ভেনিস শহরের সূচনা পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে, ঠিক যখন রোমান সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। সে সময় আকুইলিয়া ও পাদুয়ার মতো ইতালির উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সাগরের দিকে পালিয়ে যায়। পো ও পিয়াভ নদীর পলি জমে গড়ে ওঠা দ্বীপগুলো তাদের আবাসস্থল হয়ে ওঠে। ভেনেটি নামে পরিচিত এ বাসিন্দারা একজন নির্বাচিত ডুক্সের (লাতিন ভাষায় যার অর্থ নেতা, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘ডোজ’ শব্দে রূপান্তর হয়) নেতৃত্বে এ দ্বীপগুলোয় নিজেদের সমাজ প্রতিষ্ঠা করে নেয়। প্রথম ডুক্স নির্বাচিত করা হয় ৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে।
অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের কৌশলগত গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ভেনে বাণিজ্য কেন্দ্র ও জোট প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। নবম শতাব্দীতে ভেনিস শহরের পূর্ব দিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও পশ্চিমে ফ্রাংক রাজ্যের অবস্থান ছিল। ৮১৪ খ্রিস্টাব্দে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি শহরটিকে স্বায়ত্তশাসন বজায় ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার সুযোগ এনে দেয়। ১০৮২ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য থেকে কর মওকুফের সুবিধার ফলে মিসরের সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ মসলা বাণিজ্য সহজতর হয়। সামন্তবাদী সংঘাতে লিপ্ত ইউরোপীয় অঞ্চলে ভেনিস একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে। পরিচিতি পায় ‘লা সেরেনিসিমা’ নামে। এখানকার প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল অপরিহার্য। এ ঐক্য ভেনেটিদের মধ্যে ভেনিসের প্রতি আনুগত্য সৃষ্টি করে।
ভেনিস দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানপিপাসুদের একটি আশ্রয়স্থল ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ভেনেটিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শহরটি একটি প্রাণবন্ত শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর হয়। বিশেষ করে রেনেসাঁর সময়ে ভেনিসে উল্লেখযোগ্য কিছু ব্যক্তিত্বের দেখা মেলে, যারা প্রাচীন গ্রন্থ ও জ্ঞান পুনরুদ্ধার এবং প্রচার করতে চেয়েছিলেন।
এ যুগের অন্যতম প্রভাবশালী পণ্ডিত ছিলেন পেত্রার্ক, যিনি ১৩৫১ সালে ভেনিসে আসেন। গ্রিক ভাষা শেখার ও ক্ল্যাসিক্যাল জ্ঞান অনুবাদ করার তার প্রচেষ্টা রেনেসাঁর ভিত্তি স্থাপন করে দিয়ে যায়। পেত্রার্কের সঙ্গে ভেনিসের শাসক আন্দ্রেয়া দাদোঁলার বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ফলে শহরটিতে একটি গতিশীল বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। যদিও পরে একটি বিরোধের কারণে তাকে শহরটি ত্যাগ করতে হয়। তবু জ্ঞানের বিকাশে পেত্রার্কের প্রভাব যুগের পর যুগ ধরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কলুচ্চিও সালুতাতির মতো ভেনিসের আরো অনেক ভবিষ্যৎ পণ্ডিতদের তিনি অনুপ্রাণিত করতে পেরেছেন।
১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দে ফ্লোরেন্সে আসেন বাইজেন্টাইন কূটনীতিক ম্যানুয়েল ক্রাইসোলোরাস। সে সময় ইতালিজুড়ে গ্রিক অধ্যয়নে একটি পুনর্জাগরণ ঘটে। পণ্ডিতদের মধ্যে প্রাচীন জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জাগে। ফলে ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য ও দর্শন সংগ্রহ এবং অনুবাদের উত্থান ঘটে। এর বিকাশ ঘটার পেছনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন পগজিও ব্রাচিওলিনি। তিনি ছিলেন প্যাপাল কুরিয়ার একজন বিশিষ্ট লেখক। পাশাপাশি জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডে ব্যাপক ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও ছিল তার। বিভিন্ন মঠের গ্রন্থাগারগুলোয় অনুসন্ধান করে তিনি উন্মোচন করেন ভুলে যাওয়া অনেক পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে ছিল লুক্রেটিয়াসের দে রেরাম ন্যাচুরার মতো বিপ্লবী গ্রন্থ, যা খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপলের পতন ভেনিসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে শহরটিতে বিপুলভাবে গ্রিক পণ্ডিতদের আগমন শুরু হয়। তারা তাদের সঙ্গে নিয়ে আসে প্রচুর প্রাচীন গ্রন্থ ও জ্ঞান। ভেনিস হয়ে ওঠে ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য সংরক্ষণ ও প্রচারের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে ১৪৪৭-৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে পোপ পঞ্চম নিকোলাস ভ্যাটিকান গ্রন্থাগারকে নতুন করে সাজান। তিনি গ্রন্থ সংগ্রাহক ও পণ্ডিতদের আমন্ত্রণ জানান এবং বিদেশ থেকে নতুন বই সংগ্রহে লোক পাঠান। তার সময়ে গ্রন্থাগারের সংগ্রহ ৩৪০ থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৬০ হয়। গ্রিক রচনাগুলো অনুবাদে পজিও, জিওভানি অরিসপা ও লরেঞ্জো ভাল্লার মতো পণ্ডিতরা কাজ করেন। তার প্রচেষ্টায় ভ্যাটিকান গ্রন্থাগার আজ বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থাগার, যেখানে ৬০ হাজার পাণ্ডুলিপি ও আট হাজার পুস্তক সংরক্ষিত আছে।
এ পণ্ডিতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাসিলিওস বেসারিয়ন। একজন খ্যাতনামা পণ্ডিত ও কূটনীতিক। তিনি গ্রিক ও লাতিন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার বিশাল গ্রন্থাগার ভেনিসের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের একটি শক্ত ভিত্তি হয়ে ওঠে। তিনি প্রাচীনকালের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সংরক্ষণ করতেন। তার এ প্রচেষ্টা শুধু যে গ্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো রক্ষা করেছে তাই নয়, বরং পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ধারণার বিনিময়কেও সহজতর করেছে। বেসারিয়ন সক্রিয়ভাবে অ্যারিস্টটলীয় ও প্লেটোনিক দর্শনের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেন। পরে এ দর্শন রেনেসাঁর চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। তার এ প্রচেষ্টা রেনেসাঁর অগ্রগতিতে গভীর প্রভাব ফেলে।
গ্রিক পণ্ডিতদের উপস্থিতি ভেনিসের একাডেমিক পরিমণ্ডলকে উজ্জীবিত করে এবং এর প্রভাব গ্রন্থাগারের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ভেনিসের স্থানীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা সে সময়ের বিস্তৃত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবাহে অবদান রাখেন। এ জ্ঞানের প্রবাহ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ভেনিস শহরকে একটি জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে দৃঢ় করে।
পাশাপাশি পনেরো শতকের মাঝামাঝি একটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব শুরু হয় মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারের মাধ্যমে। এ আবিষ্কার সাহিত্য ও জ্ঞানের দৃশ্যপট পরিবর্তন করে দেয়। মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করেন জোহানেস গুটেনবার্গ। ১৪৫০ সালের মধ্যে গুটেনবার্গ জার্মানির মাইনজে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন ও বাইবেলের ১৮০টি কপি মুদ্রণ করেন। হাতে লেখার চেয়ে মুদ্রণ অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়, যা জ্ঞানের দ্রুত বিস্তার ঘটাতে সক্ষম।
ভেনিস দ্রুতই মুদ্রণযন্ত্রের উদ্ভাবনকে গ্রহণ করে এবং এর সম্ভাবনা বুঝতে পারে। এ উদ্ভাবন যে সাহিত্যকে গণমানুষের জন্য আরো সহজলভ্য করে তুলতে পারে, তা ভেনিস অনুধাবন করে। ১৪৬৯ সালে ভেনিসের সরকার জোহানেসকে মুদ্রণশালার একচেটিয়া অধিকার প্রদান করে। দ্রুতই মুদ্রণশালার বিস্তার ঘটে এবং ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য, ধর্মীয় গ্রন্থ ও বৈজ্ঞানিক কাজের একটি বৈচিত্র্যময় প্রকাশনার সূচনা হয়। এভাবে সমাজে জ্ঞানের বিস্তার ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত হয়।
এ উদীয়মান শিল্পের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন এরহার্ড র্যাটডল্ট, যিনি ১৪৭৫ সালে একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। র্যাটডল্টের বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার মধ্যে অন্যতম ছিল ১৪৮২ সালে ইউক্লিডের দি এলিমেন্টসের প্রথম মুদ্রিত সংস্করণ। আদেলার্ড সংস্করণের ভিত্তিতে মুদ্রিত এ সংস্করণে প্রথমবারের মতো ডায়াগ্রাম যুক্ত হয়, যা জ্ঞান প্রচারে মুদ্রণযন্ত্রের বিপ্লবী সম্ভাবনাকে তুলে ধরে।
বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা উন্নত গণিতের জ্ঞান প্রয়োজন করতে থাকেন। উত্তর ইতালির স্কুলগুলোয় ফিবোনাচ্চির লিবার অ্যাবাসি পড়ানো হতো। এটি হিসাব, বীজগণিত ও জ্যামিতির প্রাথমিক ধারণা শেখাত। তবে সংখ্যাতত্ত্ব ও অন্যান্য জটিল ধারণাগুলো কয়েক শতাব্দী ধরে অনাদৃত থেকে যায়। পনেরো শতকে লুকা পাচিওলি ভেনিসের সান আন্তোনিও ডি ক্যাসটেলোর গ্রন্থাগারে একটি পাণ্ডুলিপি খুঁজে পান। তিনি এগুলো তার সুম্মা ডি এরিথমেটিকা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করে সবার সামনে তুলে ধরেন। এভাবে ভেনিস শহর ও মুদ্রণযন্ত্র ক্ল্যাসিক্যাল রচনাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করার মাধ্যমে একটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে তোলে। পরবর্তী বিজ্ঞানীরা পূর্বসূরিদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে ভুলগুলো সংশোধন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন।
ভেনিসের প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন ও পণ্ডিতদের প্রতি প্রতিশ্রুতি কেবল সাহিত্য প্রবেশাধিকারকে গণতান্ত্রিকই করেনি, বরং অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে একটি উন্মাদনা জাগিয়ে তোলে। ১৫০০ সালের মধ্যে আগের সুশৃঙ্খল ও সীমিত বিশ্বের ধারণা ভেঙে পড়তে শুরু করে। জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হয়। মানুষ তাদের অবস্থান নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হয়। ইউক্লিড, গ্যালেন ও টলেমির মতো প্রাচীন পণ্ডিতদের কাজ নতুন মুদ্রিত সংস্করণের মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করলে সেগুলোর ত্রুটিও প্রকাশিত হয়। ষোলো শতকে বিজ্ঞানীরা এসব ত্রুটি সংশোধন করে প্রকৃতির গভীর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নতুন তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। এটি সতেরো শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অসাধারণ আবিষ্কারগুলোর ভিত্তি তৈরি করে।
মিনহাজুল আবেদীন: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা









