অনেকে শিরোনামের মধ্যে অন্য কিছু খুঁজলেও এটাই সত্য হোসেন শহীদ সত্যিকার অর্থেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কালপুরুষ। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকতেই পারে অনেকের এ ভাবনার মধ্যে। সারা উপমহাদেশে সুফি ও আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী প্রায় আট-নয়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অখণ্ডিত বাংলার মেদিনীপুরে এ পরিবারের বাস প্রায় ২০০ বছরের অধিক সময়।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাজনীতিতে প্রবেশ সম্পর্কে লিখেছেন: ১৯২০ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করে আমি বাংলার আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হই এবং খেলাফত সংগঠনে যোগ দিই এবং কলকাতা খেলাফত কমিটির অনেক বছর সম্পাদক ছিলাম। প্রথমদিকে আমি কংগ্রেসে যোগ দিই এবং মেয়র সি আর দাশের সঙ্গে কলকাতার ডেপুটি মেয়র ছিলাম।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী তরুণ ব্যারিস্টার হোসেন সোহরাওয়ার্দী। ১৯২১ সালে কলকাতার খিদিরপুর শিল্প এলাকার বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিতে আলোড়নের মধ্যে তার প্রবেশ। অসহায় প্রজার ওপর জমিদারের নিপীড়ন, পরাধীন জাতির ওপর শ্বেতাঙ্গ শাসকের সীমাহীন অত্যাচার দেখে মূলত রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। বয়সে নবীন হলেও ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে আপসহীন ও সাহসী ভূমিকা পালনে পিছপা হননি কোনো সময়। অক্সফোর্ডে শিক্ষাপ্রাপ্ত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আইন পরিষদে অসাধারণ প্রার্থিতা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অনলবর্ষী ও ক্ষুরধার বক্তব্য অল্প দিনেই পরিষদের ভেতর ও বাইরে সব মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। রাজনৈতিক জীবনে অল্পদিনেই শহীদ সোহরাওয়ার্দী একজন আপসহীন, অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতার স্বীকৃতি আদায়ে সমর্থ হন। এ সময় ব্রিটিশ সরকার আইনসভায় ভারতীয়দের দমনের উদ্দেশ্যে বেত্রাঘাত বিল উত্থাপন করে। তিনি ঘৃণার সঙ্গে এবং উদাত্ত কণ্ঠে বলেন, ‘ভারতীয়রা পশু নয়। তাদের সাদা প্রভুদের মতো তারাও মানুষ। ব্রিটিশদের মতো তাদেরও অনুভূতি আছে। পৃথিবীর অন্যান্য সভ্য জাতির মতো আত্মসম্মান আছে। উত্থাপিত হলে বিলটি ব্রিটিশ সরকার মনোনীত সদস্যদের দ্বারা পাস হতে পারে, কিন্তু তা হবে মনুষ্যত্বের বিরুদ্ধে। আমরা দাশ ছিলাম না। আমরা ব্রিটিশদের পশুশক্তির নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সভ্যতার যেকোনো মাপকাঠিতে আমরা শ্রেষ্ঠ ছিলাম।’ ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তার এ নির্ভীক হুঁশিয়ারি ভারতীয় তরুণদের অতি সহজেই উজ্জীবিত করেছিল সেদিন। অন্যদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের দৃষ্টিতেও পড়েন ব্রিটিশ সরকারবিরোধী এ তরুণ রাজনীতিবিদ এবং ক্রমে তিনি দেশবন্ধুর সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তী সময়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী অকাট্য যুক্তির দ্বারা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে বোঝাতে সমর্থ হন যে রাজনৈতিক, সামজিক, আর্থিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলমানদের সহযোগিতা পেতে হলে জনসংখ্যা অনুপাতে সব ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকা অপরিহার্য, হিন্দু-মুসলমান ঐক্যবদ্ধ না হলে ভারতের স্বাধীনতা লাভও সম্ভব নয়। মুসলমান সম্প্রদায় যদি শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে, তবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কখনই ঐক্য গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। আমরা জানি, এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৪ সালে সম্পাদন হয় চিত্তরঞ্জন দাশের ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্ট, যারা ভিত্তিতে শতকরা ৫৬টি সরকারি চাকরি বরাদ্দ হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কংগ্রেস ত্যাগ করে ‘স্বরাজ দল’ তৈরি করলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী এ দলে যোগ দেন এবং ডেপুটি লিডারের দায়িত্ব নেন। দেশবন্ধুর অগাধ আস্থা ছিল শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওপর। ১৯২৫ সালের ১৬ জুন অকস্মাৎ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে বাঙালি জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়, যা পরবর্তী সময়ে পূরণ হয়নি আর কোনো নেতার মাধ্যমে। এ কথা সত্য, বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রাধান্য পায় দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর এবং বাতিল হয়ে যায় হিন্দু-মুসলমান সুসম্পর্কের ঐতিহাসিক দলিল বেঙ্গল প্যাক্ট। এই সঙ্গে স্বরাজ দলের সঙ্গেও সম্পর্কের ইতি টানতে বাধ্য হন এবং করপোরেশন থেকে পদত্যাগ করেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মুসলিম লিগের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছিলেন ১৯৩৬ সালে অথচ এ দলের জন্ম ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব বাড়িতে। এ মধ্যবর্তী সময়ে সোহরাওয়ার্দী যুক্ত থেকেছেন কংগ্রেস অথবা স্বরাজ দলের সঙ্গে। ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত শহীদ সোহরাওয়ার্দী পিছিয়ে পড়া নিজ সম্প্রদায়ের যাবতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজে মন দেন—এ কথা সত্য। কিন্তু নিজে সাম্প্রদায়িক হননি কোনোদিন। আচরণ, দায়িত্ববোধ ও নীতিনির্ধারণের মধ্য দিয়ে একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষের চেহারা ফুটে উঠেছে তার মধ্যে সবসময়। অন্যদিকে তিনি ছিলেন গণতন্ত্রমনা। অখণ্ডিত বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে যে নীতি অনুসরণ করেছিলেন তাতে দেখা যায়, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণভাবে গণতন্ত্রের মানসপুত্র। ব্রিটিশ শাসনামলে অখণ্ডিত বাংলার প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসে তিনি প্রথমেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার মামলার বন্দিসহ মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন সব রাজবন্দির। তার শাসনামলে ভারত রক্ষা আইনে কোনো রাজনৈতিক দলের
কর্মীকে গ্রেফতারের নজির পর্যন্ত নেই। এতৎসত্ত্বেও বলা যায়, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর শাসনামলকে কলঙ্কিত করেছিল, ’৪৬-এর ১৬ আগস্টের কলকাতা দাঙ্গা; যা সেদিনের মুসলিম লিগ কাউন্সিল প্রত্যক্ষ দিবস (Direct Action Day) রূপে ঘোষণা করেছিল। দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর দায় তার অবশ্যই থেকে যায়, যেহেতু বাংলা সরকারের তিনিই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। শতাব্দীর মানবতাবিরোধী ঘৃণিত এ দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, আহত হয়েছিলেন প্রচুরসংখ্যক এবং বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্বও হয়েছিলেন অনেকেই। প্রায় ৭৬ বছর পার হয়ে এসে তার জন্য আজও অনেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেই এককভাবে দায়ী করেন; বিষয়টি এখনো বিতর্কের আলোচনায় উঠে আসে। এককভাবে মোটেও সেদিনের কুৎসিত দাঙ্গার জন্য দায়ী ছিলেন না হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। উদাহরণসহ বলা যায়, কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক জনম মুখোপাধ্যায়ের হাল আমলে লেখা গ্রন্থ ‘হাংরি বেঙ্গল: ওয়্যার, ফেমিন অ্যান্ড দি এন্ড অব এম্পায়ার’ গ্রন্থে তথ্য সহযোগে তিনি ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নিয়ে মিথ্যাচারের পর্দা ফাঁস করেছেন। এছাড়া ‘বাঙলা ভাগ হল’ বইয়ে জয়া চ্যাটার্জির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের কথা আমরা অনেকেই জানি। চিন্তক অন্নদাশঙ্কর রায়ও একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, সোহরাওয়ার্দী কোনোক্রমেই এককভাবে ছেচল্লিশের দাঙ্গার জন্য দায়ী নন। তিনি পরিষ্কারভাবে আরো বলেছেন, ‘এক হাতে তালি বাজে না। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার লোকেরাও আগে থেকে তৈরি ছিল।’
মেদিনীপুরে উপমহাদেশের বনেদি সোহরাওয়ার্দী পরিবারে ১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জন্ম। ছেলেবেলায় মা খুজিস্তা আক্তার বানু ও মামা উপমহাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তক স্যার আবদুল্লাহ আল মামুন সোহরাওয়ার্দীর কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ভর্তি হন আলিয়া মাদ্রাসায়। অনার্সসহ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯১১ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে। মায়ের একান্ত ইচ্ছায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন আরবি ভাষা ও সাহিত্যে ১৯১৩ সালে।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুনরায় বিএসসি অনার্স ডিগ্রি এবং দুর্লভ বিসিএস লাভের পর এমএ ডিগ্রিও সম্পন্ন করেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ইংরেজি বিষয়ে। ১৯২০ সালে গ্রেজ-ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে দেশে ফিরে আসেন। শুরু করেন একই সঙ্গে ব্যারিস্টারি ও রাজনীতি। মায়ের মৃত্যু হয় ১৯১৯ সালে। ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের রাজনৈতিক সংকট তার তরুণ মানসে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ইংল্যান্ডের আলোকিত মানুষের সঙ্গে যেমন তার পরিচয় ঘটে, একইভাবে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে যেসব তরুণ ইংল্যান্ডে পড়াশোনার জন্য যান তাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। বাঙালি তরুণদের সঙ্গে তার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। সম্ভবত বিশ শতকের শুরুর বাস্তবতাকে ইংল্যান্ডে বসে সাত বছর ধরে দেখা, বোঝা ও করণীয় নির্ধারণ করেই তিনি দেশে ফেরেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সুদূর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের এক হোটেল কক্ষে স্বজনহীন নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে, বিশেষত বাংলা ও বাঙালির স্বার্থ সমন্বিত দাবি নিয়েই তার লাগাতার সংগ্রাম ছিল। স্বাধীনতার অব্যবহিত আগে শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্বার্থান্বেষী মহলের নাগপাশ থেকে বাংলাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ভারত ও পাকিস্তানের বাইরে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা রাষ্ট্রের রূপরেখা তৈরি করে একটি প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেন বাংলার জনগণের মধ্যে। সেদিন তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, কিরণ শঙ্কর রায় প্রমুখ। নানা কারণে, বিশেষত সেদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যদিও তার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ; স্বভাবতই স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি শেষ পর্যন্ত। সেদিন তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন, উপমহাদেশের দুই প্রান্তে হাজার মাইল ব্যবধানে একটি দেশের অস্তিত্ব শুধু কল্পনায় সম্ভব হলেও বাস্তবে সম্ভব নয়। এজন্যই তিনি চেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা।
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করে দুটি স্বাধীন দেশ ভারত ও পাকিস্তান; একই সঙ্গে ভাগ হয়ে যায় বাংলা ও পাঞ্জাব। নিজ সম্প্রদায়কে সাহস জোগানোসহ উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও শান্তি রক্ষায় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দিনরাত তিনি বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জায়গায়—যা ইতিহাসে ‘সোহরাওয়ার্দী-গান্ধি শান্তি মিশন’ বা ‘গান্ধি শান্তি মিশন’ নামে খ্যাত। অকস্মাৎ ১৯৪৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে হঠাৎ থেমে যায় শান্তি মিশনের সব কর্মকাণ্ড। স্বভাবতই নিজের নিরাপত্তাহীনতায় এবার ভুগতে থাকেন নিঃসঙ্গ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কলকাতায় শেষ আশ্রয় পিতার মৃত্যুর পর বন্ধুবান্ধবের আর্থিক সহযোগিতায়, ১৯৪৯ সালের ৫ মার্চ সম্পূর্ণ রিক্ত হাতে কলকাতা ছেড়ে চিরতরে চলে যান করাচি। এর মাধ্যমে ছিন্ন হয়ে যায় প্রায় ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রিয় আবাসভূমি এবং আবাল্যের বেড়ে ওঠার জায়গা কলকাতার সঙ্গে তার সম্পর্ক। কলকাতা ছিল তার কাছে রাজনৈতিক দুর্গ এবং এখান থেকেই তিনি রাজনীতি করেছেন সারা ভারতে।
এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যেতে পারে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একজন প্রকৃত জাতীয় নেতা। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর মুহূর্তেই সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের বিলোপ সাধন করে পাকিস্তানে মুসলিম সরকারের পরিবর্তে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছিলেন জিন্নাহর কাছে। দেশ বিভাগের পর তিনি আর দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতি বা মুসলিম লিগ দলে যুক্ত থাকতে চাননি। হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান মিলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী বিশ্বাসী ছিলেন এক জাতীয়তায় : সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তাই তিনি করেননি। এ উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই শুধু নয়, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিলোপ সাধন এবং জাতীয় ঐক্যের বিকাশেও সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা অনন্যসাধারণ। পাকিস্তানের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ বিকাশের ক্ষেত্রে আধুনিক চিন্তাধারার প্রবর্তক ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে তিনিই অগ্রদূত। মধ্যযুগীয় চিন্তা-চেতনার বন্ধন থেকে দেশকে মুক্ত করতে তার ছিল অনন্য ভূমিকা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পেছনে তারই ছিল সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব। সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন চৌকশ পার্লামেন্টারিয়ান ও দক্ষ প্রশাসক। জীবনে সময়ের মূল্য সম্পর্কে তিনি ছিলেন অতি সচেতন, কর্মব্যস্ততাই ছিল তার জীবনের বৈশিষ্ট্য। ১৯৫৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কাগমারীতে বলেন, ‘আমি অধীর আগ্রহে সেই বাঞ্ছিত দিনটিরই প্রতীক্ষা করছি, যেদিন হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-পারসি বা বৌদ্ধ—অর্থাৎ দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক বৈষম্যমুক্ত, সমমর্যাদাসম্পন্ন পরিবেশে বসবাস করতে পারবে।’
লাস্ট ডেজ অব ব্রিটিশ রাজ গ্রন্থের লেখক লিওনার্ড মজলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন, ‘এ কথা অকুণ্ঠ চিত্তে স্বীকার করতে হয় যে তার মতো যোগ্য প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে কেউ ছিলেন না। বেপরোয়া আত্মত্যাগ, নিঃস্বার্থ দেশসেবা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা ছিল তার নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বহুমুখী প্রতিভা তাকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে। মানবসেবায় তিনি ছিলেন উৎসর্গীকৃত প্রাণ। তার দানশীলতা দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের হৃদয় জয় করেছে।’
আক্ষেপের বিষয়, বিশ শতকের অন্যতম প্রতিভাধর নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের রাজনীতিতে তেমনভাবে সুযোগমতো কাজ করার ক্ষেত্র পাননি এবং তার মূল্যবান পরিষেবা থেকে সে দেশ বঞ্চিত হয়েছে।
আলিমুজ্জমান: ‘সোহরাওয়ার্দী পরিবার: ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার’ গ্রন্থের লেখক








