উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় ‘নারী প্রশ্ন’ গুরুত্ব পেতে শুরু করে। এ সময় বাংলার অনেক নারী ঘরের চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে শুরু করেন, যা তখনকার সমাজ ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটে আধুনিকতার একটি বড় প্রকাশ ছিল। তবে তারা শুধু ঘুরে দেখেই থেমে থাকেননি। বরং সে অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন ভ্রমণকাহিনী ও আত্মজীবনীমূলক লেখার মধ্যে।
সে সময় উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। উপমহাদেশের নারীরা যখন বিলাত (ইংল্যান্ড) ভ্রমণ করেন, তখন ধরে নেয়া যায় ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলের নারীর চোখ দিয়ে ইউরোপীয় সমাজ ও সংস্কৃতিকে দেখেন ও লেখেন। তাদের লেখায় উঠে এসেছে বিলাতের সমাজ, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির বিস্তারিত বর্ণনা। কখনো তারা রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে, আবার কখনো সরাসরি নিজের দেখা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তারা তুলনা করেছেন ভারত ও বিলাতের সমাজ ও সংস্কৃতির নানা দিক।
কিছু ক্ষেত্রে তারা উপমহাদেশের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, আবার কিছু জায়গায় বিলাতের কিছু উন্নত দিকও স্বীকার করেছেন। তবে তারা দেখিয়েছেন যে দেশগুলো নিজেদের সভ্যতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করে, সেখানেও রয়েছে নানা অসংগতি ও বৈষম্য। বিলাতের শ্রেণীবিভাজন, বিলাতিদের দৃষ্টিতে একজন উপনিবেশিত নারীর অবস্থান এবং নানা সামাজিক বিষয়ের সমালোচনা উঠে এসেছে তাদের লেখায়। এ লেখায় দুজন নারীর লেখা ভ্রমণকাহিনী ও আত্মজীবনীমূলক লেখা তুলে ধরা হয়েছে। যারা ব্রিটিশ আমলে বিলাত ভ্রমণ করে নিজেদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন। তারা হলেন দুর্গাবতী ও কৃষ্ণভাবিনী দাস। যদিও তাদের ভ্রমণের মধ্যে সময়গত ব্যবধান ছিল অনেক, তথাপি তাদের লেখায় রয়েছে মিলের অভিন্ন সুর ও অভিজ্ঞতার মৌলিক সংযোগ।
দুর্গাবতী ঘোষ ভ্রমণ নিয়ে ডায়েরিতে তার অভিজ্ঞতাগুলো লেখেন। যেখানে তিনি তার ভ্রমণের দিনলিপি অনুসারে বর্ণনা দিয়েছেন। দুর্গাবতী ঘোষ তার ভ্রমণকাহিনীতে ইংল্যান্ড নিয়ে নিজের মনে গড়ে ওঠা আবেগপ্রবণ ভাবনার কথা অকপটে বলেছেন। তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা ভারতের সাংস্কৃতিক ভাবনার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। একজন বাঙালি নারী হিসেবে তিনি বিশ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডের সমাজ ও পরিবেশ নিজের চোখে দেখেছেন এবং সে অভিজ্ঞতার খুঁটিনাটি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। তিনি ইংরেজ সমাজে নারীদের অবস্থা, আচার-আচরণ ও জীবনধারার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
আশিস নন্দী লিখেছেন, দুর্গাবতীর লেখায় বোঝা যায় কীভাবে বাঙালি গৃহজীবন, সম্পর্কের ধরন ও নারিত্ব বিদেশের পরিবেশে গিয়ে নতুনভাবে প্রকাশ পায়। তিনি ঘরের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন এক জগতে পা রাখেন, যা তার মধ্যে এক ধরনের মুক্তির অনুভব তৈরি করে।
দুর্গাবতী লেখেন, তিনি ইংরেজ নারীদের অবস্থা দেখে মুগ্ধ হন, কারণ তারা ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এটা সম্ভব হয়েছে কারণ ইংল্যান্ডের পরিবেশ ও পারিবারিক ব্যবস্থার কারণে।’ পাশাপাশি তিনি উপমহাদেশের নারীদের নিয়ে বলেন। বাঙালি নারীরা যদি ভিন্ন পরিবেশ ও সমাজে থাকত, তাহলে তারাও এমন স্বাধীনতা পেত।’
ইংল্যান্ডের দাম্পত্য জীবনের নানা বিষয় তাকে মুগ্ধ করেছে। তিনি লেখেন, সেখানে নারীরা বিবাহিত জীবনে অনেক বেশি স্বাধীন। যেমন স্বামীরা বাড়িতে না থাকলেও স্ত্রীরা নিজে অতিথিদের সঙ্গে দেখা করেন, যা তখনকার উপমহাদেশে কল্পনাও করা যেত না, কারণ নারীরা সাধারণত পুরুষদের সঙ্গে একা কথা বলতেন না। কৃষ্ণভাবিনী দাসও ইংরেজ নারীদের এমন স্বাধীনতা ও সামাজিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি অবাক হয়ে দেখেছেন, স্বামী-স্ত্রী সন্ধ্যায় ও বিকালে একসঙ্গে বাইরে ঘুরতে যান, যা উপমহাদেশের সামাজিক নিয়মের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। কৃষ্ণভাবিনী আরো বলেন, ‘ইংরেজ নারীরা সাধারণত বুদ্ধিমান, পরিশ্রমী ও শিক্ষিত। তারা ঘরও সামলায়, আবার বাইরের কাজেও দক্ষভাবে অংশ নেয়।’
দুর্গাবতীর লেখায় তিনি যেসব দেশ বা জায়গায় গেছেন, সেগুলোর মানুষ, পোশাক, অর্থনৈতিক অবস্থা ও সংস্কৃতি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। তবে তিনি ঔপনিবেশিক ধারণাকে উল্টে দিয়েছেন। সাধারণভাবে ধরা হয় ইউরোপ মানেই সভ্য, আর উপনিবেশিত দেশগুলো অসভ্য, এ ধারণাকে তিনি চ্যালেঞ্জ করেছেন। ইংল্যান্ডে দেখা অনেক কিছুই তাকে হতাশ করেছে। যেমন তিনি একবার বাসে দেখেন, একজন ইংরেজ নারী থুতু দিয়ে কাপড় ভিজিয়ে ছেলের মুখ মুছিয়ে দিচ্ছেন, যা তার কাছে অস্বস্তিকর ও অপরিষ্কার মনে হয়েছে।
দুর্গাবতী একদিকে ইংল্যান্ডের পরিষ্কার রাস্তা ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ট্রাফিক দেখে মুগ্ধ হন। অন্যদিকে মানুষের অসচেতনতা ও নোংরামিও চোখে পড়ে। এ বিপরীত চিত্র তাকে বিভ্রান্ত করে। তিনি বুঝতে পারেন, ইংরেজদের নিয়ে যে সবসময় সভ্য এমন ধারণা আছে, তা পুরোপুরি ঠিক নয়। দুর্গাবতীর এ দৃষ্টিভঙ্গিই ইউরোপকেন্দ্রিক সভ্যতার ধ্যানধারণাকে প্রশ্ন করে।
এ রকম দৃষ্টিভঙ্গি আমরা কৃষ্ণভাবিনী দাসের লেখায়ও দেখি। তিনি বিলাতের শ্রেণীবৈষম্য নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিলাতে ধনী ভদ্রলোক আর দরিদ্র সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল আলাদা এবং দরিদ্রদের মধ্যে সভ্যতার ছাপ খুব কম ছিল। ধনী আর দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব ছিল। একদিকে উঁচু দালান অন্যদিকে নোংরা এলাকায় শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের বসবাস।’ কৃষ্ণভাবিনী মনে করেন, লন্ডন আসলে বড়লোকদের জন্য তৈরি, কারণ এখানে দোকানপাট আর ভোগবাদের ছড়াছড়ি। দরিদ্ররা এখানে নিজেদের অসহায়তা আরো বেশি করে টের পায়। এতে তার মনে হতাশা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পারেন, ইংল্যান্ড সবসময় এত গুছানো বা উন্নত নয়, যতটা আগে ভাবতেন। তিনি শুধু কলোনিয়াল চিন্তাভাবনাকে ভাঙেননি বরং ইংরেজদের একচেটিয়া দৃষ্টিকেও উল্টে দিয়েছেন।
দুর্গাবতী একটি ঘটনা বর্ণনা করেন, যা তাকে পীড়া দিয়েছিল। তিনি যখন শাড়ি পরে রাস্তায় বের হতেন, তখন ইংল্যান্ডের মানুষ তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। যেটা দুর্গাবতীর কাছে অস্বস্তির কারণ ছিল। এ দৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তিনি শাড়ির ওপর একটি ওভারকোট পরে নিতেন, যাতে মানুষের দৃষ্টি উপেক্ষা করা যায়। ওভারকোটকে মূলত একটি রূপক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন। ইংরেজদের এ নজর দেয়াটাই ছিল এক ধরনের ক্ষমতার প্রকাশ, যা রূপকভাবে ঔপনিবেশিক অঞ্চলে ঔপনিবেশিক ব্যক্তিদের দৃষ্টি দেয়ার মতো। দুর্গাবতী ওভারকোট পরে ঔপনিবেশিকদের সে দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেছেন, যা ছিল এক ধরনের প্রতিবাদ।
তিনি তার লেখায় অনেক সূক্ষ্ম বিষয় তুলে ধরেন। যেমন একদিন রিজেন্ট পার্কের চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখেন সিংহ-বাঘদের কাঁচা মাংসের সঙ্গে লেটুস ও লবণ দেয়া হচ্ছে। তিনি মজা করে বলেন, ‘হয়তো এ বাঘগুলোও ইংরেজদের মতো, সালাদ খেতে অভ্যস্ত।’ এ মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি ইংরেজদের জীবনধারা ও চিন্তাভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
দুর্গাবতী যেমন ইংরেজদের আচরণ লক্ষ করছেন, তেমনি তার ভারতীয় পোশাক-পরিচ্ছদ ও চলাফেরা ইংরেজদের কাছে ভিন্ন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, ‘রাস্তায় যখন হাঁটছিলাম, তখন দুই পাশের জানালা খুলে মানুষ আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন আমরা সার্কাসের মানুষ, যারা ভালুক নিয়ে খেলা দেখাবে।’ এ অভিজ্ঞতা তাকে বিব্রত করে। তার ভারতীয় পরিচয় যেন বিদেশীদের চোখে একটি প্রদর্শনীর মতো হয়ে ওঠে। দুর্গাবতীর কাছে বিলাত হয়ে ওঠে একদিকে নতুন জিনিস দেখে ভালো লাগা, অন্যদিকে নিজের সংস্কৃতিকে আরো ভালোভাবে বোঝার জায়গা। তাদের পোশাক ও চালচলন নিয়ে বিদেশীদের যেভাবে দৃষ্টি পড়েছে, তা বোঝায় একজন বিদেশী নারীর পরিচয় কীভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে। এ বিষয়ে কৃষ্ণভাবিনী দাস বলেন, ‘যদি কারো চেহারা বা পোশাক আলাদা হয়, তাহলে তারা তাকায় এমনভাবে যেন কোনো পশুকে দেখছে।’
দুর্গাবতী লেখেন, একদিন কিছু কিশোর ছেলে তার পেছনে লেগে ছিল। এবং তারা দুর্গাবতীর কাছে পয়সা চাইতেছিল। আর ছোট ছোট কয়েকজন মেয়ে তার শাড়ি ছুঁয়ে বলে উঠেছিল, ‘কি সুন্দর শাড়ি!।’ এ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ইংল্যান্ডের বাস্তবতা আসলে তার কল্পনার মতো নয়। রাস্তায় ভিক্ষুকদের উপস্থিতি এবং অনেক ইংরেজের অশালীন আচরণ দেখে তিনি হতাশ হন। ফলে তার মনে জন্ম নেয় এক ধরনের বিভ্রান্তি। একদিকে তিনি ইউরোপকে ভাবতেন অত্যন্ত সভ্য, অন্যদিকে বাস্তবে দেখেন অসংগতি। এমন অবস্থায় যখনই কোনো উপমহাদেশের সঙ্গে দেখা হতো, তিনি গভীর আত্মিক যোগাযোগ অনুভব করতেন। বিদেশে একাকিত্বের মধ্যে নিজের লোকের সঙ্গে দেখা তার মনে বন্ধুত্বের অনুভব এনে দিত। এভাবেই তিনি নিজের ভিতরের ‘আমি’কে আবিষ্কার করতে থাকেন ভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে তুলনা করে।
অন্যদিকে কৃষ্ণভাবিনী দাস সিদ্ধান্ত নেন পাশ্চাত্য পোশাক পরার। তিনি লেখেন তিনি যাতে বিলতের মানুষের খারাপ মন্তব্যের সম্মুখীন না হন, সে ভয়ে টুপি পরতেন। কিন্তু সে টুপি পরতে গিয়ে তিনি নিজের কাছে লজ্জিত হতেন। তার মতে, শুধু বাইরের পোশাক বদলালেই মানুষের ভেতরের সত্তা বদলায় না।
এ পাশ্চাত্য পোশাক পরার রীতিকে অনুসরণ করেছিলেন কুচবিহারের মহারানী সুনীতি দেবী। তিনি তার স্বামীর সঙ্গে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন এবং সেখানে রাজপরিবারের অনেক সদস্যের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তাদের আচরণ ও জাঁকজমক দেখে তিনি মুগ্ধ হন। তিনি একসঙ্গে সাদা-সোনালি গাউন ও শাড়ি দুই ধরনের পোশাকেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। রানী ভিক্টোরিয়া তাকে অনুরোধ করেন যেন তিনি তার জাতীয় পোশাকে হাজির হন।
এসব নারী ভ্রমণকারী কেবল ভৌগোলিকভাবে ভ্রমণ করেননি, বরং মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভ্রমণের মধ্য দিয়েও নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন। তারা ঔপনিবেশিক শক্তির ক্ষমতা, বৈষম্য ও সামাজিক শ্রেণীবিন্যাসকে প্রশ্ন করেছেন। এ ভ্রমণকাহিনীগুলো গুরুত্বপূৰ্ণ। কারণ এগুলো শুরু হয় নারীদের ঘরকেন্দ্রিক জীবন ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে সচেতনতা থেকে। এরপর তারা দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন দেশ ঘুরে দেখে এক নতুন রকমের স্বাধীনতা অনুভব করেন। দুই নারীর ভ্রমণকাহিনীতে দেখা যায়, নারীরা কীভাবে নিজেদের কথা বলার জায়গা তৈরি করেন, বিশেষ করে যখন তারা ভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। এ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাদের চিন্তাভাবনা ও জীবনবোধকে বদলে দেয়।
তথ্যসূত্র
১. দাস, কৃষ্ণভাবিনী। ইংল্যান্ডে এক বাঙালি নারী। অনুবাদ: নবনীতা সেনগুপ্ত। কলকাতা: হাওয়াকাল পাবলিশার্স, ২০২০।
২. দাস, কৃষ্ণভাবিনী। ইংল্যান্ডে এক বাঙালি নারী। অনুবাদ: সোমদত্তা মণ্ডল। নিউক্যাসল আপন টাইনে: কেমব্রিজ স্কলার্স পাবলিশিং, ২০১৫।
৩. দাশগুপ্ত, বিমলা। নরওয়ে ভ্রমণ। ভারতবর্ষ [অগ্রহায়ণ ১৩২০ বঙ্গাব্দ], ১৯১৩।
৪. দেবী, সুনীতি। এক ভারতীয় রাজকুমারীর আত্মজীবনী। লন্ডন: দি ইকো লাইব্রেরি, ১৯২১।
রুদ্র ইকবাল: সাংবাদিক, বণিক বার্তা








