‘The music is not in the notes,

but in the silence between.’


খুব পরিচিত এ কথাগুলো মোৎসার্ট বলেছিলেন আজ থেকে বহু বছর আগে। কিন্তু যে হিরন্মময় নীরবতার মাঝে সংগীতকে মোৎসার্ট খুঁজেছিলেন, তেমন নীরবতায় নিজেকে আড়াল করতে পারেননি তিনি। বরং যতই সময় গড়িয়েছে, সাংগীতিক নীরবতা ততই গাঢ় হয়েছে, অর্থাৎ মোৎসার্ট আরো আরো উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছেন। কখনো বাস্তবতার রথে আবার কখনো মিথের ডানায় ভর করে প্রায় তিন শতক ধরে সংগীত দুনিয়ায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করছেন মোৎসার্ট। 

অবশ্য এমন নয় শ্রেষ্টত্বের চূড়ায় বসে মোৎসার্ট নিজেকে স্পর্শের বাইরে নিয়ে গেছেন। সংগীতের ঈশ্বর হয়েছেন বটে কিন্তু ঈশ্বরের মতো অস্পৃশ্য থেকে যাননি। সংগীতের মূর্ছনায় মোৎসার্ট প্রভাবিত করেছেন সমসাময়িক আরেক মায়েস্ত্রো বিটোফেন থেকে শুরু করে একেবারে সাম্প্রতিকতম সাংগাতিক ধারাটিকে পর্যন্ত। এমনকি নিজ ক্ষেত্রের বাইরেও মোৎসার্টের প্রভাব বিস্ময়কর। তবে মোৎসার্টকে আত্মীকরণে সবাই যে সফল হননি তা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে অবশ্য মনে করা যেতে পারে বিখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যাঁ লুক গদারের সেই কথাটিকে, ‘আপনি কোথা থেকে নিচ্ছেন তা ব্যাপার না, ব্যাপার হচ্ছে আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন।’ মোৎসার্ট থেকে নিতে গিয়ে তাই অনেকই তার ভেতরেই বিলীন হয়ে গেছেন। ফলে কালের গর্ভে তাদের হারিয়ে যাওয়া ছিল অবধারিত। বিপরীতে আবার বিটোফেনের মতোও কেউ কেউ আছেন, যিনি মোৎসার্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়েও তার শ্রেষ্ঠত্বের পাশে নীরবে নিজের আসন গেড়েছেন। কিন্তু অন্যদের এ পারা না পারা কিংবা নেয়া না নেয়ার ভেতর প্রতিনিয়ত আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছেন মোৎসার্ট।

আধুনিক পাশ্চাত্য সংগীতের সবচেয়ে বড় ভিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এই ভলফগাং আমাডিউস মোৎসার্টকে। অবশ্য কেবল পাশ্চাত্য সংগীতের দেউরিতে তাকে আটকে রাখা নিছক সংকীর্ণতা বলে মনে হবে। জন্মের প্রায় ৩০০ বছর পরও সংগীতের দুনিয়ায় তার আসন টলাতে পারেনি কেউ। কেউ কেউ হয়তো এসে বিনয়ের সঙ্গে পাশে বসেছেন, কিন্তু তাকে আসনচ্যুত করার দূরতম দুঃসাহসও কেউ দেখাতে পারেননি। এই সময়ে এসেও ব্যক্তিগত কিংবা নৈর্ব্যক্তিক পরিসরে উদযাপন করা হয় তার সংগীত। মানুষের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অনুভূতিগুলো এখনো তীব্রভাবে নাড়া দিয়ে যান সলজবুর্গের রোমান সাম্রাজ্যে জন্ম নেয়া এই মিউজিক্যাল জিনিয়াস। কিংবদন্তি নাট্যকার জর্জ বানর্ড শ থেকে শুরু করে ইলিচ চাইকভস্কি কেউ এড়াতে পারেননি মোৎসার্টকে। তার ওপর দেবত্বও আরোপ হয়েছে হরহামেশা। মোৎসার্টের একশ বছর পর জন্ম নেয়া আরেক সংগীতজ্ঞ পিওতর ইলিচ চাইকভস্কির মোৎসার্টের ওপর দেবত্ব আরোপ করে বলেছিলেন, “আমি মিউজিক্যাল ক্রাইস্ট হিসেবেই মোৎসার্টকে স্মরণ করি। আমি মনে করি না যে এই তুলনা নিন্দনীয়। মোৎসার্ট দেবতার মতোই পবিত্র এবং তার সংগীত স্বর্গীয় সৌন্দর্য্যে পরিপূর্ণ।”

উপমার ডালায় সাজানো এমন তুলনা অনেকের কাছেই অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু যারা সংগীতকে কেবল শোনার বাইরে গিয়ে বোধের স্তরে উপলব্ধি করতে চান, তারা বুঝতে পারবেন চাইকভস্কির উক্তিটির মাহাত্ম্যটুকু। 

পাশ্চাত্য সংগীতের ‘ক্ল্যাসিক্যাল’ ঘরানার নেপথ্য নায়ক মোৎসার্ট। নিজের সংগীত সম্পর্কে বলতে গিয়ে একবার তিনি বলেন, ‘কে প্রশংসা করছে বা কে সমালোচনা করছে তা নিয়ে আমি ভাবিনি। আমি কেবল নিজের অনুভূতিকে অনুসরণ করি।’ নিজের অনুভূতিকে অনুসরণ করতে গিয়ে একের পর এক অমর সৃষ্টি উপহার দিয়ে গেছেন তিনি। তার সেই অনুভূতিকে অনুসরণ করে গেছে আরো অসংখ্যা সংগীতপ্রেমী মন, যাদের অনেকের সংগীত সাধনার সাক্ষাৎ অনুপ্রেরণাও তিনি। সাধারণ শ্রোতা কিংবা তরুণ সংগীতকার কারো কাছেই তাই এখন পর্যন্ত এতটুকু ম্লান নন মোৎসার্ট। সংগীতের ক্ষেত্রে বেশকিছু নতুন দিকের উন্মোচন হয়েছিল তার হাত ধরে। অপেরার ধরনে এনেছিলেন নতুনত্ব ও স্বকীয়তা। চার্চ কিংবা সরকারের হয়ে কাজ করার বদলে ফ্রি-ল্যান্স মিউজিশিয়ানের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি, যা কিনা মিউজিশিয়ানদের আর্টিস্ট মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিল। সুরের বাইরে তার এসব অবস্থানও পরবর্তী সময়ের সংগীত দুনিয়ায় নতুন তরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল। পাশাপাশি ক্ল্যাসিক্যাল অর্কেস্ট্রার ধারণাও বিকাশ লাভ করেছিল মোৎসার্টের হাত ধরে, যা সে সময় ইতালিয়ান ও জার্মান অপেরায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

সংগীতকে দেখার ক্ষেত্রে, আবিষ্কারের ক্ষেত্রে নতুন কিছু পথের সন্ধান দিয়েছিলেন মোৎসার্ট। সে সময় সংগীতের প্রতি মানুষের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তাতেও ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসেন তিনি। এমনকি এত বছর পরও এসেও মোৎসার্টের সংগীত মানুষের মস্তিষ্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক বিতর্ক চলছে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে গবেষণাও সম্পন্ন হয়েছে। যদিও নানা ধরনের সীমাবদ্ধতায় সেই গবেষণাগুলো বেশি দূর এগোতে পারেনি। পাশাপাশি মোৎসার্টকে ঘিরে মিথের সংখ্যাও কম নয়। এমন মিথও প্রতিষ্ঠিত আছে যে মোৎসার্ট শুনলে শিশুদের আইকিউ বেড়ে যায়। অতি সম্প্রতি প্রকাশিত আরেকটি গবেষণা বলছে, মোৎসার্ট শুনলে মৃগী রোগীদের খিঁচুনি কমে যায়। অবশ্য এসব বৈজ্ঞানিক আলাপ ও মিথকে আড়ালে রেখেও ব্যক্তির মন ও মস্তিস্কের ওপর মোৎসার্টের প্রভাব স্পষ্ট। এখনো যেকোনো পরিস্থিতিতে একজন শ্রোতাকে আচ্ছন্ন ও সম্মোহিত করে রাখতে পারে তার সংগীত।

ইনস্ট্রুমেন্টাল মিউজিকে মোৎসার্ট সবসবময় এক ধরনের নাটকীয়তার অন্তর্ভুক্তি ঘটাতেন, যা ভিন্ন একটি আবহ তৈরি করত। এ আবহের ভেতর দিয়ে নির্ধারিত হতো তারা জীবন্ত এবং কৌতুকপূর্ণ হবে নাকি গম্ভীর ও বিয়োগান্তক হবে। তার ক্লারিনেট এবং স্ট্রিংস পঞ্চকটি এখনো শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। সে সময় একেবারেই নতুন ইনস্ট্রুমেন্ট ক্লারিনেট নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে প্রথম দিকের একজন ছিলেন তিনি। এই ইনস্ট্রুমেন্টেটিকে তিনি তার অনেক কম্পোজিশনে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, যা সংগীতপ্রেমীদের দিয়েছিল নতুন ধরনের সংগীতের স্বাদ। এমনকি নিজের সময়ের পিয়ানো বাদকদের মধ্যেও মোৎসার্ট ছিলেন অন্যতম সেরা এবং তিনি তার অনেক কম্পোজিশন নিজস্ব ইনস্ট্রুমেন্টে তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন মেলোডিক জিনিয়াস। সংগীতে শুদ্ধতার যে রূপান্তর তিনি ঘটিয়েছিলেন, তা যে কাউকে মুহূর্তের মধ্যে আবিষ্ট করে রাখতে পারে।

