‘হাওর-জঙ্গল-মহিষের শিং/এই তিনে ময়মনসিং’। রেলগাড়ির আগমনে দাঁড়াল ‘ঝক্কর-ঝক্কর ময়মনসিং’। ততক্ষণে গীতিকার খ্যাতিতে উদ্ভাসিত ময়মনসিংহ ইংরেজ রসিকতায় রূপান্তরিত হলো ‘মাই-ম্যান সিং’ অর্থাৎ ‘আমার মানুষ গান গায়’। গানের সেই ঐতিহ্য ছিল লোকায়ত। পলাশীর যুদ্ধের পর বিশেষ করে ইংরেজদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে মুর্শিদাবাদের নবাব কর্মচারী কুলীন জমিদারবর্গ যারা মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন; তারা এ অঞ্চলে চলে এলেন। চলে আসার দুটো কারণ ছিল—প্রথমত পূর্ব প্রভুদের পতন, দ্বিতীয়ত ইংরেজ কর্নওয়ালিসের ভূমি ব্যবস্থা। এ থেকে মুক্তাগাছা-গৌরীপুরের মতো বৃহৎ জমিদারি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়।

কিন্তু এর আগেরও ইতিহাস রয়েছে। ‘সন্ধেবেলার বাতি জ্বালাবার আগে’ যেমন ‘সলতে পাকানো পর্ব’ থাকে; ঠিক অনেকটা এমনি। ময়মনসিংহের ইতিহাসের ঐতিহ্য বেশ পুরনো। একদিকে গুপ্ত আমল, পাল আমল, সেন আমল; অন্যদিকে পূর্ব ময়মনসিংহের হাওর বেষ্টিত অঞ্চলে কামরূপী শাসন নানাভাবে একে প্রভাবিত করেছে। কামরূপী আমলকে আদিবাসী ট্রাইবাল ব্যবস্থাই বলা যেতে পারে। পশ্চিম ময়মনসিংহ ছিল গুপ্ত, পাল, সেন এবং উচ্চবর্ণী মুসলিম শাসনের অধীনে। নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে ঈশা-মুসা খাঁর আমল পাড়ি দিয়ে ১৭০০ সালের দিকে সুবাদারি শাসনের প্রবর্তন হয়। মুসলিম আমলে এ ভূ-অঞ্চল বিভিন্ন পরগনা ও সরকার ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

মোগল-ঈশা খাঁ দ্বন্দ্ব এবং মিলনে ২২ পরগনার মালিক হন ঈশা খাঁ। তার এ পরগনাগুলো একসময় আকবরের রাজস্বমন্ত্রী টোডরমল কর্তৃক বিভাজিত পরগনার মিলনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে ময়মনসিংহ সরকার বাজুহার অন্তর্গত হয়। বিভিন্ন পরগনার মধ্যে মোমেনশাহি পরগনার (যা গৌরীপুর জমিদারি নামে পরিচিত) মোমেনশাহের নামের সঙ্গে ময়মনসিংহ নামের সাযুজ্য রয়েছে। নাসিরউদ্দিন বা নসরৎশাহের নামে এ অঞ্চল নাসিরাবাদ বলেও দীর্ঘদিন পরিচিত ছিল। ১৭৮৭ সালের ১ মে জেলা প্রতিষ্ঠিত হলে অধিক খাজনা প্রদানকারী গৌরীপুর জমিদারির মোমেনশাহি পরগনার নামে নামকরণ স্থায়ী হয় ময়মনসিংহ নামে।

১৮৮৫ সালে গঠিত জেলা বোর্ড স্বায়ত্তশাসিত পৌর প্রতিষ্ঠানের জন্মের মধ্য দিয়ে এ শহর আলোকিত হয়। শহরে আগমন ঘটে মুক্তাগাছা, গৌরীপুর, রামগোপালপুর, করটিয়া, কানিহারী, সুসংদুর্গাপুর, নারায়ণডহর, গাঙ্গাটিয়ার জমিদারদের। মসূয়া, ধনবাড়ি, সেনবাড়ি, বাসাবাড়ি, গোলকপুর, কৃষ্ণপুর, আঠারবাড়ি, তালজাঙ্গা, ভূঞাবাড়ি, মির্জাপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, ধলা, বেলতা প্রভৃতি অঞ্চলের ধনাঢ্য জমিদার এবং প্রতাপশালী মধ্যবিত্তদের। তারা এ শহরে এসে ভিড় করলে, শহরের জৌলুস বেড়ে যায়। শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণীর আগমনের ফলে এ শ্রেণীর নাগরিকরাই ময়মনসিংহের ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে ওঠেন। অফিস-আদালত, পোস্ট অফিস, পুলিশ স্টেশন, জেলখানা, অফিসার্স কোয়ার্টার তৈরির মধ্য দিয়ে একদিনের এক অখ্যাত মৌজায় প্রাণচাঞ্চল্য চলে আসে। এর মধ্যে ১৮০০ সালে মুদ্রা, ১৮০৭ সালে টেলিগ্রাফ, ১৮১৫ সালে চৌকিদারি ব্যবস্থা, ১৮২৩ সালে কানুনগো অফিসসহ নতুন থানাও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। তালুকদার-জমিদারদের বাসাবাড়ি বানানোর ধুম পড়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহ জমিদার নগর নামে খ্যাত হয়। সেই শহরের আকর্ষণে বিভিন্ন স্থান থেকে শহর নিকটবর্তী স্থানে শেখ-সৈয়দ; মোগল-পাঠান, ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ-জেলে-তাঁতি, কবি-শিল্পী, বাইজি-গায়ক-বাদক, বণিক-পতিতারা পর্যন্ত চলে আসে। অনেকের আবার পাড়াভিত্তিক অবস্থান ঘটে। সেহড়াপাড়া, মোড়লপাড়া, জেলে বা তাঁতিপাড়া, ব্রাহ্মপল্লী, হিন্দুপল্লী, পণ্ডিতবাড়ি, পণ্ডিতপাড়া, নওমহল, আঠারবাড়ি, কালিবাড়ি, নাপিতখলা, গুলকিবাড়ি, সানকিপাড়া, ধোপাখোলা, সেনবাড়ি, সাহেব কোয়ার্টার, কুণ্ডুবাড়ি, আমলাপাড়া, পিয়নপাড়া, দুর্গাবাড়ি, শিববাড়ি, মীরবাড়ি, হরিজন পল্লী ইত্যাদি ছাড়াও পেশাভিত্তিক ট্রাঙ্কপট্টি, শাঁখারিপট্টি, দুধমহল, চকবাজার, তামাকপট্টি, পতিতাপল্লী তারই নিদর্শন আজও বহন করে চলেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, মঠ-আখড়া, মাজার, গির্জা, মিশন (রামকৃষ্ণ) প্যাগোডা, গুরুদুয়ারায় ছেয়ে যায় ময়মনসিংহ শহর। রেললাইন চালু হওয়ায় বিভিন্ন পেশাভিত্তিক বস্তি বা আবাসনও গড়ে ওঠে। এক কথায় কলকাতাকেন্দ্রিক সামাজিক বিপ্লবের তরঙ্গ আছড়ে পড়ে ময়মনসিংহের মতো মফস্বল শহরে।

ইংরেজ প্রদর্শিত নবশিক্ষায় গড়ে ওঠে এক নতুন বিদ্বৎসমাজ। পনেরো শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁ, রিফরমেশন, ষোলো শতকের ব্রিটেনের গণতন্ত্র, আঠারো শতকের ফরাসি বিপ্লবের অনেক ইতিবাচক উপাদান ইংরেজ শাসকরা বহন করে আনার ফলে এখানকার নব্য শিক্ষিত শ্রেণীর জীবনদর্শনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। আইন-শিক্ষা-চিকিৎসা-ব্যবসা-বাণিজ্যে আসে অভিনব রূপান্তর। ১৮৮৬ সালে কাঁচাপাট রফতানির সুবিধার্থে রেল যোগাযোগ শুরু হলে লন্ডনের ডান্ডি পর্যন্ত ব্যবসার পরিধি বাড়ে। ১৮৬০ থেকে ১৮৮২ সালে মহকুমা সৃষ্টি করে দেশীয় শাসক নিয়োগসহ মানি অর্ডার, আদমশুমারি, টেলিগ্রাফ, ১৮৯৯ সালে ময়মনসিংহ-জগন্নাথগঞ্জ রাজপথ ইত্যাদি ময়মনসিংহ নগর প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট পরিমাণ ভূমিকা রাখতে থাকে। কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রাধান্যও দেখা দেয়। ১৮৬৫ সালে ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’, ‘লিটারেচার সভা’, ১৮৭৭ সালের সারস্বত সমিতি দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশের পথ উন্মুক্ত করে।

১৯০১ সালে সিটি কলেজের ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠা শিক্ষা ক্ষেত্রকে নতুন পথ দেখায়। নতুন করে ব্রাহ্মধর্ম, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের আবির্ভাবে ধর্মীয় সংস্কারবাদীদের উত্থানে ময়মনসিংহ আলোড়িত হয়। এছাড়া আনন্দমোহন বসুর প্রথম র‌্যাংলার হওয়ার গৌরব, ভাই গিরিশচন্দ্রের কুরআন অনুবাদ; কেদারনাথ, চন্দ্রকুমার দের বিশেষ বিশেষ কৃতিত্ব, ব্রাহ্ম আন্দোলন এবং আঞ্জুমানিয়া ইসলামের প্রভাব ইত্যাদি এক সঙ্গেই চলতে থাকে। ওদিকে ইংরেজ কর্মকর্তা এবং জমিদারের কর্মচারীসহ অন্য পেশাজীবীরাও শহরে এসে ভিড়তে থাকলে শহরের চৌহদ্দি বেড়ে যেতে থাকে। গলগণ্ডা কাশর থেকে ভাটি কাশর: শম্ভুগঞ্জ থেকে চড়পাড়া রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, পুকুর-জলাশয়, হাটবাজার নিত্যনতুন পসরায় সজ্জিত হয় ময়মনসিংহ শহর। আলেকজান্ডার ক্যাসেল, শশী লজ, গৌরীপুর লজ, সূর্যকান্ত হল (টাউন হল) দৃষ্টিনন্দিত স্থাপত্য ময়মনসিংহকে ঐতিহ্যমণ্ডিত করে তোলে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, বিশেষ করে ইতালীয় গথিক এবং পারস্য ঘরানার সংমিশ্রণে এসব স্থাপত্য ময়মনসিংহকে নতুনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণে সাহায্য করে।

জমিদারদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে সে সময়ের বিশ্বখ্যাত রুচিরও পরিচয় মেলে। সূর্যকান্ত ও চন্দ্রকান্ত ঘোষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জলকল স্থাপন এক নজিরবিহীন ঘটনা। ত্রিস্তরবিশিষ্ট চৌবাচ্চা, বিশুদ্ধ ভূগর্ভস্থ জল ছাঁকনির নিদর্শন এখনো জুবিলিঘাটের পৌর সুপার মার্কেটের পেছনে বিদ্যমান। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জলঝরনা, স্ট্যান্ডের আলোকবাতির সঙ্গে ডিসি জেনারেটরের মাধ্যমে ১০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (কাঁচিঝুলি থেকে ছায়াবাণী হল পর্যন্ত), মুদ্রণযন্ত্রের বিকাশ, পত্রপত্রিকা প্রকাশ, সভা-সংঘ; পাশ্চাত্য রীতির নাট্যশালা, ক্রীড়াপল্লী মধ্যবিত্ত জীবনে বৈভব নিয়ে আসে। ব্রিটিশ আমলেই রাস্তায় পালকি, সোয়ারী, মাফাইয়া, গরুর গাড়ি, সাইকেল, টমটম এবং চলার জন্য রাস্তা-ফেরি তৈরি, জেলখানায় কাগজ তৈরি অভিনব রূপ লাভ করে। মাটির রাস্তাটি টোক থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বেশকিছু সময় এ রাস্তা পাজামা রোড বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু এমন অভিনব সময়ের হুজুকের মধ্যেই ইংরেজদের ‘ভাগ করো শাসন করো’ নীতি সারা বাংলায় যে ঝড় তোলে তা ময়মনসিংহের দুয়ারে এসে হানা দেয়। শুরু হয় বঙ্গচ্ছেদ-বঙ্গচ্ছেদ খেলা।

১৯০৫ সালে বঙ্গচ্ছেদ অনিবার্য হলে ময়মনসিংহ আসাম প্রদেশের অন্তর্গত হয়ে পড়ে। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে আপাতত অস্থিরতা কমে আসে। কিন্তু ময়মনসিংহের জমিলার-কল্যুকদারদের মন উড়ুক্কু হয়ে পড়ে। অনেকেই ভারতে পাড়ি জমানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। উপমহাদেশে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের উত্থানে সাম্প্রদায়িকতা প্রথম বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেয়। এরই মাঝে কমিউনিস্টদের টংকবিরোধী আন্দোলন আবার অস্থিরতা বাড়াতে থাকে। কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে তেভাগা আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করে। মণি সিংহ-সুসংয়ের জমিদারের ভাগ্নে হয়ে মামার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে টংক প্রথার আন্দোলন সুরেন্দ্রনাথ ও রাসমণির আত্মাহুতি যেন টিপু পাগলের অনুসরণ। এ ধারার সংগ্রামের বহ্নিশিখা জাতীয় আন্দোলনেও ইন্ধন জোগাতে সাহায্য করে। পরিবর্তন হতে থাকে দীর্ঘদিনের আঁকাবাঁকা পথ ধরে।

সেই পথপরিক্রমা ভূগঠন, আবহাওয়া, প্রাণে-প্রাণে জড়িয়ে থাকা প্রাণিকুলের চিরচাঞ্চল্য: রাজনীতির হাতবদলে বহু রাজন্যের রাজসিংহাসনের হয়েছে অদল-বদল। মৌর্য থেকে ব্রিটিশ-পাকিস্তান হয়ে স্বাধীন বাংলার ভিত্তিভূমি যা তিলে তিলে প্রাকৃতজনের পদচারণে গড়ে উঠেছিল। ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ‘মহুয়া’-‘মলুয়া’র সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। রুচিমান মানুষের এ গোষ্ঠী, দয়া-ধর্ম: বীর-বীরত্বে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পুষ্ট হয়ে, বহু স্বাক্ষর রেখে গেছে ইতিহাসের পাতায়-পাতায়। আর এভাবেই ময়মনসিংহ এক সুবিশাল ইতিহাসের অনুষঙ্গ হয়ে ঐতিহ্যের নিকেতন গড়ে তুলেছে। যদিও এর ভাটার টানও কম নয়।

স্বপন ধর: লেখক ও গবেষক