মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক। তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বর্তমান পরিস্থিতি, ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
শহীদ শামসুজ্জোহা, গণ-অভ্যুত্থান ও আন্দোলনে শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে যদি কিছু বলতেন।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ধরন ছিল ভিন্ন। তখন পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল। গোটা জাতি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মুক্তি চেয়েছে। স্বাধীনতা চেয়ে করেছে প্রতিবাদ। কিন্তু এখনকার বিষয়টা অভ্যন্তরীণ। আমরা নিজেরাই ক্ষমতায় আছি। নিপীড়ন হচ্ছে, নিজেরাই সেটার প্রতিবাদ করছি। দুটি ঘটনার প্রেক্ষিত কিন্তু ভিন্ন।
শিক্ষার্থীরা প্রায়ই বলে, ‘একজন শামসুজ্জোহা স্যারকে পেলে আমাদের ওপর এমনটা হতো না।’ সেক্ষেত্রে একটা বিষয় গোচরে আনা গুরুত্বপূর্ণ। শামসুজ্জোহা স্যার প্রক্টর ছিলেন। ছিলেন একজন দায়িত্বশীল। দায়িত্বের জায়গা থেকে দেখলে তিনি সর্বোচ্চটা পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন ত্যাগ করেছেন। এখন আমরা যারা শিক্ষক হিসেবে আছি, তারা কিন্তু সাধারণ শিক্ষক। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষকের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষক। প্রক্টর, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রক্টর ও হাউজ টিউটরের মতো প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত যারা আছেন, তাদের মতো দায়িত্ব কিন্তু আমরা সাধারণ শিক্ষক হিসেবে পালন করতে পারি না। আমাদের অ্যাকসেসও নেই, যেতেও পারি না সেখানে। চাইলেই বিভিন্ন হলে কিংবা বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়াতে পারি না। আমাদের কাজে সেদিক থেকে সীমাবদ্ধতা আছে। তৎকালে প্রক্টর কিংবা হাউজ টিউটর নিয়োগ দেয়া হতো ডেডিকেটেডদের। বিপরীতে এখন কীভাবে নিয়োগ দেয়া হয় তা সবাই জানে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি এগিয়ে এসে কিছু না করেন তাহলে সাধারণ শিক্ষকদের কিছু করার থাকে না। আসলে সাধারণ শিক্ষকরা কষ্ট পাচ্ছেন। যে যার মতো চেষ্টা করছেন শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে। সম্ভাব্য উপায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সাপোর্ট দেয়ার জন্য। কিন্তু এর বাইরে সাধারণ শিক্ষকদের খুব বেশি কিছু করার নেই। আমি নিজেও প্রতিবাদ করেছি অপরাজেয় বাংলায়। যেখানে শিক্ষক হিসেবে সাপোর্ট দেয়া সম্ভব, সেগুলো করছি। অনেক শিক্ষকই সেটা করছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কাজগুলো করা দরকার, ওই জায়গাটায় আরো দৃঢ় ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল। শিক্ষার্থীরা সেটাই প্রত্যাশা করে।
এখন যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বশীল আছেন বা যাদের অ্যাকসেস বেশি, তারা কাজটা করতে পারতেন। না করার পেছনে কোন বিষয়গুলো প্রভাবক হিসেবে কাজ করে?
প্রতিষ্ঠানগুলোর কথাই ধরা যাক। আমাদের স্বাধীনতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ক্ষমতা ছিল, স্বাধীনতার পর কিন্তু সেটা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন বিভাজিত হয়ে গেছেন বিভিন্ন দলে। অধিকাংশই বিভাজিত হয়ে গেছেন। সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলেন, তাদের সংখ্যা খুব কম। অধিকাংশই কোনো না কোনো দলের সঙ্গে জড়িত। ফলে তারা সে দলের টিউন বুঝে কথা বলেন। দল ক্ষমতায় থাকলে কী চায়, ক্ষমতার বাইরে থাকলে কী চায়, সেটাই অগ্রাধিকার পায় তাদের কাছে। এর বাইরে তারা যেতে পারছেন না। ফলে বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি বলে যে একটা বিষয় আছে, সে মুক্তির জায়গাটা কিন্তু সত্যিকার অর্থে হয়নি। অথচ ১০০ বছর আগে শিখা গোষ্ঠী বলেছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি যেখানে অসম্ভব।’
কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য না, আইন-আদালত, বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে মিডিয়া পর্যন্ত সব জায়গায়ই আমরা দেখতে পাচ্ছি নিয়ন্ত্রণ। কখনো ওপর থেকে আরোপ করা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ, আবার কখনো স্বেচ্ছায় বিসর্জন দেয়া হয়েছে নিজেদের স্বাধীনতাকে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কিংবা প্রাপ্তির আশায় বিসর্জন দিয়েছেন স্বাধীনতা। ফলে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে শক্তিশালী হতে পারেনি। দাঁড়াতে পারেনি স্বতন্ত্র স্বর। বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু এর বাইরে নয়। বিশ্ববিদ্যালয় আর সমাজবিচ্ছিন্ন দ্বীপ না, বরং সমাজেরই অংশ। বিশ্ববিদ্যালয় তার সক্ষমতার সে জায়গাটায় নেই। আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। আমরা পদে পদে দেখতে পাচ্ছি তো তার প্রমাণ। ঠিক এ কারণেই এ জায়গাগুলো ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছে না। ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
আপনি বলেছেন বর্তমান সংকটটা অভ্যন্তরীণ। সে জায়গা থেকে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে আসা না হয়, তাহলে কীভাবে আমরা সমাধান করতে পারি? বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে এমন বিরূপ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন হলো ‘টিপ অব দি আইসবার্গ’। কেবল কোটা আন্দোলনের জন্যই যে এত কিছু হচ্ছে, তা কিন্তু না। মানুষ মত প্রকাশ করতে পারে না, নিপীড়িত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য বেশি, চাকরি পাচ্ছে না, এমন অনেক কারণ আছে। অনেক ছেলেমেয়ে আছে যারা ভোট দিতে পারেনি। এ রকম বিভিন্ন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বর্তমান পরিস্থিতি। এটাই আমার অ্যানালাইসিস।
এতদিন বলা হলো আদালতের কথা, এখন আবার তাড়াহুড়ো করে রায়ের দিন এগিয়ে আনা হলো। এমন সিদ্ধান্তগুলোর নেতিবাচক প্রভাব আছে। সিদ্ধান্ত নিতে হয় সঠিক সময়ে। ত্বরিত গতিতে সিদ্ধান্ত না নেয়ার কারণেই পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করে যদি ঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া হতো, আজকে এতদূর গড়াত না। তাছাড়া একটা সমস্যার সমাধান করলেই তো হবে না। আজকে একটা সমস্যার সমাধান করা হলো, কালকে আরেকটা সমস্যা দেখা দেবে। ফলে পুরো ব্যবস্থাকেই স্বচ্ছ করতে হবে। গণতান্ত্রিক ও মানবিক করতে হবে। তেমন একটা জায়গার দিকে যেতে হবে ধীরে ধীরে। একদিনেই হবে এমন না। কিন্তু ধীরে ধীরে হবে। সবার আগে যে জিনিসটা দরকার, সেটা হলো আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করিনি। যখন যে ক্ষমতায় ছিল, তারা তাদের অনুগত বানাতে গিয়ে দুর্বল করে ফেলেছে। এখন উচিত দুর্বল না করে শক্তিশালী করা। মিডিয়া, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় শক্তিশালী করা। তাদের কাজ করতে দেয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে। সেটা হলেই সমস্যার অনেকটা সমাধান করা যায়।
প্রথমত, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। উচিত সেখানকার কাজ বাধাগ্রস্ত না করা কিংবা কারো ইঙ্গিতে পরিচালিত না করা। জায়গাগুলো শক্তিশালী থাকুক। এটা একদিনে হবে এমন না। কিন্তু সে প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে হবে।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে সরকারকে আপনি কী সুপারিশ করতে চান? তাছাড়া একসময় যেহেতু শিক্ষকরা আমাদের ঢাল ছিলেন। সে জায়গা থেকে আপনি যদি কিছু বলতেন।
এর আগে শিক্ষকদের নিয়েও তুচ্ছতাচ্ছিল্য হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘ওরা ক্লান্ত হোক, তারপর বলব।’ শিক্ষকদের মধ্যেও তো এক ধরনের অভিমান আছে। না সরকার আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা করছে, না করছে কোনো পরামর্শ। কোনো যোগাযোগ নেই। সরকারের সঙ্গে শিক্ষকদের এই যে যোগাযোগহীনতা তৈরি হয়েছে, সে শূন্যতাও এ ক্রাইসিস তৈরির পেছনে কারণ। আমি মনে করি, সরকারের উচিত প্রথমে শিক্ষকদের সঙ্গে বসা। বিষয়গুলো মীমাংসা করা। সে মীমাংসাটা করা শিক্ষকদের মাধ্যমে। যদিও শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষকদের ওপরও ক্ষুব্ধ। কেন তাদের যথাসময়ে সুরক্ষা দেয়া হয়নি, সেটা নিয়ে। তাদের অনেক দাবি আছে, ক্ষোভ ও কষ্ট আছে। তার পরও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিক্ষকরা। সরকারের উচিত শিক্ষকদের কাজে লাগানো। তাদের কাজে লাগিয়ে প্রাথমিকভাবে পরিস্থিতিকে শান্ত করা। পরে অন্যান্য প্রক্রিয়া ধরে এগিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে বহু ছাত্র মারা গেছে। ভালো কথা বলতে গেলেও তো তারা রিঅ্যাক্ট করবে। কিন্তু এ কথাগুলো এখন একমাত্র শিক্ষকরাই বলতে পারেন শিক্ষার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে।
এখন কোনো শিক্ষক কথা বলতে গেলে যদি সরকার বলে শিক্ষার্থীদের উসকানি দিচ্ছে; তাহলে শিক্ষক দায় নিতে কেন যাবে? শিক্ষককে দায়িত্ব দিতে হবে। তাহলেই বিষয়টিতে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব। আমরা চাই না আর একটা প্রাণ যাক। একটা শিক্ষার্থী হোক বা পথচারী, সবাই তো আমাদের। আমাদের দেশেরই সন্তান, আমাদেরই ভাই। আরেকটা ক্ষতি হোক, সেটা আমরা চাই না। আমি মনে করি সরকারের দায়িত্ব শিক্ষকদের আগে বোঝানো—‘যা হওয়ার হয়েছে, আমরা দেখছি পরে। আপনারা আগে শিক্ষার্থীদের শান্ত করুন। তারপর আলোচনা করে একটা একটা করে সমাধান করব।’ এর দায়িত্ব পালন করতে পারবে একমাত্র শিক্ষকরা। কারণ তারাই শিক্ষার্থীদের কাছে থাকে।





