জর্জ নাথানিয়েল কার্জন তখন ইটন কলেজের ছাত্র। একটি প্রবন্ধ লিখে পুরস্কার জিতেছেন তিনি। মর্যাদাপূর্ণ ‘ফ্রেঞ্চ প্রাইজ’। একজন ছাত্রের জন্য তা অনেক বড় স্বীকৃতি। সম্মান তো বটেই। এ খবর কার্জনের পিতা স্কারসডেলের কানে পৌঁছল। তিনি কার্জনকে তার সাফল্য উদযাপন করতে বারণ করলেন। কার্জনের উদ্দেশে স্কারসডেল বললেন, ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তোমাকে মেধা দিয়েছেন। তুমি তার সদ্ব্যবহার করবে। এটি আমার আন্তরিক কামনা। মা-বাবার জন্য তুমি আশীর্বাদ হবে।’ তিনি কার্জনকে পরামর্শ দিলেন, ‘বৎস, তোমার এ বিজয়ে তুমি গর্বিত হবে না।’ লর্ড স্কারসডেল কার্জনকে চুল লম্বা করতে নিষেধ করলেন। তিনি কড়া নির্দেশ দিলেন, চুল যেন কানকে ছাপিয়ে না যায়। উল্লেখ্য, পাণ্ডিত্যের নিদর্শনস্বরূপ চুল লম্বা করার রীতি ছিল। কার্জনের মাও তাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তিনি মনে করতেন ‘ফ্রেঞ্চ প্রাইজ’ জয় কার্জনকে অনেক বেশি পরিশ্রমের দিকে ঠেলে দেবে। একপর্যায়ে সে মানসিকভাবে বিষণ্ন ও শারীরিকভাবে অবসন্ন হয়ে যাবে। সমসাময়িক ফটোগ্রাফগুলোয় দেখা যায়, কার্জন পিতার আদেশ অনুসারে চুল ছোটই রেখেছিলেন। কিন্তু মায়ের সতর্কবাণীতে তিনি মোটেই কর্ণপাত করেননি। সারা জীবন তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রম করেছেন। তার সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারই এর প্রমাণ।
বাবা হিসেবে লর্ড স্কারসডেল অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী ছিলেন। বিলাসিতা ও চাতুরী তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। সন্তানদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তিনি কখনই উৎসাহিত করেননি। এমনকি তাদের অর্জনের প্রশংসা করতেও তার অনীহা ছিল। ‘ফ্রেঞ্চ প্রাইজ’ জয়ের পর কার্জনকে উদ্দেশ করে বলা কথাগুলো তার এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বড় প্রমাণ। এ নিয়ে কার্জনের মনোকষ্ট ছিল। তার ক্যারিয়ারের প্রতি স্কারসডেলের ন্যূনতম আগ্রহ নেই বলে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। আর তা এতটাই তীব্র ছিল, তিনি কখনই কার্জনের কোনো বই কিংবা বক্তৃতা পড়ে দেখেননি। তাকে ঘিরে পিতার স্বপ্ন ছিল অন্য রকম। স্কারসডেল তাদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্যে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, জমিদারদের নিজ জমিতেই বসবাস করা উচিত। কেডলস্টোনের ঐতিহ্যবাহী কার্জন পরিবারের সদস্যরা ছিল শান্ত ও গৃহকাতর। জর্জ নাথানিয়েল কার্জন ছিলেন এর উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এতে তার প্রতি রুষ্ট ছিলেন লর্ড স্কারসডেল। কার্জনকে তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কেন বাড়িতে থাকছ না? জমিদারি দেখাশোনা করো। প্রজাদের ভালোমন্দের খবর নাও; যেমনটা আমি করছি। তা না করে তুমি সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছ কেন?’ কিন্তু কার্জনের লক্ষ্য ছিল অনেক বড়। সারা জীবন কেডলেস্টনের জমিদারি আঁকড়ে পড়ে থাকার মতো মানুষ তিনি ছিলেন না। পারিবারিক প্রথাকে অনুসরণ না করে ব্যতিক্রমী জীবন বেছে নেয়ার কারণেই তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
জর্জ নাথানিয়েল কার্জনের প্রধান আকর্ষণ ছিল রাজনীতি। এর বাইরে দুটি কাজ তিনি পছন্দ করতেন। লেখালেখি ও ভ্রমণ। ইটন কলেজে কার্জনের ‘ফ্রেঞ্চ প্রাইজ’ জয়ের বিষয়টি দিয়ে এ লেখা শুরু হয়েছে। তবে অনেক আগেই তার লেখালেখির সূত্রপাত হয়। সাত বছর বয়স থেকে তিনি দিনলিপি লেখা শুরু করেন। দিনলিপিতে তার সুখী ও গতানুগতিক শৈশবের চিত্র ফুটে উঠেছে। টাট্টু ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে মা ও গৃহশিক্ষিকার সঙ্গে তিনি বেড়াতে যেতেন। খামার ও গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতেন। মাছ ধরতেন। গ্রীষ্মে পরিবারটি সাগরের ধারে বেড়াতে যেত। এসব স্মৃতি সযতনে দিনলিপির পাতায় বন্দি করেছিলেন শিশু কার্জন।
তবে সাহিত্যিক ও বক্তা হিসেবে জর্জ নাথানিয়েল কার্জন আরো পরে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তখন তিনি ইটন স্কুলের ছাত্র। এখানে এসে তিনি শিক্ষাবিদ অস্কার ব্রাউনিংকে শিক্ষক হিসেবে পান। ব্রাউনিংয়ের সঙ্গে চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। কার্জনের মেধা যথাযথভাবে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন ব্রাউনিং। তিনি একই সঙ্গে কার্জনের মধ্যে থাকা লেখালেখি ও ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষাকে আরো তীব্র করেন। ব্রাউনিং সম্পর্কে প্রথম স্ত্রীকে কার্জন বলেছিলেন, ‘প্রিয়তমা, আজ আমি যা হয়েছি, তার জন্য আমি ব্রাউনিংয়ের কাছে ঋণী।’
খেলাধুলায় অস্কার ব্রাউনিংয়ের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। তিনি সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি ছাত্রদের উৎসাহিত করতেন। ইটনে তিনি একটি সাহিত্য সমাজ (লিটারারি সোসাইটি) গঠন করেন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কলেজের মেধাবী ছাত্রদের নিজের ঘরে আমন্ত্রণ জানাতেন ব্রাউনিং। সংগীত, শিল্প ও সাহিত্য নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও আলোচনা জমে উঠত। সাপ্তাহিক সেসব জমায়েতে নিয়মিত অংশগ্রহণকারী প্রতিভাবান ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন জর্জ নাথানিয়েল কার্জন। অস্কার ব্রাউনিংয়ের এক শিষ্য ছিলেন এসি বেনসন। তিনি এসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। কার্জনের পাণ্ডিত্য, বিতর্কের ক্ষমতা ও প্রত্যুত্তরের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তিনি। কার্জনকে দান্তে ও টেনিসনের বই উপহার দিতেন ব্রাউনিং।
সাহিত্যিক হিসেবে ইটনে কার্জনের সুনাম ছিল। তিনি একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। ‘আউট অব স্কুল অ্যাট ইটন’ নামে একটি কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলনও সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। এটি ১৮৭৭ সালের গ্রীষ্মে প্রকাশ হয়েছিল। ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দ্য স্পেকটেটর’ এ সংকলনকে ‘আনন্দদায়ক’ বলে প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘দি অ্যাথিনিয়াম’ ম্যাগাজিনে একজন সমালোচক সংকলনটির নিন্দা করেন। ‘আউট অব স্কুল অ্যাট ইটন’ সংকলনে কার্জনের নিজের তিনটি লেখা ছিল। একটি প্রবন্ধ ও দুটি কবিতা। ‘মেইডেন অ্যাসে অ্যাজ আ ক্লাইম্বার’ শিরোনামের প্রবন্ধটিতে তিনি ‘স্কফেল পাইক’-এর বর্ণনা দেন। স্কফেল পাইক ইংল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু ও বিখ্যাত পর্বত। কাম্বারল্যান্ড লেকের সৌন্দর্য বর্ণনা করে তিনি একটি কবিতা লিখেছিলেন। এ কবিতায় প্রকৃতির প্রতি তার সত্যিকার আবেগ তিনি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন বলে ‘দ্য স্পেকটেটর’ সে সময় মন্তব্য করেছিল। ‘সং অব লিবার্টি’ নামে তার আরেকটি কবিতা এ সংকলনে স্থান পায়। সমসাময়িক ইংরেজ কবি চার্লস সুইনবার্নের অনুকরণে তিনি কবিতা লিখেছিলেন। সমসাময়িক কবিদের কবিতা প্যারোডি করা কার্জনের অন্যতম শখ ছিল। নিজের প্রেমিকাদের তিনি সেসব প্যারোডি উপহার দিতেন।
১৮৭৭ সালে কার্জন অস্কার ব্রাউনিং কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সমাজের সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি অনেকগুলো প্রবন্ধ লেখেন। ফরাসি বিপ্লবের ওপর চমৎকার একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। ১৮৮১ সালে পোল্যান্ডের রাজা জন সোবিস্কিকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন কার্জন। অক্সফোর্ডের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘লোথিয়ান হিস্ট্রি প্রাইজ’-এর জন্য প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে তিনি প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তবে পুরস্কার পাননি। প্রতিযোগিতায় তিনি দ্বিতীয় হয়েছিলেন। ১৮৮৩ সালে তিনি আবার সে প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সেবার বাইজানটাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ানের ওপর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এ সময় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ‘অল সোলস’ কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন। তিনি ‘আর্নল্ড পুরস্কার’ জেতার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। অল সোলস কলেজ প্রবন্ধের জন্য এ পুরস্কার দিত। ১৮৮৪ সালের শুরুতে কার্জন তার পিতার উইম্পোল স্ট্রিটের বাড়িতে নিজেকে একপ্রকার স্বেচ্ছানির্বাসন দেন। সেখানে তিনি স্যার থমাস মুরের জীবনের ওপর গবেষণা শুরু করেন। তিনি প্রতিদিন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যেতেন। মিউজিয়ামের পাঠকক্ষে বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পড়াশোনা করতেন। তারপর রাতের খাওয়া শেষ করে অক্সফোর্ড মিউজিক হলে আধাঘণ্টা সংগীত উপভোগ করতেন তিনি। রাত ১০টার মধ্যে উইম্পোল স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে নিজের টেবিলে বসতেন কার্জন। তারপর ৬-৭ ঘণ্টা টানা লিখতেন। আর তাকে কাপের পর কাপ চা দিতে দিতে একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে যেতেন বৃদ্ধ পরিচারক। এমনকি লর্ড স্কারসডেলের কাছে কার্জনের ব্যাপারে অভিযোগও করেছিলেন সে পরিচারক। এভাবে দিনে-রাতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রবন্ধটি লেখা শেষ করেন কার্জন। তারপর অক্সফোর্ডে গিয়ে তিনি লেখাটি জমা দিয়ে আসেন। পড়াশোনা ও লেখালেখির প্রতি কার্জনের ছিল এমনই ঝোঁক।
জর্জ নাথানিয়েল কার্জন বিভিন্ন বিষয়ে অনেক বই লিখেছেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, কার্জনের ভ্রমণের নেশা ছিল। তিনি প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণকালে বিভিন্ন দেশ ও জনপদ তিনি গবেষকের দৃষ্টি নিয়ে দেখেছেন। ভ্রমণকালে পাওয়া বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা তিনি কালির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনেক সময় লেখালেখির প্রয়োজনেও তিনি ভ্রমণ করতেন। কার্জনের লেখালেখি ও ভ্রমণ ছিল পরস্পরের পরিপূরক। রাশিয়ার বিবিধ বিষয় নিয়ে তার লেখা বইটির নাম ‘রাশিয়ান ইন সেন্ট্রাল এশিয়া অ্যান্ড দি অ্যাংলো-রাশিয়ান কোশ্চেন’। এটি ১৮৮৯ সালে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল। কার্জন রচিত ‘পার্সিয়া অ্যান্ড পার্সিয়ান কোশ্চেন’ বইটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৮৯২ সালে। ‘প্রবলেমস অব দ্য ফার ইস্ট’ নামে একটি বই তিনি লিখেছিলেন। এটি ১৮৯৪ সালে প্রথম প্রকাশ হয়। ‘প্রবলেমস অব দ্য ফার ইস্ট, জাপান, কোরিয়া, চায়না’ নাম দিয়ে ২০০০ সালে বইটি রিপ্রিন্ট করে আডামান্ট মিডিয়া করপোরেশন। ১৮৯৭ সালে প্রকাশ হয় ‘দ্য পামিরস অ্যান্ড দ্য সোর্স অব দি অক্সাস’। ‘দ্য রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি’ তাদের ‘জিওগ্রাফিক্যাল জার্নাল’-এ লেখাটি প্রকাশ করে। ১৯০৭ সালে প্রকাশ হয় ‘দ্য রোমানস লেকচার’। কার্জনের ভ্রমণবিষয়ক বিখ্যাত সংকলন ‘টেলস অব ট্রাভেল’। ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে তার আরেকটি চমৎকার বইয়ের নাম ‘ট্রাভেলস উইথ আ সুপিরিয়র পারসন’।
উপমহাদেশে জর্জ নাথানিয়েল কার্জন সাধারণত একজন ব্রিটিশ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত। এ লেখা তার লেখক সত্তার ব্যাপারে পাঠকদের কিছুটা হলেও আলোকিত করবে। এ আশাবাদ রেখে নাতিদীর্ঘ এ প্রবন্ধের ইতি টানছি।
রবিউল হোসাইন: লেখক





