২৭ অক্টোবর ১৯৭৯ নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন কিছুটা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হচ্ছে:
সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া, শনিবার ২৭ অক্টোবর: ১৮ বছরের অধিককাল ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার শাসনকর্তা প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি গতকাল রাতে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের কাছে একটি রেস্তোরাঁয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের গুলিতে মারাত্মভাবে আহত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে সরকার জানিয়েছে। বলা হয়েছে, সংস্থাপ্রধান এবং প্রেসিডেন্টের প্রধান দেহরক্ষীর আকস্মিক বাদানুবাদের সূত্রে ‘আবেগময় বিস্ফোরণ’ থেকে সংস্থাপ্রধানের গুলিতে প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছেন। ঘাতক কিম জে গিয়ু প্রেসিডেন্টের আজীবন বন্ধু এবং সেদিনের ডিনার পার্টির হোস্ট। তার গুলিতে ৬২ বছর বয়স্ক প্রেসিডেন্ট, প্রধান দেহরক্ষী ছাড়া আরো চারজন নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর ৩ ঘণ্টা পর মন্ত্রিপরিষদ জরুরি বৈঠকে বসে এবং এতদিন কার্যত ক্ষমতাহীন প্রধানমন্ত্রী চোই কিউ হাকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে।
উত্তর কোরিয়ার জন্য সতর্কসংকেত
দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ চেজু বাদে দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বত্র সামরিক আইন জারি করা হয়েছে, বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব এয়ারপোর্ট। দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত ৩৮ হাজার মার্কিন সৈন্যকে ওয়াশিংটন থেকে সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে উত্তর কোরিয়া কোনো ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করে অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করতে না পারে। মন্ত্রিপরিষদ জেনারেল চাং সেওথ হোয়াকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেছে। তিনি সান্ধ্য আইন জারি করেছেন, সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছেন, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছেন এবং ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম আবার প্রেস সেন্সরশিপ বহাল করেছেন। সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পার্ক ১৬ মে ১৯৬১ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। তিনি দুটি হত্যা প্রচেষ্টা থেকে রক্ষা পান। ১৯৭৪ সালে জাপানি দখলমুক্তির (১৯৪৫) উৎসব পালনকালে একজন বন্দুকধারী ন্যাশনাল থিয়েটারে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি প্রেসিডেন্টের স্ত্রীকে আঘাত করলে তিনি নিহত হন।
১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার জন্য প্রেসিডেন্ট ভবন ব্লু হাউজে ৩০ জন চরমপন্থী কমিউনিস্ট গেরিলা প্রবেশ করে। তবে তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন ও বিক্ষোভ চলে আসছিল। লাখ লাখ প্রতিবাদকারী বন্দরনগরী বুসান ও শিল্পনগরী মাসানে বিক্ষোভ করে আসছিল। হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬১-এর যে ছাত্র আন্দোলন ও দাঙ্গা প্রেসিডেন্ট সিঙ্গম্যান রিকে ক্ষমতাচ্যুত করে পার্ককে ক্ষমতায় আনে, এবার পরিস্থিতি তার চেয়ে ভয়াবহ ছিল। সরকারের ইচ্ছায় প্রেসিডেন্টের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরোধীতাকারী নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা কিম ইয়াং স্যামের সংসদ সদস্যপদ বাতিল করা হলে বিরোধী ৬৯ সদস্যের সবাই পদত্যাগ করেন। সংশোধিত সংবিধান প্রেসিডেন্টকে যে অভাবনীয় ক্ষমতা দিয়েছে তাতে দক্ষিণ কোরিয়ার চার কোটি মানুষের জীবনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে। কোরীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সীমানা দেয়ালের ভেতরে কুংজংডং রেস্তোরাঁয় গুলিবিদ্ধ প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সামরিক হাসপাতালে নেয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তখন সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিট। রাত ১১টায় কেবিনেট জরুরি বৈঠকে বসে। ১৮ বছর একনায়ক হিসেবে দেশ চালালেও পার্ককেই আধুনিক ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ কোরিয়ার স্থপতি মনে করা হয়।
পার্ক চুং-হি হত্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
প্রথম তত্ত্ব: হত্যাকাণ্ড অপরিকল্পিত ও আকস্মিক আবেগজনিত
কয়েক মাস ধরে বিরোধীদের রাজনৈতিক আন্দোলন দমন করতে ব্যর্থতার কারণে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাপ্রধান কিম প্রবল চাপের মধ্যে ছিলেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের প্রধান দেহরক্ষী চা জি-চিওল আক্রমণাত্মকভাবে কিমের কর্মক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করছিলেন। ওদিকে প্রেসিডেন্টের আচরণে কিমের চেয়ে চাকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। চা রাতের ডিনার অনুষ্ঠানে কিমের অদক্ষতা ও ব্যর্থতার সমালোচনা করছিলেন। তৎক্ষণিকভাবে সেই ভবনে কিমের হাতে কোনো মারণাস্ত্র ছিল না। তাকে অন্য একটি ভবনে গিয়ে অস্ত্র আনতে হয়। কিম কী করতে যাচ্ছেন এ সম্পর্কে তার অধস্তন কর্মকর্তাদের কিছুই বলেননি। পার্কের মৃত্যু ঘটলে তারপর কী করতে হবে, এ বিষয়ে কিমের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিম তার গোয়েন্দা সদর দপ্তরে না গিয়ে সেনা সদর দপ্তরে যান।
দ্বিতীয় তত্ত্ব: হত্যাকাণ্ড ইচ্ছাকৃত ও পূর্বপরিকল্পিত
কিম সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফকে সোয়া ৪টায় ডিনারের নিমন্ত্রণ জানালে তিনি জবাব দেন প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির সঙ্গে ৪টায় তার খাওয়ার কথা, সেক্ষেত্রে সোয়া ৪টার মধ্যে আক্রমণ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে খাবারের অনুষ্ঠানে বন্দুক বহন করা প্রথাগত নয়। কিম দাবি করেছেন, ১৯৭২-এর সংবিধান সংশোধনের পর থেকে তিনি প্রেসিডেন্ট পার্কের একনায়কত্ব অবসানের সুযোগ খুঁজছিলেন। তিনি ১৯৭৮ সালে একবার এবং ১৯৭৯ সালে দুবার তাকে হত্যার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার আইনজীবীকে বলেছেন, নির্মাণবিষয়ক মন্ত্রী হওয়ার পর ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা করেছেন। তখনকার রেকর্ড করা নিউজ রিলে দেখা যায়, কিম যখন প্রেসিডেন্ট পার্কের সঙ্গে করমর্দন করছিলেন তার পকেট থেকে কিছু একটা বেরিয়ে আসছে বলে মনে হয়েছে। ১৯৭৯-এর এপ্রিলে তিনি একইভাবে রিপাবলিক অব কোরিয়ার তিন বাহিনীর তিন প্রধানসহ প্রেসিডেন্টকে ভোজে আমন্ত্রণ করেছিলেন, কিন্তু পরে হত্যা পরিকল্পনা স্থগিত রাখেন। ঘটনার দিন ডিনারের আগে কিম চিফ সেক্রেটারি কিম গাইয়ে উনকে বলেছেন প্রেসিডেন্টের প্রধান দেহরক্ষী চাকে সরিয়ে দেবেন। কিম সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের পার্কবিরোধী মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন। প্রেসিডেন্ট হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ট্রায়ালে উভয়ের কথার যথেষ্ট মিল পাওয়া যায়। ৫৯ জনের মধ্যে ৫০ জন জেনারেলই নতুন সংবিধান বাতিল চেয়েছেন। কিন্তু পার্কের আমলে তা হয়নি। সেনাপ্রধান ও চিফ সেক্রেটারি উভয়ই বলেছেন, ঘটনাটি কিম আবেগময় মুহূর্তে ঘটিয়েছেন। কিমের সহষড়যন্ত্রী হিসেবে এ দুজনও সন্দেহভাজন।
তৃতীয় তত্ত্ব: চার প্রতি ঈর্ষা থেকে হত্যাকাণ্ড
পার্ক শাসনে কিম দ্বিতীয় প্রধান ক্ষমতাধর হিসেবে থাকলেও প্রেসিডেন্টের প্রধান দেহরক্ষী চার কারণে তার ক্ষমতা কমছিল বলে তিনি চার প্রতি ঈর্ষান্বিত ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। কিন্তু গণতন্ত্রের দাবিতে পার্ককে গুলি করেননি বরং তা করেছেন চার প্রতি ঈর্ষাজনিত কারণে। প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে বিরোধী দলের সব তৎপরতা বন্ধ করতে তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। আদালতে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পার্কের সঙ্গে তার আপন ভাইয়ের মতো সম্পর্ক ছিল। তাদের দুজনের বাড়ি একই শহরে এবং সাউথ কোরিয়ান আর্মি একাডেমিতে তারা সহপাঠী ছিলেন।
চতুর্থ তত্ত্ব: গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য হত্যাকাণ্ড
বিচারের সময় কিম তার হত্যাকাণ্ডের পাঁচটি মোটিভের উল্লেখ করেছেন:
১. গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা, ২. কোরীয় জনগণের অধিকতর রক্তপাত বন্ধ করা, ৩. উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করা, ৪. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা, ৫. একনায়কতান্ত্রিক শাসনের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ার যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা।
কিম বলেছেন, তার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা লোভ নেই। তিনি গণতন্ত্রের জন্য কাজটি করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডিক্ল্যাসিফায়েড দলিলপত্রে এটা স্পষ্ট যে কোরিয়ান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধান হিসেবে তার কথাবার্তা অসনাতন ছিল। তিনি গণতন্ত্রের কথা বলতেন এবং তার কাছে জনগণের অধিকতর প্রবেশাধিকার ছিল। কিম এটা জোর দিয়েই বলেছেন, ১৯৭১-এর নির্বাচনে পার্ক চুং-হি বলেছেন, এটাই তার শেষ নির্বাচন। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে সংবিধান সংশোধন করে তিনি আজীবন স্বৈরাচারী একনায়ক হিসেবে থেকে যাওয়ার আয়োজন করেছেন। জাপানে কর্মরত একজন আত্মীয়কে কিম বলেছেন, পার্কের সংবিধান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি তৃতীয় পন্থা খুঁজে বের করা দরকার। কিমের মৃত্যুর পর এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে তিনি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে গোপন সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন। কিমকে যখন গ্রেফতার করা হয় তার বাড়িতে ফ্রিডম ও ডেমোক্রেসি লেখা ক্যালিগ্রাফি উদ্ধার করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে তিনি পার্ক চুং-হির একনায়কতন্ত্রের ছায়া থেকে বিরোধী দলের ওপর যে নির্যাতন চালিয়েছেন, এমনকি যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তাতে কিমকে গণতন্ত্রী মনে করা যুক্তিসংগত মনে হয় না।
পঞ্চম তত্ত্ব: সিআইএ খুন করিয়েছে
মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি প্রেসিডেন্ট হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। কারণ দক্ষিণ কোরিয়াকে পার্ক চুং-হির পারমাণবিক শক্তিতে পরিণত করার বাসনা ও উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করেনি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছে। এটা ঠিক এ কারণেই গ্রহণযোগ্য যে চুন ডু হিউয়ান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বাতিল করার পরই যুক্তরাষ্ট্র তাকে মেনে নিয়েছে।
কিম দাবি করেছেন, তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। সিউলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম এইচ গ্লেস্টিনের সঙ্গে বহুবার গোপন বৈঠক করেছেন এমনকি হত্যকাণ্ডের ৫ ঘণ্টা আগেও তার সঙ্গে দেখা করেন। রাষ্ট্রদূত স্টেট ডিপার্টমেন্টকে জানিয়েছেন, কিম তার এবং তার পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূতকে প্রেসিডেন্ট পার্কের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের উসকানি দেয়ার কথা বলতে শুরু করেছেন। ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রদূত গ্লেস্টিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছাকৃতভাবে পার্ক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে যায়। তিনি অবশ্য তার কথার ব্যাখ্যা দেননি। সিউলে সিআইএ প্রধান রবার্ট ব্রুস্টারের সঙ্গে কিম বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছেন। কিম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পর্কের অবনতি তার মৃত্যুর কারণ। অনেকে কিমের ফাঁসিতে মৃত্যুর ব্যাপারটি উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, সিআইএ তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেছে।
ষষ্ঠ তত্ত্ব: ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা
কিম স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের পদ দখলের জন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট পার্ককে হত্যার পরিকল্পনার তার পুরনো, তবে চার সঙ্গে বিরোধের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটেছে।
হত্যাকাণ্ডের ভেন্যু: ২৬ অক্টোবর ১৯৭৯ হত্যাকাণ্ডের দিন প্রেসিডেন্ট পার্ক একটি বাঁধ ও একটি টেলিভিশন সম্প্রচার স্টেশনের উদ্বোধন করেন। ফিতা কাটার এ অনুষ্ঠানে গোয়েন্দা সংস্থাপ্রধান কিম প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একই হেলিকপ্টারে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রেসিডেন্টর প্রধান দেহরক্ষী চা তাকে এ হেলিকপ্টারে আরোহণ করতে বাধা দেন। ফলে ক্ষুব্ধ কিম প্রেসিডেন্টের সহগামী হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। সেদিন গোয়েন্দা সংস্থার আমন্ত্রণে প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের পাশে গোয়েন্দা সংস্থার চত্বরেই কোরিয়া কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রেসিডেন্টকে নিয়ে একটি ব্যাঙ্কোয়েটের আয়োজন করে। তারা মাসে এ ধরনের গোটা দশেক ব্যাঙ্কোয়েটের আয়োজন করে থাকে। প্রথা অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের পাশে দিলেন দুজন তরুণী, তাদের একজন সংগীতশিল্পী শিম সু বং ও কলেজছাত্রী জিন জায়ে-সুন। কিম ও চা ছিলেন, আর্মি চিফ অব স্টাফকেও ডিনারে যোগ দিতে ডেকে আনা হয়। প্রেসিডেন্ট পার্ক ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, তুলনামূলকভাবে ছোটখাটো সুগঠিত দেহের অধিকারী।
তদন্তকারীরা জানান, গোয়েন্দা সংস্থা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আগে থেকে আঁচ করতে না পারায় এবং তা দমনে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ ছিলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রেসিডেন্ট পার্ক গোয়েন্দা প্রধান কিমকে বলেন, তার এজেন্টদের পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো পূর্বধারণা না থাকার কারণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে। পরিস্থিতি খারাপের দিক গেলে তিনি গুলির আদেশ দেবেন। কিম দাবি করেন, তার পরই প্রধান দেহরক্ষী চা এ কথা টেনে নিয়ে তাকে ভর্ৎসনা করেন: কম্বোডিয়া তো ৫০ লাখ লোক মেরেছে। ১০-২০ লাখ কোরিয়ান মরলে কি এসে যায়? চা ঠিক এ কথা বলে না থাকলেও তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করেন। তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে কিম জে গিয়ু দ্রুত বেরিয়ে যান এবং তার নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দেন গুলির আওয়াজ শোনামাত্র তারা চায়ের রক্ষীদের গুলি করবে।
কিম পয়েন্ট থ্রিটু বোরের পিস্তল নিয়ে ডিনার কক্ষে ফিরে যান, আসনও গ্রহণ করেন, তারপর চায়ের দিকে পিস্তল তাক করে প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে চিৎকার করেন: এমন নর্দমার কীটকে কীভাবে আপনি উপদেষ্টা বানালেন। গুলি লাগল চার কবজিতে। পরের গুলি সরাসরি প্রেসিডেন্টের বুকে। চিৎকার করে চা বাথরুমের দিকে ছুটলেন। ব্লু হাউজের সেক্রেটারি কিম গায়ে-উন রুম থেকে পালিয়ে গেলেন। ঘাতক কিমের আগ্নেয়াস্ত্র জ্যাম হয়ে যাওয়ায় তিনি দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে পয়েন্ট ৩৮ ক্যালিবারের একটি পিস্তল এনে চার পাকস্থলী বরাবর গুলি করলেন। প্রেসিডেন্টের দুইপাশের হতবিহ্বল দুটি মেয়ে রক্তাক্ত পার্ককে রক্ষার চেষ্টা করছিলেন। কিম দ্বিতীয়বার এসে গুলি করার পর শিল্পী শিম সু বং দ্রুত সে রুম থেকে বেরিয়ে যান। কিম এবার প্রেসিডেন্টের মাথা লক্ষ্য করে তাক করেন, তখন কলেজছাত্রী শিন পালায়। কিম প্রেসিডেন্টের কান বরাবর গুলি করে। তার অনুগত রক্ষীদের গুলিতে প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীদের চারজন নিহত হন।
যে পার্ক চুং হির হাত ধরে পৃথিবীর একটি দরিদ্রতম দেশ অত্যন্ত কম সময়ে ধনাঢ্য দেশে পরিণত হয় সেই একনায়ক প্রেসিডেন্টের মৃত্যু সংবাদ পৃথিবী পেয়ে যায়। ৪ ঘণ্টা পর কিম গ্রেফতার হলেন।
হত্যাকাণ্ডের শাস্তি: মোট ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড হয়।
কিমের সাবেক এডিসি ও ঘটনাকালীন তার অফিসের সেক্রেটারি পার্ক হিউং জু ষড়যন্ত্রে জড়িত থেকে সহযোগিতার জন্য ৬ মার্চ ১৯৮০ ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণ হারান। ২৪ মে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
১. কিম জে গিয়ু, কোরীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির সরাসরি ঘাতক।
২. পার্ক সিওন-হো, গোয়েন্দা সংস্থার জ্যেষ্ঠ এজেন্ট।
৩. ইয়ো সিওং-ওক, গোয়েন্দা সংস্থার ড্রাইভার।
৪. লি কি-জু, সেফ হাউজ সিকিউরিটি সার্ভিস প্রধান
৫. কিম তায়ে উন, নিরাপত্তা এজেন্ট
পার্ক হিউং জু এবং পার্ক সিওন হো ছাড়া বাকিরা জানতেন না কাকে কারণে গুলি করছেন। তারা কেবল হুকুম তামিল করেছেন।
এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