মোৎসার্টের সিম্ফোনিগুলো অর্কেস্ট্রশনের ঐশ্বর্যে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যেখানে তিনি মানবীয় অনুভূতির সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখিয়েছেন। যদিও ঠিক কতটা সিম্ফোনি তিনি লিখেছিলেন তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু যা কিছু আমাদের সামনে আছে, সে পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় তার প্রতি আমাদের ঋণের বোঝাটাই কেবল ভারী হয়েছে। মূলত মোৎসার্টের জীবনই সংগীতের ভেতর দিয়ে বদলেছে, যা কিনা মিউজিকের ভবিষ্যেকও অনেকটা বদলে দিয়েছে।

জীবদ্দশায় অনেকে মোৎসার্টের মিউজিককে গড় শ্রোতাদের জন্য বেশ জটিল বলে অভিযোগ করেছিলেন। দুর্বোধ্যতার অভিযোগ এখনো অপ্রতুল নয়। তবে তার কম্পোজিশনের শক্তির সামনে সেসব ধোপে টেকেনি। মোৎসার্ট কতটা প্রভাব বিস্তারি ছিলেন তা বোঝা যায় শিল্পের অন্য ক্ষেত্রগুলোর দিকে তাকালে। হেরমান হেস, আলেকান্দার পুশকিনরা এড়াতে পারেননি মোৎসার্টের প্রভাব। বুনুয়েল থেকে আলফ্রেড হিচককসহ অনেকে নিজেদের চলচ্চিত্রে কোনো না কোনোভাবে নিয়ে এসেছেন মোৎসার্টকে। ১৯ শতকে এসে সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকারদের কেউ কেউ চেষ্টা করেছিলেন তার সাংগীতিক সহিংসতা, যৌনতা এবং শক্তির সাহিত্যিক ও ভিজুয়্যাল রূপান্তর ঘটাতে। অবশ্য চলচ্চিত্র কিংবা সাহিত্যই কেবল নয়, খুব কম ক্ষেত্রই আছে যেখানে নিজের ছাপ ফেলেননি মোৎসার্ট। সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন মোৎসার্ট দ্বারা। এমনকি এমনও কথিত আছে, আইনস্টাইন নিজেকে বিজ্ঞানের জগতের মোৎসার্ট বলে মনে করতেন।

মোৎসার্টের প্রতি সাধারণ মানুষ ও সৃষ্টিশীলদের সহজাত এ আকর্ষণকে অবশ্য বেশ ভালোভাবেই শোষণ করতে পেরেছে বাণিজ্যিক ধারার থিয়েটার ও সিনেমা। সেসবও মোৎসার্টকে বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিকের উন্মোচন ঘটিয়েছে। পাশাপাশি এসব দৃষ্টান্ত বর্তমান সময়ে এসেও মোৎসার্টের উপযোগিতার স্বাক্ষর বহন করছে।

এটাও অবশ্য সত্য যে সাধারণ মানুষ মোৎসার্টের সংগীতের সঙ্গে কেবল অলসতা এবং বোধগম্যতার ওপর ভিত্তি করে নির্বাচিত কিছু সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। খুব সম্ভবত তাদের মধ্যে ধারণাটি ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয়েছে যে কোন কোন সৃষ্টিকর্ম উচ্চতর ও শ্রেষ্ঠ। পাশাপাশি কি ধরনের বার্তা তারা এখান থেকে পেতে চায় সেটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি অবশ্য কেবল সাধারণ শ্রোতাদের মধ্যেই নয়, পরবর্তীকালে যারাই মোৎসার্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সংগীত চর্চা করতে এসেছিলেন, তাদের কাজের মধ্যে দেখা যায়। যে কারণে তিনটি অপেরা, অর্ধ ডজন সিম্ফোনি, কিছু কনসার্টসহ কিছু কিছু কাজ মূলত মোৎসার্টের প্রতিনিধিত্ব করে। এছাড়া ঐতিহাসিক চাহিদার জায়গা থেকে তার বাকি কাজগুলো দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে গিয়ে স্থান করে নিয়েছে। তবে কে বলতে পারে, সামনের দিনগুলোয় মোৎসার্টকে হয়তো আরো গভীরভাবে পাঠ করা হবে। তখন নিশ্চয় আরো অনেক মিউজিক্যাল রত্ন আমাদের কাছে ধরা দেবে।

তবে সেটুকু বাদ দিয়েও বলা যায়, মোৎসার্টের জন্ম না হলে নিশ্চিতভাবে সংগীতের দুনিয়া অনেকটাই ম্লান হয়ে থাকত। সংগীত দ্বারা যে নীরবতাকে মোৎসার্ট হিরন্ময় করে তোলেছিলেন, সেটিই হয়তো তখন আক্ষরিক হয়ে উঠত।


হাসনাত শোয়েব: কবি ও সাংবাদিক