তাঁকে ‘শেরে বাংলা’ উপাধিটা দিয়েছিলেন ভিন্ন প্রদেশের অবাঙালি মুসলমানরা, ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে দেয়া তাঁর বক্তৃতা শুনে; তাঁর সাহস ও তেজস্বিতায় মুগ্ধ হয়ে। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা তাদের খর্বাকৃতি, তুলনামূলক ক্ষীণ দেহ ও নমনীয় ব্যক্তিত্বের জন্য শুধু শাসক ইংরেজদের চোখেই নয়, ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের মানুষের কাছেও ভীরু বলে পরিগণিত হতো। ফজলুল হক তাঁর শালপ্রাংশু দেহ, বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠ ও তেজোদ্দীপ্ত বক্তব্য, এই তিন ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের কারণেই হয়তো সেদিন লীগের সমবেত নেতা-কর্মীদের বিস্ময় ও মুগ্ধতা আকর্ষণ করেছিলেন। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তিনি উর্দুতেও অনর্গল কথা বলতে, বক্তৃতা করতে পারতেন। লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে তিনি উর্দুতেই ভাষণ দিয়েছিলেন। এর তিন বছর পর, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ, লাহোরে মুসলিম লীগের আরেক অধিবেশনে তিনি ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তখন একই সঙ্গে বাংলার প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগেরও সভাপতি। তাঁর উত্থাপিত সে প্রস্তাবটি পরবর্তীকালে লাহোর প্রস্তাব এবং আরো পরে পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেদিন অধিবেশন মঞ্চে দলের হয়ে যে প্রস্তাবটি তিনি উত্থাপন করেন, তাতে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে একাধিক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র (ইংরেজিতে ‘ইনডিপেনডেন্ট স্টেটস’) গঠনের কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, রাষ্ট গুলো হবে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম’। পরের বছর এপ্রিল মাসে দিল্লিতে মুসলিম লীগ দলীয় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের কনভেনশনে এ প্রস্তাবটি সংশোধিত হয়। আগেরবারের ‘স্টেটস’ শব্দটির ‘এস’ অক্ষরটি বাদ দিয়ে (জিন্নাহ বলেছিলেন, সেটা ছিল টাইপের ভুল) নতুন প্রস্তাবে ভারতবর্ষের দুদিকের দুটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। সভাপতি জিন্নাহর নির্দেশে এবার বাংলার আরেক নেতা এবং ভারতবর্ষের একমাত্র লীগ-দলীয় প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সংশোধিত এ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। আবুল হাশিমের মতো গুটিকয় নেতার আপত্তি সত্ত্বেও সংশোধিত প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে পাস হয়ে যায়। ফজলুল হক সে সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধ থেকে মুসলিম লীগ ছেড়ে গেছেন। তিনি দল না ছাড়লে বা লীগের ওই অধিবেশনে উপস্থিত থাকলে কী করতেন, বলা মুশকিল। এ ব্যাপারে অনুমানভিত্তিক কোনো সিদ্ধান্তে না যাওয়াই ভালো। তবে মুসলিম লীগের লাহোর বা পাকিস্তান প্রস্তাবের উত্থাপক হিসেবে তাঁর পরিচয়টি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
২
ফজলুল হকের জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর। তাঁর গ্রামের বাড়ি ছিল বরিশালের চাখারে। তবে জন্মেছিলেন তিনি মামাবাড়িতে, সাতুরিয়া গ্রামে। তখন বরিশাল অবশ্য ছিল বাখরগঞ্জ জেলার একটি মহকুমা। তাঁর বাবা ওয়াজেদ মিয়া ছিলেন জেলা আদালতে সরকারি উকিল। ফজলুল হকের স্কুলজীবন কাটে বরিশালেই। জিলা স্কুল থেকে তিনি বৃত্তি নিয়ে এন্ট্রান্স পাস করেন। তারপর পড়ালেখার জন্য কলকাতায় যান। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ (পরে যাকে আইএ বলা হতো) ও বিএ পাস করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম বিভাগ লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে মাস্টার্স করার পর তিনি সিটি ল কলেজ থেকে আইনেও ডিগ্রি নেন। এরপর কিছুকাল স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের (১৮৬৪-১৯২৪) জুনিয়র হিসেবে কাজ করেন। বরিশালে ফিরে তিনি জেলা আদালতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি বরিশাল রাজচন্দ্র কলেজে গণিতের খণ্ডকালীন অধ্যাপনা এবং ‘বালক’ ও ‘ভারতসুহূদ’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনাও করেন তিনি। এ সময়ই স্বদেশী নেতা অশ্বিনীকুমার দত্তের (১৮৫৬-১৯২৩) সাহচর্যে এসে তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হন। প্রথমে বরিশাল পৌরসভা ও পরে বাখরগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯০৫ সালে বঙ্গবিভাগের পর যখন পূর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়, তখন তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। যদিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মতান্তর থেকেই হোক, কিংবা পদোন্নতির আশু সম্ভাবনা নেই দেখে, কিছুদিন পর তিনি সে চাকরি ছেড়ে দেন এবং কলকাতায় ফিরে গিয়ে হাইকোর্টে পুরোপুরি আইন ব্যবসা শুরু করেন।
১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর (১৮৬-১৯১৫) আহ্বানে মোহামেডান মুসলিম কনফারেন্স উপলক্ষে সারা ভারতের মুসলিম নেতাদের এক সম্মেলনে মুসলিম লীগ গঠিত হয়।
প্রস্তুতি পর্ব থেকেই ফজলুল হক এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নবাব ভিকারউল মুলকের (১৮৪১-১৯১৭) নেতৃত্বে লীগের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটিরও তিনি ছিলেন একজন সদস্য। নবাব সলিমুল্লাহ যখন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি, ফজলুল হক ছিলেন তখন সাধারণ সম্পাদক। সংসদীয় রাজনীতিতে ফজলুল হকের প্রবেশ ১৯১১ সালে বঙ্গীয় আইনসভায় সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। সে নির্বাচনে ঢাকা কেন্দ্র থেকে তিনি অবশ্য একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে বাংলা তথা ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণে সোচ্চার হলেও বৃহত্তর পরিসরে তিনি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের পক্ষপাতী ছিলেন। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তিনি যখন প্রথমে বঙ্গীয় ও পরে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি হন, তখন এ উভয় লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তিনি দল পরিচালনা করেন। ১৯১৬ সালে লক্ষৌয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, সেই ‘লক্ষৌ প্যাক্টে’র তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। পরের বছর কংগ্রেস ও লীগের যৌথ অধিবেশনেও তিনি সভাপতিত্ব করেন। ১৯১৮ সালে একইসঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার বিরল সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মুসলমান নেতাদের অনেকেই ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত (কেউ কেউ এমনকি তার পরও) একইসঙ্গে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ এ দুটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কেবল জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) কিংবা মওলানা মোহাম্মদ আলী (১৮৭৮-১৯৩১) বা মওলানা শওকত আলী (১৮৭৩-১৯৩৮) নন; বাংলায় ফজলুল হক ছাড়াও মওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮), ব্যারিস্টার আবদুর রসুল (১৮৭২-১৯১৭), ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১) প্রমুখ অনেকেই যার উদাহরণ।
কংগ্রেসের আইনসভা বর্জনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করে ১৯২৩ সালে চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫) মতিলাল নেহেরুর (১৮৬১-১৯৩১) সঙ্গে মিলে স্বরাজ্য দল গঠন করলে ফজলুল হকও নবগঠিত এ দলে যোগ দেন। চিত্তরঞ্জন দাশের উদ্যোগে ১৯২৩ সালে মুসলমানদের জন্য চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা রেখে যে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ সম্পাদিত হয়, মুসলমান নেতৃবৃন্দের পক্ষে ফজলুল হক ছিলেন তাতে অন্যতম স্বাক্ষরকারী। এর আগের বছর তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খুলনা থেকে উপনির্বাচনে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। মাস ছয়েকের জন্য তিনি বঙ্গের শিক্ষামন্ত্রীও হন। এ সময় বিশেষ করে মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ফজলুল হকই ছিলেন কলকাতার প্রথম মুসলমান মেয়র।
৩
রাজনৈতিক জীবনের গোড়াতেই ফজলুল হক দুটি কথা ভালোভাবে বুঝেছিলেন। এক. গ্রামপ্রধান বাংলা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো এর কৃষক সমাজ। সেই কৃষকরা যদি মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে না পারে, তবে দেশের উন্নতি অসম্ভব। জমিদারি ও মহাজনি শোষণ ও অত্যাচার থেকে বাংলার কৃষক সমাজের (যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল মুসলমান) মুক্তির বিষয়টিকে তিনি তাঁর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় নিয়ে এসেছিলেন। তাকে জাতীয় রাজনীতির বিষয় করে তুলেছিলেন। রাজনীতিক বা দেশনেতা হিসেবে ‘লাঙ্গল যার জমি তার’, ‘জাল যার জলা তার’ এ স্লোগানগুলোকে জাতীয় রাজনীতির বিষয় করে তোলা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ‘ডাল-ভাতে’র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সত্যি কথা বলতে, বাংলা তথা উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান। ১৯২৯ সালে স্যার আবদুর রহিমকে সভাপতি করে কৃষক-প্রজা পার্টি গঠনেরও আগে, বিংশ শতকের গোড়ার দিকেই, ফজলুল হক গ্রামাঞ্চলে রায়তদের ওপর জমিদারদের অত্যাচারের ব্যাপারে শহরবাসী শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে কলকাতায় ‘দি ক্যালকাটা এগ্রিকারচালাল এসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। কৃষক সমাজের স্বার্থে ঋণসালিশী বোর্ড গঠন (১৯৩৮), প্রজাস্বত্ব আইন পাস (১৯৩৯) বা জমিদারি উচ্ছেদ এ সবগুলো ঘটনার সঙ্গেই ফজলুল হকের নাম উচ্চারিত হয়। যদিও তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলেই যে সবগুলো ঘটনা ঘটেছিল, তা নয়। তবে এ সবের পেছনে নেতৃপর্যায়ে তাঁর উদ্যোগটাই ছিল প্রধান। যে ফ্লাউড কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীকালে (১৯৫০) বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করা হয়, স্যার ফ্রান্সিস ফ্লাউডকে চেয়ারম্যান করে সেই কমিশন গঠিত হয় ১৯৩৮ সালে, ফজলুল হকের নেতৃত্বে লীগ-প্রজা মন্ত্রিসভা যখন ক্ষমতায়।
দ্বিতীয় যে বিষয়টিকে ফজলুল হক অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন, তা হলো মুসলমান সমাজে শিক্ষার বিস্তার। তিনি বুঝেছিলেন, মুসলমান সমাজের পশ্চাত্পদতা ঘোচাতে হলে তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে মৈত্রী বা ঐক্য গড়ে তোলার জন্যও সেটা জরুরি। কারণ কেবল সমানে সমানেই বন্ধুত্ব হতে পারে। মুসলমান সমাজের ছেলেমেয়েরা যাতে অধিক হারে লেখাপড়ার সুযোগ পায় তার জন্য স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা, হোস্টেল প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি, মুসলমান ছাত্রদের জন্য আসন সংরক্ষণ, বৃত্তির ব্যবস্থা ইত্যাদি নানা পদক্ষেপ তিনি নিয়েছিলেন। অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিভাগ-উত্তরকালে পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী উভয় অবস্থাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি নিজ হাতে রেখেছিলেন। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ, লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ, বেকার হোস্টেল, বরিশালে চাখার কলেজ, ঢাকায় আহ্সানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, কৃষি কলেজ ইত্যাদি অজস্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে তাঁর স্মৃতি জড়িত। এমন নয় যে প্রতিষ্ঠানগুলো সব তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তিনি সেগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বা সেগুলোর উদ্বোধন করেছিলেন। তবে শিক্ষা প্রসারের বিষয়টিকে যে গুরুত্ব তিনি দিয়েছিলেন, এগুলো আসলে তারই ফল। আধুনিক বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশে তাঁর অবদান সেদিক থেকে অনন্য। আবু জাফর শামসুদ্দীন যে তাঁকে ‘বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজের প্রায় একক নির্মাতা’ বলেছেন, কথাটার তাত্পর্য এ প্রসঙ্গে সহজেই অনুধাবনযোগ্য।
১৯১৮ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে জিন্নাহ ও মাহমুদাবাদের রাজার বিরোধিতা সত্ত্বেও খিলাফত আন্দোলনে যোগ দেয়ার পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণে ফজলুল হক উদ্যাগী ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতায় সর্বভারতীয় খিলাফত সম্মেলনেও সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি। কিন্তু খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গে গান্ধীর অসহযোগ কর্মসূচি মিলিত হওয়ার পর যখন ছাত্রছাত্রীদের প্রতি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বর্জনের আহ্বান জানানো হয়, তখন তিনি সে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান। মুসলমান সমাজের জন্য অসহযোগের এ নীতিকে তাঁর মনে হয়েছিল আত্মঘাতী। এ সময় তিনি বলেছিলেন, ‘যদি সমস্ত হিন্দু ছেলে স্কুল-কলেজ ত্যাগ করে, তাতে তাদের যায়-আসে না। তারা বাড়ি বসে মা-বাপের কাছেও লেখাপড়া শিখতে পারবে এবং সময় হলে স্কুল-কলেজে ফিরেও আসবে। কিন্তু মুসলমান ছেলে স্কুল-কলেজ ছাড়লে সর্বনাশ। তাদের পরিবারে সবাই অশিক্ষিত। অতএব, তারা এমনভাবে গোল্লায় যাবে যে সময় হলেও তারা আর স্কুল-কলেজে ফিরে আসবে না। মুসলমান শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়ও ফজলুল হকের অবদান ছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাসবিহারী ঘোষ (১৮৪৫-১৯২১), রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) প্রমুখ হিন্দু সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরোধিতার কথা আমরা জানি। প্রায়ই বলে থাকি। কিন্তু যে তথ্যটা হয়তো অনেকেরই জানা নেই তা হলো, গোড়ার দিকে মুসলমান সমাজেরও বিশিষ্ট কেউ কেউ ঢাকায় এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে এ অর্থ ব্যয়ের ফলে শিক্ষা খাতে সরকারের সামগ্রিক বরাদ্দে টান পড়বে। ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। মওলানা আকরম খাঁ এ সময় বলেছিলেন, মুসলমানদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অপেক্ষা প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি শিক্ষা অধিক প্রয়োজনীয়। আর ব্যারিস্টার আবদুর রসুল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে মুসলমানদের জন্য ‘বিলাসিতা’ বলে অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রও কারো কারো আপত্তির কারণ হয়েছিল।
৪
ফজলুল হকেরও আগে যিনি ‘বাংলার বাঘ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন, সেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। আর আশুতোষপুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (১৯০১-১৯৫৩) সঙ্গে ছিল তাঁর যাকে বলে সোদরপ্রতিম সম্পর্ক। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, হিন্দু মহাসভার নেতা হিসেবে শ্যামাপ্রসাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও বিপরীত দিকে ফজলুল হকেরও কখনো কখনো চরম মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী অবস্থান, তাঁদের এ ঘনিষ্ঠতায় কখনো চিড় ধরাতে পারেনি। বরং ব্যক্তিগত সম্পর্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে তাঁদের এ সৌহার্দ্য রাজনীতির অঙ্গনেও প্রসারিত হয়। ১৯৪১ সালে ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর মুসলিম লীগদলীয় মন্ত্রীরা যখন তাঁর নেতৃত্বাধীন লীগ-প্রজা পার্টি কোয়ালিশন থেকে বেরিয়ে যান, তখন শ্যামাপ্রসাদের সহযোগিতায় হিন্দু মহাসভা, কৃষক-প্রজা পার্টি এবং বঙ্গীয় কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য নিয়ে তিনি প্রগ্রেসিভ কোয়ালিশন নাম দিয়ে নতুন একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। বিরোধী মুসলিম লীগের প্রচারণায় যা ‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এর আগে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তাঁর দল কৃষক-প্রজা পার্টির জয়লাভের পর তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বের অনাগ্রহে তাঁর সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বাধ্য হয়ে তখন তাঁকে মুসলিম লীগের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করতে হয়। সেদিন যদি কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর কোয়ালিশন সরকার গঠনের উদ্যোগ সফল হতো, বাংলার ইতিহাস হয়তো অন্যদিকে মোড় নিত।
আপন সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও অধিকারের ব্যাপারে সজাগ, সোচ্চার ও সক্রিয় হয়েও ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আচরণে ফজলুল হক ছিলেন বরাবরই উদার। ব্যক্তিজীবনে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্বের কোনো দ্বন্দ্বও তিনি কখনো কল্পনা করেননি। তাঁর সম্পর্কে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪) একবার বলেছিলেন, ‘ফজলুল হক মাথার নখ থেকে পায়ের চুল পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি, একই সঙ্গে তিনি খাঁটি মুসলমানও। মুসলমানিত্ব আর বাঙালিত্বের এমন সমন্বয় আমি আর দেখিনি।’ তিনি সে সময় আরো বলেছিলেন, বাঙালির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ওপর। আর ফজলুল হক এ ঐক্যের প্রতীক।
ফজলুল হকের দানশীলতার খ্যাতি ছিল প্রবাদতুল্য। একজন সফল আইনজীবী হিসেবে তিনি যেমন প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন, তেমনি অভাবী, দুস্থ ও বিপন্ন মানুষকে অকাতরে সাহায্য করতেন। অনেক গরিব ছাত্র তাঁর অর্থে ও আশ্রয়ে থেকে পড়ালেখা করেছে। বহু কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে তিনি টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন। বিনি পয়সায় অনেকের মামলা লড়েছেন। তাঁর সুপারিশে অনেক যুবকের চাকরি বা অন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ব্যাপারে সম্প্রদায়ের গণ্ডি তিনি মানতেন না। আপন আত্মীয়স্বজন ও দলের লোকদের যেমন সাহায্য করতেন, তেমনি অন্য সম্প্রদায় ও প্রতিপক্ষ শিবিরের লোকদের সাহায্যের ব্যাপারেও ছিলেন দরাজদিল। রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে তাঁর যে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, এ মহানুভবতাও নিশ্চয় তার পেছনে কাজ করেছে। কাবুলিওয়ালাদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার নিয়েও তিনি বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করেছেন। ঋণ শোধ করতে না পেরে নিজেকে দেউলিয়াও ঘোষণা করতে হয়েছে তাঁকে। লেখক-শিল্পীদের নানাভাবে সাহায্য বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তিনি। তাঁর অর্থানুকূল্যে বিভিন্ন সময় নবযুগসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এসব পত্রিকা যে সব ব্যাপারে ফজলুল হকের ভূমিকাকে সমর্থন করেছে, কিংবা তিনি পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতি নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করেছেন, তাও নয়।
মানুষ হিসেবে ফজলুল হক ছিলেন আবেগপ্রবণ। রাজনৈতিক জীবনে অনেক সময়ই তিনি আবেগ দ্বারা চালিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর তার ফলে বিপদগ্রস্তও হয়েছেন। তিনি যখন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, তখন ব্যক্তিগত সফরে কলকাতায় গিয়ে এক সংবর্ধনার উত্তরে দুই বাংলার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা বলেন। সেটা তাঁর মনের কথাই ছিল। কিন্তু মার্কিন সাংবাদিক কালাহান যেভাবে তিলকে তাল করে সংবাদটি প্রকাশ করেন, তাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বাড়তি সুযোগ পেয়ে যায়। এমনিতেই তারা যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিলের ছুতো খুঁজছিল। ওই সংবাদটির ভিত্তিতে তারা এরপর ফজলুল হকের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনে। তারা প্রদেশে ৯২-ক ধারা জারি ও যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে। ফজলুল হককে গৃহান্তরীণ করা হয়।
৫
রাজনীতিক হিসেবে তিনি সমালোচনা বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভুলভ্রান্তি, স্ববিরোধিতা ও পশ্চাদপসারণের উদাহরণ অনেক। এমন বহু কাজ তিনি করেছেন যার ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে এমনকি আপস বা সুবিধাবাদের অভিযোগও আনা যায়। অনেকে তাঁর সম্পর্কে অস্থিরচিত্ততা, রাজনৈতিক ডিগবাজি ও নীতিহীনতার অভিযোগও এনেছেন। নিজের ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে অতিরিক্ত আস্থা থেকে তিনি অবশ্য এসব সমালোচনা বা অভিযোগকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। তিনি নাকি বলতেন, আম গাছেই তো লোকে ঢিল মারে, শেওড়া গাছে মারে না। বাংলার স্বার্থের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ নেতৃত্বের উদাসীনতা বা অবহেলার প্রতিবাদে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন (১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর)। এ সময় কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী খানের কাছে তিনি যে চিঠিটি লিখেছিলেন তা তাঁর সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। একই রকম দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় পাওয়া যায় মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে তাঁকে অপসারণের চেষ্টার মুখে বাংলার গভর্নর জন হার্বার্টকে লেখা তাঁর পত্রগুচ্ছেও (দ্র: বেঙ্গল টুডে, ১৯৪৪)। কিন্তু একই ফজলুল হক ১৯৪৬-এর নির্বাচনে তাঁর দলের শোচনীয় পরাজয়ের পর জিন্নাহর উদ্দেশে মুসলিম লীগে তাঁকে ফিরিয়ে নেয়ার আবেদন জানিয়ে যে চিঠিটি লেখেন, তার ভাষা ছিল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের। জিন্নাহ অবশ্য ফজলুল হক অতঃপর ‘সততা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে এবং নিঃস্বার্থভাবে লীগের সেবা করবেন’ এ শর্তে তাঁকে দলে পুনঃপ্রবেশের অনুমতি দেন। তবে তাঁর বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি হওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে এসে নাজিমউদ্দিন সরকারের দেয়া অ্যাডভোকেট জেনারেলের চাকরি গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় এবং এ পর্বে জনগণের অন্যান্য দাবি-দাওয়ার প্রশ্নেও পরিষদের ভেতরে ও বাইরে তিনি প্রায় নিরুচ্চার ভূমিকা পালন করেছিলেন (হয়তো চাকরিগত সীমাবদ্ধতার কারণে)। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর এ সময়ের ভূমিকাকে তিনি নিজেই নাকি ‘পলিটিক্যাল ক্লোরোফরমে বেহুঁশ’ অবস্থা বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর ভক্ত ও জীবনীকার বি ডি হাবীবুল্লাহ তেমনই জানিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের (গণতন্ত্রী দল ও কমিউনিস্টদের) মোকাবেলায় নেজামে ইসলামকে কাছে টেনেছিলেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের সময় প্রথমে শেখ মুজিবকে মন্ত্রিসভায় নিতে চাননি। যে ইস্কান্দার মির্জা তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘ভারতের চর’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, তাঁর অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন। বেতার ভাষণে ইস্কান্দার মির্জাকে বাংলার ও বাঙালির গৌরব বলেও অভিহিত করেছিলেন। এ ঘটনাগুলোকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এমনকি ক্ষমতালিপ্সার উদাহরণ হিসেবেও দেখানো যেতে পারে। তবে এগুলো আজ ইতিহাসের অংশ, ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের বিচার-বিশ্লেষণের বিষয়। এগুলোকে ছাড়িয়েই ‘হক সাহেব’ বা ‘শেরেবাংলা’ এদেশের জনচিত্তে এক হূদয়বান, সাহসী ও জনদরদী নেতার ভাবমূর্তিতে বিরাজ করছেন। মনে হয় অনাগত কালেও করবেন।
ফজুলল হক নিজে অবশ্য তাঁর জীবনে ভাগ্যের ভূমিকা উল্লেখ করে লিখেছেন: “In my stormy and chequered life chance has played more than her fair part. The fault has been my own. Never at any time have I tried to be the complete master of my own fate. The strongest impulse of the moment has governed all my actions. When chance has raised me to dazzling heights, I have received her gifts without stretched hands. When she cast me down from my high pinnacle, I have accepted her buffets without complaint.”
৬
পূর্ববঙ্গীয় গ্রামীণ পটভূমি থেকে এসে ফজলুল হক যে বাংলার তথা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন, জাতীয় নেতৃত্বে বরিত হয়েছিলেন, তা সম্ভব হয়েছিল তাঁর মেধা, বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তি, বিদ্যাবত্তা, ভাষার ওপর দখল, বাগ্মিতা এবং উপস্থিত বুদ্ধি বা প্রত্যুত্পন্নমতিত্বের গুণে। ইংরেজ রাজপুরুষ কিংবা ভারতের নানা প্রদেশের ভিনভাষী ও অভিজাত হিন্দু-মুসলমান নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তিনি যেমন সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যে ও পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে মিশতে পারতেন, দাপটের সঙ্গে তাঁদের মোকাবেলা করতে পারতেন; একইভাবে গ্রামের চাষীদের সঙ্গেও তাদের ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আপন বৈবাহিক ও অন্যান্য সূত্রে অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতের অনেকগুলো বিশিষ্ট ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ও ওঠাবসা ছিল। তেমন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের সঙ্গে তিনি অনেক সময় উর্দুতেই বাতচিত করতেন। কিন্তু তিনি যখন গ্রামের সাধারণ কৃষক বা জেলের সঙ্গে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন, নৌকায় বসে ও লুঙ্গি পরে তাদের সঙ্গে তাদের মাটির শানকিতে ভাত খেতেন, তাদের থেলো হুঁকোয় টান দিতেন কিংবা মাথাল মাথায় জমির আলপথ ধরে মাইলের পর মাইল হাঁটতেন, তারা তাঁকে তাঁদের একান্ত আপনজন বলেই মনে করত।
৭
বিভাগপূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের উপদলীয় রাজনীতিতে কিংবা ১৯৪৭-উত্তর-পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে কোনো পর্বেই শেখ মুজিব ফজলুল হকের অনুসারী ছিলেন না। গোড়া থেকেই তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক শিষ্য ও অনুসারী। ‘নানা-নাতি’র কথিত রসিকতার সম্পর্কের কথা বাদ দিলে ফজলুল হক ও মুজিব বাংলার এ দুই প্রবীণ ও তরুণ নেতার অবস্থান অধিকাংশ সময়ই বিরোধ-বিতণ্ডার ঊর্ধ্বে ছিল না। বিশেষ করে যুক্তফ্রন্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুজিব অনেকবারই পরিষদের ভেতরে ও বাইরে শেরেবাংলার সমালোচনা করেছেন। আর তা অযৌক্তিকও ছিল না। কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে নেতা ও গুরু মানলেও জনমানসের ভাষা পাঠ এবং জনসম্পৃক্তি অর্জনের দক্ষতা ও কৌশল তিনি মনে হয় শেরেবাংলার কাছ থেকেই শিখেছিলেন। তাঁর তরুণ বয়সে মুজিব যখন মুসলিম লীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী আর ফজলুল হক মুসলিম লীগ ছেড়ে ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভা গঠন করেন, সে সময় মুজিবকে হক সাহেবের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলতে নিষেধ করেছিলেন তাঁর বাবা। আর তাঁর মা বলেছিলেন: ‘বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলিও না।’ এলাকার একজন মুরুব্বিও বলেছিলেন, ‘যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব। ‘বিষয়টির উল্লেখ করে মুজিব পরে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘শেরেবাংলা মিছামিছিই “শেরেবাংলা” হন নাই। বাংলার মাটিও তাঁকে ভালোবেসে ফেলেছিল।’
বাংলার ব্যাপক সাধারণ মানুষ— গ্রামের চাষী কিংবা শহরের মজুর ও মধ্যবিত্ত, রাজনৈতিক তত্ত্ব বিচারের ঊর্ধ্বে যেভাবে একদিন ‘হক সাহেব’ বা ‘শেরেবাংলা’কে তাঁদের হূদয়ের সিংহাসনে বসিয়েছিল, পরবর্তীকালে একইভাবে আরেকজনকেও ‘শেখ সাহেব’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে সেই বিশ্বাস ও ভালোবাসার জায়গাটিতে বসিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজতাত্ত্বিকরা বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা বা বিচার করবেন জানি না, তবে ঐতিহাসিক সত্য হলো, বাংলার রাজনীতিতে শেরেবাংলার যদি কোনো সত্যিকার উত্তরসূরি থাকেন, তিনি তাঁর শিষ্য বা নিজের প্রতিষ্ঠিত দলের কেউ নন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কামরুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘শেখ সাহেব জনাব হক সাহেবের মতোই তাঁর কর্মীদের সবার নাম মনে রাখতে পারতেন এবং হক সাহেবের মতোই তাঁর দলের সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারতেন।... শেখ সাহেব ফজলুল হক সাহেবের মতোই সাধারণ বাঙালির তুলনায় দীর্ঘদেহের ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন— সত্যি বলতে তাঁরা দুজনই দক্ষিণ বাংলার লোক এবং অনেক ব্যাপারে তাদের মধ্যে মিল ছিল।’ [বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ, দ্বিতীয় খণ্ড]
