উনিশ শতকে বাংলায় নীল বিদ্রোহ সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। ১৭৭৭ খ্রিস্টাব্দে লুই বল্লো নামে এক ফরাসি বণিক অবিভক্ত বাংলার চন্দননগরের কাছে দুটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। এরপর ক্যারেলব্লুম নামে এক ইংরেজ বণিক ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আরেকটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। নীল চাষ লাভজনক হওয়ায় ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি কলকাতার রেসিডেন্ট মি. প্রিন্সেপের সঙ্গে নীল সরবরাহের চুক্তি সম্পাদন হয়। ফলে ১৮০৩ সালের মধ্যে কোম্পানির তত্ত্বাবধানে ও অর্থ সাহায্যে বাংলায় নীল চাষ মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে।

নীল চাষ, নীল প্রক্রিয়াকরণ ও তৎসংক্রান্ত অন্যান্য কাজের জন্য বড় ভূমিকা পালন করত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যাকে বলা হতো কনসার্ন। নীলকুঠিগুলো ছিল কনসার্নের অধীনে। ১৮৫৯ সালে বাংলায় প্রায় ৫০০ নীলকর ১৩৪টি কনসার্নে কাজ করত। সবচেয়ে বড় কনসার্নের মালিক ছিল বেঙ্গল ইন্ডিয়া কোম্পানি। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ ও বারাসাতে এ কোম্পানির অনেক কনসার্ন ছিল। রবার্ট ও ওয়ার্টসন কোম্পানি একটি নামকরা কোম্পানি। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী ও পাবনায় এ কোম্পানির সাতটি কনসার্ন ছিল। এ কোম্পানির মোল্লাহাটী কনসার্নের অত্যাচারের ওপর ভিত্তি করেই দীনবন্ধু মিত্রের বিখ্যাত নাটক ‘‌নীলদর্পণ’ রচিত হয়। ঢাকা, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে নীলের একচেটিয়া ব্যবসা ছিল কেপি ওয়াইজের। ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ওয়াইজের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরিটি স্থাপিত হয়েছিল। ঢাকার ওয়াইজঘাট নামটি এ স্মৃতি বহন করছে। নীল তৈরির জন্য যারা নীলকুঠিতে চাকরি করতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন দেশীয় কর্মচারী। নীলকুঠির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল পেশাদার লাঠিয়ালদের দল। প্রয়োজনমতো দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রায়তদের ওপর জোর-জুলুম করার জন্য এদের ব্যবহার করা হতো।

নীল চাষের জন্য নীলকুঠিয়াল বা কুঠির সাহেবদের অত্যাচারে বাংলার কৃষক জর্জরিত হয়ে ওঠেন। চাষীদের চুক্তিতে আবদ্ধ করে তাদের জমিতে নীল চাষ করত। চুক্তি অনুযায়ী চাষীকে দাদন অর্থাৎ কিছু টাকা অগ্রিম দেয়া হতো। উৎপন্ন নীলের দাম চাষী কী হারে পাবেন তারও উল্লেখ থাকত সে চুক্তিপত্রে। কিন্তু দাদনের চুক্তির শর্তগুলো ছিল নীলচাষী বা কৃষকদের স্বার্থবিরোধী। নীলকর সাহেবরা পাইক বরকন্দাজদের সহায়তায় চাষীদের জোর করে তাদের শর্ত অনুসারে নীল চাষ করতে বাধ্য করত। উনিশ শতকের সংবাদপত্রে নীলকুঠির সাহেব বা নীলকরদের অত্যাচারের বিবরণ পাওয়া যায়। তৎকালীন সংবাদপত্রে বিশেষ করে হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ক্যালকাটা রিভিউ, সংবাদ প্রভাকর, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, সোম প্রকাশ, ঢাকা প্রকাশ, গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নীলচাষীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনমত গঠন ও নীল চাষের ফলে দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের প্রতিকার করা। পত্রপত্রিকায় কী ধরনের সংবাদ ছাপা হতো তার দু-একটি আলোচনা করা যাক।

১৮২২ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ‘‌সমাচার চন্দ্রিকা’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ‘‌সমাচার দর্পণ’ পত্রিকা মন্তব্য করেছিল, “‍যে প্রজা নীলের দাদন না লয় তাহাদিগের প্রতি [নীলকরেরা। ক্রোধ করিয়া থাকেন।.... নীলের দাদন যে প্রজা লয় তাহার মরণ পর্যন্ত খালাস নাই, যেহেতু হিসাব রফা হয় না। প্রতি সনেই দাদন সময়ে বাঁকীদার কহিয়া ধরিয়া কয়েদ রাখে। তাহাতে প্রজারা ভীত হইয়া হাল বকেয়া বাকী লিখিয়া দিয়া দাদন লইয়া যায়।’’ (সমাচার দর্পণ, ১০ মে ১৮২২)। কীভাবে কৃষককে জোর করে দাদন নিতে বাধ্য করা হতো সে বিষয়েও ‘‌সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল—

“‍মফস্বলে কোন কোন নীলকর প্রজার উপর দৌরাত্ম্য করেন, তাহার বিশেষ কারণ এই যে, প্রজা নীলের দাদন না লয়।.... খালাসীদিগকে কহিয়া রাখেন যে ঐ সকল প্রজার গরু নীলের নিকট আইলে সে গরু ধরিয়া কুঠিতে আনিবা। তাহারা ঐ চেষ্ঠাতে নীলের জমির নিকট থাকে, কিন্তু যখন গরু নীলের নিকটে আইসে যদ্যপি নীলের কোন ক্ষতি না করে তথাপি তখনই সে গরু ধরিয়া কুঠিতে চালান করে। সে গরু এমত কয়েদ রাখে যে তৃণ ও জল দেখিতে পায়না। ইহাতে প্রজালোক নিতান্ত কাতর হইয়া কুঠিতে যায়।’’ (সমাচার দর্পণ, ১০ মে ১৮২২)।

222

কারখানার তাকে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে নীলছবি: ওল্ড ইন্ডিয়ান ফটোজ

নীলকরেরা গ্রামের নিরীহ প্রজাসাধারণদের বাধ্যতামূলকভাবে নীল চাষ করাত। কারণ প্রজারা নীল চাষে মোটেই আগ্রহী ছিল না। কেন প্রজারা নীল চাষে আগ্রহী নয়? সে বিষয়ে মন্তব্য করেছিল ‘‌তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’। এ পত্রিকায় ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে (১৭৭২ শকাব্দ) প্রকাশিত হতো ধারাবাহিক রচনা ‘‌পল্লী গ্রামস্থ প্রজাদিগের দুরবস্থা’।

উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলায় কোম্পানির আইনকে উপেক্ষা করে নীলকুঠির অধ্যক্ষরা নীলচাষীদের ওপর বিবেকবর্জিত অত্যাচার ও অবিচার চালাতে থাকে। ‘‌নীলকরদের দৌরাত্ম্যে রাইয়ত লোকদের সর্বনাশ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল ‘‌সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকা। পত্রিকাটি বলেছিল, “নীলকরদিগের দৌরাত্ম্যে জেলার প্রজারা আর কতকাল যন্ত্রণা ভোগ করিবেক? আমরা এই বাঙ্গাল গবর্নমেন্টের অধীনস্থ প্রায় সমস্ত জিলার সংবাদ লইয়া থাকি, তাহাতে প্রায় সমস্ত স্থানেই নীলকুঠির সমান দৌরাত্ম্যই দেখিতে পাই।”

নীলকরদের শোষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নীলচাষীদের ওপর শারীরিক অত্যাচার। মাঝে মাঝে নীলকরদের লাঠিয়ালরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে নীল চাষে অনিচ্ছুক চাষীদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত, গরু-বাছুর কেড়ে নিত। জোয়ান পুরুষদের ধরে নিয়ে নীলকুঠির অন্ধকার ঘরে মাসের পর মাস আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালাত। চাষী মেয়েদের ওপরও অত্যাচার করা হতো। পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক অত্যাচারের ঘটনার মধ্যে একটি ছিল সিরাজগঞ্জের গাবগাছি গ্রামের। পত্রিকায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানা যায়, এক নীলকর ১০০ লাঠিয়াল নিয়ে গাবগাছি গ্রামে যায়। সেখানকার লোকেরা নীল চাষ করতে অস্বীকার করায় লাঠিয়ালেরা তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়, ১০০ গরু-বাছুর নিয়ে যায় এবং গ্রামবাসীদের নির্দয়ভাবে প্রহার করে। ফলে একজন নিহত হয় ও অন্যরা গুরুতরভাবে আহত হয়। এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলে সিরাজগঞ্জের সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট কেবল তিনজন লাঠিয়ালকে সামান্য দণ্ড দিলেন। এমনিভাবে কুষ্টিয়ায়ও এক নীলকুঠিতে রায়তদের আটক করে ৬০ বার বেত্রাঘাত করা হয়। উনিশ শতকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘‌ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় নীলকরদের উল্লেখ করেছে ‘‌দ্বিতীয় গবর্নমেন্ট’ হিসেবে। এ প্রসঙ্গে ‘‌ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকার ব্যাখ্যা ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ২৮ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ‘‌ঢাকা প্রকাশ’ পত্রিকায় ‘‌ডিকেট’ নামক জনৈক নীলকর স্থানীয় জমিদারদের ওপরও উৎপীড়ন করেছিলেন তার বিবরণ পাওয়া যায়। বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছিল, “‍যশোহরের অন্তঃপাতিরায় গ্রামে তাঁহার (ডিকেট) কয়েকটি নীলের কুঠি আছে। তিনি এই সমস্ত কুঠির নিকটবর্তী ভূমি সকল জমা করিয়া লইয়া তাহাতে নীল বুনিবার নিমিত্তে বহু কাল পর্যন্ত চেষ্টা পান। কিন্তু ভূম্যধিকারীগণ তাঁহার প্রস্তাবে সম্মত হন না। এই নিমিত্তে তিনি তাঁহাদিগের প্রতি নানা প্রকার অত্যাচার করিতে আরম্ভ করেন। ভূম্যধিকারীগণ ডিকেটের অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া অগত্যা তাঁহাকে যৎ কিঞ্চিৎ ভূমি ছাড়িয়া দেন।’’

নীলচাষীদের ওপর এ ধরনের অমানুষিক অত্যাচার ও বেআইনি কার্যকলাপ যে নীলকররা অবাধে চালিয়ে যেতে পেরেছিল; তার কারণ কোম্পানির আইন ও আদালত ছিল নীলকরদের পক্ষে। কারণ ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ সাহেবরা নীলকুঠিতে অবসর যাপন করতে বেশ পছন্দ করতেন। এ সম্বন্ধে ‘‌সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার ১২৫৮ বাংলা সনের ২৭ চৈত্র সংখ্যার সম্পাদকীয়তে মন্তব্য করা হয়েছিল, “নীলকুঠি সংক্রান্ত নিষ্ঠুরতা ও হত্যা ঘটিত মকদ্দমা কতবার সুপ্রীম কোর্টে উপস্থিত হইয়াছে। সদর নিজামতের দফতর খানা এ বিষয়ে নথিতে পরিপূর্ণ রহিয়াছে। কিন্তু শাদা হাকিমের দ্বারা শাদা নীলকরেরা কোনমতেই শাসিত হইবেন না। কালা ব্যতীত এই জ্বালা নিবারণ হইবার নহে।”

নীলকুঠির সাহেবদের পক্ষেও দু-একটি পত্রিকা লিখেছিল। ‘‌ঢাকা নিউজ’ পত্রিকাটিকে এ সময়ে নীলকরদের কার্যকলাপ সমর্থন করতে দেখা যায়। নীলকুঠির অধ্যক্ষ আলেকজান্ডার ফর্বস এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। নীলকরদের স্বার্থ সংরক্ষণে পত্রিকাটি খুবই তটস্থ ছিল।

কিন্তু নীলকরদের শেষ রক্ষা হয়নি। উনিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলার সমগ্র নীলচাষীদের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। বিদ্রোহ এতটাই প্রবল আকার ধারণ করে তাতে ব্রিটিশ সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফলে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে সরকার নীল চাষসংক্রান্ত বিষয় তদন্তের জন্য নীল কমিশন গঠন করে। নীল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার নীল চাষ কৃষকদের ইচ্ছাধীন বলে আদেশ জারি করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিদ্রোহ থেমে থাকেনি। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে এবং ‘নীল চাষ বন্ধ কর’ দাবি আদায় হওয়ার পর ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে বাংলায় নীল চাষ কৃষকরা বন্ধ করে দেন।

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়