ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর হাতে আদমশুমারির সূচনা ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তবে পুরো সময়টায় জনগণনার প্রক্রিয়া একটি অস্থায়ী আইনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সত্যি বলতে, কাজটির জন্য আইনগত কোনো সিদ্ধান্তকেই কঠোরভাবে অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তবু এটি প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে। আর তার মূল উদ্দেশ্য ছিল আদমশুমারির কর্মী এবং গণনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আইনি দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার কাঠামো নির্মাণ। জনগণনার কাজে নিযুক্ত কর্মী, বিশেষ করে নিম্নস্তরের কর্মীরা সরকারি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সরকারি কোনো শৃঙ্খলার মধ্যে ছিল না তারা। জনগণনার কাজ ছিল অনেকটাই স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক। ফলে তাদের শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার স্বার্থেই দরকার ছিল আইনি কাঠামোর। সেই প্রয়োজনীয়তা নানা সময়ে শাসকগোষ্ঠীর নীতিনির্ধারকদের কথায় উঠে এসেছে।

প্রাথমিকভাবে আদমশুমারির কাজ প্রথম শুরু হলে এটি ঘিরে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। আইনি কাঠামো এক্ষেত্রে গুজব থেকে ঘটনাকে আলাদা রাখার কাজ করেছে। অনেক এলাকায় আদমশুমারিকে নতুন কোনো কর আরোপের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হতে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ হয়ে উঠেছিল সন্দেহপ্রবণ এবং অসহযোগী। এমনকি কিছু এলাকায় তো এটাও বিশ্বাস করা হতো যে ব্রিটিশরা ভারতীয় নারীদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য জনগণনা করছে। ফলে মানুষ শুধু সংশয়ীই ছিল না; আদমশুমারির প্রতি শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব রেখেছিল। এমনকি মাঝে মাঝে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীকেও ডাকা হয়েছিল, যদিও সৌভাগ্যক্রমে এমন ঘটনা বেশি ঘটেনি। আদমশুমারির প্রতি সাধারণ জনগণের ধারণা গভীর সন্দেহ থেকে উদাসীনতায় পরিণত হয়। এ পরিস্থিতিতে একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন সময় আলোচিত হয়েছে। যেহেতু আদমশুমারির কমিশন সম্পূর্ণ অস্থায়ী ছিল, তাই আইনও অস্থায়ী ছিল। উদাহরণস্বরূপ ১৮৮০ সালের জনগণনা আইনে বলা হয়, ‘যেহেতু ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ ভারতের জনগণনা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন, তাই এ আইন প্রণয়ন করা হলো।’

ভারতে জনসংখ্যা গণনার দীর্ঘদিনের রীতি হলো প্রতিবার জনগণনার জন্য আইন প্রণয়ন করা। এ আদমশুমারি আইন ছিল অস্থায়ী এবং জনগণনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যেত। প্রথমবারের মতো ১৯০৯ সালে জনগণনা কমিশনার স্যার এডওয়ার্ড গেইট একটি স্থায়ী আইন প্রবর্তনের প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। বিষয়টি ১৯২০ সালে পুনরায় বিবেচনা করা হয়। অস্থায়ী আইনটির নিজস্ব কিছু সুবিধা ছিল। এটি গ্রেট ব্রিটেনের রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণও ছিল। ১৯৩১ সালের ভারতের জনগণনা রিপোর্টে জনগণনা কমিশনার হাটন একটি স্থায়ী আইন প্রণয়নের জন্য জোরালোভাবে সুপারিশ করেন। হাটনের সুপারিশের সময় বয়েলি ও রবার্টসনের একটি রিপোর্টও এ ধরনের স্থায়ী আইন প্রণয়নের পক্ষে শক্তি জোগায়। স্থায়ী আইন প্রণয়নের বিষয়টি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যেমন প্রতি পাঁচ বছরে একটি আদমশুমারি করা এবং একটি স্থায়ী কর্মী বাহিনী গঠন করা।

পাসকৃত আদমশুমারি আইন ছিল সংক্ষিপ্ত এবং এতে অনেক বিষয়ে স্পষ্ট কোনো আলোচনা ছিল না। এতে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি যে সব গণনা এক রাতের মধ্যে শেষ করতে হবে। এটি গণনার পদ্ধতি সম্পর্কেও কিছু বলেনি। জনগণনা ছিল বাস্তব, যার মানে হলো এটি নির্দিষ্ট একটি সময়ে ভারতে উপস্থিত সব ব্যক্তির তালিকা তৈরির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জনগণনার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করা রেওয়াজ ছিল। জনগণনা কমিশনার জেএইচ হাটন প্রস্তাব করেছিলেন যে আদমশুরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালনা করা উচিত। হাটন একটি স্থায়ী আইন প্রণয়নের পক্ষে ছিলেন প্রধানত একটি স্থায়ী জনগণনা বিভাগ এবং পাঁচ বছর অন্তর আদমশুমারি করার জন্য। অন্যদিকে বয়েলি-রবার্টসন রিপোর্ট একটি অর্থনৈতিক জনগণনা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে স্থায়ী আইন প্রণয়নের পক্ষে ছিল। স্থায়ী আইন প্রণয়নের পক্ষে হাটনের যুক্তি ছিল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি এড়ানো। যেহেতু ভারত একটি নতুন সংবিধান তৈরির পথে ছিল তখন, হাটন বিশ্বাস করেছিলেন যে নিয়মিত জনগণনার বিধান ভবিষ্যৎ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা ভালো হবে।

ব্যাপক অর্থনৈতিক জরিপের প্রস্তাব, একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক কর্মী বাহিনী গঠন এবং একটি অন্তর্বর্তী পাঁচ সাল মেয়াদি জনগণনার ধারণা সরকার খরচের অজুহাতে প্রত্যাখ্যান করেছিল। স্থায়ী জনগণনা আইন প্রণয়নের আবেদনও শেষ পর্যন্ত গৃহ মন্ত্রণালয়ের সচিব এফএইচ পাকল দ্বারা খারিজ করা হয়েছিল। ১৯৩৮ সালের ২৩ নভেম্বরের একটি নোটে পাকল লিখেছিলেন, ‘১৯৪১ সালের পরবর্তী ১০ বছরে, যখন পরবর্তী জনগণনা হওয়ার কথা, এমন অনেক সাংবিধানিক পরিবর্তন ঘটতে পারে যা আমরা পূর্বানুমান করতে পারি না এবং এখন যদি আমরা স্থায়ী আইন প্রণয়ন করি, ১৯৫১ সালের জনগণনার আগেই এতে ব্যাপক সংশোধনের প্রয়োজন হবে। স্থায়ী আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে আরেকটি বাস্তব যুক্তি হলো আইনসভায় এমন আইন প্রণয়নের অপ্রিয়তা, যা বেশকিছু পূর্বানুমানকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিয়ে প্রণীত।’ এ ব্যাপারে সচিবের সিদ্ধান্ত ছিল: ‘আমার সিদ্ধান্ত হলো, আমাদের একটি অস্থায়ী আইনের সঙ্গে থাকার প্রয়োজন।’ গৃহ মন্ত্রণালয়ের সদস্য আরএম ম্যাক্সওয়েলও সচিবের সঙ্গে একমত ছিলেন। ফলে ভারত অস্থায়ী আইনের অধীনে চলতে থাকে।

জনগণনা আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে অনুমোদিত আইন প্রণয়নের ব্যাপক সুযোগ ছিল। প্রাদেশিক সরকারগুলোও এ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারত। প্রাদেশিক সরকারগুলোকে জনগণনাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। তবে তাদের সম্মতি পাওয়ার আগে এ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়নি। সময় বাঁচানোর জন্য ভারতের সরকার সাধারণত প্রাদেশিক সরকারগুলোকে জানাত যে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কোনো আপত্তি না জানালে কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিক নোটিস জারি করবে। এ ক্ষমতা প্রদান অনুযায়ী প্রাদেশিক সরকারগুলো জনগণনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ করতে এবং জনগণনাবিষয়ক অন্যান্য সিদ্ধান্ত নিতে পারত। ব্রিটিশ শাসনামলের পুরো সময়জুড়ে আদমশুমারি একটি অস্থায়ী আইনের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যদিও জনগণনা বিভাগের কর্মকর্তারা স্থায়ী আইন প্রণয়নের পক্ষে ছিলেন। শুধু স্বাধীনতার পরই এটি একটি স্থায়ী আইনের দ্বারা শক্তভাবে সমর্থিত হয়েছিল।

ঔপনিবেশিক আমলে শাসকগোষ্ঠী আদমশুমারি পরিচালনার উদ্দেশ্য কেবল এখানকার জনসংখ্যা কিংবা তাদের পরিচয় উদ্ধার ছিল না; অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে এখানকার অর্থনীতি। আদমশুমারির মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠীর হাতে সামগ্রিক ধারণা তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সম্পদ, জনগণের পেশা ও আয় নিয়েও। এর মধ্য দিয়ে ভারতে পশ্চিমা পণ্যের বাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে তারা ব্যবহার করেছে। এজন্য দেখা যায়, ১৮৬০ সালে বিলাত থেকে ভারতে সুতিবস্ত্রের আমদানি যেখানে ছিল ৯৬ লাখ পাউন্ড স্টার্লিং, তা ১৮৮০ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৭০ লাখ পাউন্ড। ১৯০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ কোটি পাউন্ড। এভাবে আমদানি বৃদ্ধির অর্থ হলো, দেশীয় শিল্প দেশের ও বিদেশের বাজার হারাল। বস্ত্র শিল্পে যুক্ত সব শিল্পী, কারিগর, শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেকে বাধ্য হয়ে চাষ-আবাদ শুরু করেন। এর ফলেই কিন্তু মুক্তি ছিল না। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী নানা সময়ে নানা কারণে কর আরোপ করেছে। মানুষ সেই কর পরিশোধ করতে না পেরে ঘর ও গ্রাম ছেড়েছে, এমন আখ্যান বেশুমার। রয়েছে মন্বন্তরের কালো তিলক। আর শাসকগোষ্ঠীর এমন নীতি গ্রহণে প্রভাবিত করেছে আদমশুমারি। তবে আইনি ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য যেটাই হোক, ব্রিটিশ জরিপ পরবর্তী সময়ে দালিলিক রূপ লাভ করেছে। ব্রিটিশ আদমশুমারিগুলোকে প্রামাণ্য হিসেবেই গ্রহণ করেন ঐতিহাসিকরা।

মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক