সাজসজ্জার দুনিয়ায় কিছু জিনিস কখনই পুরনো হয় না। এর মধ্যে একটি হলো লাল লিপস্টিক। আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নুড, পিঙ্ক বা মভের মতো হালকা রঙগুলো বেশ ‘ট্রেন্ডি’ হলেও লালের আবেদন চিরন্তন। মুহূর্তেই চেহারা প্রাণবন্ত করা কিংবা আত্মবিশ্বাস যোগ করার ক্ষমতা লালকে অন্যসব রঙ থেকে আলাদা করে তোলে। প্রাচীনকালে লিপস্টিক তৈরি ও ব্যবহারের সূচনা থেকেই উজ্জ্বল লাল ঠোঁট মানেই ছিল সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক। হাতে তৈরি ঠোঁট রঞ্জক থেকে লিপস্টিক আজ বিউটি ইন্ডাস্ট্রির একটি বিলিয়ন ডলার বাজারে পরিণত হয়েছে।
খ্যাতনামা মেকআপশিল্পী ও তারকারের মতে, বিশ্বের সর্বকালের পাঁচটি সবচেয়ে আইকনিক লিপস্টিক শেডের মধ্যে চারটিই লাল। এর মধ্যে প্রথমেই আসে জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ম্যাকের খুবই জনপ্রিয় শেড ‘রুবি উ’র নাম। ২০০০-এর দশকের কথা, রুবি উ নামের লাল ওষ্ঠরঞ্জনীটির জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। এখনো তারকাদের মেকআপশিল্পীরা এবং ফ্যাশনসচেতন অনেক তরুণী এটিকে তাদের ‘প্রিয় লাল রঙ’ হিসেবে ব্যবহার করেন। শেডটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এতে সামান্য নীল আন্ডারটোন থাকার কারণে যেকোনো ত্বকের সঙ্গে সুন্দরভাবে মানিয়ে যায় এবং মুখকে উজ্জ্বল দেখায়। অ্যামাজনে বর্তমানে সর্বাধিক বিক্রীত লাল লিপস্টিক ম্যাকের রুবি উ। বিশ্ববাজারে লিপস্টিকটির দাম ২৫ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার টাকা)।
আরেকটি জনপ্রিয় লাল লিপস্টিক ও সবচেয়ে বিকানো শেড হলো রুজ ডিওর ৯৯৯। এটি উজ্জ্বল ও মানসম্পন্ন বা বলা যায় ক্ল্যাসিক লাল রঙের একটি লিপস্টিক, যা ফ্যাশন আইকনদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। ক্রিস্টিয়ান ডিওর ফ্যাশন হাউজ ‘নিখুঁত লাল’ রঙ তৈরির চেষ্টা করতে গিয়ে আধুনিক এ সংস্করণ তৈরি করে। ১৯৫০-এর দশকের প্রথম দুটি ডিওর লিপস্টিক ৯ ও ৯৯ থেকে নামটি এসেছে। উভয় শেডের সেরা বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে তৈরি করা হয়েছে রুজ ডিওর ৯৯৯, যা রুচিসম্পন্ন ও দুর্দান্ত লাল রঙ হিসেবে পরিচিত। অ্যামাজনে পণ্যটির মূল্য ২৮ ডলার (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩ হাজার টাকার বেশি)।
বিশ্বের সবচেয়ে আইকনিক লিপস্টিকের তালিকায় তিন নম্বরে আছে শ্যানেলের বিখ্যাত ও সর্বাধিক বিক্রীত লাল লিপস্টিক ‘পাইরেট’। এর রঙ বেশ ঘন ও গাঢ় লাল, যা কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার কোকো শ্যানেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এ লিপস্টিকে একটি শক্তিশালী নীল আভা রয়েছে, যা রঙটিকে আরো সমৃদ্ধ এবং মার্জিত করে তোলে। অনেকের মতে, লিপস্টিকটির অতিরিক্ত সুবিধা হলো এটি দাঁতকে আরো সাদা দেখায়। শ্যানেলের ওয়েবসাইটে পণ্যটির দাম ৫০ ডলার, (বাংলাদেশী মুদ্রায় ৬ হাজার টাকার বেশি)।
এছাড়া পুরনো নামিদামি ও ক্ল্যাসিক লিপস্টিক ব্র্যান্ডগুলোর তালিকায় ‘আইকনিক’ হিসেবে নাম করে নিয়েছে ২০১৭ সালে বাজারে আসা ফেন্টি বিউটি। বার্বাডিয়ান গায়িকা রিহানার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় কোম্পানিটি। ব্র্যান্ডটির স্টানা লিপ পেইন্টের ‘আনসেনসরড’ লাল শেডটি সব রঙের ত্বকে মানিয়ে যায় বলে দাবি করা হয় এবং এর জনপ্রিয়তা ও বিক্রির রেকর্ডও তাই প্রমাণ করে। ফেন্টি বিউটির ওয়েবসাইটে লিপস্টিকটির দাম ২৯ ডলার (৩ হাজার ৫০০ টাকার বেশি)।
বাজার গবেষণা সংস্থা গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী লিপস্টিক বাজারের আকার ২০২৪ সালে ১৭ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭৪৯ কোটি ডলারের পৌঁছেছে। আগামী পাঁচ বছরে বাজারটি ২ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলারে পৌঁছবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এখানে ম্যাকের রুবি উ ও ডিওর ৯৯৯-এর মতো বিখ্যাত লাল শেডগুলো খুচরা ও পাইকারি উভয় বাজারে বিক্রির শীর্ষে আছে। আগামী এক দশকে বাজারটি প্রতি বছর প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এছাড়া ক্রেতারা এখন ব্র্যান্ড ও রঙ নির্বাচনের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, সুস্থতা এবং পরিবেশের প্রতিও বেশি যত্নশীল। ফলে লিপস্টিক থেকে শুরু করে রূপসজ্জার সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে জৈব ও রাসায়নিকমুক্ত লিপস্টিকের চাহিদা বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী, ই-কমার্সের উত্থানের কারণে সৌন্দর্য শিল্প, বিশেষ করে লিপস্টিক খাত বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে ক্রেতারা সহজেই বিভিন্ন রঙ ও ব্র্যান্ডের লিপস্টিক ঘাঁটতে ও কিনতে পারছেন। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন রিভিউ এবং তরুণ বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাব প্রথাগত এবং নতুন পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল মাধ্যমের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলো গ্লোবাল মার্কেটে প্রবেশ করতে পারছে, যেমন ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে ম্যাক কসমেটিকস ও মেবলিন গ্রাহকদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াচ্ছে। এর মধ্যে আছে ভার্চুয়াল ট্রাই-অন ফিচার এবং গ্রাহকের পছন্দ, প্রোফাইল বা ব্যবহার অনুযায়ী বিশেষভাবে পরামর্শ দেয়া।
লিপস্টিকের বাজারে বরাবরই নেতৃত্ব দিচ্ছে ম্যাক, ক্রিস্টিয়ান ডিওর, মেবলিন ও ল’রিয়েল। এর মধ্যে শীর্ষে থাকা ম্যাকের লিপস্টিকেরই ২০০টিরও বেশি শেড রয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটি তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে কাজ করে সীমিত সংস্করণের (লিমিটেড এডিশন) কালেকশনও তৈরি করে। অন্যদিকে ডিওরের লিপস্টিককে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে বাজারজাত করা হয়, এর সঙ্গে থাকে ফ্যাশন, উদ্ভাবন ও সৌন্দর্যের সমন্বয়। ডিওর মূলত দামি প্যাকেজিং এবং উৎকৃষ্ট গুণ-মানের টেক্সচারের জন্য পরিচিত। এছাড়া মেবলিন ব্র্যান্ডটি সাশ্রয়ী দাম, সহজলভ্যতা এবং চলতি ফ্যাশন বা ট্রেন্ডের সঙ্গে মানিয়ে চলার ওপর বেশি মনোযোগ দেয়।
ফরাসি ব্র্যান্ড ল’রিয়েল প্যারিসের ৫০টিরও বেশি লিপ প্রডাক্ট শেড রয়েছে, যা সব বয়স, ত্বকের রঙ ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় তৈরি।
বাজারে রঙের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি স্টিক, ক্রিম, তরল, পেনসিল, পাউডার এবং শিমারসহ নানা ধরনের লিপস্টিক রয়েছে। এর মধ্য ‘স্টিক’ লিপস্টিক এখনো বাজারে সবচেয়ে পরিচিত এবং জনপ্রিয় পণ্য। গত বছর ৪০ লাখ ডলার বিক্রি নিয়ে লিপস্টিক বাজারে শীর্ষে ছিল বিভাগটি। ২০৩৪ সালের মধ্যে স্টিক সেগমেন্টটি ৬৬০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে গ্লোবাল মার্কেট ইনসাইটস।
মাইশা মারজানা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা










