তোমরা জন্মেছ উজ্জ্বল আলোকে প্লাবনের মধ্যে, আর আমাদের জন্ম গভীর অন্ধকারে, অন্ধকারেই হয়েছে আমাদের যাত্রা শুরু। অন্ধকারকে ভেদ করে এসে উত্তীর্ণ হয়েছি আমরা আলোকের তীরে। আলো হয়তো সেজন্য আমাদের কাছে বেশি মূল্যবান। এটুকু তফাৎ রয়েছে তোমাদের আর আমাদের যুগে। সে যুগের সেই আলোকের অভিযানে যিনি আমাদের অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের কবি-দা। মৃত্যুর বছর কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের লক্ষ্য করে শামসুন নাহার মাহমুদ তার জীবনের বিগত দিনকে স্মরণ করেই কথাগুলো বলেছিলেন।
আত্ম অনুসন্ধানী হতে আমরা ভুলে গেছি। আসলে কখন জানি না আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্লেষণ, শক্তি, সাহস, সততা সবই। হারাতে হারাতে নিঃস্ব হতে চলেছি। সেজন্য জাতীয় জীবনের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোথায় যেন একটা রিক্ততা আর শূন্যতা আঁকড়ে ধরে আছে আমাদের। কেউ কেউ মনে করতে পারেন ঘুরে ঘুরে পুরনো গৌরবকে খুঁড়ে খুঁড়ে বের করা এক ধরনের বাতিক। ঘুরেফিরে আমরা আনি অতীত গৌরবের কথা। হ্যাঁ, পুনরাবৃত্তির দরকার, অত্যন্ত বেশি দরকার আজ, বিশেষ করে ইতিহাসের কথা এবং তা আমাদের জাতীয় জীবনের প্রয়োজনেই। কেননা তা না হলে আমরা জানতে পারছি না অতীতের অনেক কিছু। দীর্ঘদিন ধরে বর্জন করা হচ্ছে অতীত ইতিহাসকে। বিগত সরকারের পাঠ্যসূচিতে অকারণেই এ বর্জন চলে আসছে। তাই ইতিহাসবিমুখতা এ দেশে এ জাতির জন্য আর বেশিদিন চলতে দেয়া যাবে না।
উপমহাদেশে নারী শিক্ষা, নারী আন্দোলন নিয়ে অতীতে যেসব মহিলা আন্দোলন করেছেন তাদের মধ্যে বেগম রোকেয়া এবং পরবর্তীকালে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন সন্দেহ নেই। সেকালের একজন নামকরা লেখিকা, নগেন্দ্রবালা মুস্তাফী ১৯৯৫ সালে লিখেছেন বাঙালি মহিলাদের অবস্থা ‘পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির’ মতো। তিনি বলেন, একেবারে বাল্যকাল থেকেই কঠোর পর্দাপ্রথার নিয়ন্ত্রণে মানুষ বলেই বঙ্গ মহিলারা লেখাপড়া শিখতে পারেন না এবং তার ফলে তাদের মানসিক বৃত্তিসমূহের বিকাশও ঘটেনি। (উৎস: সংকোচের বিহ্বলতা; আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গ রমণীর প্রতিক্রিয়া, পৃষ্ঠা ৫২ গোলাম মুর্শিদ)। কথাটা সত্যি বটে, কিন্তু শামসুন নাহার মাহমুদের ক্ষেত্রে কথাটা পুরোপুরি মেনে নেয়া যায় না। ...ব্রিটিশ শাসনের কৌশলে চাপিয়ে দেয়া পর্দাপথা আর কুসংস্কার তাকে পদে পদে উচ্চশিক্ষার পথে বাধা দিয়ে অন্তঃপুরে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এসব বাধার মূলোৎপাটন করে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং সমাজে পিঞ্জরাবদ্ধ মেয়েদের দ্বার ভেঙে বের করে আনার জন্য সংগ্রাম করেছেন।
আমাদের সমাজ জীবনের এক যুগসন্ধিক্ষণে বেগম শামসুন নাহার মাহমুদের আবির্ভাব। সে আবির্ভাব ছিল তার একক আবির্ভাব। সেদিন সমাজে তার সাথি ছিল না, তার সাধনার অনুকূল পরিবেশ ছিল না। বরং ছিল সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু সব প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শামসুন নাহার মাহমুদ নিজের তথা এ দেশের নারীসমাজের অগ্রগতির পথ রচনা করে গেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার অবদান ছিল অশেষ কৃতিত্বের। দেশ বিভাগের আগে তিনি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থেকে কাজ করে গেছেন। এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল ঘনিষ্ঠ।
আজকের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে সমাজজীবনে নারী শিক্ষা, নারীর অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন অনেকখানি অগ্রগামী। কিন্তু সামগ্রিক রূপে অশিক্ষা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানও মেয়েদের জীবনকে করে তুলেছে অস্থির, অসুস্থ। আমাদের এ ঘুণেধরা সমাজে শিক্ষার সংস্কার প্রচেষ্টায় আজ মেয়েদের উদ্দাম ও শক্তির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। গতানুগতিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার।
বেগম শামসুন নাহার মাহমুদের মতো আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে বাংলাদেশের নারীসমাজ আজ তার আরদ্ধ কাজ সম্পন্ন করতে পারলে তা বস্তুত জাতীয় অগ্রগতিকেই কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
[লেখা তিনটি ঈষৎ সংক্ষেপিত এবং ‘বেগম শামসুননাহার মাহমুদ স্মারকগ্রন্থ’ থেকে সংকলিত]










