বিশ্বের সেরা সব সুন্দরীর তালিকা করা হলে সেখানে অবশ্যই থাকবে অনেক রানী ও রাজকুমারীর নাম। তাদের সৌন্দর্যগাথা যুগ যুগ ধরে দ্যুতি ছড়িয়ে আসছে ইতিহাসের পাতায়। সেই আলো ছড়ানো তালিকায় জ্বলজ্বল করবে রানী নিলুফারের নাম।

তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের সর্বশেষ রাজকুমারী ছিলেন নিলুফার ফরহাত বেগম সাহিবা। তার সৌন্দর্য এমন ছিল যে তার নাম দেয়া হয়েছিল ‘সৌন্দর্যের দেবী’। তুরস্কের রাজধানী ইস্তানবুলের রাজপ্রাসাদে জন্ম নেয়া নিলুফার সেই সময়ে পৃথিবীর আলো দেখেন, যে সময়ে তুরস্কের রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ছে। ১৯১৬ সালে জন্মগ্রহণ করা নিলুফার বাবাকে পেয়েছিলেন মাত্র দুই বছর। সেই ছোট্টবেলায় পিতৃহারা নিলুফার সাত বছর বয়সে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তুরস্ক ছেড়ে মায়ের সঙ্গে ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল একটা কঠিন ও সাধারণ জীবন। কিন্তু সে জীবন পেরিয়ে একসময় তার সৌন্দর্য, স্টাইল আর আভিজাত্য ঠিকই তাকে বিশ্বদরবারে সুপরিচিত করে তোলে।

নিজের জীবত্কালে অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন নিলুফার। এরপর ভাগ্যই তাকে নিয়ে যায় হায়দরাবাদের রাজপরিবারে। হায়দরাবাদের সর্বশেষ নিজাম নিলুফারকে তার দ্বিতীয় পুত্র মুয়াজ্জম জাহর স্ত্রী হিসেবে পছন্দ করেন। এ বিয়ের সূত্রেই তুরস্কের নিলুফার, ফ্রান্সের নিলুফার পৌঁছে যান হায়দরাবাদে।

সে সময়ের অনেকের বক্তব্য থেকে মিলেছে নিলুফারের সৌন্দর্যের বয়ান। তাদের মতে, নিলুফার শুধু সুন্দরীই ছিলেন না, বরং আশ্চর্য রকম মনোমুগ্ধকারিণী ছিলেন। তবে তার থেকেও বেশি আকর্ষণীয় ছিল নিলুফারের স্বকীয়তা। কথায় বলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভেদরেখা ভেঙেছেন এ রানী। শুধু হায়দরাবাদেই নয়, বিশ্বব্যাপী সবখানেই সমানভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন রাজকুমারী, জায়গা করে নিয়েছেন অনেকের মনে। নিজের সৌন্দর্য ও কাজের জন্য নিলুফার এত বেশি জনপ্রিয় ছিলেন যে তাকে বলা হতো হায়দরাবাদের কোহিনূর।


রীতি ভাঙার কৃতিত্বও ছিল তার, সেই সময়ে নিজাম পরিবারের নারীদের পর্দায় থাকার রেওয়াজ ছিল কিন্তু নিলুফারকে কখনো পর্দা করতে দেখা যায়নি। ইস্তানবুলে জন্ম নিয়ে এবং ফ্রান্সে বড় হওয়ার পরও ভারতীয় শাড়িকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন খুব আন্তরিকভাবে। নিলুফারের ডিজাইনের ধারণা এত বেশি নতুন ও অনন্য ছিল যে ভারতীয় শাড়িকেও তিনি কিছুটা পাশ্চাত্য ছোঁয়া দিয়েছিলেন নির্দ্বিধায়। ফলে প্রাচ্য ও পশ্চিমের সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায় তার পোশাকে। আর যেহেতু নিলুফার বিভিন্ন মহাদেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন, তাই খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের পোশাকে পরিবর্তন আনতে পারতেন। শুধু শাড়ির কুচিই নয়, তার গায়ে বিভিন্ন সময়ে সুন্দর সুন্দর সব গাউনও দেখা গেছে। কাঁধ খোলা পোশাক পরেও একইভাবে দ্যুতি ছড়িয়েছেন এ তুর্কি শাহজাদি।

নিলুফারের ফ্যাশনসচেতনতা ও ফ্যাশন ধারণার বর্ণনা দিতে গিয়ে ইতিহাসবিদরা বলছেন, কিছু কিছু ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনারকে তিনি নির্ধারিত কাজ দিতেন তার ডিজাইনের আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে। টিস্যু, সিল্ক নেট ও শিফন শাড়ির ওপর পাইলেটস বা ভারী এমব্রয়ডারির কাজ পছন্দ করতেন নিলুফার। যেখানে ভারতীয়রা সাধারণত মেটে বা গাঢ় রঙ পছন্দ করত, রানী সেখানে তার শাড়িগুলোয় সূক্ষ্ম অলংকরণের সঙ্গে প্যাস্টেল রঙের ব্যবহারে পাশ্চাত্য ছোঁয়া দেয়ার চেষ্টা করতেন।


নিলুফারের জ্ঞাতি বোন দুরুশেহভারের সঙ্গে নিজামের প্রথম ছেলের বিয়ে হয়। দুরুশেহভারও তার সৌন্দর্য, ফ্যাশন ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন। এ দুই নারী একসঙ্গে প্যারিস ও লন্ডনের বিভিন্ন ফ্যাশন শোয় অংশ নিয়ে বিশ্ববাসীর নজরে পড়তেন প্রায়ই। দ্য টেলিগ্রাফকে হায়দরাবাদের আদালতের এক সাবেক কর্মকর্তা নওয়াব মুজিব আলি ইয়াভার জং জানিয়েছিলেন, নিজাম তার সুন্দরী পুত্রবধূদের দেখানোর জন্যই অনেক সময় বড় বড় পার্টির আয়োজন করতেন।


স্বাধীনতাপূর্ব ভারতে বেশ কয়েকজন ভাইসরয়ের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করা ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার কনার্ড করফিল্ডের কাছেও নিলুফারের সৌন্দর্যের বর্ণনা মেলে। তিনি বলেন, নিলুফারের বেগুনি চোখ আর নীল-কালো কোঁকড়ানো চুল যেকোনো পুরুষের মন হরণ করার জন্য যথেষ্ট। আমার চোখে দেখা সুন্দরতম সৃষ্টি তিনি।

পোশাকের পাশাপাশি নিলুফারের গহনাও নজর কেড়েছে অনেক সময়। তার কানে যেমন রত্ন পাথরের দুল দেখা গেছে, তেমন ঝাড়বাতি কানের ড্রপ, গলায় কয়েক স্তরের মুক্তার মালা এবং অসামান্য কারুকাজ করা ব্রেসলেটও দেখা গেছে হাতে।

নিলুফারের সাজসজ্জার দিকে একটু গভীর মনোযোগ দিলেই দেখা যাবে মুক্তার কানের দুল, সাত স্তরের মুক্তার গলার হার তার খুব প্রিয় ছিল। খুব কম সময় হলেও তার শাড়িতে উজ্জ্বল এক ব্রোচ দেখা গেছে। যদি গহনাগাটির কথা বলার সক্ষমতা থাকত, তাহলে নিলুফারের ব্রোচই বলত একটি লম্বা গল্প।

ডেকান ক্রনিকেলে অরবিন্দ আচার্য শুনিয়েছেন সেই গল্পই। ১৮৬৯ সালের দিকে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ও তার স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউজেনি তুরস্ক সফর করেন। তখন সুলতান আবদুল আজিজ অটোমান সম্রাজ্য শাসন করতেন। সে সময়ে সম্রাজ্ঞী ইউজেনির পোশাকে হীরার বেল্ট দেখা যায়। ওই আয়োজনের ঝলমলে আলোয়ও বেল্টটি এত বেশি উজ্জ্বলতা ছড়াচ্ছিল যে তুরস্কের নারীরা পর্দার আড়ালে থেকেও সেটার উজ্জ্বলতা দেখেছিল। পরে সুলতান আবদুল আজিজ সেটার অনুকরণে আরেকটি বেল্ট বানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। যদিও তাতে খুব একটা সফল হননি তিনি, কিন্তু নতুনটাও কম আকর্ষণীয় ছিল না।

সুলতান আবদুল আজিজের নির্দেশে ব্রোচটি বানাতে ৪০টি হীরা ব্যবহূত হয়। যেন বেশি বেশি প্রতিফলন তৈরি করে, সেজন্য হীরাগুলো সব গোলাপের আকারে কাটা হয়। পরে তিনি সেটা সুলতান মুরাদকে দেন। সুলতান মুরাদ একসময় তার নাতনি আদিলে সুলতানাকে সেই বেল্টটা উপহার দেন। আদিলের মেয়ে নিলুফারের যখন বিয়ে হয় তখন তার বিয়ের পোশাকের অংশ ছিল সেই বেল্ট।

বিয়ের পরে নিলুফার যখন হায়দরাবাদে পৌঁছেন, তখন তিনি উপলব্ধি করেন, এ বেল্ট শাড়ির সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য উপযোগী নয়। তখন তিনি বেল্টের পেছনে একটি পিন জুড়ে নেন এবং সেটাকে ব্রোচ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেন। এভাবেই সেই ব্রোচ জড়িয়ে যায় নিলুফার ও হায়দরাবাদের সঙ্গে।

মুয়াজ্জমের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নিলুফার মার্কিন তরুণ এডওয়ার্ড পোপের সঙ্গে বিয়ে সারেন। তারপর ব্রোচটি আর বেশি ব্যবহূত হয়নি। দীর্ঘকাল বাক্সবন্দি থাকা ব্রোচটি নিলুফারের মৃত্যুর পর পোপ তার পরবর্তী স্ত্রী এভিলিন ম্যাডক্সকে দেন।


নিলুফারের শাড়ি, গহনা, জীবনযাত্রা সবকিছু নিয়েই চর্চা হতো প্রবল। ভারতীয় শাড়িতে খানিকটা ফরাসি ছোঁয়া নিয়ে আসেন নিলুফার। বেশির ভাগ আলোকচিত্রী সে সময়ে তার সহজ সৌন্দর্য পছন্দ করতেন খুব। মুম্বাইয়ের মাধব দাসের হাতে নিজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি শাড়ির দায়িত্বও দিতেন নিলুফার। শিফন ও ক্রেপের শাড়িতে তাকে বেশি দেখা গেছে, যেগুলোয় আবার বেনারস ব্রোকেডের পাড় থাকত। রানীর দেখভালের কাজে নিয়োজিত ফারনান্দে সেসিথেও তার জন্য অনেক শাড়িতে এমব্রয়ডারি ডিজাইনের কাজ করেছেন বলে পরে জানা যায়।

শুধু রাজকীয়ই না, নিলুফারকে বলা হতো ফ্যাশন ডিভা। ফরাসি একটি ফ্যাশন ফার্ম সে সময়ে নিলুফারের কিছু কিছু শাড়ি বিশেষভাবে তৈরি করত। কিন্তু কিছু সময় পরে দেখা যায়, নিলুফার শাড়ি পরা বন্ধ করে দেন এবং পাশ্চাত্য পোশাক পরা শুরু করেন।

সাজসজ্জার পাশাপাশি নিলুফারের কথাবার্তা আর আচরণও অনেক বেশি মুগ্ধ করত আশপাশের সবাইকে। প্রিন্সেস নিলুফার ছাড়া আর কারো পক্ষে অতিথিদের এত বেশি বাড়ির আবেশ দেয়া সম্ভব না। তার চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়ভাবে চা পরিবেশন করতে আর পারবে কে! তার সঙ্গে কথা বললে তার জানার পরিধি বোঝা যেত বলেই মন্তব্য ইতিহাসবিদদের। সেসব আলোচনায় যেমন আন্তর্জাতিক রাজনীতি ছিল তেমনি প্যারিসের স্টাইলও ছিল।

১৯৪৯ সালে দ্য শিকাগো ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে পার্সি উড বলেন, ফরাসি ভাষায় যেমন স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি, একইভাবে বাধাহীনভাবে বলতে পারতেন ইংরেজিও। এক স্বজনের জন্মদিনের আয়োজনে রাজকুমারী নিলুফার হাজির হন কালো রঙা প্যারিস গাউন গায়ে দিয়ে। নিজের সৌন্দর্য দিয়ে সেখানে থাকা সব পুরুষের নজর নিমেষেই কেড়ে নেন তিনি। সবাইকে উপলব্ধি করতে বাধ্য করেন যে ওই ঘরে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তিনি। পুরো বিষয়টাই বেশ মনোমুগ্ধকর।

নিজের সময়ে সবচেয়ে সুন্দরী নারীদের একজন ছিলেন নিলুফার। বেশকিছু ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন সে সময় বিশ্বের সেরা ১০ সুন্দরীর একজন হিসেবেও আখ্যা দেয় তাকে। ভোগ ম্যাগাজিনেও তাকে নিজের কিছু শাড়ি নিয়ে হাজির হতে দেখা যায়। তা দিয়ে তিনি নজর কাড়েন বিশ্ববাসীর। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর নিলুফার ফ্রান্সে চলে যান তার মায়ের সঙ্গে বসবাস করতে। সে সময়ে হলিউড থেকে বিভিন্ন কাজের অফার পেতে শুরু করেন নিলুফার। কিন্তু সেসবের কোনোটাই গ্রহণ করতে রাজি হননি তিনি।

সৌন্দর্য দিয়ে দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হলেও নিলুফার সবার মন কেড়েছিলেন নিজের কাজ দিয়ে। নিজাম নারীদের জন্যও তার দরজা খোলা ছিল সবসময়। সেই সময়ের হায়দরাবাদের উৎসব, উদযাপন ও আয়োজনে অংশ নিতেও শুরু করেন নিলুফার। এসব আয়োজনে বেশির ভাগ সময় তাকে দেখা যেত প্রধান অতিথি হিসেবে। শোনা যায়, নিলুফারের এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে একটু বিরক্তই ছিলেন নিজামের বেগম দুলহান পাশা। গুজব রয়েছে, তিনি বিষ দিয়ে পুত্রবধূকে হত্যাও করতে চেয়েছিলেন।

বাড়ি ও নিজের অঞ্চল ছাড়িয়েও সবার কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন নিলুফার। নিলুফারের সামাজিক জীবনের একটি বড় অংশ ছিল লেডি হায়দারি ক্লাব। সেখান থেকেই বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের আয়োজন ও ফান্ড তোলার কাজগুলো করতেন তিনি। ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন রাজকুমারী নিলুফার।

নিলুফারের স্বাধীনচেতা আচরণ, প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ও অবিরাম উদ্যম পরবর্তী সময়ে নারী প্রজন্ম ও ফ্যাশনবোদ্ধাদের এত বেশি প্রভাবিত করে যে বিশ্বব্যাপী অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার ও জুয়েলার্স তার স্মৃতিতে পোশাক সংগ্রহ ও জুয়েলারির ধারা নিয়ে আসে। নিলুফারের ওয়্যারড্রোব এখনো বিশ্বব্যাপী ফ্যাশন পড়ুয়াদের পাঠ্যসূচির অংশ। তার শাড়ি পরা ছবিগুলো নিউইয়র্ক ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে প্রদর্শিত হচ্ছে বছরের পর বছর। এ প্রতিষ্ঠানে তার ব্যবহূত ৩৪টি শাড়িও দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিলুফার নিজের জন্য জীবন যাপন করে নারীদের সামাজিক স্টেরিওটাইপের বিরুদ্ধে যেতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি হূদয়ের কথা শুনতেন, তাতে জীবন তাকে যেখানেই নিয়ে যাক।

 

শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক