ঔপনিবেশিক শাসন যখন সংকুচিত হয়ে আসছিল, তখন পৃথিবীজুড়েই শুরু হয় পরিচয়বাদী রাজনীতি। ভাষা, ধর্ম, নৃতাত্ত্বিক কিংবা আঞ্চলিক পরিচয় নতুন দ্যোতনা তৈরি করে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর থেকে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের আগ পর্যন্ত আসামের রাজনীতিতে বহুমাত্রিক গতিমুখ দৃশ্যমান ছিল। ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোট ছিল সে দীর্ঘ সমীকরণের ফল। বিষয়টিতে আলো ফেলেছেন ড. আশফাক হোসেন তার ‘Three Bengali Districts and the Making and Unmaking of Assam-Bengal Borders, 1874-1947’ শিরোনামে প্রকাশিত গবেষণায়। তার দাবি, সিলেটের গণভোটে একই সঙ্গে ধর্মীয় আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বহুত্ববাদ, ও নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদের রাজনীতি ক্রিয়াশীল ছিল।
গত শতাব্দীর বিশের দশকে আসামের উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণী বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। যদিও খান বাহাদুর আলাউদ্দিন চৌধুরী ও মৌলভী দেওয়ান ওয়াসিল চৌধুরী বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করেছিল। সে সময় তাদের শঙ্কা ছিল জেলাগুলোর মুসলমানরা এটা মেনে নেবে না। সিলেটের রাজনীতিবিদ আবদুল মতিন চৌধুরী ১৯২৪ সালেই আসাম মন্ত্রিসভায় চিঠি মারফত জানান, সিলেটের মুসলমানরা বাংলার অংশ হতে চায় না। বরং এটা কেবল সিলেটি হিন্দুদের দাবি। ফলে শিগগিরই সিলেটের মুসলমানরা বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতায় আগ্রহ হারান। এ রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে হিন্দুদের দ্বারা। এক্ষেত্রে আবদুল মতিন চৌধুরীর ভূমিকাও ছিল ব্যাপক। কারণ তিনি স্থানীয় মুসলিম রাজনীতিকদের বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরুদ্ধে জমায়েত করেছেন। এমন পরিস্থিতিতেই আবির্ভাব ঘটে মুহম্মদ সাদুল্লার। তিনি আসামের অভিজাত মুসলমান। আসামের আইনসভায় দ্রুত আধিপত্য স্থাপন করতে সক্ষম হন তিনি। সাদুল্লা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখতে চাচ্ছিলেন। মৌলভী দেওয়ান ওয়াসিল চৌধুরী নিজেই বাঙালি থেকে সিলেটি বলাকে একটা স্বতন্ত্র পরিচয়বাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেন। সিলেটি বলতে সাধারণত সিলেটের মুসলিম বোঝানো হতো সে সময়ে। হিন্দু ও মুসলিম বিভাজনের নতুন মাত্রা পেল।
তবে আসামের রাজনীতিবিদরা ত্রিশের দশকে আসলে সিলেটকে ছেড়েই দিতে চাচ্ছিলেন। বাংলাভাষী সিলেটিদের তারা আসামের রাজনীতিতে বৃহত্তর স্বার্থ উদ্ধারে প্রতিবন্ধকতা মনে করতে লাগলেন। জোড়াহাট সার্বজনিক সভায় একটা প্রস্তাব পাস হয় সিলেটকে আসাম থেকে পৃথক করার পক্ষে। আসামের পত্রিকাগুলো প্রস্তাবটিকে সমর্থন দেয়। ১৯৩৩ সালে আসাম অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, সিলেট যতদিন পর্যন্ত আসামের সঙ্গে থাকবে, ততদিন আসামের নিজের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, হাইকোর্ট এমনকি ভাষা পর্যন্ত থাকবে না। আসামে বেড়ে ওঠা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর থেকে নিজেদের পৃথকভাবেই হাজির করতে চেয়েছেন। ১৯৩১ সালে ইন্ডিয়ান রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে আসামের প্রতিনিধি চন্দ্রধর বারোয়াহ ভাষার ভিত্তিতে আসামকে পুনসংজ্ঞায়নের প্রস্তাব তোলেন; সেখানে সিলেটকে পৃথক করার কথা বলা হয়। এর ভিত্তিতেই ১৯৩৪ সালে রিফর্ম অফিস বরাবর লেখা হয় চিঠি। একই বছরের ডিসেম্বরে বারোয়াহর সঙ্গে কথা বলে ব্রিটিশ সরকার। তাকে বোঝানো হয়, ব্রিটিশ সরকার সিলেটকে কেন আসামের সঙ্গে রাখতে চায়। ব্রিটিশ সরকারের এ অবস্থান ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অপরিবর্তিত ছিল। তবে আমলাদের মধ্যে সিলেট ও কাছাড়কে আসাম কিংবা বাংলায় হস্তান্তর করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে আসাম, কলকাতা, দিল্লি ও লন্ডনে। সিলেটের অবস্থান নিয়ে মুসলমানদের মতামত ছিল বিভক্ত।

১৯৩৮ সালে গঠিত আসামের মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সাদুল্লা
ছবি: আতফুল হাই শিবলির গ্রন্থ ‘আবদুল মতিন চৌধুরী’
১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার সিলেটে গণভোটের আহ্বান করে। সিলেট কোন অংশের সঙ্গে যুক্ত হবে তার সিদ্ধান্ত নেবে জনগণই। যদি গণভোটের রায় বাংলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে হয়, তাহলে বাংলা ও পাঞ্জাবের মতো একটা বাউন্ডারি কমিশন গঠন করা হবে। মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলো হস্তান্তর করা হবে পূর্ব বাংলার কাছে। অমলেন্দু গুহের দাবি, গণভোট আসামের নেতাদের দাবি ছিল সিলেট থেকে মুক্তি লাভ। তারা আর সিলেটকে আসামের সঙ্গে রাখতে চায় না। সিলেটকে ছেড়ে দিতে পারলে আসামের জন্য ভাষাগতভাবে একটা একক পরিচয় দাঁড় করানো সুবিধা হয়। তবে কংগ্রেস ও হিন্দু অভিজাতরা এ সময় চাচ্ছিলেন সিলেটকে আসামের ভেতরে রাখতে। মুসলিম লীগ বিষয়টি নিয়ে ছিল বিভাজিত। আসাম মুসলিম লীগের প্রাদেশিক প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার সাদুল্লা ছিলেন বিপরীত অবস্থানে। দুই সিলেটি রাজনীতিক মাহমুদ আলি ও আবদুল মতিন চৌধুরী ভাসানীকে সমর্থন দেন। এ বিভাজনের কারণেই এর আগে মুসলিম লীগ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারেনি। এদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিদের পাঠান সিলেটকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে।
এমন সময়ে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দুদের মধ্যে এমন ব্যক্তি খুব কমই ছিলেন, যিনি সিলেটকে পূর্ব বাংলার সঙ্গে একত্র করতে চান। এমনকি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কমিউনিস্ট ও মুসলিম নানকররাও চাচ্ছিলেন আসামের সঙ্গে সিলেটকে যুক্ত রাখতে। দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ তার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘স্থানীয় কমিউনিস্টরা মুসলিম লীগ নেতাদের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক রেখেছিলেন। কিন্তু গণভোটের দিনগুলোয় তা ভেঙে যায়।’ কমিউনিস্ট নেতা চঞ্চল শর্মা লিখেছেন, ‘আমাদের কৌশল ছিল ভারতের পক্ষে কিছু মুসলিম ভোট সংগ্রহ করা; কিন্তু আমরা ব্যর্থ হই।’
কমিউনিস্টরা ভারতে যোগ দেয়ার পক্ষে থাকলেও দলিত হিন্দুরা ছিলেন মুসলিম লীগের পেছনে। সিলেটের গণভোটে যোগেন মণ্ডল দলিত হিন্দুদের সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আইনমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন সিলেট সফর করেন। তিনি কমিউনিস্টদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি দেন। অবশ্য বিরাট মণ্ডলের মতো কোনো কোনো দলিত হিন্দু ভারতে থাকার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু তাদের সে অর্থে প্রভাব ছিল না। কংগ্রেসের রাজনীতিক সুহাসিনী দাস দাবি করেছেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যেহেতু শত শত বছর ধরে নিম্ন হিন্দুদের চেপে রেখে এসেছে; গণভোটের দিনগুলোয় নিম্ন হিন্দুরা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের কথায় ভরসা রাখতে চায়নি।
সিলেটের গণভোটে মৌলভিদের ভূমিকাও কম ছিল না। মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানির জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ছিল কংগ্রেসের শরিক দল। ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজেও ছিলেন গান্ধীর বন্ধু। আসামের মুসলমানদের ওপর তার প্রভাব ছিল যথেষ্ট। যেহেতু তিনি ভারত ভাগেরই বিরোধিতা করেছেন, অনুসারীদের প্রতি তার নির্দেশনা ছিল যেন বাংলার সঙ্গে সিলেটকে যুক্ত করার বিরোধিতা করা হয়। ভাগাভাগির রাজনীতির বিরুদ্ধে তার লিখিত বই ‘মুত্তাহিদা কউমিয়াত আউর ইসলাম’, যেখানে তিনি কঠোরভাবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের দার্শনিক ভিত্তি দাঁড় করানো ইকবালের মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। মাওলানা মাদানীর অনুসারীরা সিলেটে থেকে নানাভাবেই ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকে। ১৯৪৬ সালে আসামের আইনসভা নির্বাচন হয়, সেখানে সিলেটের দুটি আসন থেকে মাওলানা মাদানির দল জয়যুক্ত হয়। কংগ্রেস মাওলানা মাদানির অবস্থানকে নিজেদের পক্ষের অবস্থান হিসেবেই গ্রহণ করে। এভাবে সিলেটের গণভোটের আগেই পক্ষ বা বিপক্ষের আদর্শিক পাটাতন প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল।
সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ৭ জুলাই ১৯৪৭ সালে। ফল আসে সিলেটকে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে। অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই হস্তান্তর হয় ক্ষমতা। পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে ভোট পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯টি এবং আসামে থাকার পক্ষে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১টি। পূর্ব বাংলার পক্ষে ভোট বেশি পড়ে ৫৫ হাজার ৫৭৮টি। গণভোটের মধ্য দিয়ে আসাম ও সিলেটের ভাগ্য নির্ধারিত হলো। অধিকাংশ অভিজাত মুসলিম সিলেটকে বাংলায় রাখার পক্ষে ছিলেন। হিন্দু অভিজাতরা চেষ্টা করেছেন আসামের সঙ্গে যুক্ত রাখতে। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি এক প্রকার সমাঝোতায় পৌঁছেছিল। বিপরীতে নিম্ন হিন্দুদের অবস্থান ছিল মুসলিম লীগের পক্ষে। আবার মাওলানা আজাদ ও হোসাইন আহমদ মাদানির অনুসারীরা ভোট দিয়েছেন ভারতের পক্ষে। বলতে গেলে কংগ্রেসের চাপের কারণেই কাছাড় ও গোয়ালপাড়া আসামের সঙ্গে থেকে গেল। গণভোটের মধ্যে একই সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ধর্ম, বহুত্ববাদ ও নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ ও সর্বভারতীয়বাদের রাজনীতি বিরাজ করছিল। রাজনীতিতে যে মেরুকরণ তখন দেখা দিয়েছিল; তা বর্তমান আসাম ও সিলেটের রাজনীতি পাঠের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক









