চিন্তার জগতে ঝড় তোলা ফ্রাংকফুর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে কালজয়ী একটি জোকস আছে। জোকসটি কিছুটা এ রকম: জনৈক শিল্পোদ্যোক্তার পুত্র ফেলিক্স ওয়েল একদল জার্মান পণ্ডিতের হাতে ১০ মিলিয়ন রেইচমার্ক (জার্মান মুদ্রার পুরনো নাম) অনুদান তুলে দেন মার্ক্সবাদী তত্ত্বের ওপর ফ্রাংকফুর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য। অনুদানকালে তিনি পণ্ডিতদের বলেছিলেন, ‘আমি চাই গরিব শ্রমিকদের সমস্যা আপনারা খুঁজে বের করবেন।’ ১০ বছর পর ওই পণ্ডিতদের দল তার কাছে এসে বলল, ‘আপনার আর্থিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ। আমরা প্রচুর গবেষণা করে বের করেছি যে গরিব শ্রমিকদের মূল সমস্যা আপনি নিজেই!’

ফ্রাংকফুর্ট স্কুল এভাবেই সমাজের কর্তাব্যক্তিদের দিকে সরাসরি সমালোচনার তীর ছুড়েছিল। ক্ষমতার চূড়ায় বসা শাসক, প্রাচুর্যের রঙে রঙিন পুঁজিপতি অথবা সংস্কৃতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়া ব্যবসাদার কেউই এ স্কুলের হাত থেকে রক্ষা পাননি। জার্মানির কয়েকজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের উদ্যোগে ‘ফ্রাংকফুর্ট ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল রিসার্চ’ নামে ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল সমালোচনামূলক তত্ত্ব ও গবেষণার মানোন্নয়ন। প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পোশাকি স্তর অতিক্রম করে পুঁজিবাদী সমাজের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এখানে চিন্তার চাষাবাদ করে বিখ্যাত হওয়া তাত্ত্বিকদের মধ্যে থিওডর অ্যাডোর্নো (১৯০৩-৬৯), ম্যাক্স হর্কহেইমার (১৮৯৫-১৯৭৩), হার্বার্ট মার্কুস (১৮৯৮-১৯৬৯) ও ওয়াল্টার বেনজামিনের (১৮৯২-১৯৪০) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এদের মধ্যে অ্যাডোর্নো, হর্কহেইমার ও ওয়াল্টার বেনজামিন পণ্ডিত হিসেবে কালোত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

নাৎসি বাহিনী বিশ শতকের তৃতীয় দশকে যখন ইহুদিদের ওপর বর্ণবাদী নিপীড়ন ও বামপন্থীদের দমন করার হীন প্রচেষ্টা শুরু করল, তখন ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের কতিপয় সদস্য ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। চল্লিশের দশকের প্রথম দিকে পলাতক কয়েকজন সদস্যের উদ্যোগে নিউইয়র্কে স্কুলটির অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করা হয়। চল্লিশের দশকের শেষে অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার পুনরায় জার্মানিতে ফিরে আসেন এবং অন্যরা আমেরিকায়ই অবস্থান করে উদারতাবাদ ও প্রায়োগিক সামাজিক বিজ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী আমেরিকান পুঁজিবাদী সমাজের তীক্ষ্ণ সমালোচনার ফলে পণ্ডিত মহলে পুনরায় আলোচিত হয়ে ওঠেন। এ দুজনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নাৎসি বাহিনীর ফ্যাসিবাদী জার্মান রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সর্বগ্রাসবাদ, আমেরিকান একাধিপত্য, ভোক্তামুখী পুঁজিবাদ প্রভৃতি নিয়ে বিতর্কের পথ ধরে ফ্রাংকফুর্ট স্কুল গণমাধ্যম ও জনসংস্কৃতি (পপুলার কালচার) বিষয়ক তাত্ত্বিক আলোচনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। যেসব চিন্তাধারা মাথায় রেখে ফ্রাংকফুর্ট স্কুল তাদের কর্মপরিকল্পনা সাজিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১. সামাজিক জীবনের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব, বিশেষ করে জনসংস্কৃতি বা পপুলার কালচারের পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার নেতিবাচক দিক এবং ২. বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর পপুলার কালচারের আধিপত্য বিস্তারের কারণ ও ফলাফল।

অ্যাডোর্নো-হর্কহেইমার মূলত প্রযুক্তিতাড়িত সংস্কৃতি বা রূপান্তরকামী জনসংস্কৃতির (চলচ্চিত্র, রেডিও, টেলিভিশন, ঝলমলে ফ্যাশন, বিজ্ঞাপন, রক সংগীত, গোয়েন্দা সাহিত্য, কৃত্রিম শিল্পকর্ম) তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, মানুষের জীবন বহুলাংশে যান্ত্রিক বলয়ে আটকে গেছে; কোথাও সামান্যতম মৌলিকত্বের ছোঁয়া নেই। তাদের তত্ত্ববিশ্ব নিংড়ে আটটি স্বতন্ত্র চিন্তাকণা খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন—

এক. পুঁজিবাদ একটি চলমান বিনাশী শক্তি। এর পতন ঘটাতে হবে।

দুই. নিজেদের সুখী মনে করলেও সব মানুষ প্রকৃতপক্ষে অসুখী। দার্শনিক ও সামাজিক বিজ্ঞানীদের এসব বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

তিন. সবকিছু কমিউনিস্ট ভাবাদর্শের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যদিও নিরপক্ষে রাজনৈতিক চিন্তা বলতে কিছু হয় না, তবু যারা বিপ্লবের সরাসরি বিরোধিতা করবে তারা মানুষের পক্ষের শক্তি নয়।

চার. আর্টের বিচার হতে হবে সত্যনিষ্ঠ ও পক্ষপাতশূন্য। ভালো আর্ট বা মন্দ আর্টের বিভেদরেখা না টেনে আর্টের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করতে হবে।

পাঁচ. আর্টের অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে নৈতিকভাবে।

ছয়. আর্টের মধ্যে নিহিত সত্য সমাজকাঠামোর স্বরূপ উন্মোচন করতে সক্ষম। মানুষকে বিষয়ের গভীরে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।

সাত. দর্শন ও বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখা আবিষ্কার বিদ্যাচর্চার জন্য খুবই ক্ষতিকর ও হুমকিস্বরূপ। দর্শন ও বিজ্ঞানের সব শাখা একই ধারায় নিয়ে আসতে হবে।

আট. তর্কের ক্ষেত্রে কাব্যিক ও শৈল্পিক রীতি যৌক্তিক রীতির চেয়ে উত্তম।

জনসংস্কৃতির ওপর গবেষণাকালে অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার তাদের Dialectic of Enlightenment (1947 [1972]) গ্রন্থে সংস্কৃতি কারখানা (Culture Industry) তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন। এটি মূলত কার্ল মার্ক্সের পণ্যপূজা (Commodity Fetishism), বিনিময় মূল্যের কর্তৃত্ব ও একচেটিয়া পুঁজিবাদের সমন্বিত রূপ। সংস্কৃতি কারখানা জনসাধারণের রুচি ও পছন্দের ভিত্তিতে এমনসব সাংস্কৃতিক পণ্য উৎপাদন করে, যেগুলোর মাধ্যমে ব্যবসায়িক সাফল্য লাভের পাশাপাশি এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও সৃষ্টি করা সম্ভব। অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার ‘সংস্কৃতি কারখানা’ শব্দবন্ধের ব্যাখ্যায় বলেছেন:

‘সংস্কৃতি কারখানা পরিচিত ও পুরনোকে নতুন মাত্রায় রূপান্তর করে। এর সব শাখা একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী গণমুখী চাহিদা ও ভোগের প্রকৃতির ধারায় বিপুল পরিমাণ পণ্যের উৎপাদন করে। প্রতিটি শাখা একই কাঠামোয় পারস্পরিক যোগ্যতাবলে কাছাকাছি সংঘবদ্ধ। এটা সম্ভবপর হয়েছে প্রযুক্তিগত সামর্থ্যরে পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের ফলে। সংস্কৃতি কারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই ভোক্তাদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সঙ্গে সংস্কৃতির ভালোমন্দের যে তারতম্য যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, তাতে শৈথিল্য স্থাপন করে। এটি উচ্চমার্গীয় শিল্পকলার সৌন্দর্যকে যেমন বিনষ্ট করে, তেমনি নিম্নবর্গীয় শিল্পকলার স্বকীয়তাও গুঁড়িয়ে দেয় সভ্যতার চমকপ্রদ হাতিয়ারের সাহায্যে। সাধারণ শিল্পকলার যে বিদ্রোহী আবেদন থাকে, তাতেও মন্থর ভাবধারা জুড়ে দেয় সামাজিক সহযোগিতার অনুপস্থিতিতে। মানুষের সচেনতাকে ঘিরে আবর্তিত হলেও মানুষ সংস্কৃতি কারখানার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, মানুষকে যন্ত্রপাতির সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়াই বরং তাদের অভিপ্রায়। ভোক্তারা এখানে অপাঙক্তেয়, সংস্কৃতি কারখানা তাদের বিষয় হিসেবে গণ্য করে, বিষয়ী হিসেবে নয়।’ (Adorno 1991, 85)

সংস্কৃতি কারখানার পণ্যগুলো উৎপাদন করা হয় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে। মুনাফার আকার যত বড় হয়, পণ্যের উৎপাদনও তত বাড়ে। বিষয়ের চেয়ে বস্তু, ভোক্তার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বই এখানে বিবেচ্য। অ্যাডোর্নোর দৃষ্টিতে আনন্দময় জীবন কিংবা নৈতিক দায়িত্বশীলতা, কোনোটাই সংস্কৃতি কারখানার অভিসন্ধি নয়, বরং এর পেছনে সর্বদা সচল থাকে ক্ষমতার কারসাজি। কিন্তু এ ক্ষমতার সিকিভাগও ভোক্তাদের হাতে নেই, উৎপাদক ও পুঁজিপতিরাই সবকিছুর নিয়ন্তা। পণ্যসর্বস্ব এ সংস্কৃতিকে কার্ল মার্কস যেখানে ‘কমোডিটি ফেটিসিজম’ বা ‘পণ্যপূজা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, অ্যাডোর্নো সেখানে খুঁজে পেয়েছেন সংস্কৃতি কারখানা। মানুষকে প্রয়োজনের বাইরেও পণ্যের মোহমায়ায় আচ্ছন্ন করে রাখার জন্য পুঁজিবাদী প্রকল্পগুলো সাজানো হয় সর্বগ্রাসী ছক কষে। তাই সংস্কৃতি কারখানা বাইরে আলো ঝলমল হলেও ভেতরে কালো টলমল।

অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার সংস্কৃতি কারখানার পণ্যগুলোর মধ্যে ‘আবর্জনা’ প্রত্যক্ষ করেছেন। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, রক সংগীত, ম্যাগাজিনের মধ্যে তারা কোনো শিল্পের অস্তিত্ব অনুভব করেননি। তাদের মতে, চলচ্চিত্র কখনো বিশুদ্ধ শিল্পের পর্যায়ে পড়ে না, চলচ্চিত্রের যদিও সহজাত একটা ধর্ম রয়েছে, কিন্তু তাতে প্রতিফলিত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা কাজ করে। আগের দিনে দর্শক চলচ্চিত্র বাস্তব জীবনের সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত তা যাচাই করে নিতেন, কিন্তু বর্তমানে যান্ত্রিক এবং অন্যান্য সুবিধার প্রভাবে চলচ্চিত্রের রূপ এতটাই বাস্তবিক হয়ে উঠেছে যে দর্শক মনে করে এতে যা দেখানো হয় তা-ই প্রকৃত সত্য। সংস্কৃতি কারখানা ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক শিল্প-উপাদানগুলোর ব্যবহারযোগে এমন চলচ্চিত্র উপহার দেয়, যা দেখে দর্শক বাস্তব জীবন থেকে পর্দার জীবন আলাদা করতে পারেন না এবং অনেক সাধারণ দর্শক চলচ্চিত্রের জীবনযাপন, দর্শন, সংলাপ তাদের যাপিত জীবনে প্রয়োগ করতে চান। চলচ্চিত্রের এমন প্রতিক্রিয়া সাধারণ্যে অনেক জটিলতা সৃষ্টির কারণ।

সংস্কৃতি কারখানা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে একটি সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এ সম্পর্ক অবশ্যই পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে সক্রিয় থাকে। অ্যাডোর্নো উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, একটি যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি রেডিও কারখানার যেমন নির্ভরশীলতার সম্পর্ক, একটি চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তেমন ব্যাংকের যুক্ততা রয়েছে। আজকাল টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোয় বিরাট অংশজুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়, তারা বহু আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করে। একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান পণ্যের প্রচারণার সুবিধার্থে সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পেছনে অঢেল অর্থের জোগান দেয়। ব্যাপক জনসমাগম ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন প্রকল্পের ব্যয়ভারও অনেক সময় পুরোটাই বহন করে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনো কোনো অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা, পরিকল্পনা ও বিজ্ঞাপনের সর্বত্রই পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া প্রতিষ্ঠানের লোগো ও নাম প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা জুড়ে দেয়া হয়। অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমারের মতে, এমন প্রস্তাব সংস্কৃতির স্বাধীন

বিকাশের পথ সংকুচিত করে এবং সংস্কৃতির পণ্যায়নকে উৎসাহিত করে।

অ্যাডোর্নো জনপ্রিয় সংগীত বা পপ সংগীত নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সংগীতকে তিনি শুধু বিনোদনের উপকরণ হিসেবে নেননি, বরং সামাজিকতা ও দার্শনিকতার অন্যতম উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সংগীত ভাবনা তার বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বরাবরই উদ্দীপনা জুগিয়েছে। এজন্যেই তিনি সংগীতকে দর্শনসমৃদ্ধ শিল্পকলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে তিনি সবসময়ই সংগীতের বুর্জোয়াকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার মতে, সংস্কৃতি কারখানা সংস্কৃতির ধ্রুপদি আবেদন নষ্ট করেছে এবং সংগীতকে একটি ‘সাংস্কৃতিক পণ্য’ হিসেবে বাজারমুখী করেছে। সংগীত এখন একটি বিশেষ ভঙ্গির, বিশেষ শিল্পীর, বিশেষ গায়কীর চক্রে আটকে গেছে। অবাধ যান্ত্রিকীকরণের ফলে সংগীতের ভাষা, ভাব ও সুরের মধ্যে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। অ্যাডোর্নোর মতে, জনপ্রিয় সংগীত উৎপাদন হয় প্রমিতকরণ ও ফিউশনের মাধ্যমে। এতে কথা ও সুরের এত বাঁকবদল ঘটে যে কখনো মনে হতে পারে সংগীতের মূল ভাবটুকুও বুঝি আর অবশিষ্ট নেই।

ফ্রাংকফুর্ট স্কুলের সংস্কৃতি কারখানা তত্ত্বটি পুঁজিবাদী সমাজের যৌক্তিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্র প্রসারিত করলেও সমালোচকদের মতে, অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমার জনসংস্কৃতির বিচার যেভাবে করেছেন, তার কোনো প্রায়োগিক প্রমাণ নেই। ভোক্তাদের ওপর গবেষণা না চালিয়েই তারা তাদের নিজস্ব মতামতের ওপর ধারণাটি উপস্থাপন করেছেন। তাছাড়া এতে ভাষাগত জটিলতাও বিদ্যমান। মার্ক্সের ‘পণ্যপূজা’ ও জনসংস্কৃতির ‘বিনিময় মূল্যের কর্তৃত্ব’ যেভাবে একই সূত্রে গাথা হয়েছে, তার কোনো বাস্তবিক ভিত্তি নেই। ফ্রাংকফ্রুট স্কুলেরই প্রতিনিধি ওয়াল্টার বেনজামিনের সঙ্গে এখানেই অ্যাডোর্নো ও হর্কহেইমারের মতাদর্শিক পার্থক্য। বেনজামিন সংস্কৃতি থেকে রাজনীতির পৃথককরণের বিপক্ষে ও সময়ের চাহিদার কারণেই যে সংস্কৃতির আধুনিকায়ন জরুরি, সে বিষয়েও তার দ্বিধা নেই। তিনি মনে করেন, নতুন ফ্যাশন, রুচি, বিনোদন মানুষের জন্যই এবং এগুলোর ব্যখ্যা রাজনৈতিকভাবে না হওয়াই উচিত।

গ্রন্থপঞ্জি

Adorno, Theodor, The Culture Industry, London, Routledge, 1991.

Danesi, Marcel, Popular Culture: Introductory Perspective, Fourth Edition, 2018.

MacDonald, D. A Theory Of Mass Culture, In B. Rosenberg and D. White (Eds) Mass Culture, 1957

Smith, Philip, Cultural Theory: An Introduction, USA, 2001.

[রচনাটি ২০২৪ সালে প্রকাশিত লেখকের সংস্কৃতি চিন্তার কারখানা গ্রন্থে প্রকাশিত নিবন্ধের ঈষৎ পরিমার্জিত রূপ]

শারফিন শাহ: লেখক