আমার দাদিই একমাত্র মুসলিম মহিলা, যিনি প্রথম মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এবং ন্যাশনাল অসেম্বলির মেম্বার ছিলেন। আমার দাদা-দাদির পরিবারে বাঙালি দেশপ্রেমের যে সংস্কৃতি, যে ভাবনা তা বরাবরই উপস্থিত ছিল। সেই পরিবেশেরই একজন ছিলেন আমার দাদি, শামসুন নাহার মাহমুদ। তিনি শুধু রাজনীতির মানুষ ছিলেন না; তার চিন্তার পরিসর ছিল পরিবার, সমাজ, আইন—সবকিছুকে ঘিরে।

আমাদের দেশে ব্রিটিশ আইন এখনো বিদ্যমান। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম আইনও ব্রিটিশ আইনকে অতিক্রম করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো এখানেও মুসলিম পুরুষের একাধিক বিয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে আইনের ক্ষেত্রে এর কিছুটা পরিবর্তন আছে—একাধিক বিয়ে অনুমোদনযোগ্য হলেও প্রথম স্ত্রীর লিখিত অনুমতির বিষয়টি রয়েছে। এ আইনের রচয়িতা ও পাকিস্তান পার্লামেন্টের উপস্থাপিকা ছিলেন শামসুন নাহার মাহমুদ। আইনকে তিনি কেবল কাগজের বিষয় হিসেবে দেখতেন না; মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এর প্রভাব নিয়েও ভাবতেন।

তার আরেকটি ভাবনার জায়গা ছিল উত্তরাধিকার আইন। প্রচলিত মুসলিম আইনে ভাইবোনের সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে ভাই দ্বিগুণ এবং বোন অর্ধেক অংশ পায়। শামসুন নাহার মাহমুদ চেয়েছিলেন, পিতা-মাতার সম্পত্তিতে ভাই ও বোন যেন সমান অংশ পায়। এ পরিবর্তন আনার জন্যও তিনি একটি বিল নিয়ে কাজ করছিলেন। কিন্তু সেটি সম্পন্ন করে যাওয়ার সময় তিনি পাননি।

আমাদের পরিবারে রাজনীতি ও চিকিৎসার পাশাপাশি খেলাধুলারও একটি চর্চা ছিল। আমার দাদা ছিলেন সার্জন, আর দাদি রাজনীতিবিদ। আমার বাবা স্বাধীনতার আগেই পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সদস্য হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলেছেন। তবে বাঙালি হওয়ার কারণে তাকে বৈষম্যের শিকারও হতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ওয়ারী ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্রিকেটের পাশাপাশি টেনিস ও টেবিল টেনিসেও তার সাফল্য ছিল।

3

শামসুন নাহারের বড় ছেলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মামুন মাহমুদ (পেছনে); বসা (বাঁ থেকে) ডা. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী, শামসুন নাহার, হবীবুল্লাহ্ বাহার, সামনে শামসুন নাহারের ছোট ছেলে মঈনু মাহমুদ ও হবীবুল্লাহ বাহারের কন্যা সেলিনা বাহার

দাদির ভাই হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীও খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই হয়তো ভাইয়ের কিছু প্রতিচ্ছবি তিনি তার কনিষ্ঠ পুত্রের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন। বাবার খেলাধুলার প্রতি আগ্রহকে তিনি সক্রিয়ভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। আমাদের পরিবারে খেলাধুলা শুধু বিনোদন ছিল না; এটি ছিল মানসিক উৎকর্ষ, দলগত চেতনা ও একধরনের জাতীয় ঐক্যের জায়গা।

একদিকে সংসদে দাঁড়িয়ে আইন নিয়ে কাজ করা একজন রাজনীতিবিদ, অন্যদিকে পরিবারের মধ্যে সন্তানের স্বপ্নকে উৎসাহ দেয়া একজন মা—এ দুই পরিচয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। তার কিছু কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল, কিছু কাজ অসমাপ্ত থেকে গিয়েছিল। কিন্তু সেসব অসমাপ্ত কাজও তার চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সামনে রেখে যায়—সমাজের প্রচলিত কাঠামোর ভেতর থেকেই তাকে বদলে দেয়ার চেষ্টা।

রিয়াদ মাহমুদ: শামসুন নাহার মাহমুদের নাতি

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ন্যাশনাল পলিমার গ্রুপ