‘আমি কৃষক পরিবারে জন্ম নিয়েছি। একজন দরিদ্র কৃষক হিসেবে বেড়ে উঠেছি। ছোট থেকেই কৃষকদের কষ্ট ও গ্রামগুলোর নানা ধরনের কঠিন সমস্যা দেখেছি। এগুলো আমার অস্থি-মজ্জায় ঢুকে গেছে। তাই সরকার গঠন করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে সবকিছুর আগে গ্রামগুলোকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করব।’

১৯৬৭ সালে এক রাজনৈতিক প্রচারণায় কথাগুলো বলেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি। তার গ্রামীণ উন্নয়নের রূপকল্প ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়া চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। পার্ক চুং-হির স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে বৈধতা দেয়ার ক্ষেত্রে ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’ একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল। এর সাফল্য দেশে-বিদেশে প্রচার করা হয়েছিল। সে সময় বিদেশী পণ্ডিত, রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পার্ক চুং-হির গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রতি বেশ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় এসে গ্রাম ও কৃষির উন্নয়নে পার্ক সরকারের সাফল্য সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করতেন। তারপর নিজ নিজ দেশে ফিরে পত্রিকায় পার্ক শাসনের সাফল্যের কাহিনী তুলে ধরতেন। আবার ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’-এর নেতাদের আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। তারা সেখানকার গ্রামবাসীদের আধুনিক হওয়ার পদ্ধতি শেখাতেন। স্বনির্ভর হওয়ার প্রশিক্ষণ দিতেন। গ্রাম ও কৃষির উন্নয়নে পার্ক শাসনের সাফল্য দেখে মুগ্ধ হওয়া বিদেশীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রিচার্ড ক্রিশফিল্ড নামের একজন প্রতিবেদক। ১৯৮০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রামগুলো ঘুরে দেখেছিলেন। সে অভিজ্ঞতাকে আধেয় করে ‘ভিলেজেস’ নামে একটি বই লিখেছিলেন তিনি। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত বইটি বেস্টসেলার হয়েছিল। তিনি গ্রামবাসীর জীবনমান উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন। সেখানে কোনো দুর্ভিক্ষ ছিল না। গ্রামবাসী টেলিভিশনের সঙ্গে ততদিনে পরিচিত হয়ে গেছে। তারা মোটর টিলারের মাধ্যমে কৃষিকাজ করত। ক্রিশফিল্ডের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, গ্রামবাসী পার্ক চুং-হিকে শ্রদ্ধা করত।

১৯৭০ সালে ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’-এর সূচনা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি। তার এ উদ্যোগের স্লোগান ছিল ‘আত্মনির্ভরশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অধ্যবসায়।’ এ স্লোগানে অনুপ্রাণিত গ্রামবাসী সড়ক ও সেতু নির্মাণ এবং কূপ খনন করেছিল। খড়ের পরিবর্তে উজ্জ্বল রঙের টালি দিয়ে তারা ঘরের ছাদ তৈরি করেছিল। এসব দেখে পার্কবিরোধীরাও ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’-এর প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছিল। তারা স্বীকার করে নিয়েছিল, গ্রামবাসী যদি পর্যাপ্ত পুঁজি ও প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি পায় এবং বাজারে যদি তাদের প্রবেশাধিকার থাকে, তাহলে তারা দারুণ সাফল্য অর্জন করতে পারে।

ষাট ও সত্তরের দশকের দক্ষিণ কোরিয়ায় গ্রামাঞ্চলের পরিমাণ বেশি ছিল। অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত। ১৯৬১ সালের ১৬ মে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পার্ক চুং-হি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মোট জনসংখ্যার ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশ তখন গ্রামে বাস করে। ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত গ্রামবাসীর সংখ্যা বেড়ে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫৯ লাখে পৌঁছায়। তার-পর থেকে গ্রামীণ জনসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। তথাপি ১৯৭৫ সালের শেষার্ধেও দেশটির প্রতি পাঁচজনের দুজন গ্রামে বাস করত। তখন পর্যন্ত দেশটিতে শিল্প-কারখানার তুলনায় কৃষি খাতে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি ছিল। অধিকাংশ পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ছিল। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সচ্ছলতা নিশ্চিত করা ছাড়া পার্ক চুং-হির অন্য কোনো উপায় ছিল না। শহরের অধিবাসীরা ততদিনে তার বিরুদ্ধে ভোট দেয়া শুরু করেছে। তাই পার্ক চুং-হি ও তার দল ডেমোক্রেটিক জাস্টিস পার্টি (ডিজেপি) ক্রমহ্রাসমান গ্রামীণ ভোটারদের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সব শহরেই ডিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। কেবল গ্রামাঞ্চলে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছিল। পার্ক শাসনের প্রতি গ্রামবাসীর সমর্থন আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’-এর যাত্রা হয়েছিল। কৃষি উন্নয়ন বিষয়ে দেয়া পার্ক চুং-হির বক্তৃতা সংকলনের ভূমিকায় এক আমলা লিখেছিলেন, ‘এ আন্দোলন প্রেসিডেন্ট পার্ক ব্যক্তিগতভাবে শুরু করেছেন। সারা দেশে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ আন্দোলনের মাধ্যমে গ্রামীণ সম্প্রদায়ের আধুনিকায়ন সম্পন্ন হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পুনর্জাগরণে এটিই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।’

গ্রামীণ উন্নয়নে পার্কের নেতৃত্বাধীন সরকার কিছু প্রশাসনিক সংস্কার করেছিল। কৃষিজমিগুলো সমতল করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেচ ব্যবস্থাকে আরো উন্নত ও শক্তিশালী করা হয়। এগুলো তদারকির দায়িত্ব কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়কে দেয়া হয়। ১৯৬১ সালের ২৯ জুলাই ‘এগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ ল’ নামে কৃষিবিষয়ক নতুন আইন পাস করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় চালু করা হয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনটি প্রকল্পের অধীনে গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীকে সাক্ষর করার প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গ্রামগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্বে ছিল ‘এজেন্সি ফর রুরাল রিভাইটালাইজেশন’। গ্রামীণ কৃষকদের পুঁজি ও প্রযুক্তি সহায়তা দেয়া এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতে সহায়তা করার কাজটি করত ‘এগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ’ নামে একটি সংস্থা।

প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি গ্রামবাসী কৃষকদের স্বনির্ভর করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’-এর একেবারে শুরু থেকেই তিনি আত্মনির্ভরশীলতা ও অধ্যবসায়ের কথা বলতেন। তার এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি সমালোচনাও কম নয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে ‘নিউ ভিলেজ মুভমেন্ট’ এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক