বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে খন্দকার মোশতাক আহমদ পরিচিত নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তার। কিন্তু ইতিহাসে তিনি সমালোচিত হয়েছেন তার কিছু পদক্ষেপের কারণে। এর মধ্যে প্রধান হলো শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসা। পঁচাত্তরের আগস্টের পর ৮৩ দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এর পর তিনি ক্ষমতা হারান। মুজিবনগর সরকার, শেখ মুজিবুর রহমানের কেবিনেটের সদস্য, বাকশালের কার্যকরী কমিটির সদস্য হলেও খন্দকার মোশতাকের এ সময়গুলো নিয়ে আলোচনা হয় কম। কিন্তু এ সময় বা কেবল রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের শেষ দিকে নজর দিলেই তার কিছু বৈশিষ্ট্য নজরে পড়বে। এর মধ্যে একটি হলো তার মার্কিনপন্থী মনোভাব।
খন্দকার মোশতাক আহমদসহ তার সমমনা অনেকেরই যোগাযোগ ছিল হেনরি কিসিঞ্জার প্রশাসনের সঙ্গে। এ নিয়ে লরেন্স লিফশুলজ গবেষণা করেছেন। কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একটা বড় অংশ মার্কিন মুখাপেক্ষী ছিল। তারা মার্কিন সাহায্যপ্রার্থী ছিল বললে আরো স্পষ্ট হয়। এমনকি খন্দকার মোশতাক ও তার মিত্ররা বিপদের সময় মার্কিন হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে পলায়নের পরিকল্পনা করেছিলেন।
১৯৭৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব নেন ডেভিস ইউজিন বোস্টার। ১৫ আগস্ট তিনি মোশতাকের একটি জীবনবৃত্তান্ত ও কিছু তথ্য নিয়ে ওয়াশিংটনে টেলিগ্রাম পাঠান। এর শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদের যে জীবনবৃত্তান্ত নিচে দেয়া হলো, তা থেকে এটা দেখা যাবে যে তিনি অব্যাহতভাবে নিজেকে একজন আমেরিকাপন্থী হিসেবেই চিত্রিত করে এসেছেন এবং সম্ভবত তার ফলাফল হিসেবে একজন ভারতবিরোধী ও সোভিয়েতবিরোধী হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে।’
আজকের দিনে এসে এ কথা সবারই জানা, সে সময় বিশ্বে দুটি পরাশক্তি ছিল—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। পাকিস্তানের ভরসার জায়গা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও কেউ ছিলেন রাশিয়া আর কেউ মার্কিনপন্থী। মোশতাক নিজেকে মার্কিনপন্থী হিসেবে প্রকাশ করতেন।
বোস্টার তার বিবরণে লেখেন, ‘কুমিল্লা জেলায় মোশতাকের জন্ম সম্ভবত ১৯১৮ সালে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনসহ অন্য বিষয়ে ডিগ্রি নেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি ......
স্বাধীনতার পর থেকে শাসক দলে পাশ্চাত্যপন্থী ও মধ্যপন্থী হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। তিনি তাজউদ্দীন আহমদের বিরোধী ছিলেন। জানা যায়, স্বাধীনতার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হারানোর জন্য তিনি ভারতীয় নেতাদের দোষারোপ করে থাকেন। তাকে খুব বেশি আমেরিকাপন্থী বলে মনে করা হয়ে থাকে।’
ষাট ও সত্তরের দশকে মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম মাথাব্যথা ছিল সমাজতন্ত্র। তারা কোনো দেশেই সমাজতন্ত্রকে বাড়তে দিতে চাইত না। মার্কিনপন্থী মনোভাব প্রকাশ করার একটি বড় পন্থা ছিল সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করা। বোস্টারের বর্ণনা থেকে জানা যায়, মোশতাক সেটাই করেছিলেন। বোস্টার লিখেছেন, ‘মোশতাক ১৯৭২ সালে মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, তিনি সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতি সমর্থন করেন, কিন্তু সমাজতন্ত্রকে নয়। তার মতে, সমাজতন্ত্র অগণতান্ত্রিক ও নিয়ন্ত্রিত (রেজিমেন্টেড)। তিনি এ ধারণা দিয়েছিলেন, বাংলাদেশে মাত্রাতিরিক্ত ভারতীয় ও সোভিয়েত প্রভাবের সম্ভাবনায় তিনি সন্তুষ্ট নন। যদিও পাকিস্তান আমলে আইয়ুবের নিপীড়নমূলক শাসনের প্রতি অব্যাহত মার্কিন সহায়তার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচক ছিলেন। ১৯৭২ সালে দূতাবাস-কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সোভিয়েত ও ভারতীয় প্রভাবের লাগাম টানতে প্রতিসাম্য রক্ষা করে চলবে।
১৯৭৪ সালের মে মাসে মোশতাকের সঙ্গে রাষ্ট্রদূত সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। মোশতাক এ সময় রাষ্ট্রদূতকে একান্তে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় একজন আমেরিকাপন্থী সদস্য হিসেবে তার যে পরিচিতি রয়েছে, তাকে তিনি তার ‘সুনাম’ বলেই গণ্য করেন। তার শত্রুরা বিষয়টি তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। মোশতাক এ কথা বলার পর শেখ মুজিবকে সহায়তার জন্য ব্যাপকভিত্তিক মার্কিন সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মুজিবকে তিনি তখন তার ভাষায় অন্তর থেকে ‘সাচ্চা গণতন্ত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মোশতাক আরো ধারণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মুজিবকে ব্যাপক অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়, তাহলে বামের দিকে ঝোঁকার চাপ থেকে মুজিব নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন।
সেই থেকে অনেকবার মোশতাকের সহযোগীদের মুখ থেকে তিনি যে আমেরিকাপন্থী তা শুনতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১০ আগস্ট একটি নৈশভোজ ছিল। সেখানে রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। মোশতাক অন্যান্য বাঙালির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সময় বাংলাদেশে খাদ্যসহায়তার জন্য ‘ফ্রি ওয়ার্ল্ড সোর্সেস’-এর উল্লেখ করেন এবং মন্তব্য করেন, ‘‘নো ওয়ান ভোটস ইন বাংলাদেশ নাউ।’’ আমরা জানি না, মুজিবের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে মোশতাক কতটা জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন। বাকশালের তরুণ নেতারা, যারা এ ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন, তারা দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, বর্তমান পার্টি কাউন্সিল সম্পর্কে মোশতাক ছিলেন প্যাসিভ বা অপ্রতিরোধী।’
মোশতাকের মার্কিনপন্থী হওয়া নিয়ে মোটামুটি এ ছিল বোস্টারের তারবার্তায়। ১৬ ও ১৭ আগস্ট বোস্টার ওয়াশিংটনে যেসব বার্তা পাঠান তাতে মোশতাক বিষয়ে তেমন কোনো কথা ছিল না। সম্ভবত বোস্টারের সঙ্গে মোশতাক বা তার প্রশাসনের যোগাযোগ করার সে রকম কোনো প্রয়োজন পড়েনি। তবে প্রয়োজন হয়েছিল ওই বছরেরই নভেম্বরে। ৩ নভেম্বর সূর্যাস্তের আগে মোশতাক, ফারুক ও রশিদ দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন। মোশতাক আশা করেছিলেন তার জন্য একটি মার্কিন হেলিকপ্টার ঢাকায় আসবে। কিন্তু চাইলেই সব হয় না। যেমন মোশতাকের এ ইচ্ছায় নিঃশর্ত সাড়া দেননি হেনরি কিসিঞ্জার। তবে মোশতাকসহ আর্মি অফিসারদের মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় দিতে রাজি হয়েছিলেন তিনি। এমনকি প্রয়োজন হলে প্রাথমিকভাবে তাদের মার্কিন দূতাবাসে আশ্রয় দেয়ার জন্য বোস্টারকে নির্দেশ দেন তিনি।
এদিকে ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে বোস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বেলা ২টা ২০ মিনিটে বোস্টারকে ফোন করেন মোশতাক আহমদের মুখ্য সচিব মাহবুবুল আলম চাষী। বোস্টার ৩ নভেম্বর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে তার পাঠানো ৫৩০৪ তারবার্তায় এ কথোপকথনের উল্লেখ করেন। চাষী জানতে চান ‘বাংলাদেশের কয়েকজন লোককে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া সম্ভব হবে কিনা?’
বোস্টারের বয়ানে, ‘আমি [বোস্টার] জানতে চাইলাম, আপনি যে কয়েক ব্যক্তির কথা বলছেন, এর মধ্যে দুই মেজর রয়েছেন কিনা। সচিব উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, বিদেশের মাটিতে বসে কাউকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া আমাদের স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে না।’
মাহবুবুল আলম চাষীকে বোস্টার কোনো নিশ্চয়তা দেননি। তবে কোন সময়ে হেলিকপ্টার প্রয়োজন হতে পারে তা জানতে চাইলে চাষী জানিয়েছিলেন যে ওইদিন সন্ধ্যায়ই প্রয়োজন হতে পারে। বোস্টার এরপর লিখেছেন, ‘সচিব জানালেন, দুই মেজর ছাড়াও স্বয়ং প্রেসিডেন্ট তাদের সঙ্গী হতে পারেন।’
বোস্টার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত জানাতে অনুরোধ করেছিলেন। ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ কিসিঞ্জার স্বয়ং ২৬১৭৮৫ নম্বর তারবার্তায় বোস্টারকে নির্দেশনা দেন। তিনি প্রেসিডেন্ট মোশতাককে এই বলে নিশ্চয়তা দিতে বলেছিলেন যে ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন রয়েছে।’ এছাড়া মোশতাক যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চাইলে সেখানে তাকে স্বাগত জানানো হবে বলেও জানান কিসিঞ্জার।
তবে হেলিকপ্টার প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ‘ঢাকা থেকে তাদের আনতে একটি মার্কিন হেলিকপ্টার পাঠানোর প্রস্তাবে আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়।’
কর্নেল ফারুক-রশিদ চলে যাওয়ার পরও বোস্টার চাষীকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ত্যাগের আগে দরকার হলে প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগী দল মার্কিন দূতাবাসে থাকবেন।’ জবাবে চাষী তাকে গভীর কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। বোস্টার লিখেছেন, ‘চাষী আর মার্কিন হেলিকপ্টারের কথা মুখে আনেননি। আমিও আর এ প্রসঙ্গ তুলিনি।’
[নিবন্ধটি তৈরিতে মিজানুর রহমান খান রচিত ‘মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকাণ্ড’ থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে]
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক









