চলচ্চিত্র কেবল গল্পের ক্যানভাস নয়; এটি আমাদের দেখার চোখকেও বদলে দেয়। লরা মুলভির ‘male gaze’ তত্ত্ব সে কথাই বলে। আর মেকআপ, বিশেষ করে লিপস্টিক সিনেমায় প্রায়ই দর্শকের দৃষ্টি এবং গল্পের দিকনির্দেশকে প্রভাবিত করেছে। কখনো এটি কেবল সৌন্দর্যের উপাদান, কখনো চরিত্রের আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, কখনো ক্ষমতার প্রতীক, আবার কখনো সামাজিক বার্তা। ছোট্ট এ টিউবের মধ্যে লুকানো ক্ষমতা কখনো চলচ্চিত্রে অস্ত্রের মতো কাজ করেছে, কখনো ভেতরের জটিলতা প্রকাশ করেছে। সিনেমার ইতিহাসে অনেক স্মরণীয় দৃশ্যই বন্দি হয়েছে লিপস্টিকের রঙে, যেখানে একটি নিখুঁত রঙের ছোঁয়া চরিত্র, গল্প ও দর্শকের মনস্তত্ত্বকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে।

‘জেন্টেলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস’ সিনেমায় মেরিলিন মনরো
মেরিলিন মনরো—‘জেন্টেলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস’ (১৯৫৩)
লরেলি লি চরিত্রে মেরিলিন মনরো এ সিনেমায় লিপস্টিক লাগানোকে এক জাদুময় মুহূর্তে পরিণত করেছেন। এ ছোট্ট অভ্যাস তার ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করেছে এবং দেখিয়েছে কীভাবে একজন নারী সচেতনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে চারপাশের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
পর্দার বাইরে দৃশ্যটি সামাজিক প্রভাবও ফেলেছে। লাল লিপস্টিক গ্ল্যামারের প্রতীক হয়ে উঠেছে, ফ্যাশনকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং দেখিয়েছে যে নারীর প্রসাধন কেবল একটি শখ নয়, বরং শক্তির এক মাধ্যমও হতে পারে। মধ্য-শতাব্দীর পপ সংস্কৃতিতে নারীত্বকে একদিকে পূজার যোগ্য ও আকর্ষণীয় হিসেবে দেখানো হতো, অন্যদিকে বাজারজাত, বাণিজ্যিক এবং বস্তুগতভাবে ব্যবহার করা হতো। মেরিলিন মনরোর লিপস্টিক দৃশ্যটি সে যুগের নারীত্বের এ দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছে।

সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’ ছবির পোস্টার
আরতি—‘মহানগর’ (সত্যজিৎ রায়, ১৯৬৩)
সত্যজিৎ রায়ের Mahanagar-এ আরতি (মাধবী মুখোপাধ্যায়) তার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সহকর্মী এডিথের কাছ থেকে একটি লিপস্টিক পান এবং অফিসে সেটি ব্যবহার করা শুরু করেন। যখন তার রক্ষণশীল স্বামী লিপস্টিকটি দেখেন, তিনি রেগে যান, লিপস্টিকটি ছুড়ে ফেলে দেন, এর মধ্য দিয়েই এটি একটি পারিবারিক দ্বন্দ্বের প্রতীক হয়ে ওঠে।
লিপস্টিক এখানে শুধু সৌন্দর্যের উপাদান নয়; এটি আরতির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং ভারতীয় মধ্যবিত্ত নারীর জীবনে আধুনিকতা প্রবেশের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। সমালোচকরা বারবার এ দৃশ্যকে উল্লেখ করেছেন লিঙ্গ, সামাজিক শ্রেণী এবং আধুনিকতার সংমিশ্রণ বোঝাতে।

ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফ্যানি’স-এ অড্রে হেপবার্ন
অড্রে হেপবার্ন—‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানি’স’ (১৯৬১)
হলি গোলাইটলির চরিত্রে অড্রি হেপবার্ন নিউইয়র্কের ব্যস্ততম ট্যাক্সির পেছনের সিটে বসে আছেন, এক হাতে ছোট কমপ্যাক্ট আয়না, অন্য হাতে লিপস্টিক। শহরের কোলাহলে এগোতে এগোতে তিনি ঠোঁটে লিপস্টিক দিচ্ছেন, সিনেমার ক্ষুদ্র মুহূর্তটির মধ্য দিয়ে পুরো চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলে।
সিনেমায় হলি কেবল একজন তরুণী নন; তিনি এমন একজন নারী, যিনি নিজেকে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়াটিকে জীবনের কৌশল বানিয়েছেন। যাত্রার মাঝেও লিপস্টিক লাগানো তার অভ্যাস, যা তার আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্বতাকে বারবার প্রমাণ করে। শহরের অস্থিরতা এবং ঝঞ্ঝাটের মাঝেও তার মুহূর্তটি একদিকে সৌন্দর্য, অন্যদিকে ছদ্মবেশ হসেও প্রকাশিত করেছে, যা দর্শককে প্রভাবিত করেছে বটে। এ দৃশ্য কমপ্যাক্ট আয়না এবং লিপস্টিকের সংমিশ্রণে ১৯৬০-এর দশকের নগর নারীত্বের নিখুঁত প্রতীক হিসেবে থেকে গেছে।
ফে ডানাওয়ে—‘চায়নাটাউন’ (১৯৭৪)
Chinatown-সিনেমায় লিপস্টিকের ব্যবহারকে দেখানো হয়েছে নিখুঁত, নিয়ন্ত্রিত, সুন্দরের প্রতীক হিসেবে, একই সঙ্গে ছবির নৈতিক অবক্ষয়কেও ফুটিয়ে তুলেছে। সমালোচকরা বলেছেন, ইভলিন চরিত্রে ফে ডানাওয়ে ‘র মেকআপ গোপনীয়তা এবং অভিব্যক্তি বনাম বাস্তবতার দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। তিনি একদিকে দীপ্তিমান, অন্যদিকে ভঙ্গুর; এ দ্ব্যর্থতা পুরো চলচ্চিত্রের রহস্যময় আবহকে আরো গভীর করে। লিপস্টিক ডানাওয়েকে এ চলচ্চিত্রে এক জটিল নায়িকারূপে পরিচিত করিয়েছে এবং দর্শকদের বুঝিয়েছে লিপস্টিকের এ রঙের নিচে লুকানো আছে অপ্রকাশ্য সত্য।
এলিজাবেথ টেইলর—‘বাটারফিল্ড ৮,’(১৯৬০)
এ সিনেমায় গ্লোরিয়া ওয়ান্ড্রাসের চরিত্রে এলিজাবেথ টেইলর এক অপরিচিত ব্যক্তির বিছানায় ঘুম থেকে ওঠার পর একটি লিপস্টিকের টিউব তুলে নিয়ে রাগে বাথরুমের আয়নায় লাল অক্ষরে লিখে দেন—‘NO SALE’। এ ছোট্ট দৃশ্যটি লিপস্টিককে এক ধরনের ঘোষণা বা ম্যানিফেস্টোতে রূপান্তর করেছে। এখানে এলিজাবেথ লিপস্টিক ব্যবহার করে শুধু সৌন্দর্য প্রদর্শন করেননি; বরং এটি তার নিজের মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত যেখানে লিপস্টিককে নারীকে আকর্ষণীয় দেখানোর বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, সেখানে এলিজাবেথ ছোট্ট এ দৃশ্যে দেখিয়েছেন যে সে ‘বিক্রীত’ নয়, অর্থাৎ সে কোনো পুরুষ বা সমাজের নিয়মের অধীনে নিজেকে আটকে ফেলতে চায় না, বরং আত্মনির্ভরশীলতাই তার শক্তি। সমালোচক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা এটিকে চলচ্চিত্রের একটি শক্তিশালী ভিজুয়াল স্টেটমেন্ট হিসেবে দেখেছেন, যা তখনকার সময়ের যৌনতা, নারীর স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
চলচ্চিত্রে লিপস্টিক শুধু প্রসাধনী নয়, এটি নারীর সংবেদনশীলতা, সামাজিক পরিচয় ও ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ট্যাক্সিতে হোক, আয়নার ওপর অস্থায়ী রেখা হোক বা অফিসের চেয়ারে বসে হোক, ছোট্ট এ সিলিন্ড্রিক বস্তু চরিত্রের অন্তর্নিহিত ভাব, দর্শকের উদ্বেগ এবং সমাজের মনস্তত্ত্বকে একক, অমোঘ চিত্রে ধরে রেখেছে।
আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










