‘মাটির নিচে বুড়ি, নায় না ধোয় না সুন্দরী’ বাঙালির ধাঁধার উত্তর কি বলে দেয়া লাগবে? তাহলে বলি, রসুন। নিশ্চয়ই এর আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না। কেবল বুদ্ধির খেলা নয়, রসুন নিয়ে পৌরাণিক গল্পগাছাও কম নেই। রসুনকে কেন্দ্র করে সে আলাপে যাওয়ার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, পৌরাণিক গল্প শুধু বিশ্বাসের মোড়কে কোনো কিছু দূরবর্তী করে তোলা বা অলীক ক্ষমতারোপ করে না, বরং তার বহুল ব্যবহার আর কার্যক্ষমতাকেও স্বীকার করে নেয়। কে না জানে, পুরাণ কোনো আদি-ভৌতিক বিশ্বাসে ভরা কাহিনী গাথা নয়, বরং একটি জাতির অতীত পরিচয় আর বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চারও পরিচয় বহন করে।
মানুষের সাংস্কৃতিক ও পৌরাণিক বিশ্বাস আজকের দিনেও সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে এ তিনকে ঘিরে। সে সুবাদে মিসরের ফারাও বংশের বিখ্যাত তুতেন খামেনের সমাধিতে কেন আরো অনেক কিছুর সঙ্গে মাটির তৈরি রসুন পাওয়া গিয়েছিল? কিংবা গ্রামে এখনো বিয়েতে ‘লজিমা’ (কনের সাজগোছের প্রশাসনী-পোশাক) বা কনের সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো খাবারের পাশে এক কোয়া রসুনও কেন দেয়া হয়, তা একবার খতিয়ে দেখেছি কি? খাবারে বা ভেষজ ওষুধ হিসেবে রসুনের ব্যবহার তো সেই কবে থেকেই চলে আসছে। সেটা অঞ্চল ভেদে আর আলাদা করা যায় না। রসুন নিয়ে প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যের কত পৌরাণিক গাথা, ভৌতিক কিংবা ঐশ্বরিক বিশ্বাস চালু আছে, তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। সে আলাপ শুরু করা যেতে পারে এর উৎপত্তি ও নাম থেকেই।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, রসুনের উৎপত্তিস্থল মধ্য-এশিয়া। তাও প্রায় সাত হাজার বছর আগে! বিশেষ করে আজকের চীন, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানের কাছাকাছি তিয়েন শান পর্বতমালা অঞ্চলে। ফলে পৌরাণিক কাহিনী ও বিশ্বাস পর্বতের রসুনের ব্যবহার আমরা দেখতে পাব। তবে এর আসল ব্যাপারটা লুকিয়ে আছে নামের মধ্যেই।
রসুনের বৈজ্ঞানিক নাম ‘অ্যালিয়াম স্যাটিভাম’ তৈরি হয়েছে সেল্টিক শব্দ অ্যালিয়াম ও লাতিন শব্দ স্যাটিভাম থেকে। অ্যালিয়াম মানের অর্থ ‘জ্বলন্ত’ বা ‘হুংকার’, আর স্যাটিভাম মানে ‘রোপণ’ বা ‘চাষ’। তাতে দাঁড়ায় আগুনে চাষবাস। একটু পুরাণ সচেতন মানুষ মাত্র বোঝেন, জ্বলন্ত বা আগুনের ভেতর লুকিয়ে আছে হাজারও পৌরাণিক গল্প। অ্যাংলো-স্যাক্সন ‘গার-লিক’ থেকে আসা ইংরেজি শব্দে আদি মানে করা যায় ‘বর্শা উদ্ভিদ’। এটা হয়তো তার পাতার তীক্ষ্ণ দাঁড়িয়ে থাকার শাব্দিক প্রকাশ। এ নিয়ে পৌরাণিক গল্পের অভাবও নেই।
বাংলায় উন (কম) রসের অর্থে রসুন বোঝায় মনে করা হলেও হিন্দু পুরাণে অসুরের শরীর থেকে রসুনের জন্মের কাহিনী মনে রাখলে, ‘অসুর’ শব্দ ধ্বনি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে ‘রসুন’-এর রূপান্তর হয়েছে কিনা, তাও চিন্তার বিষয়। একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, এত ঔষধি গুণ থাকার পরও আমরা কেন রসুনকে কম-বেশি অশুভবাহী বা অশুভ তাড়িনি মনে করি! সে উত্তর খুঁজতে হবে পুরাণের ভেতরেই।
প্রচলিত এক কিংবদন্তি অনুসারে, হিন্দু ধর্মের ত্রিমূর্তির একজন বিষ্ণু সাগর মন্থনের (সমুদ্রকে বাম-ডানে নাড়ানো) সময় তার ‘মোহিনী’ (অপূর্ব সুন্দরী নারী) রূপ ধারণ করে দেবতাদের মধ্যে অমৃত বিতরণ করছিলেন। এ সুযোগে দেবতাদের সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন রাহু ও কেতু দুই অসুর। খেয়াল না করে তাদেরও অমৃত ভোগ দিয়ে ফেলেন বিষ্ণু। পরে খেয়াল হতেই এক কোপে রাহু ও কেতুর মাথা কেটে ফেলেন তিনি। মুণ্ডচ্ছেদের ফলে তাদের গলায় আটকে থাকা অমৃত মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় পেঁয়াজ ও রসুন। অসুরের গলধ অমৃত থেকে জন্ম বলে এগুলো খেলে মানবদেহে আসুরিক শক্তির আবির্ভাব হতে পারে। সে কারণে এগুলো আহার থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয় মনে করে সনাতন হিন্দু ধর্মমত। ভক্তি ও অহিংসার মাধ্যমে আত্মিক মুক্তি লাভ করতে চাওয়া বৈষ্ণব মতও তাই বলে।
রসুন খাওয়া নিয়ে বৈষ্ণব মতাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত আছে আরেক পৌরাণিক গল্প। স্ত্রী গর্ভবতী হওয়া উপলক্ষে এক ঋষি গোমেধ (গাভীকে কেটে আগুনে উৎসর্গ) যজ্ঞের আয়োজন করেন। এ সময় গরুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছে হয় তার স্ত্রীর। লোভ সংবরণ করতে না পরে তিনি মাংসের স্তূপ থেকে এক খণ্ড লুকিয়ে নিজের কাছে রাখেন পরে খাবেন বলে। যজ্ঞ শেষে মন্ত্রবলে ওই মাংসের স্তূপ থেকে আবার একটি বাছুর জন্ম দেন ঋষি। কিন্তু তার শরীরে এক খণ্ড মাংস কম পড়ায় দিব্যদৃষ্টিতে তিনি দেখেন এর কারণ কী। বিষয়টি বুঝতে পেরে দূরে মাঠের মধ্যে মাংস খণ্ডটি ছুড়ে ফেলেন তার স্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রের প্রভাবে ওই মাংস পিণ্ডেও প্রাণসঞ্চার হয়। পরে সে মাংস থেকে জন্ম হয় পেঁয়াজ আর হাড় থেকে হয় রসুনের। যেহেতু এ দুটি সবজি প্রাণীদেহ থেকে উৎপন্ন, তাই পেঁয়াজ-রসুনকে আমিষ হিসেবেই গণ্য করে বৈষ্ণবরা।
প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আমিষ হচ্ছে রাজসিক খাবার, যা মানুষের মনে ক্রোধ, ঈর্ষা, অহংকার, উত্তেজনা, জাগতিক সুখভোগের ইচ্ছা বাড়িয়ে তোলে। তাই মনের আধ্যাত্মিক উন্নতি চাইলে এ ধরনের আহার উচিত নয় বলে মনে কর বৈষ্ণবরা। একমত চালু আছে প্রাচীন ভারতীয় ধর্মমতাবলম্বী জৈনদের মধ্যেও। তারাও পেঁয়াজ ও রসুনকে আমিষ হিসেবেই বিবেচনা করে। অহিংসা, আত্মসংযম ও সব জীবের প্রতি দয়া এ ধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অহিংসা নীতি একইভাবে উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই মূলজ উদ্ভিদ না খাওয়া জৈনদের মেনে চলা কঠোর অনুশাসনের মধ্যে পড়ে। তারাও পেঁয়াজ-রসুন এড়িয়ে চলার কথা বলে।

প্রাচীন মিসরীয় চিত্রে রসুন ছবি: মিডিয়াম
‘মনু সংহিতা’য় বলা হচ্ছে, পেঁয়াজ ও রসুন যেহেতু মাটির নিচে জন্মায়, যা অশুদ্ধ, তাই পুনর্জাত মানুষের এগুলো খাদ্য হিসেবে গ্রহণে মানা করেন মনু। আয়ুর্বেদে প্রকৃতির তিনটি গুণের ভিত্তিতে খাদ্যকে ভাগ করা হয়েছে, তার মধ্যে পেঁয়াজ-রসুন ‘তামসিক’ (অন্ধকার বা অজ্ঞানতা) হিসেবে গোত্রভুক্ত, যা মনমানসিকতার অজ্ঞাত পরিবর্তন ঘটায়। পেঁয়াজ-রসুন যে শারীরিক উত্তেজনা বড়ায়, সেটা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও প্রমাণ করে। আশ্চর্য দিক হলো এ সবজির একটা সাম্প্রদায়িক ব্যবহারও আছে সমাজে। পেঁয়াজ খাওয়া মুসলিমদের মাথা গরম এমন কথা দেশভাগের পূর্বাপর বাংলার দুই সীমানায় ব্যবহার হয়েছে।
ঐতিহাসিক সূত্র বলেছে, মধ্যযুগে আফগান ও মোগলদের ভারতে আসার পর উপমহাদেশে পেঁয়াজ ও রসুনের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। তবে সে সময় কিছু হিন্দু সম্প্রদায় এ খাদ্যগুলোকে ‘বিদেশী’ বা ‘অশুদ্ধ’ মনে করে বর্জনও করেছিলেন। এটা ঠিক সরাসরি পেঁয়াজ-রসুন খাওয়া নিয়ে হিন্দু-মুসলিম কখনো বিবাদে জড়ায়নি, তবে এ খাদ্যাভ্যাসগুলো সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক পরিচায়ক হিসেবে কাজ করেছে, করছে।
হিন্দু বা মুসলিম পুরাণ নয়, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে রসুনের ভূমিকা নিয়ে নানা গল্পকাহিনীর খোঁজ পাওয়া। এর কোনো কোনোটি সে দেশের ইতিহাসেরও অংশ। হিন্দু ও মুসলিম কিংবদন্তিতে রসুনকে অশুভ প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও এশিয়া-আফ্রিকার সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসরে রসুনকে অত্যন্ত পবিত্র মনে করা হতো। প্রাচীন মিসরীয় পুরাণে দুআট (Duat) নামে পাতাল বা মৃতদের জগতের কথা জানা যায়। এর অধিকর্তা ছিলেন সোকার (Sokar)। তিনি ছিলেন নেক্রোপলিস বা মেমফিস অঞ্চলের সমাধিক্ষেত্রের দেবতা। তার নির্দেশেই মৃতদের রক্ষা ও পুনর্জন্মের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। প্রাচীন মিসরীয় লিপি ও চিত্রে একটি বাজপাখির মাথাযুক্ত মানুষের মূর্তি দেখা যায়, সেটি তারই সাধারণ রূপ। এ দেবতার পূজায় লাগত রসুন।
বিখ্যাত ফারাও তুতেন খামেনের সমাধিতে মাটির তৈরি রসুনের প্রতিকৃতি পাওয়া এ ইঙ্গিত দেয় যে তারা পরকালেও রসুনের গুরুত্ব বা পবিত্রতায় বিশ্বাস করত। সে না হয় পুরাণের কাহিনী গেল। শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য পিরামিড নির্মাণকারী শ্রমিকদের রসুন খাওয়াতেন ফারাওরা, এমন কথাও শোনা যায়। আলাপটা চালু আছে প্রাচীন অলিম্পিক ক্রীড়াবিদের বেলায়ও। ভালো পারফরম্যান্সের জন্য প্রতিযোগিতার আগে রসুন খেতেন তারা। একইভাবে সাহস জোগাবে বলে রোমান সৈন্যরা যুদ্ধের আগে রসুন খেতেন বলে জানা যায়। কে না জানে, গ্রিক পুরাণে বিশ্বের প্রায় সব শৃঙ্খলারই একটা কল্পরূপ পাওয়া যায়। সেখানে পাতাল ও জাদুমন্ত্রের দেবী হেকেটেকে (Hecate) রসুনের অর্ঘ্য দেয়া হতো দুটি পথের মিলনস্থলে। বিনিময়ে তিনি দিতেন নগরবাসীকে অশুভ দৃষ্টি থেকে সুরক্ষা।
এশীয় দেশ কোরিয়া পুরাণে খোদ মানুষের সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রসুনের আলাপ। এতে দেখা যায়, গোজোসিওন (প্রাচীন জোসিওন) হচ্ছে কোরীয় উপদ্বীপের প্রথম রাজ্য, পরে কোরীয় ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত রাষ্ট্র। কোরীয় উপদ্বীপের উত্তর অংশ ও মাঞ্চুরিয়ার লিয়াওনিং অববাহিকা অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত রাজ্যটি ২৩৩৩ থেকে ১০৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল বলে কিংবদন্তি আছে। এর প্রতিষ্ঠার পুরাণের নাম দানগুন ওয়াংগম। এর কাহিনীতে দেখা যায়, মানবজগৎ শাসন করার ইচ্ছা নিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন স্বর্গীয় রাজার পুত্র হ্বানুং। সেখানে এসে দেখেন, একটি বাঘ ও একটি ভালুক মানুষ হতে চাইছে। হ্বানুং তাদের একটি গুহায় ১০০ দিনের একটি ধ্যান পরীক্ষা দেন। শর্ত দেন, এ পুরো সময় শুধু মগওয়ার্ট বা আর্টেমিসিয়া (এক ধরনের ভেষজ) ও রসুন খেয়ে থাকতে হবে তাদের। কিন্তু বাঘটি ধৈর্য হারিয়ে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। থেকে যায় ভালুকটি। পরীক্ষা সম্পন্ন করে সে পরিণত হয় উংনিয়েও নামে এক নারীতে। সে নারীকে বিয়ে করেন স্বর্গীয় পুত্র হ্বানুং। তাদের সংসারেই জন্ম নেন দানগুন ওয়াংগম। আর তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন কোরিয়ার প্রথম রাজ্য গোজোসিওন। কোরীয় কিংবদন্তিতে রসুন একদিকে স্বর্গীয় দেবতা ও পৃথিবীর মানুষের মিলনের প্রতীক, একই সঙ্গে ধ্যানের মাধ্যমে পশু থেকে মানুষের উন্নীত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
ইউরোপে আধুনিক সাহিত্যে রসুনের উপস্থিতি পাওয়া যায় সম্ভবত গ্রিক মহাকবি হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’তে। একবার ওডিসিউস ও তার কিছু অনুসারী জাদুকারী সার্সির (Circe) কাছে গেলেন। সার্সি ও তার বোন মেডেয়া (Medea) হচ্ছেন জাদু, ডাকিনী ও মোহের দেবী হেকেটের কন্যা। হেকেটের কাছে ম্যান্ড্রেকসহ অন্তত তিনটি বিষাক্ত উদ্ভিদ ছিল। তিনি মেয়েদের জাদুবিদ্যায় পারদর্শী করার পাশাপাশি বিষাক্ত উদ্ভিদের গোপন রহস্য সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান দিয়েছিলেন। ম্যান্ড্রেককে বলা হতো সার্সি উদ্ভিদ। তিনি সাক্ষাতেই ওডিসিউস ও তার অনুসারীদের ওপর ম্যান্ড্রেক গুল্মের বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ দিয়ে মানুষ থেকে শূকরে পরিণত করেন তিনি। কিন্তু রক্ষা পান ওডিসিউস। কারণ দেবতা হার্মিস তাকে আগেই পাহাড়ে উৎপাদিত এক ধরনের রসুন মলি (Moly) খেতে বলেছিলেন। একটি বিশেষ ‘হলুদ রসুন’। ম্যান্ড্রেকের বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে পর্বতের রসুনকে কার্যকর দেখা যায়। সেখান থেকে এটা ভালোভাবেই মনে হতে পারে, হোমার ও তার সমসাময়িকরা ‘পর্বত রসুন’কে সম্ভবত সাধারণ জাদুকরীবিরোধী উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। রসুনের জন্ম ও পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাসের কথা আগেই বলেছি। ফলে হোমারের ওডিসিতে ‘পর্বত রসুন’ বলতে যে ‘হলুদ রসুনের’ কথা বলা হয়, তা আমাদের কাছে অপরিচিত লাগে না। গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতিতে রসুন শক্তি এবং সামরিক বীরত্বের প্রতীক ছিল।
তবে ওডিসির মতো ইউরোপীয় লোককাহিনীতে রসুনের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যবহার হলো অশুভ শক্তি তাড়ানোর ক্ষমতা। মধ্যযুগে (প্রায় ৫০০-১৫০০ খ্রিস্টাব্দ) ইউরোপে অশুভ শক্তির ধারক ডাকিনী অপবাদ দিয়ে নারীদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে, সে সময়ও রসুনকে শুভ সংরক্ষণ হিসেবে ব্যবহার দেখা যায়। সে প্রেক্ষাপটে লেখা আইরিশ লেখক ব্রাম স্টোকারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’ প্রকাশ পায় ১৮৯৭ সালে। এর প্রধান খলচরিত্র কাউন্ট ড্রাকুলা হচ্ছে ভ্যাম্পায়ার (রক্তপায়ী)। ইউরোপীয় লোককথায় ভ্যাম্পায়ারদের উপস্থাপন করা হয়েছে মৃত উঠে আসা জীব (Undead) হিসেবে। ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসে ভ্যাম্পায়ারের অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে দেখানো হয়েছে রসুন। এতে দেখা যায়, রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে লুসি ওয়েস্টেনরা। তার রক্তের পরিমাণও ক্রমে কমতে থাকে। ডক্টর আব্রাহাম ভ্যান হেলসিং বুঝতে পারেন যে একটি ভ্যাম্পায়ার (ড্রাকুলা) তাকে আক্রমণ করছে। লুসিকে রক্ষায় তিনি ঘরের চারপাশে রসুনের ফুল ছড়িয়ে দেন। তার গলায় পরিয়ে দেন রসুনের একটি মালা। এর প্রভাবে ড্রাকুলা তার কাছে আসতে পারত না, ফলে লুসি শান্তিতে ঘুমাতে পারতেন। একবার লুসির মা রসুনের তীব্র গন্ধে মেয়ের কষ্ট হচ্ছে ভেবে লুসির ঘর থেকে সব রসুন সরিয়ে ফেলেন, তখনই একটি নেকড়ের রূপ ধরে জানালা ভেঙে ঘরে ঢুকে লুসিকে পুনরায় আক্রমণ করে ড্রাকুলা। এতে লুসি মারা গিয়ে পরিণত হয় ‘ব্লুফার লেডি’ নামে পরিচিত এক ভ্যাম্পায়ারে। সে বেছে বেছে শিশুদের শিকার করতে শুরু করে। শেষে ভ্যান হেলসিং ও তার সঙ্গীরা লুসিকে সমাধি থেকে তুলে হৃৎপিণ্ডে একটি কাঠের খুঁটি ঢুকিয়ে দেয়। আর তার মুখে পুরে দেয় রসুন। এতে লুসির ভ্যাম্পায়ার হিসেবে ফিরে আসা বন্ধ হয়ে যায়। পুরো উপন্যাসে ড্রাকুলার বিরুদ্ধে ক্রস ও পবিত্র রুটি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার দেখা যায় রসুনের।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় লোকবিশ্বাসে ভ্যাম্পায়ার ছাড়াও নেকড়ে-মানব ও শয়তানদের বিরুদ্ধে রসুনকে একটি শক্তিশালী ঢাল দেখা গেছে। অশুভ প্রতিকৃতির বিরুদ্ধে রসুন হলো সাধারণ মানুষের লোকজ বিশ্বাস। মানুষের অশুভ নজর থেকে বাঁচতে ঘরের জানালায় রসুনের মালা ঝুলিয়ে রাখা হতো। ব্যক্তি বিশেষে গলায় পরে থাকত রসুনের কোয়া। এ বিশ্বাস রসুনের শক্তিশালী গন্ধ ও জীবাণুনাশক গুণের কারণেই তৈরি হয়েছিল, যা তাদের রোগবালাই থেকেও রক্ষা করত।
মধ্যযুগে যখন রোগকে মনে হতো স্রষ্টার অভিশাপ, তখন চিকিৎসাও ছিল খানিকটা ভেষজ উপাদানের ব্যবহার, খানিকটা জাদু আর খানিকটা স্রষ্টার তুষ্টিতে মন্ত্রের প্রভাব। তখনো রসুন ছিল চিকিৎসার উপাচার। এখন সরাসরি ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল। নানা বিশ্বাস আর সম্প্রদায় চর্চা দিয়ে যেভাবেই মূল্যায়ন করা হোক, বস্তু হিসেবে রসুনের গুণাগুণ হারিয়ে যাওয়ার নয়।
তথ্যসূত্র
১. Garlic in Health, History, and World Cuisine; by Susan Moyers, Suncoast Press, 1996
২. Garlic, an Edible Biography: History, Politics, and Mythology; by Robin Cherry, ROOST BOOKS Boston 2014
অলাত এহ্সান: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক





