই এসব ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো বোঝে’— তার কণ্ঠে আমার অপমানসূচক বার্তা উড়িয়ে দেয়ার সুর স্পষ্ট। যোগ করল—
‘আমরা যখন মঞ্চটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলাম, মনে আছে দর্শকসারি থেকে তুমুল অভিবাদন ভেসে আসছিল?’
‘তাতে কী!’
‘এমনকি গানের দলের সদস্যরাও কি উচ্ছ্বসিত হয়েছিল...’
‘আমি লজ্জাবনত হয়ে শুধু একবার মাথা ঝাঁকিয়েছিলাম।’
‘আর ওই যে সাজঘরে আমাদের সেঁধিয়ে দিয়ে চলে গেল দাদাজান... লোকটার যে মাথা নষ্ট, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ আছে?’
‘বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানো তো।’
জ. প্রিয় কোনো মানুষের পাগলামিকে ভর করে উদ্দীপ্ত হওয়ার চেষ্টা
বাবা তার কৈশোরেই পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হন— ন্যাট কিং কোল, মাইলস ডেভিস, এলভিস। সেই সময়কার সোভিয়েতে পাশ্চাত্য সংগীত এক প্রকার নিষিদ্ধই ছিল। পুলিশ ধরতে পারলে সোজা গারদে পুরে দিত। এ রকম বিপদ সত্ত্বেও বাবা তার শোয়ার ঘরে কাঠের মেঝেতে একটা ফোকর বানিয়ে সেখানে ডিস্কগুলো লুকিয়ে রাখতেন। তবে হরেদরে সব ডিস্কই নকল তৈরি ছিল। বাবার এই ঝোঁকে স্বভাবতই দাদাজানের অনীহা ছিল। দাদাজান বরাবরই চাইতেন রোমানিয়ান সংগীতকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে। বলা চলে, ওটাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, বিশ্বজুড়ে আমাদের সংস্কৃতি আর চারিত্রিক যে দুর্নাম ছড়িয়েছে তার পুনরুদ্ধার। অথচ বাবা বুঁদ ছিলেন জ্যাজ, ব্লুজ আর রক এন রোলে।
২১ বছর বয়সে এসে বাবা ঠিক করলেন, আমেরিকায় পালাবেন।
পালানো আর কি...
আর্মেনিয়া-তুরস্ক সীমান্তে সন্ধ্যার মুখে হাজির হয়ে অপেক্ষা করা আর রাত বাড়লেই সীমান্ত ডিঙিয়ে ভোঁ দৌড়।
ওইসব সীমান্তে এ ধরনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেশ মামুলিই ছিল সে সময়, সাফল্যের হারও বেশ ঈর্ষণীয়। সাইবেরিয়ার শ্রমশিবিরের দাগি আসামিদের কাছে লোকজন মূল্যবান সব টোটকা জানতে ধরনা দিত। কিন্তু বাবা তাড়াহুড়োয় গেলেন না। সাঙ্গোপাঙ্গদের তাড়া সত্ত্বেও সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে এগোলেন।
একদিন সূর্য ওঠার আগে মস্কোর উপকণ্ঠে মা-বাবার দুই কামরার বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন বাবা। টেবিলে ছেড়ে এলেন একটা ছোট চিঠি। তাতে লেখা, আমেরিকায় পৌঁছে থিতু হতে পারলে, ভিসা জোগাড় করতে পারলে তোমাদের জানাব। সঙ্গে নিলেন তার প্রিয় গিটার, ১০০ রুবলের একটা নোট আর স্টিলের তার কাটার জন্য একটা প্লায়ার।
গ্রীষ্মকালের আর্মেনীয় সীমান্ত এলাকার ভূখণ্ড এককথায় বুনো আর হিংস্র, রহস্যে ঘেরা। আর এর পর্বতমালায় যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বাস করত, তারা বেহেড বেপরোয়া ছিল। যা-ই হোক, বিপত্সংকুল পথ পেরিয়ে বাবা যখন সীমান্তের কাছাকাছি সমতলের দেখা পেলেন, দেখলেন সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। মাঠের বুক চিরে একটাই রাস্তা। গা গোলানো গরম, বুকের খাঁচা হাঁপরের মতো উঠছে-নামছে। বাবার বিশ্বাস ছিল, এসব তিনি উতরে যাবেনই। ডাকছে আমেরিকা, শিগগিরই এলভিসের সঙ্গে একটা মেগা হিট গান...
সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াটি চোখে পড়ল সহসাই। যতদূর চোখ যায় বিস্তৃত। রক্ত ছলকে উঠল যেন! গতি দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে উঠতে চাইল বাবার। কিন্তু সেটা সামলে নিলেন। অবশ্য সোভিয়েতবাসী সবারই উত্তেজনা প্রশমনের এ অভ্যাসটা রপ্ত হয়েই যেত সে সময়ে। তিনি জানতেন, ‘গোপন’ বা ‘গোপনীয়তা’ অভিধাটি কেবল আমেরিকার সম্পদ, আমেরিকার জন্যই তৈরি, পুব দিককার কারু ব্যবহারের জন্য নয়। ফলে দিনের বেলায় পার না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থিতু হলেন একটা ঝোপের আড়ালে। কিন্তু বাবার কপাল খারাপ ছিল। কাছের একটা খাড়াই থেকে দুজন রাশান সীমান্তরক্ষীর নজরে পড়ে গেলেন।
সন্ধ্যা নামার পর বাবা ঝোপ থেকে বেরিয়ে প্রায় বুকে হেঁটে এগোলেন সীমান্তে বেড়ার দিকে। কাছাকাছি পৌঁছতেই শুনলেন বাজখাই গলা—
‘থামো। ঠিক ওখানেই উঠে দাঁড়াও।’
রাইফেল বাগিয়ে খাড়াই ছেড়ে নেমে আসছে দুই সৈন্য। সাবধান বাণী কানেই তুললেন না বাবা। একেবারে উড়ে চললেন সীমান্তের দিকে। যেন এক উন্মত্ত পাহাড়ি ছাগল! হাচড়েপাচড়ে সীমান্তের বেড়ায় আছড়ে পড়লেন তিনি।
‘থামো এক্ষুনি। নইলে গুলি খাবে।’
আর কথামতোই গুলি ছুড়ল সৈন্যরা। প্রথম গুলিটা কানের পাশ দিয়ে শাঁই করে বেরিয়ে গেল। গিটারটাকে কষে আঁকড়ে ধরে এঁকেবেঁকে দৌড় লাগালেন অনেকটা মার্কিন সিনেমায় দেখা নায়কদের মতো। শেষতক একটা পাথরের বাধা পেয়ে বেড়ার গাঘেঁষে আছড়ে পড়লেন মাটিতে। দমাদম বুটের লাথি, নাক দিয়ে দরদর করে রক্ত ঝরছে। হুঁশ ফিরে দেখলেন, একটা হাত কাঁটাতার গলে তুরস্কে ঝুলছে। গিটারটা ঝুলছে কাছের একটা পিলারে। সীমান্তরক্ষীরা বাবাকে পাকড়াও করে একটা জিপে তুলে দিল। জিপে তাকে এবং আরো কয়েকজন দোসরকে সঙ্গে করে কাছের থানায় পৌছুল। এর সপ্তাহখানেক পর দাদাভাই বাবাকে ছাড়িয়ে নিতে এলেন। থানার কাপ্তান দাদার কাছ থেকে একগাদা টিপছাপ নিয়ে রাখল।
বাবার সাধের গিটারটা সেই তখন থেকেই লাপাত্তা।
ঝ. বেমক্কা ঘুষির জোরে রাজত্ব
আমাদের কথোপকথন দুপুর ছাড়িয়ে বিকালে ঠেকেছে। বিকালের নরম রোদ মেঝেতে জালের মতো ফুটকি মেলে আছে। চারপাশে তাকিয়ে আমি উজ্জ্বলতায় ডুবে গেলাম। একটু ক্লান্তি কাজ করলেও বেশ চাঙ্গা অনুভব করলাম, নিজেকে পরিশ্রুত মনে হলো।
‘সারা জীবনই লোকটা বেশ দেমাগ দেখিয়ে গেছে’— বলার সময় নিজের কণ্ঠেই কেমন গর্বের রেশ অনুভব করলাম।
‘দৃঢ় মনোবল থাকলে যা হয় আর কি, যা তার কাছে অপরিসীম মাত্রাতেই ছিল। আর এর জন্যই সারা জীবন শত্রু বাড়িয়ে গেছেন। লোকজন তাকে একভাবে চালাতে চাইত, কিন্তু তিনি চলতেন ঠিক তার পথেই। তবে আশ্চর্যজনকভাবে তিনি কারুর জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠেননি। বিরক্তিকর পর্যায়েও যাননি।’ একটানা বলে গেল কিশোরী আমি।
‘ব্যাপারটা দারুণ তাই না?’
বাবা অবশ্য এরপর আরো বহুবার পালানোর চেষ্টা করেছেন। এ চেষ্টা তার ঐতিহ্যিক বা নানাবিধ বঞ্চনা থেকে উদ্ভূত নয়। এ চেষ্টা একজন ব্যক্তির শিল্পীসত্তার স্বাধীন থাকার চেষ্টা। এ চেষ্টা জারি থাকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। হলিউডে পৌঁছে সেই দৌড় থেমেছিল আমাদের। তখন থেকেই আমাদের আমেরিকা পর্বের গল্প শুরু। তাই বলে নিজের শিকড়কে ভুলে থাকেননি মুহূর্তের জন্য। ভুলে যাননি তিনি কোথাকার কোন ভূখণ্ডের মানুষ। বরং এখানকার সুশীলরা তা বারবারই মনে পড়িয়ে দিয়েছে। বাবাও প্রতিবার অভিনব পন্থায় সেসবের উত্তর দিয়ে গেছেন—
যখনই শুনতে পেতেন যে, লোকজন তার জাতপাত নিয়ে বুড়বুড়ি কাটছে, ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিতে কসুর করতেন না। রক্তারক্তি বাধিয়ে বেশ গর্বের সঙ্গে কাছের থানার গারদে রাত কাটাতেন।
যখন দেখতেন, বেহুদাই লোকজন তার সঙ্গে অস্পৃশ্যের মতো আচরণ করছে, রোমানি ভাষায় অভিশাপের বন্যা বইয়ে দিতেন। তবে সেটা বেশ সুবোধ ঢঙে। দেখে মনে হতো, ক্ষমা চাইছেন।
যখনই সুযোগ পেতেন, খুব মার্জিত আচরণে এবং অকপটে আবেদন জানাতেন, যেন তারা তাদের অপমানসূচক কথাবার্তাগুলো পুনর্বিবেচনা করে।
সম্ভব হলে তিনি লোকজনকে রোমানি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জাতিগত সৌন্দর্য-সৌকর্য, তাদের সাহসিকতা আর বৈচিত্র্যপূর্ণ চরিত্রের কথা শোনাতেন। তিনি বলতেন, তোমাদের মতো ওরাও বাড়িঘরেই বাস করে। তাদেরও বাচ্চাকাচ্চা-স্কুল-হাটবাজার-অফিস-আদালত আছে। বেশ মানবিক, তাই না?
গিটারটা সঙ্গে থাকলে তিনি জগতের জন্য শান্তীকামী গানই বাজাতেন। আর এই শেষ নম্বরের কাজটিই বাবার খুব পছন্দের ছিল।
বাবার বন্ধুরা অবশ্য প্রায়ই খেপাতেন এই বলে যে, একজন সাচ্চা রোমানির কাজই হলো যুদ্ধ জয় করে টিকে থাকা। এক্ষেত্রে তিনি একটাই উত্তর দিতেন, যুদ্ধ আমাদের মন টুটাফাটা বানিয়ে দেয়, শিল্প তা মেরামত করে।
ঞ. ফেনিয়ে তোলা ফেনা
‘এ বইটা আমাকে ভেতর থেকে একদম গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তুমি জানো?’ ছবিটাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, আমি জানি, আমি উন্মাদ নই।
খোদার কসম, আমি মনে করি, ভাগ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ফন্দি এঁটে আপনাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয় না। এমনও নয় যে, সে অন্ধকার কোনো ভাঁড়ারে, পরিত্যক্ত ড্রামের ওপর বসে লেজ নাড়তে নাড়তে খ্যানখ্যানে গলায় হাসতে হাসতে ভাবে,
‘একটু অপক্ষো করো বাছা... একটু রোসো।’
‘তো! কী বোঝা গেল তাতে?’ ছবির কিশোরী মুখ খুলল। ‘পুরনো ক্ষত আঁচড়ে তাকে দগদগে করো অথবা এসবের থেকে মুক্ত থাকো। এও এক ধরনের প্রতিকার।’
আমার আঙুল ছবির পরিচিত মুখগুলোর ওপর খেলে গেল।
আমার আত্মা আমার দিকে ফিরে ফিরে চায়।
ভিড় করে আসে।
আমার ভুলে যাওয়া ক্ষতকে মেরামত করে।
আমি এসব ঘটতে দিই আনমনে।
লেখক পরিচিতি: ওকসানা মারিফিতি। মার্কিন লেখক। ১৫ বছর বয়সে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে সপরিবারে আমেরিকা পাড়ি জমান। লেখালেখি শুরুর আগে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন হলিউডে। তার রচিত স্মৃতিকথা ‘আমেরিকান জিপসি’, গল্পসংগ্রহ ‘ক্রিভয় লেক’। নিয়মিত লিখে থাকেন ‘স্লেট’, ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে।






