মানুষ শুধু রুটিতে বাঁচবে না, খোদার মুখ থেকে যে বাক্য নির্গত হয়, তাতে বাঁচবে। বাইবেলে যিশুর উচ্চারিত বক্তব্যটিতে ব্যক্তিজীবনের দুটি দিক স্পষ্ট। প্রথমটি রুটি ও দ্বিতীয়টি বিশ্বাস। কিন্তু এ দুটি দিক পরস্পরকে প্রভাবিত করেছে প্রায়ই। রুটি আর বিশ্বাসের এমন পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার নজির ইতিহাসে বেশুমার।

লাস্ট সাপারের সময় যিশু খামিরবিহীন রুটি ভেঙেছিলেন। এজন্য লাতিন, আর্মেনীয় ও মারোনাইট গির্জাগুলো খামিরবিহীন রুটি ব্যবহার করে। খামিরবিহীন রুটি ব্যবহার করা হয় অ্যাংলিকান কমিউনিয়নের অনেক গির্জায়ও। ইথিওপীয় খ্রিস্টানরাও ইস্টারের আগে বৃহস্পতিবার খামিরহীন রুটি ব্যবহার করে, তবে অন্যান্য অনুষ্ঠানে থাকে খামিরযুক্ত রুটি। গ্রিক ও অন্যান্য অরিয়েন্টাল চার্চ খামিরযুক্ত রুটি ব্যবহার করে। সেন্ট থমাস খ্রিস্টানরাও সূক্ষ্ম আটা দিয়ে তৈরি খামিরযুক্ত রুটি ব্যবহার করে, যা প্রাচীন নিয়ম অনুযায়ী সেদিনই প্রস্তুত করা উচিত, যেদিন এটি পবিত্রকরণের জন্য ব্যবহার হবে। এটি বৃত্তাকার আকৃতির, বড় একটি ক্রসের ছাপ থাকে। চারপাশে থাকে ছোট ছোট ক্রসের প্রান্ত, যাতে ভাঙলে প্রতিটি টুকরা পবিত্র প্রতীকটি ধারণ করতে পারে। রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রুটিটি পাতলা ও বৃত্তাকার আকারে তৈরি হয়। এতে থাকে ক্রুশবিদ্ধ যিশুমূর্তির খোদাই।

সেন্ট জেফিরিনাস তৃতীয় শতাব্দীতে পোপ ছিলেন। তিনি পবিত্রকরণ রুটির নাম দেন Corona sive oblata, sphericce, figures। অর্থাৎ মুকুটটি বা গোলাকার বৃত্ত পবিত্রকরণের পরে ঈশ্বরের উপস্থিতির সূচক হিসেবে ধরা হয়। প্রাচ্যের গির্জায় কখনো কখনো বেদির রুটিগুলো বর্গাকার আকারে তৈরি করা হয়। সেখানে একটি ক্রস ও একটি শিলালিপি খোদাই করা থাকে। বর্গাকার রুটির আকার দিয়ে বোঝানো হয় খ্রিস্টের ক্রুশের আত্মবলির মাধ্যমে পৃথিবীর চার কোণ পরিত্রাণ পেয়েছে। আর্মেনীয়, কপটিক ও গ্রিক গির্জাগুলোয় রুটি ব্যবহারের নজির পাওয়া যায়।

প্রথম দিকের গির্জায় খামিরহীন রুটি ব্যবহার করা হয়নি। সাধারণ রুটি ব্যবহার করা হতো, যা তারা নিজেদের জন্য তৈরি করত। বরং এভিওনাইটদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা খামিরহীন রুটি দিয়ে উদযাপন করত। পোপ প্রথম ইনোসেন্ট বলেছিলেন খামিরহীন রুটি পবিত্র কর্মকে নির্দেশ করে। তবে কার্ডিনাল বোনা মনে করেন, যখন সাধারণ রুটি দিয়ে জনগণের উৎসর্গ বন্ধ হয়ে যায়, তখন পুরোহিতরা নিজেরাই রুটি সরবরাহ করতে শুরু করে। এভাবে খামিরযুক্ত রুটি থেকে খামিরহীন রুটিতে পরিবর্তন এল। কমিউনিয়ন রুটির এ পরিবর্তন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গির্জাগুলোর মধ্যে বড় বিরোধের সৃষ্টি করেছিল।

Untitled

দ্য মান্না ছবি: নিকোলা পুসি

এডওয়ার্ড ষষ্ঠের প্রথম সাধারণ প্রার্থনার বইটি পুরো রাজ্যে ইউক্যারিস্ট উদযাপনের জন্য খামিরহীন রুটি ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। এটি রোমান ও গ্রিক গির্জাগুলোর ওয়াফারের অনুকরণে তৈরি। তবে ওয়াফারে সাধারণত ক্রুশবিদ্ধ বা পবিত্র মেষশাবকের ছাপ থাকত। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি ও রাজকীয় প্রার্থনাগৃহগুলোয় ওয়াফার ব্যবহার হতো। লুথারিয়ান পদ্ধতিতে উপাদানগুলোকে ক্রুশের চিহ্ন দিয়ে পবিত্র করা হয়। একটি রুটি অংশগ্রহণকারীকে দেয়া হয়। লাল রঙের পরিবর্তে সাদা মদ ব্যবহার করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা হাঁটু গেড়ে উপাদানগুলো তাদের মুখে গ্রহণ করে, হাতে নয়। ক্যালভিনিস্টিক ধরনটি যতটা সম্ভব সহজ। ফরাসি রিফর্মড গির্জায় রুটি দুটি রূপার থালায় এবং মদ দুটি রুপার কাপে রেখে একটি সাদা লিনেন কাপড়ে আচ্ছাদিত রাখা হয়। ব্রিটিশ নন-এপিস্কোপাল গির্জাগুলোয় অংশগ্রহণকারীরা টেবিলের কাছে আসার পরিবর্তে তাদের আসনে থাকে। রুটি ও মদ ডিকনরা চারপাশে বিতরণ করে দেন। আমেরিকান নন-এপিস্কোপাল গির্জাগুলোয়ও সাধারণত একই পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়। রোমান ক্যাথলিক গির্জার দাবি, রুটি ও মদ যিশুর প্রকৃত শরীর ও রক্তে রূপান্তর হয় পুরোহিতের পবিত্র প্রার্থনার মাধ্যমে। বিপরীতে কোয়াকাররা এটা পালন করে না। তাদের কাছে রুটি ও মদ যিশুর শরীর ও রক্তের প্রতীক। ভক্ত তার মধ্যে বিশ্বাসের মাধ্যমে অংশ নেন।

ইংরেজ জাতির জন্য একটি আধা পবিত্র রুটি রয়েছে হট-ক্রস বান। ইংল্যান্ডে গুড ফ্রাইডেতে এ রুটি লাখ লাখ খাওয়া হয়। এ রুটির উৎপত্তি অস্পষ্ট। বেশির ভাগ অভিধান এটিকে প্রাচীন ফরাসি শব্দ ‘বিগনে’ বা ‘বুগনে’ থেকে উদ্ভূত বলে মনে করে। এক্ষেত্রে রুটিগুলো গোলাকৃতির। তাতে একটি ক্রস চিহ্ন রয়েছে। রুটিগুলো গুড ফ্রাইডে সকালের সময় ভাঙা ও খাওয়া হয়। তবে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, গুড ফ্রাইডেতে রুটি খাওয়ার এ প্রথা ক্যাথলিক থেকে নয়, এসেছে একটি প্রাচীন ধর্মীয় প্রথা থেকে। এটা ছিল আশেরাহর পূজার সঙ্গে সম্পর্কিত। তার সম্মানে পাসওভারের সময় স্যাক্সনরা বিশেষ ধরনের রুটি বানাত ও উৎসর্গ করত। বাইবেলের বুক অব জেরেমিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, তুমি কি দেখছো না তারা কী করছে জুদার শহরগুলোয় এবং জেরুজালেমের সড়কগুলোয়? শিশুরা কাঠ সংগ্রহ করে, পিতারা আগুন জ্বালায় ও মায়েরা তাদের ময়দা মিশিয়ে আকাশমাতার জন্য কেক তৈরি করে। প্রত্নতাত্ত্বিক ড. স্টুকলি দাবি করেছেন, আকাশমাতার সেবা করার জন্য ইস্টারের কেক তৈরি করা হতো আগে। আকাশমাতার পূজা, বিভিন্ন নাম বা অন্য কোনো চিহ্নের মাধ্যমে সর্বত্রই একটি সাধারণ প্রথা। এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যমান। তাকে সাধারণত মেডোনার মতো শিশুসন্তান কোলে অবস্থায় চিত্রিত করা হয়। এ রকম ছবি লুভর মিউজিয়াম ও কোপেনহেগেনের বৃহত্তম এথনোগ্রাফিক মিউজিয়ামেও দেখা যায়। সেখানে চীনা আকাশমাতা তিয়েন-হাও সাদা মাটির মূর্তি দাঁড়ানো। মূলত আকাশমাতার প্রতিকৃতি মেক্সিকো থেকে চীন, মিসর, গ্রিস, ইতালি ও ইংল্যান্ডে একইভাবে খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় রুটি, তার সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক আখ্যান ও প্রবাদ রয়েছে। এমনকি শেকসপিয়ারের নাটকেও দেখা যায় ওফেলিয়া বলছে, প্যাঁচাটি ছিল এক বেকারের কন্যা। কিংবদন্তি আছে, যিশু একবার একটি বেকারির দোকানে গিয়ে রুটি খেতে চেয়েছিলেন। দোকানের মালিক তৎক্ষণাৎ তার জন্য কিছু ময়দা চুলায় ভাজতে দেন। ময়দার টুকরা তৎক্ষণাৎ ফুলে ওঠে এবং কিছুক্ষণ পরে এক বিশাল রুটির আকার ধারণ করে। এ কিংবদন্তি ওয়েলসে এখনো প্রচলিত। তবে সেখানে বেকারের মেয়ে পুরোপুরি অস্বীকার করে যিশুকে ময়দা দেয়ার। তার জন্য তিনি তাকে লিলিথ, লামিয়া, স্ট্রিক্স, রাতের পিশাচ, মারা, স্ক্রিচ-প্যাঁচায় পরিণত করেন।

মিরাকেল স্ট্রিট নাম এসেছে ১৩১৫ সালে সেখানে ঘটে যাওয়া একটি অলৌকিক ঘটনা থেকে। তখন ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। লেইডেন শহরে দুই মহিলার মধ্যে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। তারা ছিলেন প্রতিবেশী। এক মহিলা একটি বার্লি রুটি কিনে সেটি দুই টুকরা করে নিয়ে এক টুকরা রেখে দেয়, কারণ এটিই ছিল একমাত্র খাবার। হঠাৎ তার ক্ষুধার্ত প্রতিবেশী তাকে দ্বিতীয় টুকরাটি দেয়ার অনুরোধ করে। মূল্যও দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সে একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করে এবং দৃঢ়ভাবে শপথ করে বলেছিল যে তার কাছে অন্য কোনো রুটি নেই। যেহেতু তার প্রতিবেশী তাকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, সে শপথ করেছিল যদি আমার বাড়িতে এর বেশি রুটি থাকে, তবে আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে তা পাথরে পরিণত হোক। তারপর তার প্রতিবেশী তাকে ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু যখন প্রথম টুকরাটি খেয়ে ফেলে এবং সে দ্বিতীয় টুকরাটি খুঁজতে যায়। যেটি সে রেখেছিল, সে রুটি পাথরে পরিণত হয়েছিল। সে, পাথর এখন লেইডেন সেন্ট পিটার্স চার্চে রয়েছে। একটি চিহ্ন হিসেবে তারা তা সব বড় ধর্মীয় উৎসবে পবিত্র আত্মার সামনে রাখে।

রুটির ব্যবহার সম্পর্কে সবচেয়ে অস্বাভাবিক ধারণা হলো পাপ খাওয়া। মৃত ব্যক্তির শবদেহের সঙ্গে একটি পুরুষ থাকত, যিনি সামান্য ফিতে একটি রুটি খেয়ে নিতেন। এ খাওয়ার মাধ্যমে তিনি মৃত ব্যক্তির পাপ নিজের ওপর গ্রহণ করতেন। এ রকম অজস্র বিশ্বাস আছে রুটিকে ঘিরে।

মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক ও সাংবাদিক