সিউলের নিকটবর্তী কুংজংডং রেস্তোরাঁয় ডিনার সারার পর চলমান বুসান-মাসান গণঅভ্যুত্থান দমনের ব্যাপারে কোরিয়ান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (কেসিআইএ) চত্বরে আলোচনা করার সময় তৎকালীন কেসিআইএ প্রধান কিম জে-গিয়ুর ছোড়া গুলিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সে সময়ের প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি এবং তার দেহরক্ষী চা চি-চোল নিহত হন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হির ১৮ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। সেদিন ছিল ২৬ অক্টোবর, ১৯৭৯।
প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি হত্যার কিছুক্ষণের মধ্যেই কিম জে-গিয়ুকে সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে। বিচার চলাকালে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কিম জানান, তার কাজটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল। স্বৈরশাসক পার্ক চুং-হিকে সরিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি এটি করেছেন। কিমের আইনজীবী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলতে থাকেন, কোরীয় গণতন্ত্র তার কাছে ঋণী। তাদের দাবি ছিল, প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হিকে হত্যা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত করেছেন কিম জে-গিয়ু। অন্যদিকে, জেনারেল চুন-ডু-হুয়ানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী এ হত্যা তদন্তের প্রতিবেদনে জানায়, কিমের মনে ক্ষমতা দখলের বাসনা জেগেছিল। তা বাস্তবায়নের পথে বাধা ছিল পার্ক চুং-হি ও চা চি-চোল। প্রেসিডেন্টের সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল ‘প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিস’। চা চি-চোল ছিলেন এ বাহিনীর প্রধান। বহু দিন ধরেই কেসিআইএ প্রধান কিম জে-গিয়ুর সঙ্গে প্রেসিডেন্সিয়াল সিকিউরিটি সার্ভিসের প্রধান চা চি-চোলের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব ছিল। পার্ক চুং-হির ওপর চা চি-চোলের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে নিজের অবস্থান ও ভাগ্য নিয়ে শঙ্কিত হন কিম জে-গিয়ু। তাই এ দুজনকে সরিয়ে পথের কাঁটা দূর করেছেন তিনি। কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কিম কাজটি করেননি। করেছেন ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য। তবে তার অনুসারীদের মতে, পার্ক চুং-হির শাসনামলে বিরোধী রাজনীতিক এবং বুসান ও মাসানে অনুষ্ঠিত সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান দমনের ব্যাপারে পার্ক চুং-হি ও চা চি-চোলের চরম পন্থার বিপরীতে কিম জে-গিয়ু একটি মাঝামাঝি অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত অনুসারে পার্ক চুং-হি ও চা চি-চোল কর্তৃক রুদ্ধ গণতন্ত্রের দ্বার উন্মোচনকল্পে স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছিলেন। এ দুই বিরুদ্ধ মতের গোলকধাঁধায় এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ। দেশটির ইতিহাসের ধারাক্রমে পার্ক ও কিমের প্রতি তাদের মনোভাব প্রতিনিয়ত পাল্টে যাচ্ছে। কখনো পার্ক নায়ক, কিম খলনায়ক। কখনো তার উল্টো। ১৫ বছরের ব্যবধানে নির্মিত দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি সিনেমায় এ দ্বিধাদ্বন্দ্বের সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে।
‘দ্য প্রেসিডেন্ট’স লাস্ট ব্যাং’ (পরিচালক: ইম স্যাং-সু) নামে ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমাটিতে কিম জে-গিয়ুকে একজন নিষ্ঠুর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হিকে হত্যার পেছনে যার আদর্শিক কোনো প্রেরণা ছিল না। কৃতকর্ম পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সামলানোর ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনাও ছিল না তার। নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের গল্প ফেঁদেছিলেন তিনি। অন্যদিকে, ২০২০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট’ (পরিচালক: উ মিন-হো) সিনেমায় কিম জে-গিয়ুর ভূমিকাকে ভিন্ন লেন্সে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস চালানো হয়। সিনেমাটিতে কিম একজন আদর্শবাদী মানুষ। দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দিয়ে যিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ মসৃণ করতে চেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি ও কেসিআইএ প্রধান কিম জে-গিয়ুর প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের এ মনোভাবের পালাবদলের কারণ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।
প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হির শাসনামলে দক্ষিণ কোরিয়া দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। দেশটির নাগরিকদের কাছে তাই তিনি অর্থনৈতিক মুক্তির দিশা। অন্যদিকে, যেকোনোভাবেই হোক, কিম জে-গিয়ু হয়ে উঠেছেন গণতন্ত্রের প্রতীক। তাই দেশটিতে যখনই অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, জনগণ পার্ক চুং-হির মতো একজন শাসকের অভাব তীব্রভাবে অনুভব করে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হলে তারা কিম জে-গিয়ুতে উত্তরণের পথ খোঁজে। এভাবেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পট পরিবর্তেনের সঙ্গে পার্ক ও কিমের ভূমিকা-সংক্রান্ত ব্যাখ্যাও পাল্টে যায়।
প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হিকে নায়ক হিসেবে দেখার শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। তখন অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছিল দক্ষিণ কোরিয়া। ইতিহাসে এটি ‘আইএমএফ ক্রাইসিস’ নামে পরিচিত। সে সময় দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির ব্যাপক পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)। তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রচুর মানুষ বেকার হয়ে যায়। অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা ও সামাজিক অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয় সাধারণ মানুষ। সে স্মৃতি অদ্যাবধি তাদের মনে জাগরুক। এমন প্রেক্ষাপটে জনমনে পার্ক চুং-হির বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় তার সরকারের সাফল্যের স্মৃতি প্রবল হয়ে ওঠে। বিষয়টি ‘পার্ক চুং-হি সিনড্রোম’ নামে খ্যাতি লাভ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার তৎকালীন রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে এ সিনড্রোম মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৭ সালের এপ্রিলে দেশটিতে একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা কাকে দক্ষিণ কোরিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট মনে করেন। গণভোটে ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন পার্ক চুং-হি। একই বছর অনুষ্ঠিত আরেকটি গণভোটে রাজা সেজং দ্য গ্রেট (যিনি কোরীয় বর্ণমালার উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন) এবং অ্যাডমিরাল সুন-সিনের (১৯৫০ সালে জাপানের আক্রমণ থেকে যিনি কোরিয়াকে রক্ষা করেছিলেন) মতো ব্যক্তিদের পেছনে ফেলে কোরিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের খেতাব জোটে পার্ক চুং-হির কপালে। জনগণ একজন ‘অতিমানবিক নেতা’ হিসেবে তার স্মৃতি উদযাপন করতে থাকে। একই সঙ্গে একজন মিতব্যয়ী, নিঃস্বার্থ, আত্মত্যাগী ও ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে পার্ক চুং-হির ইমেজ তৈরি হয়। পার্ক চুং-হির এমন ইমেজ তৈরিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিল দক্ষিণ কোরিয়ার ‘বেবি বুমার’ প্রজন্ম। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষার্ধে তাদের জন্ম। পার্ক শাসনামলে শিল্পায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাপক অর্থনৈতিক সাফল্যের চিত্র তারা দেখেছে। গণতন্ত্রের দামে তাদের দারিদ্র্য থেকে টেনে তুলেছিলেন পার্ক চুং-হি। ২০১৬ সালে পার্ক চুং-হির মেয়ে পার্ক গিয়ুন-হায়ির সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় বেবি বুমাররা তার পক্ষে জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল বের করেছিল। পার্ক চুং-হির প্রতি জনগণের এ দরদের প্রতিফলন ঘটে ১৯৯৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। রি ইন-জি নামের এক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী পার্ক চুং-হির অনুকরণে চুল রেখে ও পোশাক পরে জনগণের আবেগকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করেছিলেন। অনেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী পার্ক শাসনামলের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের কথা জোরেশোরে প্রচার করেছিলেন। কেউ কেউ আবার পার্ক চুং-হির সঙ্গে নিজেদের আত্মীয়তার কথাও তুলে ধরেছিলেন। তাদের একজন ছিলেন কিম চোং-পিল। তিনি বৈবাহিক সূত্রে পার্ক চুং-হির ভাতিজা ছিলেন। এমনকি পার্ক চুং-হি ক্ষমতায় থাকাকালীন তার কড়া সমালোচনা করে নির্যাতিত হওয়া কিম দায়ি-জুংও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে পার্কের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে সময় পার্ক চুং-হির স্মৃতি এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকরাও তা পুঁজি করতে হামলে পড়েছিল। ১৯৯৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিম দায়ি-জুং জয়ী হয়েছিলেন। আর পার্ক চুং-হির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হন তার মেয়ে পার্ক গিয়ুন-হায়ি। রাজনীতিতে দ্রুত এগিয়ে যেতে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান রক্ষণশীল দল গ্র্যান্ড ন্যাশনাল পার্টির (জিএনপি) সভানেত্রীর পদ অলংকৃত করেন। আর ২০১২ সালের নির্বাচনে মুন জা-ইনকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট হন পার্ক গিয়ুন-হায়ি। রাজনৈতিক জীবনের পুরোটাজুড়ে পার্ক গিয়ুন-হায়ি তার পিতার নেতৃত্ব ও সাফল্যের জয়গান প্রচার করেছেন। আত্মজীবনী থেকে রাজনৈতিক প্রচারণা, সর্বত্র তিনি পার্ক চুং-হিকে সামনে তুলে ধরেছেন। তার স্লোগান ছিল ‘ভালোভাবে বাঁচার চেষ্টা করো’। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তার পেছনে কেবল পিতার ভূমিকা নয়, মায়েরও উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। পার্ক গিয়ুন-হায়ির সুবিন্যস্ত চুল দেখতে অনেকটাই তার মা ইয়ুক ইয়োং-সুর মতো ছিল। ইয়ুক ইয়োং-সু ১৯৭৪ সালে আততায়ীর বুলেটে মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর পিতার শাসনামলের অবশিষ্ট সময় ‘ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে তাকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। তখন থেকেই তার এক ধরনের ইতিবাচক ইমেজ জনমনে তৈরি হয়। প্রবল প্রশংসিত পিতামাতার সন্তান হিসেবে পার্ক গিয়ুন-হায়ি ভোটারদের তার পক্ষে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধ পর্যন্ত পার্ক গিয়ুন-হায়ির এ জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ছিল। কিন্তু সে বছরের অক্টোবরে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। চো সুন-সিল নামের দক্ষিণ কোরীয় এক নারী ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্কের জেরে পার্ক গিয়ুন-হায়ির নামে রাজনৈতিক কলঙ্ক রটে। তদন্তে জানা যায়, প্রেসিডেন্টের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়েছিলেন চো সুন-সিল। এমন প্রেক্ষাপটেই দক্ষিণ কোরিয়ায় ‘গণতন্ত্রের নায়ক’ হিসেবে কিম জে-গিয়ুর উত্থান। পার্ক চুং-হি সিনড্রোমের পরিবর্তে তখন সামনে আসে কিম জে-গিয়ু সিনড্রোম। আর এ সিনড্রোমের আলোকেই ‘দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট’ সিনেমায় একজন আদর্শবাদী ও বিপ্লবী নায়ক হিসেবে কিম জে-গিয়ুকে উপস্থাপন করা হয়। ‘দ্য প্রেসিডেন্ট’স লাস্ট ব্যাং’ সিনেমায় দেখানো হয়েছিল ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে কিম জে-গিয়ু পার্ক চুং-হিকে হত্যা করেছিলেন। আর ‘দ্য ম্যান স্ট্যান্ডিং নেক্সট’ সিনেমায় দেখানো হয় কিম জে-গিয়ুর এ সিদ্ধান্ত ছিল গণতান্ত্রিক আদর্শপ্রসূত।
(সুনগিক ইয়াং রচিত ‘সাউথ কোরিয়ান পলিটিকস অ্যান্ড ডাইভারজেন্ট ফিল্মিক পোর্ট্রেয়ালস অব দি অ্যাসাসিনেশন অব পার্ক চুং-হি’ প্রবন্ধ অবলম্বনে)
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