৮
ফজলুল হক জন্মেই ছিলেন যেন নেতা হতে। আর এ ব্যাপারে নিজের মোহময় ব্যক্তিত্ব বা নেতৃত্বগুণের ওপর তাঁর যতটা আস্থা ছিল, সংগঠনের আবশ্যকতায় বোধহয় তিনি ততটা বিশ্বাসী ছিলেন না। এখানে সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, ভাসানী ও মুজিবের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য। তাঁর নেতৃত্বে বিভাগপূর্বকালে গঠিত কৃষক-প্রজা পার্টি কিংবা বিভাগোত্তরকালে কৃষক-শ্রমিক পার্টি (১৯৫৩) কোনোটিই দল হিসেবে দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তি বা স্থায়িত্ব পায়নি। দু-চারজন বিশ্বস্ত অনুগামী ছাড়া বাকিরা হয়তো মন্ত্রিত্বের লোভে তাঁর সঙ্গে এসে ভিড়েছেন, আবার সময়-সুযোগ মতো তাঁকে ছেড়ে গেছেন। তাঁর ওপর নির্ভর করে বা তাঁকে ঘিরে দল তৈরি হয়েছে, তিনি দলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। ফলে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার জোরে নির্বাচনী লড়াইয়ে তিনি কেবল নিজ আসনটি ধরে রাখতে পেরেছেন, দলকে জেতাতে পারেননি। যেমন ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রবল জোয়ারের মুখে মুসলিম লীগের ১১৩টি আসনের বিপরীতে কৃষক-প্রজা পার্টি মাত্র তিনটি আসনে জয়ী হয়। তার মধ্যে দুটিই ছিল বরিশাল সদর-দক্ষিণ ও খুলনার বাগেরহাটে ফজলুল হকের নিজ আসন। তিনি বাগেরহাট আসনটি ছেড়ে দেয়ার পর উপনির্বাচনে তা মুসলিম লীগের দখলে চলে যায়।
৯
‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ কথাটা আমাদের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দেশনেতাদের মধ্যে ফজলুল হকের বেলায় যতটা প্রযোজ্য, অন্য কারো ক্ষেত্রে ততটা নয়। সত্যি কথা বলতে, জীবনকালেই তিনি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। ঘুষি মেরে নারকেল ভাঙা, একাই একটা বড় কাঁঠাল বা পঁয়তাল্লিশটি ফজলি আম খাওয়া, বন্ধুর ঠাট্টার মুখে পরীক্ষার কয়েক দিন আগে বিষয় পরিবর্তন করে গণিত নিয়ে পরীক্ষা দেয়া, তাঁর সম্পর্কে প্রচলিত এ ধরনের গল্পগুলো হয়তো অতিকথাই। অন্তত সবগুলোর বাস্তব ভিত্তি বোধহয় নেই। কিন্তু দেশের মানুষ নির্দ্বিধায় তা বিশ্বাস করেছে। ইব্রাহীম খাঁ ও বি ডি হাবিবুল্লাহর রচনার মধ্য দিয়ে এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও সেগুলো স্থান করে নিয়েছে। আমাদের শ্রুতি-সাহিত্যেরও অংশ হয়ে গেছে তা। এভাবে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে একজন মহাপুরুষ হিসেবে এদেশের জনমানসে শেরেবাংলার একটি স্থায়ী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর কিংবদন্তিও তো সবাইকে নিয়ে রচিত হয় না। তার জন্য ব্যক্তিত্বের এক ধরনের বিভা থাকতে হয়। শেরেবাংলার তা ছিল, হয়তো বেশি মাত্রায়ই ছিল।
প্রায় ঊননব্বই বছর বয়সে ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে সংকটাপন্ন অবস্থায় তিনি যখন রোগশয্যায়, তখনই একবার কি দুবার তাঁর মৃত্যুর গুজব রটেছিল। সে সময় আমার বাবা-মাসহ চারপাশের বয়স্কদের মধ্যে যে শোকাকুল প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম, শৈশবস্মৃতির সরণি বেয়ে আমার মনে তা আজো জাগরূক। মৃত্যুর পর তাঁকে দেখার জন্য ও তাঁর জানাজায় অংশ নেয়ার জন্য দলমত নির্বিশেষে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে তখন পর্যন্ত তা একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। আউটার স্টেডিয়ামে জানাজা শেষে গভর্নর আজম খান সেদিন শোকার্ত মানুষের সঙ্গে পায়ে হেঁটে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে মরহুমের সমাধিস্থল পর্যন্ত এসেছিলেন।





